জামে আত-তিরমিযী 47 · Chapters on Tafsir
আপনার ভাষায় এখনো কোনো অনুবাদ নেই — ইংরেজি দেখাচ্ছে
2950। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি সঠিক ইলম ব্যতীত কুরআন প্রসঙ্গে কোন কথা বলে, সে যেন জাহান্নামকে নিজের জন্য বাসস্থান বানিয়ে নিল। যঈফ, মিশকাত (২৩৪) নাকদুত তাজ আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
2951। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ নিশ্চিতভাবে যা তোমাদের জানা আছে তা ব্যতীত আমার নিকট হতে হাদীস বর্ণনা করা থেকে তোমরা নিবৃত্ত থাকবে। কারণ যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করে সে যেন জাহান্নামকে নিজের আবাস বানিয়ে নিল। আর যে ব্যক্তি নিজের খেয়াল মর্জিমত কুরআন প্রসঙ্গে কথা বলে সেও যেন জাহান্নামকে নিজের গৃহ বানিয়ে নিল। যঈফ, মিশকাত (২৩৫), নাকদুত তাজ, যঈফা (১৭৮৩), সিফাতুস সালাত আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান।
2952। জুনদাব ইবনু আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি নিজের মত অনুযায়ী কুরআন প্রসঙ্গে কথা বলে, সে সঠিক বললেও অপরাধ করলো (এবং সঠিক ব্যাখ্যা করলো-সেও ভুল করলো)। যঈফঃ মিশকাত (২৩৫), নাকদুত তাজ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি গারীব। কোন কোন হাদীস বিশারদ এ হাদীসের রাবী সুহাইল ইবনু আবূ হাযমের সমালোচনা করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কিছু বিশেষজ্ঞ সাহাবী ও অন্যান্যদের সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তারা (উক্ত বিষয়ের) জ্ঞান ব্যতীত কুরআনের তাফসীর করার ব্যাপারে খুবই কঠোর মত ব্যক্ত করেছেন। মুজাহিদ, কাতাদাহ (রাহঃ) প্রমুখ বিশেষজ্ঞ আলিম প্রসঙ্গে বর্ণিত আছে যে, তারাও কুরআনের তাফসীর করেছেন। তাদের প্রসঙ্গে অবশ্য এ ধারণা করার সুযোগ নেই যে, তারা কুরআন প্রসঙ্গে মনগড়া কিছু বলেছেন বা জ্ঞান ছাড়া কুরআনের তাফসীর করেছেন অথবা নিজেদের থেকে কুরআন ব্যাখ্যায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তাদের প্রসঙ্গে আমরা যে মন্তব্য করেছি যে, তারা জ্ঞান ছাড়া কুরআন প্রসঙ্গে কিছু বলেননি, তাদের বক্তব্য হতেও তার সমর্থন পাওয়া যায়। হুসাইন ইবনু মাহদী আল-বাসরী, 'আবদুর রাযযাক্ হতে, তিনি মামার হতে, তিনি কাতাদাহ (রাহঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, কাতাদাহ্ (রহঃ) বলেন, কুরআনের এমন কোন আয়াত নেই যার (ব্যাখ্যা) প্রসঙ্গে আমি কিছু শুনিনি। সানাদ সহীহঃ মাকুতু"। ইবনু আবী উমার সুফিয়ান ইবনু উয়াইনাহ হতে, তিনি আ'মাশ(রহঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, মুজাহিদ (রাহঃ) বলেছেন, আমি যদি ইবনু মাসউদ (রাযিঃ)-এর কিরআতের অনুসরণ করতাম, তাহলে কুরআনের এমন অনেক বিষয় যে প্রসঙ্গে ইবনু আব্বাস (রাযিঃ)-কে প্রশ্ন করেছি সেগুলো প্রসঙ্গে আমি তাকে প্রশ্ন করার প্রয়োজনবোধ করতাম না। সানাদ সহীহঃ মাকুতু"।
2954। আদি ইবনু হাতিম (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ইয়াহুদীরা অভিশপ্ত এবং নাসারাগণ পথভ্রষ্ট .... তারপর পূর্ণ হাদীস বর্ণনা করেন। সহীহঃ তাখরাজু শারহিল আকীদাতিত তাহাবীয়া (৫৩১), সহীহাহ (৩২৬৩)।
2955। আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা'আলা পৃথিবীর সর্বত্র হতে এক মুঠো মাটি নিয়ে আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করেছেন। তাই আদম-সন্তানরা মাটির বৈশিষ্ট্য প্রাপ্ত হয়েছে। যেমন তাদের কেউ লাল, কেউ সাদা, কেউ কালো বর্ণের আবার কেউ বা এসবের মাঝামাঝি, কেউ বা নরম ও কোমল প্রকৃতির। আবার কেউ কঠোর প্রকৃতির, কেউ মন্দ স্বভাবের, আবার কেউ বা ভালো চরিত্রের। সহীহঃ মিশকাত (১০০), সহীহাহ (১৬৩০)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
2956। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলার বাণী “তোমরা সিজদাবনত শিরে প্রবেশ করো"- (সূরা বাকারাহ ৫৮)-এর ব্যাখ্যায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তারা (বনী ইসরাঈল) তাদের নিতম্বে ভর করে দরজা দিয়ে প্রবেশ করেছিল। একই সনদে “কিন্তু যারা অন্যায় করেছিল, তারা তাদের যা বলা হয়েছিল তার পরিবর্তে অন্য কথা বলল”— (সূরা আল-বাকারাহঃ ৫৯) এ আয়াত প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তারা (হিত্তাতুন-এর পরিবর্তে) বলেছিল, “হাব্বাতুন ফী শারাতিন” যবের মধ্যকার শস্যদানা’। সহীহঃ বুখারী (৪৪৭৯), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
2957। আবদুল্লাহ ইবনু আমির ইবনু রাবী'আহ (রহঃ) হতে তার বাবার সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক অন্ধকার রাতে আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে সফরে ছিলাম। আমরা ধারণা করতে পারছিলাম না কিবলাহ কোন দিকে হবে। কাজেই আমাদের সকলেই নিজ নিজ ধারণা মোতাবিক কিবলার দিক নির্ধারণ করে নামায আদায় করে। আমরা বিষয়টি সকাল বেলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উত্থাপন করলাম। তখন নাযিল হয়ঃ “তোমরা যে দিকেই মুখ ফিরাও সেদিকই আল্লাহ তা'আলার চেহারা”— (সূরা বাকারাহঃ ১১৫)। হাসানঃ ইবনু মা-জাহ (১০২০)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি গারীব। আমরা আশ'আস আস-সাম্মান আবুর রাবী বর্ণনাকারী কর্তৃক আসিম ইবনু উবাইদুল্লাহর হাদিস ব্যতীত আর কারো নিকট হতে এটিকে অবহিত নই। আর আশ'আসকে হাদীস শাস্ত্রে দুর্বল বলে অভিহিত করা হয়েছে।
2958। ইবনু উমার (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা হতে মাদীনায় ফেরার পথে তার সাওয়ারী তাকে নিয়ে যে অভিমুখে অগ্রসর হত তিনি সেদিকে ফিরেই নফল নামায আদায় করতেন। তারপর ইবনু উমর (রাযিঃ) এই আয়াত পাঠ করেনঃ পূর্ব ও পশ্চিম আল্লাহ তা'আলারই। অতএব তোমরা যেদিকেই মুখ ফিরাও সেদিকই আল্লাহ তা'আলার চেহারা”— (সূরা আল-বাকারাহ ১১৫)। ইবনু উমর (রাযিঃ) বলেন, এ প্রসঙ্গেই উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়। সহীহঃ সিফাতুস সালাত, মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। কাতাদাহ্ (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি এ আয়াত প্রসঙ্গে বলেন যে, এর নির্দেশ রহিত (মানসূখ) হয়ে গেছে। রহিতকারী (নাসিখ) আয়াতটি হলঃ “অতএব তুমি মাসজিদুল হারামের দিকে তোমার মুখ ফিরাও”— (সূরা আল-বাকারাহ ১৪৪)। শাতরাল মসজিদিল হারাম" অর্থাৎ “কাবার দিকে”। তার এই মত নিম্নোক্ত সূত্রে বর্ণিত হয়েছেঃ মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল মালিক ইবনু আবূশ শাওয়ারিব-ইয়াযীদ ইবনু যুরাইহ হতে, তিনি সাঈদ হতে, তিনি কাতাদাহ (রাহঃ) হতে। মুজাহিদ (রাহঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি ফাছাম্মা ওয়াজহুল্লাহ" অর্থ করেছেন, “ফাসাম্মা কিবলাতুল্লাহ" (সেদিকেই আল্লাহ তা'আলার কিবলাহু রয়েছে)। তার এই মত নিম্নোক্ত সূত্রে বর্ণিতঃ আবূ কুরাইব মুহাম্মাদ ইবনুল আল-ওয়াকী হতে, তিনি নাযর ইবনু আরাবী হতে, তিনি মুজাহিদ (রাহঃ) হতে। সানাদ সহীহ, মাকতু।
2959। আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা যদি মাকামে ইবরাহীমের পেছনে নামায আদায় করতাম (তাহলে ভালো হত)। এ প্রসঙ্গেই অবতীর্ণ হয়ঃ “তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে (ইবরাহীমের দাড়াবার স্থানকে) নামাযের জায়গা হিসেবে গ্রহণ কর”— (সূরা আল-বাকারাহ ১২৫)। সহীহঃ বুখারী (৪৪৮৩), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
2960। আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, "উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ) বলেছেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি মাকামে ইবরাহীমকে যদি নামাযের জায়গা হিসেবে গ্রহণ করতেন! এ প্রসঙ্গেই অবতীর্ণ হয়ঃ “ওয়াত্তাখিযু মিম মাকামি ইবরাহীমা মুসাল্লা”। তোমরা ইবরাহীমের দাঁড়াবার স্থানকে নামাযের জায়গা বানিয়ে নাও। সহীহঃ বুখারী ও মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। ইবনু উমার (রাযিঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে।
2961। আবূ সাঈদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলার বাণী “এভাবে আমি তোমাদেরকে এক ন্যায়নিষ্ঠ জাতিরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছি" (সূরা বাকারাহ ১৪৩) প্রসঙ্গে বলেছেনঃ ওয়াসাতান অর্থ আদলান (ন্যায়নিষ্ঠ)। সহীহঃ বুখারী (৪৪৮৭), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। আবূ সাঈদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (কিয়ামত দিবসে) নূহ (আঃ)-কে ডেকে বলা হবে, তুমি কি (তোমার সম্প্রদায়কে আল্লাহ তা'আলার বাণী) পৌছে দিয়েছিলে? তিনি বলবেনঃ হ্যাঁ। তারপর তার সম্প্রদায়কে ডেকে প্রশ্ন করা হবেঃ তিনি কি তোমাদের নিকট (আল্লাহ তা'আলার বাণী) পৌছিয়েছিলেন? তারা বলবে, আমাদের নিকট কোন সতর্ককারী আসেনি। আমাদের নিকট কেউই আসেনি। তখন তাকে বলা হবে, আপনার সাক্ষী কারা? তিনি বলবেনঃ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার উন্মাতগণ। তারপর তোমাদেরকে ডেকে আনা হবে। তোমরা সাক্ষ্য দিবে যে, নিশ্চয়ই তিনি (দাওয়াত) পৌঁছে দিয়েছিলেন। তার প্রামাণ হচ্ছে বারাকাতময় আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ “এভাবে আমি তোমাদেরকে এক ন্যায়নিষ্ঠ জাতিরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছি। যাতে তোমরা মানব জাতির জন্য সাক্ষীস্বরূপ এবং রাসূল তোমাদের সাক্ষীস্বরূপ হবে”— (সূরা আল-বাকুরাহ ১৪৩)। সহীহঃ বুখারী (৪৪৮৭)। মুহাম্মাদ ইবনু বাশশার-জাফার ইবনু ‘আওন হতে, তিনি আমাশ (রাহঃ) হতে এই সূত্রেও একই রকম বর্ণনা করেছেন। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
2962। আল-বারাআ ইবনু আযিব (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাদীনায় পদার্পণ করে ষোল বা সতের মাস পর্যন্ত বাইতুল মাকদিসের দিকে (ফিরে) নামায আদায় করেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কা'বার দিকে (মুখ করে) নামায আদায় করার আগ্রহ পোষণ করতেন। এ প্রেক্ষিতেই আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেনঃ “আকাশের দিকে তোমার বারবার তাকানোকে আমি অবশ্যই লক্ষ্য করেছি। কাজেই আমি তোমাকে অবশ্যই এমন কিবলার দিকে ফিরিয়ে দিচ্ছি যা তুমি পছন্দ কর। অতএব তুমি মাসজিদুল হারামের দিকে তোমার মুখ ফিরাও”— (সূরা আল-বাক্কারাহঃ ১৪৫)। ফলে কাবার দিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া হলো। আর তিনি এটাই পছন্দ করতেন। এক লোক তার সাথে আসরের নামায আদায় করে একদল আনসারীর সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। তারা তখন বাইতুল মাকদিসের দিকে (মুখ করে) আসরের নামাযের রুকূতে ছিল। তিনি বললেন, এই লোকটি সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, সে রাসূলুল্লাহ -এর সাথে নামায আদায় করে এসেছে। আর প্রকৃত অবস্থা এই যে, (নামাযে) কাবার দিকে মুখ ফিরানো হয়েছে। তারাও তৎক্ষণাৎ রুকূ’ অবস্থায়ই (কাবার দিকে) ঘুরে যান। সহীহঃ সিফাতুস সালাত, বুখারী (৪৪৯২), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। সুফইয়ান সাওরীও এটি আবূ ইসহাক হতে বর্ণনা করেছেন।
2963। ইবনু উমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, তারা (কুবা মসজিদে) ফজরের নামাযে রুকু অবস্থায় ছিলেন। সহীহঃ প্রাগুক্ত, ইরওয়াহ (২৯০), বুখারী (৪৪৮৮), মুসলিম। এ অনুচ্ছেদে আমর ইবনু আওফ আল-মুযানী, ইবনু উমার, উমারাহ ইবনু আওস ও আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতেও হাদীস বর্ণিত আছে। আবূ ঈসা বলেন, ইবনু উমর (রাযিঃ)-এর বর্ণিত হাদীসটি হাসান সহীহ।
2964। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কাবার দিকে ফিরিয়ে দেয়া হলে সাহাবীগণ তাকে প্রশ্ন করেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের যেসব ভাই বাইতুল মাকদিসের দিকে (ফিরে) নামায আদায় করা অবস্থায় মারা গেছেন তাদের কি হবে? আল্লাহ তা'আলা তখন নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন (অনুবাদ) “আল্লাহ তা'আলা তোমাদের ঈমানকে বিনষ্ট করেন না”— (সূরা আল-বাকারাহঃ ১৪৩)। সহীহ লিগাইরিহীঃ তা’লীকাতু হাসান (১৭১৪), বুখারী। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
2965। উরওয়া (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আয়িশাহ (রাযিঃ)-কে বললাম, যে ব্যক্তি সাফা ও মারওয়ার তাওয়াফ (সাঈ) করেনি আমি তাতে সমস্যা মনে করি না। আমি নিজেও এ দুই পাহাড়ের মাঝে তাওয়াফ না করতে কোন পরোয়া করি না। আয়িশাহ্ (রাযিঃ) বললেন, হে আমার বোন পুত্র! তুমি যা বললে তা খুবই অন্যায় কথা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে এই দুই পাহাড়ের মাঝে তাওয়াফ করেছেন, মুসলিমরাও এর তাওয়াফ করেছেন। তবে মুশাল্লাল’ নামক স্থানে স্থাপিত মানাত নামক প্রতিমার নামে যেসব কাফির ইহরাম বাধতো তারা সাফা ও মারওয়ার তাওয়াফ করত না। অতঃপর বারকাতময় আল্লাহ তা’আলা অবতীর্ণ করেনঃ “যে লোক বাইতুল্লাহর হজ্জ করে বা উমরা করে এই পাহাড়দ্বয়ের মাঝে তাওয়াফ করায় তার কোন সমস্যা নেই”- (সূরা আল-বাকারাহ ১৫৮)। তোমাদের কথাই যদি সঠিক হত, তাহলে এভাবে বলা হতঃ “ফালা জুনাহা আলাইহি আল-লা ইয়াত্তাওয়াফা বিহিমা” (এই পাহাড়দ্বয়ের মাঝে তাওয়াফ না করাতে কোন সমস্যা নেই)। যুহরী (রাহঃ) বলেন, আমি আবূ বাকর ইবনু আবদুর রাহমান ইবনুল হারিস ইবনু হিশামের নিকট এটি বর্ণনা করলে তিনি খুবই আনন্দিত হন এবং বলেন, এটা তো হল ইলমের (জ্ঞানের) কথা! আমি বহু আলিমকে বলতে শুনেছি, যেসব আরববাসী সাফা-মারওয়ার তাওয়াফ করে না তারা বলে, এ দুটি পাহাড়ের মাঝে তাওয়াফ করা জাহিলী যুগের প্রথা। অপর দিকে কিছু সংখ্যক আনসারী বলত, আমাদেরকে বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করার আদেশ করা হয়েছে এবং সাফা-মারওয়ার মাঝে তাওয়াফের আদেশ দেয়া হয়নি। এ প্রসঙ্গেই আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করলেনঃ “নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহ তা'আলার নির্দেশনসমূহের অন্তর্ভুক্ত”– (সূরা আল-বাকারাহ ১৫৮)। আবূ বাকর ইবনু আবদুর রাহমান বলেন, আমার মতে উপরোক্ত উভয় দলের প্রসঙ্গেই এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (২৯৮৬), বুখারী (৪৪৯৫), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
2966। আসিম আল-আওয়াল (রাহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ)-কে সাফা ও মারওয়া প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলাম। তিনি বললেন, এ দু'টি (পাহাড়) ছিল জাহিলিয়াতের নিদর্শন। ইসলামের আবির্ভাব হলে আমরা এতদুভয়ের মাঝে সাঈ করা হতে বিরত থাকলাম। তখন বারকাতময় আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেনঃ “সাফা ও মারওয়া হল আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত। অতএব বাইতুল্লাহর হজ্জকারী বা উমরাকারী ব্যক্তির জন্য এতদুভয়ের মাঝে তাওয়াফ করাতে কোন সমস্যা নেই”- (সূরা আল-বাকারাহ ১৫৮)। আনাস (রাযিঃ) বলেন, এটা হল নফল ইবাদাত। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৎকাজ করলে আল্লাহ তা'আলা তো গুণগ্রাহী ও সর্বজ্ঞ” (সূরা আল-বাকুরাহ ১৫৮)। সহীহঃ বুখারী (৪৪৯৬), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এই হাদীসটি হাসান সহীহ।
2967। জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কায় এলেন, তখন সাতবার বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করলেন। তখন আমি তাকে এ আয়াত পাঠ করতে শুনলাম (অনুবাদ) “তোমরা ইবরাহীমের দাঁড়াবার স্থানকে নামাযের স্থানরূপে গ্রহণ কর”— (সূরা আল-বাকারাহ ১২৫)। তারপর তিনি মাকামে ইবরাহীমের পিছনে নামায আদায় করলেন, তারপর হাজরে আসওয়াদের নিকট এসে তাতে চুমু দিলেন, তারপর বললেনঃ আল্লাহ তা'আলা প্রথমে যা উল্লেখ করেছেন আমরা তা হতে শুরু করব। অতঃপর তিনি তিলাওয়াত করলেনঃ “সাফা ও মারওয়া আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত"- (সূরা আল-বাকারাহ ১৫৮)। সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (২৯৬০), বুখারী ও মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
2968। আল-বারাআ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণের এ নিয়ম ছিল যে, কোন রোযাদার ইফতারের পূর্বে ঘুমিয়ে পড়লে তিনি সেই রাত ও পরবর্তী দিনে কিছু খেতেন না, এভাবে পরবর্তী সন্ধ্যা পর্যন্ত অভুক্ত থাকতেন। একবার কাইস ইবনু সিরমাহ আল-আনসারী (রাযিঃ) রোযা অবস্থায় ছিলেন। ইফতারের সময় উপস্থিত হলে তিনি তার স্ত্রীর নিকট এসে বললেন, কোন খাবার আছে কি? তার স্ত্রী বললেন, না। তবে আমি আপনার জন্য কিছু খুঁজে আনতে যাচ্ছি। কাইস (রাযিঃ) ঐ দিন কায়িক পরিশ্রম করেছিলেন। তাই তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। তার স্ত্রী এসে তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতে পেয়ে বললেন, আপনার জন্য আফসোস! পরবর্তী দিন দুপুর হলে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। এ ঘটনা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট বর্ণনা করা হলে তখন নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ) 'রোযার রাতে তোমাদের জন্য স্ত্রী সম্ভোগ হালাল করা হল” (সূরাঃ আল-বাকারাহ ১৮৭)। এতে তারা অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। আয়াতের শেষাংশ নিম্নরূপ (অনুবাদ) “রাতের কালো রেখা হতে ভোরের সাদা রেখা স্পষ্টরূপে তোমাদের নিকট প্রতিভাত না হওয়া পর্যন্ত তোমরা পানাহার কর”— (সূরা আল-বাকারাহ ১৮৭)। সহীহঃ সহীহ আবূ দাউদ (২০৩৪), বুখারী ও মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
2969। নুমান ইবনু বাশীর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলার বাণী “তোমাদের প্রভু বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব”— (সূরা মু'মিন ৬০) প্রসঙ্গে বলেছেনঃ দু'আও একটি ইবাদাত। তারপর তিনি পাঠ করলেনঃ "তোমাদের প্রভু বলেন, তোমারা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব। যারা অহংকারবশে আমার ইবাদাতে বিমুখ, তারা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে” (সূরা মু'মিন ৬০)। সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (৩৮২৮)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
2970। আদী ইবনু হাতিম (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘হাত্তা ইয়াতাবাইয়্যানা লাকুমুল খাইতুল-আবইয়াযু মিনাল-খাইতিল আসওয়াদি মিনাল-ফাজরি”— (সূরা বাকারাহ ১৮৭) আয়াত অবতীর্ণ হলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেনঃ এখানে খাইতুল আবইয়াযি মিনাল খাইতিল আসওয়াদি বলতে “রাতের অন্ধকার ও দিনের আলো” বুঝানো হয়েছে। সহীহঃ সহীহ আবূ দাউদ (২০৩৪), বুখারী (৪৫১০), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। আহমাদ ইবনু মানী'-হুশাইম হতে, তিনি মুজালিদ হতে, তিনি শা'বী হতে, তিনি আদী ইবনু হাতিম (রাযিঃ) হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সূত্রে একই রকম বর্ণনা করেছেন।
2971। 'আদী ইবনু হাতিম (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রোযা বিষয়ে (সাহরীর সময়সীমা প্রসঙ্গে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রশ্ন করলাম। তিনি বললেনঃ কালো সুতা হতে সাদা সুতা যে পর্যন্ত না স্পষ্ট প্রতিভাত হয়"- (সূরা আল-বাকারাহ ১৮৭)। আদী (রাযিঃ) বলেন, আমি সাদা ও কালো দুটি রশি নিলাম, (শেষ রাতে) আমি উভয়টি দেখতে লাগলাম (এবং সাদা-কালোর পার্থক্য নিরূপণের চেষ্টা করলাম)। (এ ঘটনা শুনে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে কিছু বলেন। কি বলেছিলেন তা বর্ণনাকারী সুফইয়ান মনে রাখতে পারেননি। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এর অর্থ হল রাত ও দিন। সহীহঃ প্রাগুক্ত, বুখারী ও মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
2972। আসলাম আবূ ইমরান আত-তুজীবী (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রোম সাম্রাজ্যের কোন এক শহরে অবস্থানরত ছিলাম। তখন আমাদেরকে মুকাবিলা করার উদ্দেশ্যে রোমের এক বিশাল বাহিনী যাত্রা শুরু করল। মুসলিমদের পক্ষ হতেও একই রকম বা আরো বিশাল একটি বাহিনী যাত্রা শুরু করল। তখন মিসরবাসীর শাসক ছিলেন উকবাহ ইবনু আমির (রাযিঃ) এবং বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন ফাযালাহ ইবনু উবাইদ (রাযিঃ)। একজন মুসলিম সেনা রোমীয়দের উপর প্রচণ্ড আক্রমণ করেন। এমনকি বুহ্য ভেদ করে তিনি তাদের ভেতরে ঢুকে পড়েন। তখন মুসলিমগণ সশব্দে চিৎকার করেন এবং বলেন, সুবহানাল্লাহ! লোকটি নিজেকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করেছে। তখন আবূ আইয়ুব আল-আনসারী (রাযিঃ) দাঁড়িয়ে বললেন, হে জনমণ্ডলী! তোমরা এ আয়াতের এরূপ ব্যাখ্যা করছ? অথচ এ আয়াতটি আমাদের তথা আনসারদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা যখন ইসলামকে বিজয় দান করলেন এবং ইসলামের বিপুল সংখ্যক সাহায্যকারী হয়ে গেল, তখন আমাদের মধ্যে কেউ কেউ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে না শুনিয়ে চুপে চুপে বলল, আমাদের মাল-সম্পদ তো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ তা'আলা ইসলামকে এখন শক্তিশালী করেছেন। তার সাহায্যকারীর সংখ্যাও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন যদি আমরা আমাদের মাল-সম্পদ রক্ষাণাবেক্ষণের জন্য অবস্থান করতে এবং বিনষ্ট হয়ে যাওয়া সম্পদের পুনর্গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করতাম (তাহলে ভাল হতো)। এ প্রসঙ্গেই আল্লাহ তা'আলা আমাদের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে তার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর প্রতি নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ “তোমরা আল্লাহ তা'আলার পথে ব্যয় কর এবং নিজেদের হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না” (সূরা আল-বাক্কারাহ ১৯৫)। কাজেই মাল-সম্পদের তত্ত্বাবধান ও তার পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করা এবং জিহাদ ত্যাগ করাই হচ্ছে ধ্বংস। অতএব আবূ আইয়ুব আল-আনসারী (রাযিঃ) বাড়িঘর ছেড়ে সব সময় আল্লাহ তা'আলার রাস্তায় জিহাদে ব্যাপৃত থাকতেন। অবশেষে তিনি রোমে (তৎকালীন এশিয়া মাইনর, বর্তমানে তুরস্ক) ইন্তিকাল করেন এবং সেখানেই তাকে দাফন করা হয়। সহীহঃ সহীহাহ (১৩)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ গারীব।
2973। কাব ইবনু উজরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে মহান সত্তার হাতে আমার প্রাণ নিবদ্ধ তার শপথ আমার সম্পর্কেই নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে এবং তাতে আমার প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছেঃ “তোমাদের মধ্যে যদি কেউ পীড়িত হয়, বা মাথায় ক্লেশ থাকে, তবে রোযা অথবা দান-খাইরাত অথবা কুরবানীর দ্বারা তার ফিদিয়া দিবে” (সূরাঃ আল-বাকারাহ ১৯৬)। কাব ইবনু উজরাহ (রাযিঃ) বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে হুদাইবিয়াতে ইহরাম অবস্থায় ছিলাম। মুশরিকরা আমাদেরকে (হাজ্জ বা উমরার উদ্দেশে মক্কায় যেতে) বাধা দিল। আমার মাথায় বাবরী চুল ছিল। উকুন আমার মুখমণ্ডলে পতিত হচ্ছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি বললেনঃ তোমার মাথার কীটগুলো কি তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে? আমি বললাম, হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি তোমার মাথার চুল মুণ্ডন করে ফেল। এ প্রসঙ্গেই এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। মুজাহিদ (রহঃ) বলেন, এক্ষেত্রে তিনটি রোযা রাখতে হবে অথবা খাদ্য দান করতে হবে ছয়জন মিসকীনকে অথবা এক বা একাধিক ছাগল যবেহ করতে হবে। সহীহঃ বুখারী (৪৫১৭), মুসলিম, অনুরূপ হাদীস পূর্বে (৯৫৩) নং উল্লেখ হয়েছে। ‘আলী ইবনু হুজর-হুশাইম হতে, তিনি আশ'আস ইবনু সাওওয়ার হতে, তিনি শা'বী হতে, তিনি আবদুল্লাহ ইবনু মাকিল হতে, তিনি কাব ইবনু উজরাহ (রাযিঃ) হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সূত্রে উপরোক্ত হাদীসের একই রকম বর্ণনা করেছেন। আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান সহীহ। 'আবদুর রাহমান ইবনুল আসবাহানী (রাহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু মুগাফফালের সূত্রে একই রকম হাদীস বর্ণনা করেছেন।
2974। কাব ইবনু উজরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট আসলেন। আমি তখন ডেকচির নিচে আগুন জ্বালাচ্ছিলাম। তখন আমার কপালের উপর অথবা বলেছেন আমার চোখের ভ্রুর উপর দিয়ে উকুন ঝরে পড়ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমার কীটগুলো কি তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে? আমি বললামঃ হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ তুমি তোমার মাথা কামিয়ে ফেল এবং তার পরিবর্তে একটি পশু যবেহ কর অথবা তিন দিন রোযা রাখ অথবা ছয়জন মিস্কীনকে আহার করাও। বর্ণনাকারী আইয়ুব বলেন, তিনি কোন বিষয়টি প্রথমে বলেছেন তা আমি অবগত নই। সহীহঃ দেখুন পূর্বের হাদীস। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
2975। আবদুর রাহমান ইবনু ইয়ামার (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃহাজ্জ হচ্ছে আরাফাতে অবস্থান,হাজ্জ হচ্ছে আরাফাতে অবস্থান, হাজ্জ হচ্ছে আরাফাতে অবস্থান। মিনার জন্য নির্ধারিত আছে তিন দিন। “কোন ব্যক্তি যদি দুই দিন থেকে তাড়াতাড়ি চলে আসে তবে তার কোন গুনাহ হবে না। আর যদি কোন ব্যক্তি বিলম্ব করে, তারও কোন গুনাহ হবে না”— (সূরা আল-বাকারাহ ২০৩)। ফজর উদয়ের পূর্বেই যে ব্যক্তি আরাফাতে পৌছে যায়, সে হাজ্জ পেয়ে গেল। সহীহঃ (৮৮৯) নং হাদীস পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। ইবনু আবী উমার বলেন, সুফইয়ান ইবনু উয়াইনা বলেছেনঃ সুফিয়ান সাওরীর বর্ণিত হাদীসগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে উৎকৃষ্ট। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। এটি শুবাহ (রাহঃ) বুকাইর ইবনু আতা হতে বর্ণনা করেছেন। বুকাইর ইবনু আতার সূত্র ব্যতীত এটি সম্পর্কে আমরা কিছু জানি না।
2976। আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ভীষণ কলহপ্রিয় লোক আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচাইতে ঘৃণ্য। সহীহঃ বুখারী (৪৫২৩), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান।
2977। আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইয়াহুদীদের এই নিয়ম ছিল যে, তাদের কোন নারীর মাসিক ঋতুস্রাব হলে তারা তার সাথে একত্রে পানাহারও করত না এবং একই ঘরে একত্রে বসবাসও করত না। এ বিষয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রশ্ন করা হলে আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেনঃ লোকেরা আপনাকে হায়িয প্রসঙ্গে প্রশ্ন করে। বলুন, তা অশুচি"- (সূরা আল-বাকারাহ ২২২)। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে যথারীতি একত্রে পানাহারের ও ঘরে একসাথে বসবাসের নির্দেশ দেন, শুধু সহবাস প্রসঙ্গ ব্যতীত। এতে ইয়াহুদীরা বলল, এ লোকটি আমাদের কোন একটি বিষয়েরও বিরোধিতা না করে ছাড়ছে না। বর্ণনাকারী বলেন, আব্বাদ ইবনু বিশর ও উসাইদ ইবনু হুযাইর (রাযিঃ) রাসূলুল্লাহ -এর নিকট আসেন এবং বিষয়টি তাকে জানান। তারা বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি ঋতুস্রাব চলাকালে স্ত্রী-সহবাস করব না? এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারা রক্তিম বর্ণ হয়ে গেল। আমরা অনুমান করলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের উভয়ের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন। তারা দুজনে উঠে রাওনা করলেন। তাদের সামনে দিয়েই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য দুধ হাদিয়া এলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে ডেকে পাঠান এবং তাদেরকে দুধ পান করান। এতে তারা বুঝতে পারল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হননি। সহীহঃ আদাবুয যিফাফ (৪৪), সহীহ আবূ দাউদ (২৫০)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল আলা - আব্দুর রহমান ইবনু মাহদী হতে, তিনি হাম্মাদ ইবনু সালামা হতে, তিনি সাবিত হতে, তিনি আনাস (রাযিঃ) হতে অনুরূপ অর্থবোধক হাদীস বর্ণনা করেছেন।
2978। ইবনুল মুনকাদির (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি জাবির (রাযিঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ ইয়াহুদীরা বলত, কোন ব্যক্তি স্ত্রীর পেছন দিক হতে তার জননেন্দ্রিয়ে সহবাস করলে সন্তান হয় টেরা চোখবিশিষ্ট। এ প্রসঙ্গেই এ আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ “তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের শস্যক্ষেত্র। কাজেই তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা যেতে পার"- (সূরা আল-বাকারাহ ২২৩)। সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (১৯২৫), বুখারী (৪৫২৮), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
2979। উম্মু সালামা (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের শস্যক্ষেত্র স্বরূপ। অতএব তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা যেতে পার”— (সূরা বাকারাহ ২২৩), এ আয়াত প্রসঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অর্থাৎ একই রাস্তায় (জননেন্দ্রিয়ে) সহবাস করবে। সহীহঃ আদাবুয যিফাফ (২৭-২৮)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। ইবনু খুসাইম হচ্ছেন 'আবদুল্লাহ ইবনু উসমান ইবনু খুসাইম। ইবনু সাবিত হচ্ছেন আবদুর রাহমান ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু সাবিত আল-জুমাহী আল-মাক্কী। আর হাফসা (রাযিঃ) হচ্ছেন, ‘আবদুর রাহমান ইবনু আবূ বকর আস-সিদ্দীক-এর কন্যা।
2980। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমার (রাযিঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি ধ্বংস হয়ে গেছি। তিনি বললেনঃ কিসে তোমাকে ধ্বংস করল? উমার (রাযিঃ) বললেনঃ রাতে আমার বাহনটি উল্টা করে ব্যবহার করেছি (পেছনের দিক হতে সহবাস করেছি)। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন জাওয়াব দিলেন না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হলঃ “তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের শস্যক্ষেত্র। অতএব তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা যেতে পার”— (সূরা আল-বাক্কারাহ ২২৩)। সামনের দিক হতেও বা পেছনের দিক হতেও (জননেন্দ্রিয়ে) সঙ্গত হতে পার, তবে মলদ্বারে অথবা হায়িয অবস্থায় (সহবাস হতে) বিরত থাক। হাসানঃ আদাবুয যিফাফ (২৮-২৯)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। ইয়াকুব ইবনু আবদুল্লাহ আল-আশ'আরী হচ্ছেন ইয়াকুব আল-কুম্মী।
2981। মা'কিল ইবনু ইয়াসার (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যামানায় তার বোনকে এক মুসলিমের নিকট বিবাহ দেন। এ মহিলা তার নিকট যত দিন জীবন অতিবাহিত করার করলো। তারপর তার স্বামী তাকে এক তালাক দেয়। ইদ্দাত শেষ হয়ে যাওয়ার পূর্বে সে তাকে আবার স্ত্রীত্বে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করেনি। এমতাবস্থায় ইদ্দাত শেষ হয়ে যাওয়ার পর লোকটি তার স্ত্রীর প্রতি এবং স্ত্রী স্বামীর প্রতি আকৃষ্ট হল। তাই সেও এক প্রস্তাবকের মাধ্যমে তাকে পুনর্বিবাহের প্রস্তাব পাঠায়। কিন্তু তার ভাই (মাকিল) বলেন, হে ইতর প্রাণী! আমি তোমার সাথে আমার বোনের বিবাহ দিয়ে তোমাকে সম্মানিত করেছিলাম, কিন্তু তুমি তাকে তালাক দিয়েছ। আল্লাহর কসম! সে আর কখনো তোমার নিকট ফিরে যাবে না। এই তোমার সাথে শেষ কথা। বর্ণনাকারী বলেন, আল্লাহ তা'আলা জানতেন ঐ নারীর প্রতি লোকটির আকর্ষণ এবং লোকটির প্রতি নারীর আকর্ষণের কথা। তখন বারকাতময় আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেনঃ “তোমরা যখন স্ত্রীদের তালাক দাও এবং তারা তাদের ইদ্দাত কাল পূর্ণ করে, তখন তারা চাইলে তোমরা তাদের বাধা দিও না। তোমাদের মধ্যে যে কেউ আল্লাহ তা'আলা ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাকে এর দ্বারা উপদেশ দেয়া হচ্ছে। এটা তোমাদের জন্য শুদ্ধতম ও পবিত্রতম। আল্লাহ তা'আলা জানেন, তোমরা জান না”— (সূরা আল-বাকরাহ ২৩২)। বর্ণনাকারী বলেন, মাকিল (রাযিঃ) এ আয়াত শোনার পর বললেন, আমার প্রভুর আদেশ সর্বোপরি শিরোধার্য। আমি শুনলাম এবং আনুগত্যের শির অবনত করলাম। তিনি ঐ লোককে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, (চলো) তোমার সাথে তাকে বিবাহ দিয়ে দিচ্ছি এবং তোমার খাতির সম্মান বহাল করছি। সহীহঃ ইরওয়াহ (১৮৪৩), সহীহ আবূ দাউদ (১৮২০), বুখারী (৪৫২৯)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। হাসান (রহঃ) হতে এটি অন্যান্য সূত্রেও বর্ণিত হয়েছে। হাসান (রহঃ) সূত্রে হাদীসটি গারীব। এ হাদীস হতে জানা গেল যে, ওয়ালী অর্থাৎ অভিবাবক ব্যতীত বিবাহ বৈধ হয় না। কারণ মাকিল ইবনু ইয়াসার (রাযিঃ)-এর বোন প্রাপ্তবয়স্কা তালাকপ্রাপ্তা ছিলেন। ওয়ালী ব্যতীত নিজের বিবাহ করার এখতিয়ার থাকলে তিনি নিজেই বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হয়ে যেতে পারতেন এবং তার ওয়ালী মাকিল ইবনু ইয়াসার (রাযিঃ)-এর প্রয়োজন বোধ করতেন না। আল্লাহ তা'আলাও এ আয়াতে ওয়ালী অর্থাৎ অভিভাবকদেরই সম্বোধন করেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ “তারা যদি বিধিমত পরস্পর সম্মত হয় তাবে স্ত্রীগণ নিজেদের স্বামীদের বিবাহ করতে চাইলে তোমরা তাদের বাধা দিও না”। এ আয়াত দ্বারা প্রমানিত হয় যে, বিবাহের ব্যাপারটি নারীদের সম্মতি সাপেক্ষে ওয়ালীর উপর ন্যস্ত করা হয়েছে।
2982। আয়িশাহ্ (রাযিঃ)-এর মুক্তদাস আবূ ইউনুস (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আয়িশাহ্ (রাযিঃ) আমাকে তার জন্য কুরআনের একটি কপি লিখে দেয়ার আদেশ দিয়ে বলেনঃ “তোমরা নামাযসমূহের প্রতি যত্নবান হবে, বিশেষত মধ্যবর্তী নামাযের প্রতি" (সূরা বাকারাহ ২৩৮) আয়াতে পৌছে আমাকে জানাবে। আবূ ইউনুস (রহঃ) বলেন, আমি উক্ত আয়াতে পৌছে আয়িশাহ (রাযিঃ)-কে জানালাম। তিনি আমাকে এভাবে লেখার আদেশ দিলেনঃ “তোমরা নামাযসমূহের প্রতি যত্নবান হবে, বিশেষত মধ্যবর্তী নামাযের তথা আসর নামাযের প্রতি এবং আল্লাহ তা'আলার উদ্দেশে বিনীতভাবে দাড়াবে।” আয়িশাহ (রাযিঃ) বলেন, আমি তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট শুনেছি। সহীহঃ সহীহ আবূ দাউদ (৪৩৭), মুসলিম। এ অনুচ্ছেদে হাফসাহ (রাযিঃ) হতেও হাদীস বর্ণিত আছে। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
2983। সামুরাহ ইবনু জুনদাব (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সালাতুল উসতা (মধ্যবর্তী নামায) হল ‘আসরের নামায। সহীহঃ মিশকাত (৬৩৪)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
2984। আলী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহযাব যুদ্ধের দিন (এই) দুআ করেনঃ “হে আল্লাহ! তুমি এদের (কাফিরদের) কবরসমূহ ও ঘরসমূহকে আগুন দিয়ে ভর্তি করে দাও, যেমন তারা আমাদেরকে মধ্যবর্তী নামায হতে বিরত রেখেছে, এমনকি সূর্য ডুবে গেছে। সহীহঃ সহীহ আবূ দাউদ (৪৩৬), বুখারী (৪৫৩৩), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। আলী (রাযিঃ) হতে এটি অন্যান্য সূত্রেও বর্ণিত হয়েছে। আবূ হাসসান আল-আ'রাজের নাম মুসলিম।
2985। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সালাতুল উসতা (মধ্যবর্তী নামায) হল আসরের নামায। সহীহঃ মিশকাত (৬৩৪)। যাইদ ইবনু সাবিত, আবূ হাশিম ইবনু উতবাহ ও আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
2986। যাইদ ইবনু আরকাম (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যামানায় আমরা নামাযের মধ্যে কথাবার্তা বলতাম। এ প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়ঃ “তোমরা আল্লাহ তা'আলার উদ্দেশ্যে অনুগত সেবকের মত দাড়াও"- (সূরা আল-বাকরাহ ২৩৮)। এতদ্বারা আমাদেরকে (নামাযে) চুপ থাকার নির্দেশ দেয়া হল। সহীহঃ সহীহ আবূ দাউদ (৮৭৫)। আহমাদ ইবনু মানী-হুশাইম হতে, তিনি ইসমাঈল ইবনু আবূ খালিদ (রাহঃ) হতে এই সূত্রেও একই রকম বর্ণনা করেছেন। তবে তাতে আরও আছেঃ ওয়া নুহীনা আনিল কালাম" (আমাদেরকে কথা বলতে নিষেধ করে দেয়া হয়)। সহীহঃ সহীহ আবূ দাউদ (৮৭৫), বুখারী ও মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। আবূ আমর আশ-শাইবানীর নাম সাদ ইবনু ইয়াস।
2987। আল-বারাআ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “তোমরা নিকৃষ্ট বস্তু দান করার ইচ্ছা করবে না”— (সূরা আল-বাকারাহ ২৬৭) আয়াতটি আমাদের আনসারদের প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা ছিলাম খেজুর বাগানের মালিক। লোকেরা তাদের খেজুর বাগান হতে বেশী বা স্বল্প পরিমাণ অনুসারে খেজুর নিয়ে আসতো। কেউ বা এক-দুই ছড়া খেজুর এনে মসজিদে ঝুলিয়ে রাখতো। সুফফাবাসী সাহাবীগণের খাদ্য সংস্থানের বিশেষ কোন নির্দিষ্ট উৎস ছিল না। তাদের কারো ক্ষুধা পেলে তিনি উক্ত খেজুরের ছড়ার নিকট এসে তাতে লাঠি দ্বার আঘাত করতেন। ফলে কাচা-পাকা খেজুর ঝরে পড়ত এবং তিনি তা খেতেন। কিন্তু কিছু সংখ্যক লোকের কল্যাণকর কাজের প্রতি খুব একট আগ্রহ ছিল না। তাদের কেউ নিকৃষ্ট ও পচা খেজুরের ছড়াও নিয়ে আসতো, আবার কেউ ভেঙ্গে পড়া ছড়াও নিয়ে আসতো এবং তা (মসজিদে) বুলিয়ে রাখতো। কল্যাণময় আল্লাহ তা’আলা এ প্রসঙ্গে আয়াত অবতীর্ণ করেন (অনুবাদ) “হে ঈমানদারগণ! তোমরা যা উপার্জন কর এবং আমি যা জমিন হতে তোমাদের জন্য উৎপাদন করি, তন্মধ্যে যা উৎকৃষ্ট তা ব্যয় কর এবং তা হতে নিকৃষ্ট বস্তু ব্যয় করার সংকল্প করো না, অথচ তোমরা তা গ্রহণ করবে না, যদি না তোমরা চক্ষু বন্ধ করে থাক” (সূরা আল-বাকারাহ ২৬৭)। তিনি বলেন, অর্থাৎ দাতা যেরূপ দান করেছে, অনুরূপই যদি তাকে উপহারস্বরূপ দেয়া হয়, তাহলে সে কখনো তা গ্রহণ করবে না, চক্ষুর লজ্জায় পড়া বা দৃষ্টি এড়িয়ে রাখা ব্যতীত। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর হতে আমাদের কেউ কিছু আনলে তার নিকট যা আছে তার মধ্যকার সর্বোৎকৃষ্টগুলো নিয়ে আসতো। সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (১৮২২)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব সহীহ। আবূ মালিক হচ্ছেন আবূ মালিক আল-গিফারী। তার নাম গাযওয়ান বলেও কথিত আছে। সাওরী (রহঃ) সুদীর সূত্রে উক্ত হাদীসের অংশবিশেষ রিওয়ায়াত করেছেন।
2988। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আদম সন্তানের প্রতি শাইতানের এক স্পর্শ রয়েছে এবং ফেরেশতারও এক স্পর্শ রয়েছে। শাইতানের স্পর্শ হচ্ছে মন্দ কাজের প্ররোচনাদান ও সত্যকে অস্বীকার করার। ফেরেশতার স্পর্শ হচ্ছে কল্যাণের কাজে উৎসাহিত করা এবং সত্যকে স্বীকার করা। কাজেই যে ব্যক্তি নিজের মধ্যে এরূপ নেকীর স্পর্শ অনুভব করে সে যেন জ্ঞাত হয় যে, এটা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে এবং এজন্য সে যেন আল্লাহ তা'আলার প্রতি শুকরিয়া আদায় করে। আর কেউ নিজের মধ্যে এর বিপরীত স্পর্শ উপলব্ধি করলে সে যেন তখন শইতান হতে আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় চায়। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিম্নোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করেনঃ (অনুবাদ) “শাইতান তোমাদেরকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীল কাজের নির্দেশ দেয়। আর আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে তার ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন। আল্লাহ তা'আলা প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ"- (সূরা বাকারাহ ২৬৮)। সহীহঃ মিশকাত তাহকীকু সানী (৭৪)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। এটি হচ্ছে আবূল আহওয়াসের রিওয়ায়াত। আমরা আবূল আহওয়াসের সূত্র ব্যতীত এটিকে অন্য কোন সূত্রে মারফু' হিসেবে জানতে পরিনি।
2989। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হে লোক সকল! আল্লাহ তা'আলা পবিত্র। তিনি পবিত্র জিনিস ব্যতীত কিছু কুবুল করেন না। আল্লাহ তার রাসূলদেরকে যেসব বিষয়ের হুকুম দিয়েছেন, মুমিনদেরকেও সেসব বিষযের হুকুম দিয়েছেন। তিনি বলেছেনঃ “হে রাসূলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু হতে আহার কর এবং সৎকাজ কর। তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে আমি সবিশেষ অবগত"- (সূরাঃ আল-মু'মিনূন ৫১)। তিনি আরো বলেনঃ “হে মু’মিনগণ! তোমাদেরকে আমি যে রিযিক দিয়েছি তা হতে পবিত্র বস্তু আহার কর”— (সূরাঃ আল-বাকারাহ ১৭২)। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিতে যার মাথার চুল বিক্ষিপ্ত, অবিন্যস্ত এবং সারা শরীর ধূলি মলিন। সে আসমানের দিকে হাত দরায করে বলে, হে আমার প্রভু! হে আমার প্রতিপালক! অথচ তার খাদ্য ও পানীয় হারাম, তার পোশাক হারাম, তার জীবন জীবিকাও হারাম। এমতাবস্থায় তার দু’আ কিভাবে কুবুল হতে পারে। হাসানঃ গাইয়াতুল মারাম (২৭), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। আমরা এটিকে ফুযাইল ইবনু মারযুকের হাদীস হিসেবে জানি। আবূ হাযিম হচ্ছেন আবূ হাযিম আল-আশজাঈ। তার নাম সালমান, ‘আজ্জা আল-আশজাইয়্যার মুক্তদাস।
2990। আলী (রাঃ) বলেন, নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হলে আমরা সবাই উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়লামঃ “তোমাদের মনে যা আছে তা ব্যক্ত কর বা লুকিয়ে রাখ, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের নিকট হতে তার হিসাব গ্রহণ করবেন। তারপর তিনি যাকে ইচ্ছা মাফ করবেন এবং যাকে ইচ্ছা সাজা দিবেন। আল্লাহ তা'আলা সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান” (সূরাঃ আল-বাকারা- ২৮৪)। আমরা বললাম, আমাদের কেউ মনে মনে যা কিছু বলে তারও হিসাব গ্রহণ করা হবে। জানি না, তার মধ্যে কতটুকু ক্ষমা করা হবে আর কতটুকু ক্ষমা করা হবে না। তখন পূর্বোক্ত আয়াতের হুকুম বাতিল (মানসূখ) করে নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ “আল্লাহ তা'আলা কারো উপর তার সাধ্যাতীত কষ্টদায়ক দায়িত্ব অর্পণ করেন না। সে ভালো যা কামাই করে তা তারই এবং মন্দ যা কামাই করে তাও তারই” (সূরাঃ আল-বাকারা- ২৮৬)। সনদ দুর্বল
2991। উমাইয়্যা নাম্নী রাবী হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি আইশা (রাঃ)-কে বারকাতময় আল্লাহ তা'আলার বাণী “তোমাদের মনে যা আছে তা প্রকাশ কর বা গোপন রাখ, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের নিকট হতে তার হিসাব গ্রহণ করবেন" (সূরাঃ আল-বাকারা- ২৮৪) এবং “কেউ খারাপ কাজ করলে তার প্রতিদান সে পাবে” (সূরাঃ আন-নিসা— ১২৩) প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলাম। আইশা (রাঃ) বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করার পর হতে এ পর্যন্ত আর কেউ আমার নিকট এ প্রসঙ্গে জানতে চায়নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এর অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা জর ও বিভিন্ন বালা মুসিবত দ্বারা বান্দাকে যে সাজা দেন এটা হল তাই। এমনকি যে সামান্য জিনিসপত্র সে তার জামার হাতার মধ্যে রাখে তা হারিয়ে গেলে সে যে অস্থির হয় তাও (তাতেও তার গুনাহ মাফ হয়)। অবশেষে লাল সোনা যেমন হাপড় হতে (অগ্নিদগ্ধ হয়ে) নির্মল হয়ে বেরিয়ে আসে তেমনি বান্দাও তার গুনাহসমূহ হতে (পরিচ্ছন্ন হয়ে) মুক্তা হয়ে যায়। সনদ দুর্বল আবূ ঈসা বলেনঃ আইশা (রাঃ)-এর রিওয়ায়াত হিসেবে এ হাদীসটি হাসান গারীব। আমরা এটিকে হাম্মাদ ইবনু সালামার সূত্র ব্যতীত অন্য কোন সূত্রে জানি না।
2992। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন “তোমাদের মনে যা আছে তা প্রকাশ কর অথবা গোপন রাখ আল্লাহ তা'আলা তোমাদের নিকট হতে তার হিসাব গ্রহণ করবেন"- (সূরা বাকুরাহ ২৮৪) এ আয়াত অবতীর্ণ হয়, তখন মানুষদের অন্তরে এরূপ একটা জিনিস (আশংকা ও খটকা) সৃষ্টি হয় যা অন্য কিছুতে সৃষ্টি হয়নি। তাই তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এ ব্যাপারে জানালেন। তিনি বললেনঃ তোমরা বল “আমরা শুনলাম ও অনুগত্য করলাম”। এতে আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তরে ঈমান ঢেলে দিলেন। তারপর কল্যাণময় আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেনঃ “রাসূল ঈমান এনেছে তার প্রতি তার প্রভুর পক্ষ হতে যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুমিনগণও....."— (সূরা আল-বাকারাহ ২৮৫)। "আল্লাহ তা'আলা কারো উপর তার সাধ্যাতীত দায়িত্ব চাপান না। সে ভালো যা করে তা তারই এবং মন্দ যা করে তাও তারই। হে আমাদের প্রতিপালক! যদি আমরা ভুলে যাই বা অন্যায় করে ফেলি, তবে তুমি আমাদের (অপরাধীরূপে) পাকড়াও করো না”— (সূরা আল-বাকারাহ ২৮৬)। আল্লাহ তা'আলা বলেন, আমি তা করলাম। “হে আমাদের প্রভু! আমাদের পূর্ববর্তীদের উপর যেমন গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছিলে, আমাদের উপর তেমন দায়িত্ব অর্পণ করো না”। আল্লাহ তা'আলা বলেন, আমি কুবুল করলাম। “হে আমাদের প্রভু! আমাদের উপর এমন ভার অর্পণ করো না, যা বহনের শক্তি আমাদের নেই। আমাদের গুনাহ মোচন কর, আমাদের ক্ষমা কর, আমাদের প্রতি দয়া কর, তুমিই আমাদের অভিভাবক। কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে জয়যুক্ত কর"- (সূরা আল-বাকারাহ ২৮৬)। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি কবুল করলাম। সহীহঃ মুসলিম (১/৮১)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। এ হাদীসটি ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে অন্য সূত্রেও বর্ণিত হয়েছে। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। আদম ইবনু সুলাইমান প্রসঙ্গে কথিত আছে যে, তিনি ইয়াহইয়া ইবনু আদমের বাবা।
2993। আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে [বলতে শুনেছি] “যাদের অন্তরে সত্য-লঙ্ঘনের প্রবণতা রয়েছে শুধু তারাই ফিতনা সৃষ্টি ও ভুল ব্যাখ্যার উদ্দেশে মুতাশাবিহাত-এর অনুসরণ করে"- (সূরা আ-লি ইমরান ৭) আয়াত প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলাম। তিনি বললেনঃ তুমি তাদের দেখলে চিনে রাখবে। অধঃস্তন বর্ণনাকারী ইয়াযীদের বর্ণনায় আছেঃ তোমরা তাদের দেখলে চিনে রাখবে। তিনি দুই অথবা তিনবার এ কথা বলেছেন। সহীহঃ বুখারী, মুসলিম।
2994। আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এ আয়াত বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রশ্ন করা হলঃ “তিনিই তোমাদের উপর এ কিতাব অবতীর্ণ করেছেন যার কিছু আয়াত মুহকাম, এগুলো কিতাবের মূল এবং অন্যগুলো মুতাশাবিহাত। যাদের মনে কুটিলতা আছে, তারাই ফিতনা সৃষ্টি এবং ভুল ব্যাখ্যার উদ্দেশে মুতাশাবিহাতের অনুসরণ করে..... শুধু বোধসম্পন্ন ব্যক্তিরাই শিক্ষা গ্রহণ করে"- (সূরা আ-লি ইমরান ৭)।রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা কুরআনের মুতাশাবিহ আয়াতসমূহের অনুসারীদের দেখলে অনুধাবন করে নিবে যে, আল্লাহ তা'আলা এদেরই নামোল্লেখ করেছেন। কাজেই তোমরা তাদের পরিহার করবে। সহীহঃ বুখারী (৪৫৭৪), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। এ হাদীসটি আইয়ুব (রাহঃ)-এর বরাতে ইবনু আবূ মুলাইকাহ সূত্রেও আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে। এ হাদীসটি ইবনু আবী মুলাইকাহ হতে আয়িশাহ্ (রাযিঃ) সূত্রে একাধিক বর্ণনাকারী একই রকম বর্ণনা করেছেন। তারা তাতে আল-কাসিম ইবনু মুহাম্মাদ হতে” এ কথাটি উল্লেখ করেননি। ইয়াযীদ ইবনু ইবরাহীমই এ হাদীসে “আল-কাসিম ইবনু মুহাম্মাদ"-এর নাম উল্লেখ করেছেন। ইবনু আবী মুলাইকাহ হলেন আবদুল্লাহ ইবনু উবাইদুল্লাহ ইবনু আবী মুলাইকাহ। তিনি আয়িশাহ (রাযিঃ)-এর নিকট হতেও হাদীস শুনেছেন
2995। আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নবীগণের মধ্য হতে প্রত্যেক নবীরই কিছু সংখ্যক বন্ধু থাকেন। আমার বন্ধু হচ্ছেন আমার বাবা ও আমার প্রতিপালকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইবরাহীম (আঃ)। তারপর তিনি পাঠ করলেনঃ মানুষের মধ্যে তারাই ইবরাহীমের ঘনিষ্ঠতর যারা তার অনুসরণ করেছে এবং এই নবী ও যারা ঈমান এনেছে তারা। আর আল্লাহ তা'আলা মুমিনদের অভিভাবক”— (সূরা আল-ইমরানঃ ৬৮) সহীহঃ মিশকাত তাহকীকু সানী (৫৭৬৯)। মাহমুদ-আবূ নু'আইম হতে, তিনি সুফইয়ান হতে, তিনি তার বাবা হতে, তিনি আবৃ্য যুহা হতে, তিনি আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সূত্রে একই রকম বর্ণনা করেছেন। তবে তাতে মাসরুকের উল্লেখ নেই। আবূ ঈসা বলেন, এটি আবু্য যুহা-মাসরুক সূত্রে বর্ণিত হাদীসের চাইতে অনেক বেশি সহীহ। আবূয যুহার নাম মুসলিম ইবনু সুবাইহ। আবূ কুরাইব ওয়াকী হতে, তিনি সুফিয়ান হতে, তিনি তার বাবা হতে, তিনি আবূয যুহ হতে, তিনি আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সূত্রে আবূ নু'আইমের হাদীসের একই রকম বর্ণনা করেছেন। এ সূত্রেও মাসরুকের উল্লেখ নেই।
2996। আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের মাল-সম্পদ আত্মসাৎ করার জন্য মিথ্যা শপথ করবে, সে আল্লাহ তা'আলার সাথে এরূপ অবস্থায় মিলিত হবে যে, তিনি তার প্রতি অসন্তুষ্ট। আশ'আস ইবনু কাইস (রাযিঃ) বলেন, আল্লাহর শপথ! এ হাদীস আমার সাথে সংশ্লিষ্ট। আমার ও এক ইয়াহুদীর এক খণ্ড শরীকানা জমি ছিল। সে আমার মালিকানা অস্বীকার করে বসে। আমি তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট হাযির করলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেনঃ তোমার কি কোন সাক্ষী প্রমাণ আছে? আমি বললাম, না। তিনি ইয়াহুদীকে বললেনঃ তুমি শপথ কর। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সে এভাবে (মিথ্যা) শপথ করে তো আমার মাল নিয়ে যাবে। তখন বারকাতময় আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ (অনুবাদ) “যারা আল্লাহ তা'আলার সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি এবং নিজেদের শপথসমূহ তুচ্ছ মূল্যে বিক্রয় করে আখিরাতে তাদের জন্য কোন অংশ নেই। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা না তাদের সাথে কথা বলবেন, না তাদের প্রতি তাকাবেন এবং না তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন। তাদের জন্য রয়েছে মর্মম্ভুদ শাস্তি”– (সূরা আ-লি ইমরান ৭৭)। সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (২৩২৩), বুখারী (৪৫৫০), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। ইবনু আবী আওফা (রাযিঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে।
2997। আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “তোমরা যা ভালোবাস তা হতে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনো পুণ্যলাভ করবে না”— (সূরা আ-লি ইমরান ৯২) অথবা “কে সে ব্যক্তি যে আল্লাহ তা'আলাকে উত্তম ঋণপ্রদান করবে? তিনি তার জন্য তা বহু গুণে বৃদ্ধি করবেন"- (সূরা আল-বাকারাহ ২৪৫) আয়াত অবতীর্ণ হলে আবূ তালহা (রাযিঃ), যার একটি ফলের বাগান ছিল, বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমার বাগানটি আল্লাহ তা'আলার পথে দান করে দিলাম। আমি গোপনে এটি দান করতে পারলে এর প্রকাশ্য ঘোষণা দিতাম না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমার আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে তা বণ্টন করে দাও। সহীহঃ সহীহ আবূ দাউদ (১৪৮২), বুখারী (৪৫৫৪), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। হাদীসটি মালিক ইবনু আনাস (রাহঃ) ইসহাক ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু আবী তালহা হতে, তিনি আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতে এই সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
2998। ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ এক লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে দাড়িয়ে প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসূল! (উত্তম) হাজী কে? তিনি বলেনঃ যার মাথার চুল অগোছাল ও জামা কাপড় ধুলি-মলিন হয়েছে। অপর ব্যক্তি দাড়িয়ে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! উত্তম হাজ্জ কি? তিনি বললেনঃ উচ্চস্বরে (তালবিয়া) পাঠ ও রক্ত প্রবাহিত (কুরবানী) করা। অপর ব্যক্তি দাড়িয়ে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সাবীল (রাস্তা) বলতে কি বুঝায়? তিনি বললেনঃ পাথেয় ও যানবাহন। অত্যন্ত দুর্বল, “আল-আজু ওয়াসসাজ্জু” “উচ্চ স্বরে তালবিয়া পাঠ ও রক্ত প্রবাহিত করা" এই অংশটুকু সহীহ। ইবনু মাজাহ (২৮৯৬) আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি আমরা শুধু ইবরাহীম ইবনু ইয়াযীদ আল-খুযী আল-মন্ধীর সূত্রে ইবনু উমার হতে জেনেছি। বিশেষজ্ঞ আলিমগণের কেউ কেউ ইবরাহীম ইবনু ইয়াযীদের স্মৃতিশক্তির সমালোচনা করেছেন।
2999। সা'দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আসো, আমরা ডাকি আমাদের পুত্রগণকে ও তোমাদের পুত্রগণকে, আমাদের নারীগণকে ও তোমাদের নারীগণকে, আমাদের নিজেদেরকে ও তোমাদের নিজেদেরকে....." (সূরা আ-লি ইমরান ৬১) আয়াত অবতীর্ণ হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আলী, ফাতিমা ও হাসান-হুসাইন (রাযিঃ)-কে ডাকলেন এবং বললেনঃ হে আল্লাহ! এরাই আমার পরিজন। সনদ সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব সহীহ।
3000। আবূ গালিব (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবূ উমামা (রাযিঃ) দামিশকের সিড়ির উপর (খারিজীদের) কতগুলো মুণ্ড পড়ে থাকতে দেখলেন। আবূ উমামা (রাযিঃ) বললেন, এগুলো জাহান্নামের কুকুর এবং আসমানের চামড়ার (ছাদের) নিচে নিকৃষ্টতম নিহত এরা। আর এরা যাদেরকে হত্যা করেছে তারা উত্তম লোক। তারপর তিনি এ আয়াত পাঠ করলেন (অনুবাদ) “সেদিন কিছু মুখ উজ্জল হবে এবং কিছু মুখ কালো হবে। যাদের মুখ কালো হবে তাদের বলা হবে, তোমরা ঈমান আনার পরও কি কুফর করেছিলে? সুতরাং তোমরা শাস্তির স্বাদ গ্রহণ কর”— (সূরা আ-লি 'ইমরান ১০৬)। আবূ গালিব (রাহঃ) বলেন, আমি আবূ উমামাহ (রাযিঃ)-কে বললাম, আপনি কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এটা শুনেছেন? তিনি বললেন, আমি যদি এটা এক, দুই, তিন, চার, এমনকি সাতবার পর্যন্ত না শুনতাম, তাহলে তোমাদের নিকট তা বর্ণনা করতাম না। হাসান সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (১৭৬)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান। আবূ গালিবের নাম হাযাওওয়ার এবং আবূ উমামা আল-বাহিলী (রাযিঃ)-এর নাম সুদাই ইবনু আজলান, তিনি বাহিলা গোত্রের নেতা।
3001। বাহয ইবনু হাকীম (রহঃ) পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে “তোমরাই শ্রেষ্ঠ উন্মাত, মানবজাতির জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে"- (সূরা আল-ইমরান ১১০) আয়াত প্রসঙ্গে বলতে শুনেছেনঃ অবশ্যই তোমরাই দুনিয়াতে সত্তর (৭০) সংখ্যা পূর্ণকারী দল। তোমরাই আল্লাহ তা'আলার নিকট সর্বোত্তম ও মর্যাদা সম্পন্ন। হাসানঃ ইবনু মা-জাহ (৪২৮৭)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান। এ হাদীসটি একাধিক বর্ণনাকারী বাহয ইবনু হাকীম (রাহঃ) হতে একই রকম বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তারা “তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মাত, মানবজাতির জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে” আয়াতের উল্লেখ করেননি।
3002। আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, উহুদের যুদ্ধের দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সামনের মাড়ির দাঁত ভেঙ্গে যায়। তার চেহারা যখম হয়, এমনকি কপালে যখম হওয়ার কারণে মুখমণ্ডলে রক্ত ঝড়ে পড়ে। তখন তিনি বললেনঃ কিভাবে ঐ জাতি সফলকাম হবে, যারা তাদের নবীর সাথে এহেন আচরণ করেছে, অথচ তিনি তাদেরকে আল্লাহ তা'আলার পথে আহবান করেছেন। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ “তিনি তাদের প্রতি ক্ষমাশীল হবেন অথবা তাদেরকে শাস্তি দিবেন এ বিষয়ে তোমার করণীয় কিছু নেই। কারণ তারা যালিম”— (সূরা আ-লি ইমরান ১২৮)। সহীহঃ মুসলিম (৫/১৭৯), বুখারী মু'আল্লাকরূপে (৭/৩৬৫) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3003। আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (উহুদের দিন) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুখমণ্ডল আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং তার সামনের মাড়ির দাঁত ভেঙ্গে যায়। তার কাধের উপর একটি তীর নিক্ষিপ্ত হয়। ফলে তার মুখমণ্ডল বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে থাকলে তিনি তা মুছে ফেলছিলেন এবং বলছিলেনঃ সেই জাতি কিভাবে নাজাত পেতে পারে, যারা তাদের নবীর সাথে এহেন নির্মম আচরণ করে, অথচ তিনি তাদেরকে আল্লাহ তা'আলার দিকে আহবান করছেন। তখনি বারকাতময় আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ (অনুবাদ) “তিনি তাদের প্রতি ক্ষমাশীল হবেন অথবা তাদেরকে শাস্তি দিবেন এ বিষয়ে তোমার করণীয় কিছু নেই। কারণ তারা যালিম”— (সূরা আ-লি ইমরান:১২৮)। সহীহঃ দেখুন পূর্বের হাদীস। আমি আবদ ইবনু হুমাইদকে বলতে শুনেছি, এই হাদীস বর্ণনায় ইয়াযীদ ইবনু হারূন ভুলের শিকার হয়েছেন। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3004। সালিম ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) হতে তার বাবার সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, উহুদের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ “হে আল্লাহ! আবূ সুফইয়ানের প্রতি অভিশাপ বর্ষণ করুন। হে আল্লাহ আল-হারিস ইবনু হিশামের প্রতি অভিশাপ বর্ষণ করুন। হে আল্লাহ! সাফওয়ান ইবনু উমাইয়্যার প্রতি অভিশাপ বর্ষণ করুন।” বর্ণনাকারী বলেন, তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ “তিনি তাদের প্রতি ক্ষমাশীল হবেন অথবা তাদেরকে শাস্তি দিবেন এ বিষয়ে তোমার করণীয় কিছু নেই.....”— (সূরা আ-লি ইমরান ১২৮)। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের তওবাু কুবুল করেন এবং তারা ইসলাম গ্রহণ করে উত্তম মুসলিম হন। সহীহঃ বুখারী (৪০৬৯)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। উমার ইবনু হামযা কর্তৃক সালিম (রহঃ) হতে তার বাবার সূত্রে বর্ণিত হাদীস হিসেবে এটিকে গারীব গণ্য করা হয়। যুহরী ও সালিম হতে, তার পিতার সূত্রে এটি বর্ণনা করেছেন। মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল (আল-বুখারী) এটি উমার ইবনু হামযাহ্ কর্তৃক বর্ণিত হাদীস হিসেবে অবহিত নন। তিনি এটি যুহরী কর্তৃক বর্ণিত হাদীস হিসেবে অবহিত আছেন।
3005। ‘আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, চারজন ব্যক্তিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদদু'আ করছিলেন। এ সম্পর্কেই বারকতাময় আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেনঃ “তিনি তাদের প্রতি ক্ষমাশীল হবেন অথবা তাদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন এ বিষয়ে তোমার করণীয় কিছু নেই। কারণ তারা যালিম”— (সূরা আ-লি ইমরান:১২৮)। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের তাওফীক দান করেছিলেন। হাসান সহীহঃ বুখারী (৪০৬৯, ৪০৭০)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব সহীহ। এটিকে নাফি (রহঃ) কর্তৃক ইবনু উমর (রাযিঃ) সূত্রে বর্ণিত হাদীস হিসেবে গারীব গণ্য করা হয়। এ হাদীসটি ইয়াহইয়া ইবনু আইয়ুবও ইবনু আজলানের সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
3006। আসমা ইবনুল হাকাম আল-ফাযারী (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আলী (রাযিঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ আমি এমন লোক ছিলাম যে, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট কোন হাদীস শুনলে আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছায় আমি তার দ্বারা প্রভূত উপকৃত হতাম। আর আমার নিকট তার কোন সাহাবী হাদীস বর্ণনা করলে আমি তাকে শপথ করতে বলতাম। আমার কথায় তিনি শপথ করলে, আমি তার সত্যতা স্বীকার করতাম। অতএব আবূ বাকর (রাযিঃ) আমার নিকট হাদীস বর্ণনা করেন। বলা বাহুল্য, আবূ বাকর (রাযিঃ) সত্য কথাই বলেছেন। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ কোন লোক যদি গুনাহ করার পর পবিত্রতা অর্জন করে নামায আদায় করে, তারপর আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে তবে তাকে আল্লাহ তা'আল। অবশ্যই ক্ষমা করে দেন। তারপর তিনি এ আয়াত পড়েন (অনুবাদ) “যাদের অবস্থা এমন যে, তারা কখনো অশ্লীল কর্ম করে ফেললে অথবা নিজেদের প্রতি যুলুম করলে পরে আল্লাহ তা'আলাকে স্মরণ করে এবং নিজেদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে (তাদেরকে ক্ষমা করা হয়)। আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত কে গুনাহ মাফ করতে পারে? আর তারা যা করে ফেলেছে জ্ঞাতসারে তার পুনরাবৃত্তি করে না”— (সূরা আলি ইমরান-১৩৫)। হাসানঃ ইবনু মা-জাহ (১৩৯৫)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি উসমান ইবনুল মুগীরাহ্ (রহঃ)-এর সূত্রে শুবাহ প্রমুখ বর্ণনাকারীগণ মারফুরূপে বর্ণনা করেছেন। মিস'আর ও সুফইয়ানও উসমান ইবনুল মুগীরার সূত্রে এটি রিওয়ায়াত করেছেন, তবে মারফু হিসেবে নয়। কিছু বর্ণনাকারী এই হাদীসটি মিস’আর হতে মাওকুফ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, আর কিছু বর্ণনাকারী মারফু’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সুফইয়ান সাওরী তা উসমান ইবনুল মুগীরাহ হতে মাওকুফ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। উক্ত হাদীস ব্যতীত আসমা ইবনুল হাকাম কর্তৃক বর্ণিত আর কোন হাদীস আমাদের জানা নেই।
3007। আনাস (রাযিঃ) হতে আবূ তালহা (রাযিঃ)-এর সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, উহুদের দিন আমি মাথা তুলে তাকিয়ে দেখলাম, সকলে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে নিজ নিজ ঢালের নিচে ঢলে পড়েছেন। আল্লাহ তা'আলার নিম্নোক্ত বাণীর তাৎপর্য তাইঃ “দুঃখ-কষ্টের পর আবার আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে তন্দ্রারূপে প্রশান্তি দান করলেন”-(সূরা আ-লি ইমরান ১৫৪) সনদ সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। আবদ ইবনু হুমাইদ-রাওহ ইবনু উবাদাহ্ হতে, তিনি হাম্মাদ ইবনু সালামাহ্ হতে, তিনি হিশাম ইবনু উরওয়াহ হতে, তিনি তার বাবা হতে, তিনি আবূয যুবাইর (রহঃ) হতেও উপরোক্ত হাদীসের একই রকম বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3008। আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আবূ তালহা (রাযিঃ) বলেন, উহুদের যুদ্ধের দিন যুদ্ধের কাতারে আমরা তন্দ্রাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। তিনি বলেন, আমিও সেদিন তন্দ্রাচ্ছন্ন লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। ফলে বারবার আমার তরবারি আমার হাত হতে পড়ে যাচ্ছিল আর আমি তা তুলে নিচ্ছিলাম। আবার পড়ে যাচ্ছিল আবার তুলে নিচ্ছিলাম। অপর দলটি ছিল মুনাফিকদের। তাদের নিজ জানের চিন্তা ব্যতীত আর কোন চিন্তাই ছিল না। এরা ছিল সবচেয়ে কাপুরুষ ও ভীরু এবং সত্যের সাহায্য ত্যাগকারী। সহীহঃ বুখারী (৪০৮৬, ৪৫৬২)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। ইবনু আবী উমার-সুফইয়ান হতে তিনি আতা ইবনু আস সাইব হতে তিনি আবূ উবাইদা হতে এই সূত্রে ইবনু মাসউদ হতে অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন, তাতে আরও অতিরিক্ত আছে "আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট সালাম পৌছাবে আর তাকে জানাবে আমরা সন্তুষ্ট এবং আমাদের প্রতিও সন্তুষ্ট। সনদ দুর্বল
3009। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) বলেন, “অন্যায়ভাবে কোন বস্তু আত্মসাৎ করা কোন নবীর কাজ হতে পারে না”— (সূরা আ-লি ইমরান ১৬১) আয়াত বাদর যুদ্ধকালে হারিয়ে যাওয়া একটি লাল চাদর প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়েছে। কেউ কেউ বলল যে, হয়ত তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়েছেন। এ প্রসঙ্গেই বারকাতময় আল্লাহ তা’আলা অবতীর্ণ করেনঃ “খিয়ানাত (আত্মসাৎ) করা কোন নবীর কাজ হতে পারে না। আর যে ব্যক্তি খিয়ানাত করবে, কিয়ামতের দিন সে তার খিয়ানাতসহ হাযির হবে। তারপর প্রত্যেক ব্যক্তিই তার কৃতকর্মের পুরাপুরি প্রতিফল লাভ করবে। কারো প্রতি যুলুম করা হবে না”— (সূরা আ-লি ইমরান ১৬১)। সহীহঃ সহীহাহ (২৭৮৮)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। আবদুস সালাম ইবনু হারব (রহঃ) খুসাইফির সূত্রে একই রকম বর্ণনা করেছেন। কেউ কেউ খুসাইফ হতে, তিনি মিকসাম হতে এই সূত্রে এ হাদীস রিওয়ায়াত করেছেন, কিন্তু তাতে ইবনু আব্বাস (রাযিঃ)-এর উল্লেখ করেননি।
3010। জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার সাথে সাক্ষাৎ করে আমাকে বললেনঃ হে জাবির! কি ব্যাপার, আমি তোমাকে ভগ্নহৃদয় দেখছি কেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার আব্বা (উহুদের যুদ্ধে) শহীদ হয়েছেন এবং অসহায় পরিবার-পরিজন ও কর্জ রেখে গেছেন। তিনি বললেনঃ আল্লাহ তা'আলা কিভাবে তোমার আব্বার সাথে মিলিত হয়েছেন আমি কি তোমাকে সেই সুসংবাদ দিব না? আমি বললাম, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেনঃ আল্লাহ তা'আলা কখনো কারো সাথে তার পর্দার অন্তরাল ব্যতীত (সরাসরি) কথা বলেননি কিন্তু তিনি তোমার বাবাকে জীবন দান করে তার সাথে সরাসরি কথা বলেছেন। তাকে তিনি বললেনঃ তুমি আমার নিকট (যা ইচ্ছা) চাও, আমি তোমাকে তা দান করব। সে বলল, হে প্ৰভু! আপনি আমাকে জীবনদান করুন, যাতে আমি আবার আপনার রাহে নিহত হতে পারি। বারাকাতময় আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ আমার পক্ষ থেকে আগে হতেই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে আছে যে, তারা আবার (দুনিয়ায়) ফিরে যাবে না। এ প্রসঙ্গে নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ “যারা আল্লাহ তা'আলার পথে নিহত হয়েছে, তোমরা তাদেরকে মৃত মনে করো না, বরং তারা জীবিত এবং তাদের প্রতিপালকের নিকট হতে তারা রিযিকপ্রাপ্ত”– (সূরা আ-লি ইমরান ১৬৯)। হাসানঃ ইবনু মা-জাহ (১৯০, ২৮০০)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি উপরোক্ত সনদসূত্রে হাসান গারীব। 'আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু আকীল (রাহঃ) জাবির (রাযিঃ)-এর সূত্রে এ হাদীসের অংশবিশেষ বর্ণনা করেছেন। এটিকে আমরা মূসা ইবনু ইবরাহীমের সূত্রে জেনেছি। আলী ইবনু আবদুল্লাহ আল-মাদীনীসহ অপরাপর হাদীসবিদগণ মূসা ইবনু ইবরাহীমের সূত্রে একই রকম রিওয়ায়াত করেছেন।
3011। 'আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, নিম্নোক্ত আয়াত বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলঃ (অনুবাদ) “যারা আল্লাহ তা'আলার পথে নিহত হয়েছে তোমরা তাদেরকে মৃত মনে করে না, বরং তারা জীবিত এবং তাদের প্রতিপালকের নিকট হতে রিযিকপ্রাপ্ত”– (সূরা আ-লি ইমরান ১৬৯)। তিনি বললেন, আমরাও অবশ্য এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেছিলাম। আমাদেরকে অবহিত করা হয় যে, জান্নাতের মধ্যে তাদের রূহগুলো সবুজ পাখির আকারে যথা ইচ্ছা ঘুরে বেড়ায়, আরশের সাথে ঝুলানো ঝাড়বাতিসমূহে (বসে) আরাম করে। একবার তোমার প্রভু তাদের প্রতি উকি দিয়ে প্রশ্ন করেনঃ তোমরা আরো কিছু চাও কি? তাহলে আমি তোমাদের আরো বাড়িয়ে দিব। তারা বলল, হে আমাদের প্রভু! আমরা এর চাইতে বেশি আর কি চাইব। আমরা জান্নাতের মধ্যে যেখানে ইচ্ছা ঘুরে বেড়াচ্ছি। আল্লাহ তা'আলা আবার উকি দিয়ে বলেনঃ তোমাদের আরো কিছু চাওয়ার আছে কি, তাহলে আমি আরো বাড়িয়ে দিব। যখন তারা দেখলো যে, কিছু চাওয়া ব্যতীত তাদের রেহাই নেই তখন তারা বলল, আপনি আমাদের দেহে প্রাণ সঞ্চার করে দিন যাতে আমরা আবার দুনিয়ায় ফিরে যেতে পারি এবং আবার আপনার পথে পুনরায় শহীদ হতে পারি। সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (২৮০১), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3012। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে লোক তার সম্পদের যাকাত প্রদান করে না, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন তার (মালকে তার) ঘাড়ে বিষধর অজগর সাপরূপে স্থাপন করবেন। তারপর তিনি এই কথার সত্যতা প্রমাণে আল্লাহ তা'আলার কিতাবের এ আয়াত আমাদেরকে শুনান (অনুবাদ) “তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা নিজ অনুগ্রহে যা দান করেছেন তাতে যারা কৃপণতা করে তারা যেন মনে না করে যে, এটা তাদের পক্ষে কল্যাণকর। না, এটা তাদের পক্ষে অকল্যাণকর। যাতে তারা কৃপণতা করে কিয়ামতের দিন তাই তাদের গলার বেড়ি হবে। আসমান ও যমীনের স্বত্বাধিকার একমাত্র আল্লাহ তা'আলার জন্য। তোমরা যা কর আল্লাহ তা'আলা তা বিশেষভাবে অবহিত”– (সূরা আ-লি ইমরান ১৮০)। বর্ণনাকার কখনো বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সমর্থনে এ আয়াতাংশ পাঠ করেন (অনুবাদ) “যাতে তারা কৃপণতা করে কিয়ামতের দিন তা তাদের গলায় বেড়ী হবে।” তিনি আরো বলেনঃ যে ব্যক্তি মিথ্যা শপথের মধ্যেমে তার মুসলিম ভাইয়ের মাল আত্মসাৎ করে, সে আল্লাহ তা'আলার সাথে এরূপ অবস্থায় মিলিত হবে যে, আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি অসন্তুষ্ট। এর সত্যতার সমর্থনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলার কিতাবের এ আয়াত পাঠ করেন (অনুবাদ) “যারা আল্লাহ তা'আলার সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি এবং নিজেদের শপথসমূহকে তুচ্ছ মূল্যে বিক্রয় করে, পরকালে তাদের জন্য কোন অংশ নেই। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা না তাদের সাথে কথা বলবেন, না তাদের প্রতি তাকাবেন, আর না তাদেরকে পবিত্র করবেন। তাদের জন্য রয়েছে উৎপীড়ক শাস্তি”— (সূরা আ-লি ইমরান ৭৭)। সহীহঃ মুশকিলাতুল ফাকর (৬০), তা’লীকুর রাগীব (১/৬৮) হাদীসের ২য় অংশ বুখারী (৭৪৪৫), মুসলিম (১/৮৬)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। “শুজা'আন আকরাআ” অর্থ সাপ।
3013। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একটি চাবুক রাখার সমপরিমাণ জান্নাতের জায়গা সমগ্র পৃথিবী ও তার মধ্যকার সব কিছুর চাইতে উত্তম। তোমরা চাইলে এ আয়াত পাঠ করতে পারো (অনুবাদ) “(কিয়ামতের দিন) যাকে আগুন হতে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে দাখিল করানো হবে সেই সফলকাম। বস্তুত পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতীত কিছুই নয়”— (সূরা আ-লি ইমরান ১৮৫)। হাসানঃ সহীহাহ (১৯৮৭), বুখারী। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3014। হুমাইদ ইবনু আবদুর রাহমান ইবনু আওফ (রাহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মারওয়ান ইবনুল হাকাম তার দ্বাররক্ষীকে বললেন, হে আবূ রাফি ইবনু আব্বাস (রাযিঃ)-এর নিকট যাও এবং তাকে বল, যে লোক তার প্রাপ্তীর জন্য খুশী হয় এবং কোন কাজ না করেও তার জন্য প্রশংসা কুড়াতে চায় সে শাস্তিযোগ্য হলে তো আমরা সকলেই শাস্তিযোগ্য হব। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) বললেন, এ আয়াতের সাথে তোমাদের কি সম্পর্ক, এ আয়াত তো কিতাবধারীদের প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়েছে। এরপর ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) তিলাওয়াত করেনঃ (অনুবাদ), “যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল আল্লাহ তা'আলা তাদের নিকট হতে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেনঃ তোমরা তা মানুষের নিকট স্পষ্টভাবে প্রকাশ করবে এবং তা গোপন করবে না। এরপরও তারা তা অগ্রাহ্য করে এবং তুচ্ছ মূল্যে তা বিক্রয় করে। সুতরাং তারা যা ক্রয় করে তা কত নিকৃষ্ট"- (সূরা আ-লি ইমরান ১৮৭)। তিনি আরো তিলাওয়াত করেনঃ (অনুবাদ) “তুমি কখনো এরূপ ধারণা করো না যে, যেসব লোক স্বয়ং যা করেছে তাতে আনন্দ প্রকাশ করে এবং স্বয়ং যা করেনি এমন কাজের জন্য প্রশংসিত হতে ভালোবাসে তারা শাস্তি হতে মুক্তি পাবে, বরং তাদের জন্য রয়েছে মর্মস্তুদ শাস্তি"- (সূরা আ-লি 'ইমরান ১৮৮)। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের (আহলে কিতাব) নিকট কোন বিষয়ে জানতে চাইলে তারা তা গোপন করে তার বিপরীত তথ্য তাকে অবহিত করে চলে যায়। তারা তাকে এ ধারণা দেয় যে, তিনি যে বিষয়ে তাদের নিকট জানতে চেয়েছেন তারা তাই তাকে জানিয়েছেন। বিনিময়ে তারা তার নিকট হতে প্রশংসা কামনা করে এবং তাদের কিতাব হতে তথ্য প্রদানের বিষয়টি ও তাদের নিকট রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জানতে চাওয়ার বিষয়টিতে সত্য গোপন করে তারা আনন্দ বোধ করে। সহীহঃ বুখারী (৪৫৬৮), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব সহীহ।
3015। মুহাম্মাদ ইবনুল মুনকাদির (রাহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাযিঃ)-কে বলতে শুনেছি, আমি অসুস্থ হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দেখতে আসেন। আমি অজ্ঞান অবস্থায় ছিলাম। আমার চেতনা ফিরে পাওয়ার পর আমি বললাম, আমি আমার ধন-সম্পদ প্রসঙ্গে কিভাবে সিদ্ধান্ত করব? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বিষয়ে নীরব থাকলেন। তারপর আয়াত অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ) “আল্লাহ তা'আলা তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ এক পুরুষের (পুত্রের) অংশ দুজন মহিলার (কন্যার) সমান”— (সূরা আন-নিসা ১১)। সহীহঃ সহীহ আবূ দাউদ (২৭২৮), বুখারী (৪৫৭৭), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। এ হাদীসটি মুহাম্মাদ ইবনুল মুনকাদির হতে একাধিক বর্ণনাকারী বর্ণনা করেছেন। আল-ফাযল ইবনুল মুনকাদির হতে, তিনি জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সূত্রে উপরের হাদীসের অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। আল-ফাযল ইবনুস সাব্বাহর হাদীসে এ হাদীসের চেয়ে আরো বেশী বর্ণনা আছে।
3016। আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, কয়েকজন মহিলা আওতাস যুদ্ধের দিন আমাদের হস্তগত হয়, যাদের স্বামীরা মুশরিকদের মধ্যে বর্তমান ছিল। তাই ঐ সব মহিলাকে আমাদের কিছু সংখ্যক লোক অপছন্দ করল। এ প্রসঙ্গেই আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেনঃ “এবং নারীদের মধ্যে তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীগণ ব্যতীত সকল সধবা তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ"- (সূরা আন-নিসা ২৪)। সহীহঃ সহীহ আবূ দাউদ (১৮৭১), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান।
3017। আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আওতাস যুদ্ধের দিন কয়েকজন বন্দী মহিলা আমাদের হাতে আসে যাদের স্বামীরা তাদের সম্প্রদায়ে বর্তমান ছিল। সাহাবীগণ বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে অবহিত করেন। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ “এবং নারীদের মধ্যে তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীগণ ব্যতীত সকল সধবা নারী তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ"- (সূরা আন-নিসা ২৪)। সহীহঃ দেখুন পূর্বের হাদীস। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান। সুফইয়ান সাওরী (রহঃ) এভাবে উসমান আল-বাত্তী হতে, তিনি আবূল খালীল হতে, তিনি আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাযিঃ) হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সূত্রে পূর্বোক্ত হাদীসের মত বর্ণনা করেছেন। অবশ্য এ হাদীসে আবূ আলকামার উল্লেখ নেই। কাতাদাহ্ (রহঃ)-এর সূত্রে হাম্মাম ব্যতীত অপর কেউ এ হাদীসের সনদে আবূ আলকামার উল্লেখ করেছেন বলে আমার জানা নেই। আবূল খালীলের নাম সালিহ ইবনু আবূ মারইয়াম।
3018। আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাবীরা গুনাহ প্রসঙ্গে বলেনঃ তা হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার সাথে শারীক করা, বাবা-মার অবাধ্য হওয়া, নরহত্যা করা ও মিথ্যা বলা। সহীহঃ গাইয়াতুল মারাম (২৭৭), বুখারী ও মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব সহীহ। রাওহ ইবনু উবাদাহ (রহঃ) শুবাহ (রাহঃ) হতে এটি বর্ণনা করেছেন। তিনি সনদে (বর্ণনাকারীর নাম উবাইদুল্লাহ ইবনু আবূ বাকর-এর পরিবর্তে) আবদুল্লাহ ইবনু আবূ বাকর বলেছেন, তা সঠিক নয়।
3019। আবদুর রাহমান ইবনু আবূ বাকরাহ (রাহঃ) হতে তার বাবার সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমি কি সবচাইতে মারাত্মক কাবীরা গুনাহগুলো প্রসঙ্গে তোমাদেরকে অবহিত করবো না? সাহাবীগণ বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেনঃ আল্লাহ তা'আলার সাথে অংশীদার স্থাপন, বাবা-মার অবাধ্য হওয়া। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি হেলান দেয়া অবস্থায় ছিলেন, এবার উঠে সোজা হয়ে বসে বললেন; মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া, অথবা বলেছেনঃ মিথ্যা কথা বলা। আবূ বাকর (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথাটি বারবার বলে যাচ্ছিলেন। এমনকি আমরা বললাম, আহা! তিনি যদি চুপ হতেন। সহীহঃ প্রাগুক্ত, বুখারী, মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ গারীব।
3020। আবদুল্লাহ ইবনু উনাইস আল-জুহানী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মারাত্মক মারাত্মক কাবীরা গুনাহ হল—আল্লাহ তা'আলার সাথে অংশীদার স্থাপন করা, বাবা-মার নাফারমানী করা এবং মিথ্যা শপথ করা। কেউ আল্লাহ তা'আলার নামে অপরিবর্তনীয় ও অবশ্যম্ভাবীরূপে প্রযুক্ত হওয়ার মত শপথ করলে এবং তাতে মশার পাখা বরাবর নগণ্য মিথ্যাও যোগ করলে তা তার অন্তরে কিয়ামত পর্যন্ত একটি কলংকময় দাগ হয়ে বিরাজিত থাকবে। হাসানঃ মিশকাত তাহকীক সানী (৩৭৭৭)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। আবূ উমামা আল-আনসারী (রাযিঃ) হলেন সালাবার ছেলে। তার নাম আমাদের জানা নেই। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বেশ কিছু হাদীস বর্ণনা করেছেন।
3021। 'আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কবীরা গুনাহসমূহের মধ্যে রয়েছে আল্লাহ তা'আলার সাথে অংশীদার স্থাপন করা, বাবা-মায়ের অবাধ্যা হওয়া, অথবা বলেছেনঃ মিথ্যা শপথ করা। বর্ণনাকারী শুবাহর সন্দেহ যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষোক্ত দুটি কথার কোনটি বলেছেন। সহীহঃ বুখারী। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3022। মুজাহিদ (রহঃ) হতে বর্ণিত, উম্মু সালামাহ্ (রাযিঃ) বলেন, পুরুষরা জিহাদ করে কিন্তু মহিলারা জিহাদ করে না। মীরাসের (উত্তরাধিকার) ক্ষেত্রেও মহিলারা (পুরুষের তুলনায়) অর্ধেক পায়। এ প্রসঙ্গেই কল্যাণময় আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেন (অনুবাদ) “আল্লাহ তা'আলা যদ্বারা তোমাদের কাউকে অপর কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, তোমরা তার লোভ করো না। যা পুরুষ অর্জন করেছে তা তার প্রাপ্য অংশ আর নারী যা অর্জন করেছে তা তার প্রাপ্য অংশ। তোমরা আল্লাহ তা'আলার নিকট তার অনুগ্রহ প্রার্থনা কর। আল্লাহ তা'আলা নিশ্চয়ই সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ”— (সূরা আন্-নিসা ৩২)। মুজাহিদ (রহঃ) বলেন, একই প্রসঙ্গে নিম্নোক্ত আয়াতও অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ) আত্মসমর্পণকারী পুরুষ ও আত্মসমর্পণকারী নারী, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সতবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ ও বিনীত নারী, লজ্জাস্থান হিফাযাতকারী পুরুষ ও লজ্জাস্থান হিফাযাতকারী নারী, আল্লাহ তা'আলাকে বেশী স্মরণকারী পুরুষ ও আল্লাহ তা'আলাকে বেশী স্মরণকারী নারী এদের জন্য আল্লাহ তা'আলা রেখেছেন ক্ষমা ও মহাপ্রতিদান"- (সূরা আল-আহযাব ৩৫)। উম্মু সালামাহ (রাযিঃ)-ই ছিলেন মাদীনায় হিজরতকারিনী প্রথম মহিলা। সনদ সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি মুরসাল। কেউ কেউ ইবনু আবূ নাজীহ কর্তৃক মুজাহিদ (রহঃ) সূত্রে এটি মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন যে, উম্মু সালামা (রাযিঃ) এই কথা বলেছেন।
3023। উম্মু সালামাহ্ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তা'আলা স্ত্রীলোকদের হিজরাত প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন বলে আমি শুনিনি। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন (অনুবাদ) “আমি তোমাদের মধ্যে কর্মে নিষ্ঠ কোন নর বা নারীর কাজকে বিফল করি না। তোমরা একে অপরের অংশ। অতএব যারা হিজরাত করেছে, নিজেদের আবাস হতে উৎখাৎ হয়েছে, আমার পথে নির্যাতিত হয়েছে.....”— (সূরা আ-লি ইমরান ১৯৫)। পূর্বের হাদীসের সহায়তায় সহীহ।
3024। আবদুল্লাহ (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে হুকুম দিলেন তাকে কুরআন তিলাওয়াত করে শুনানোর জন্য। তখন তিনি মিম্বরে বসা ছিলেন। আমি তাকে সূরা আন-নিসা হতে তিলাওয়াত করে শুনলাম। আমি যখন এ আয়াত পর্যন্ত পৌছলাম (অনুবাদ) “আমি যখন প্রত্যেক উম্মাত হতে একজন করে সাক্ষী হাযির করব এবং তোমাকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত করব, তখন কি অবস্থা হবে?" (সূরা আন-নিসা ৪১), তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তার হাত দিয়ে চাপ দেন। আমি তার প্রতি তাকিয়ে দেখলাম, তার দু'চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছে। সনদ সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, আবূল আহওয়াস (রাহঃ) আমাশ হতে, তিনি ইবরাহীম হতে, তিনি আলকামাহ হতে, তিনি আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে এই সূত্রে এরূপই বর্ণনা করেছেন। মূলত তা হবেঃ ইবরাহীম-উবাইদাহ হতে, তিনি আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে।
3025। আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমাকে কুরআন হতে তিলাওয়াত করে শুনাও। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার উপরই তো কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, আর আমি আপনাকে তা তিলাওয়াত করে শুনাব। তিনি বললেনঃ অন্যের তিলাওয়াত শুনতে আমি পছন্দ করি। অতএব আমি সূরা আন-নিসা তিলাওয়াত করতে শুরু করলাম। আমি পাঠ করতে করতে যখন (অনুবাদ) “এবং আমি তোমাকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষীরূপে উপস্থিত করব", তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দিকে তাকিয়ে দেখলাম তার দুই চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সহীহঃ বুখারী (৪৫৮২), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ রিওয়ায়াতটি আবূল আহওয়াসের হাদীসের তুলনায় অনেক বেশি সহীহ। সুওয়াইদ ইবনু নাসর-ইবনুল মুবারাক হতে, তিনি সুফইয়ান হতে, তিনি আমাশ (রাহঃ) হতে মু'আবিয়াহ ইবনু হিশামের হাদীসের অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।
3026। আলী ইবনু আবী তালিব (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আবদুর রাহমান ইবনু আওফ (রাযিঃ) আমাদের জন্য খাবারের আয়োজন করলেন এবং আমাদেরকে দাওয়াত করে শরাব পান করান। আমাদেরকে এই শরাবের নেশায় ধরে। ইতোমধ্যে নামাযের ওয়াক্ত হয়ে যায়। লোকজন আমাকেই ইমামতি করতে এগিয়ে দেয়। আমি পাঠ করলামঃ “কুল ইয়া আয়্যুহাল কাফিরূন। লা আ'বূদু মা তা’বুদূন। ওয়া নাহনু নাবুদু মা তাবুদুন।" অর্থাৎ “ওয়ালা নাবুদু” (তোমরা যাদের ইবাদাত কর আমরা তাদের ইবাদাত করি না)-এর স্থলে আমি “ওয়া নাহনু নাবুদু মা তাবুদূন” (তোমরা যাদের ইবাদাত কর, আমরাও তাদের ইবাদাত করি) পড়ে ফেললাম। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন (অনুবাদ) “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাযের নিকটেও যেয়ো না, যতক্ষণ না তোমরা যা বল তা বুঝতে পার" (সূরা আন-নিসা ৪৩)। সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব সহীহ।
3027। ‘আবদুল্লাহ ইবনুয যুবাইর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, কংকরময় হাররা এলাকার একটি (পানিসেচের) নালা নিয়ে এক আনসারীর সাথে তার ঝগড়া বাধে। উক্ত নালার মাধ্যমে তারা খেজুর বাগানে পানি দিতেন। আনসারী বললেন, পানি আসতে নালাটি আপনি ছেড়ে দিন। যুবাইর (রাযিঃ) তা মানলেন না। দু’জনেই বিষয়টি নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবাইর (রাযিঃ)-কে বললেনঃ হে যুবাইর! তোমার বাগানে পানি দিয়ে তোমার প্রতিবেশীর জন্য পানি ছেড়ে দিও। এতে আনসারী ব্যক্তি রাগান্বিত হয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ইনি আপনার ফুফাতো ভাই বলেই (এরূপ ফাইসালা করছেন)। এ কথায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। তিনি বললেনঃ হে যুবাইর! তুমি তোমার বাগানের পানি প্রবাহিত করে আলগুলো পর্যন্ত পানি জমা না হওয়া পর্যন্ত নালা অন্যত্র প্রবাহিত হতে দিবে না। যুবাইর (রাযিঃ) বলেন, আল্লাহর শপথ! আমার মনে হয় এ ঘটনা প্রসঙ্গেই এ আয়াত অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ) “কিন্তু না, তোমার প্রভুর শপথ। তারা ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের পারস্পরিক মতভেদের ব্যাপারসমূহের বিচারভার তোমার উপর অর্পণ না করে..."— (সূরা আন-নিসা ৬৫)। সহীহঃ বুখারী (৪৫৮৫), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, আমি মুহাম্মাদ (বুখারী)-কে বলতে শুনেছি, ইবনু ওয়াহব (রাহঃ) এ হাদীসটি লাইস ইবনু সা'দ হতে এবং ইউনুস (রাহঃ) যুহরী হতে, তিনি উরওয়া হতে, তিনি আবদুল্লাহ ইবনুয যুবাইর (রাযিঃ) হতে, এই সূত্রে উক্ত হাদীসের একই রকম বর্ণনা করেছেন। অপর দিকে শু'আইব ইবনু আবী হামযাহ্ (রহঃ) যুহরী হতে, তিনি উরওয়াহ হতে, তিনি যুবাইর (রাযিঃ) হতে, এই সূত্রে এ হাদীস রিওয়ায়াত করেছেন, কিন্তু তাতে 'আবদুল্লাহ ইবনুয যুবাইর (রাযিঃ)-এর উল্লেখ করেননি।
3028। যাইদ ইবনু সাবিত (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, “তোমাদের কি হল যে, মুনাফিকদের প্রসঙ্গে তোমরা দুই দল হয়ে গেলে....."— (সূরা আন-নিসা ৮৮) আয়াত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উহুদ যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীদের (মুসলিম বাহিনীর) মধ্য হতে কিছু সংখ্যক লোক (যুদ্ধক্ষেত্র হতে) ফিরে আসে। তাদের প্রসঙ্গে সাহাবীগণ দুই দলে বিভক্ত হয়ে যান। এক দলের বক্তব্য ছিল, তাদেরকে হত্যা কর। অন্য দলের মত ছিল, তাদেরকে হত্যার প্রয়োজন নেই। এ প্রসঙ্গেই এ আয়াত অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ) "তোমাদের কি হল যে, মুনাফিকদের ব্যাপারে তোমরা দুই দল হয়ে গেলে..."— (সূরা আন-নিসা ৮৮)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মাদীনা হল তাইবাহ-পবিত্র নগরী। তা ময়লা আবর্জনা (অপবিত্রতা মুনাফিকী) এমনভাবে দূর করে দেয় যেভাবে আগুন লোহার ময়লা দূর করে দেয়। সহীহঃ বুখারী (৪৫৮৯), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। আবদুল্লাহ ইবনু ইয়াযীদ হলেন একজন আনসারী আল-খাতমী, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহচার্য পেয়েছেন।
3029। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন নিহত ব্যক্তি নিজ হাতে তার হত্যাকারীকে তার কপালের চুল ও মাথা ধরে নিয়ে আসবে। তার ঘাড়ের কর্তিত রগসমূহ হতে রক্ত বের হতে থাকবে। সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! এ লোক আমাকে হত্যা করেছে। এমনকি সে তার হত্যাকারীকে নিয়ে আরশের নিকট পৌছে যাবে। আমর ইবনু দীনার বলেন, লোকেরা ইবনু আব্বাস (রাযিঃ)-এর নিকট (হত্যাকারীর) তাওবার বিষয়ে আলোচনা করলে তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করেন (অনুবাদ) “কোন ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম। সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি রুষ্ট হবেন, তাকে অভিসম্পাত করবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত রাখবেন"- (সূরা আন-নিসাঃ ৯৩)। তিনি বলেন, এ আয়াত মানসূখও হয়নি বা তার বিধান পরিবর্তিতও হয়নি। অতএব তার আর তাওবা কিসের। সহীহঃ মিশকাত তাহকীক সানী (৩৪৬৫), তা’লীকুর রাগীব (৩/২০৩) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান (গারীব)। কেউ কেউ এ হাদীসটি আমর ইবনু দীনার হতে, তিনি ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে এই সূত্রে একই রকম বর্ণনা করেছেন, কিন্তু তা মারফু হিসেবে নয়।
3030। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, সুলাইম বংশের এক লোক তার এক পাল ছাগল নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এক দল সাহাবীর সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। সে তাদেরকে সালাম দিল। তারা (পরস্পর) বলল, এ লোক তোমাদের হাত হতে বাচার জন্যই তোমাদেরকে সালাম দিয়েছে। এই বলে তারা উঠে গিয়ে লোকটিকে হত্যা করল এবং তার ছাগলগুলো নিয়ে রাসূলুল্লাহ -এর নিকট এসে হাযির হল। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন (অনুবাদ) “হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন আল্লাহ তা'আলার পথে (জিহাদের জন্য) বের হবে, তখন অবশ্যই পরীক্ষা করে নিবে এবং কেউ তোমাদের সালাম দিলে (পার্থিব জীবনের সম্পদের আকাজক্ষায়) তাকে বলবে না যে, তুমি মুমিন নও"- (সূরা আন-নিসা ৯৪)। হাসান সহীহঃ তা’লীক 'আলাল ইহসান (৭/১২২), বুখারী (২৫৯১) সংক্ষেপে, মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান। উসামাহ ইবনু যাইদ (রাযিঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে।
3031। আল-বারাআ ইবনু আযিব (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, "মু'মিনদের মধ্যে যারা ঘরে বসে থাকে তারা সমান নয়”— (সূরা আন-নিসা ৯৫) আয়াত অবতীর্ণ হলে আমর ইবনু উম্মি মাকতুম (রাযিঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসলেন। তিনি ছিলেন দৃষ্টিশক্তিহীন (অন্ধ)। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি তো দৃষ্টিশক্তিহীন। আমাকে আপনি কি নির্দেশ দেন? তখন আল্লাহ তা'আলা নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন (অনুবাদ) "তবে যারা অক্ষম তাদের কথা স্বতন্ত্র”— (সূরা আন-নিসা ৯৫)। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ (আয়াতটি লিপিবদ্ধ করতে) তোমরা আমার জন্য কাঁধের হাড় ও দোয়াত অথবা (বললেন) তখতি ও দোয়াত নিয়ে এসো। সহীহঃ বুখারী (৪৫৯৩-৪৫৯৪), মুসলিম, ১৬৭০ নং পূর্বে উল্লেখ হয়েছে। আমর ইবনু উম্মি মাকতুম (রাযিঃ) আবদুল্লাহ ইবনু উম্মি মাকতুম বলেও কথিত। তিনি হলেন আবদুল্লাহ ইবনু যায়িদাহ এবং উম্মি মাকতুম তার মা।
3032। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, “মুমিনদের মধ্যে যারা অক্ষম নয় অথচ ঘরে বসে থাকে”— (সূরা আন-নিসা ৯৫) আয়াত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যারা অক্ষম হয়েও ঘরে বসে ছিল তারা এবং যারা বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে তারা (মর্যাদায়) এক সমান নয়। এখানে তাদের কথাই বলা হয়েছে। বদর যুদ্ধের নির্দেশ সম্বলিত আয়াত অবতীর্ণ হলে আবদুল্লাহ ইবনু জাহশ ও ইবনু উম্মি মাকতুম (রাযিঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা তো উভয়েই অন্ধ! এক্ষেত্রে আমাদের দু'জনের জন্য কি কোনরূপ সুযোগ আছে? তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ) “মুমিনদের মধ্যে যারা অক্ষম নয় অথচ ঘরে বসে থাকে তারা সমান নয় এবং যারা জিহাদ করে তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা মহাপুরস্কারের ক্ষেত্রে যারা ঘরে বসে থাকে তাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন”— (সূরা আন-নিসা ৯৫)। যারা অক্ষম না হওয়া সত্ত্বেও ঘরে বসে থাকে, এখানে তাদের কথা বলা হয়েছে। সহীহঃ বুখারী (৪৫৯৫)। আবূ ঈসা বলেন, ইবনু আব্বাস (রাযিঃ)-এর হাদীস হিসেবে উক্ত সূত্রে এই হাদীসটি হাসান সহীহ। মিকসাম প্রসঙ্গে বলা হয় যে, ইনি 'আবদুল্লাহ ইবনুল হারিসের মুক্তদাস। তিনি আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিঃ)-এর মুক্তদাস বলেও কথিত। তার উপনাম আবূল কাসিম।
3033। সাহল ইবনু সা’দ আস-সাঈদী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মারওয়ান ইবনুল হাকামকে মসজিদে বসা দেখে আমি তার নিকট এগিয়ে গিয়ে তার পাশে বসলাম। তিনি আমাদের বললেন, যাইদ ইবনু সাবিত (রাযিঃ) আমাকে জানিয়েছেন যে, নবী, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার দ্বারা লেখাচ্ছিলেনঃ “লা ইয়াসতাবিল কাইদূনা মিনাল মু'মিনীনাওয়াল মুজাহিদুনা ফী সাবীলিল্লাহ"। তখন তার নিকট ইবনু উম্মি মাকতুম (রাযিঃ) এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল। আল্লাহর শপথ আমি যদি জিহাদ করতে পারতাম, তাহলে অবশ্যই জিহাদ করতাম। তিনি ছিলেন অন্ধ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা তার রাসূলের উপর ওয়াহী অবতীর্ণ করলেন, তখন তার উরু আমার উরুর উপর ছিল। তা এত ভারী লাগছিল যে, এতে আমার উরু ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। কিছুক্ষণ পর তার এ অবস্থা দূরীভূত হয়। আল্লাহ তা'আলা তার উপর অবতীর্ণ করেনঃ “গাইরু উলিয যারারি”। সহীহঃ বুখারী (৪৫৯২)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। একাধিক বর্ণনাকারী এ হাদীসটি যুহরী হতে সাহল ইবনু সা'দের বরাতে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। মামার এটি বর্ণনা করেছেন যুহরী হতে, তিনি কাবীসাহ ইবনু যুয়াইব হতে, তিনি যাইদ ইবনু সাবিত হতে এই সূত্রে। তিনি আরো বলেন, এ হাদীসটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একজন সাহাবী কর্তৃক একজন তাবিঈ হতে বর্ণিত অর্থাৎ সাহল ইবনু সা’দ আস-সাইদী আল-আনসারী (রাযিঃ) রিওয়ায়াত করেছেন মারওয়ান ইবনুল হাকাম হতে। মারওয়ান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে সরাসরি হাদীস শুনেননি। তিনি তাবিঈদের অন্তর্ভুক্ত।
3034। ইয়া'লা ইবনু উমাইয়্যাহ্ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি উমার (রাযিঃ)-কে বললাম, আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “তোমরা যখন শত্রুর আশংকা করবে তখন নামায কসর করবে”— (সূরা আন-নিসা ১০১)। এখন তো মানুষ নিরাপদ ও ভীতিমুক্ত হয়ে গেছে (এখন নামায কসর করার কি প্রয়োজন)। উমার (রাযিঃ) বললেন, তুমি যে বিষয়ে বিস্ময়বোধ করছ আমিও একই বিষয়ে বিস্ময়বোধ করেছি এবং বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উত্থাপন করেছি। তিনি বলেছেনঃ এটা তো তোমাদের জন্য আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে সাদাকাহ। অতএব তোমরা তার সাদাকাহ (অনুগ্রহ) গ্রহণ কর। সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (১০৬৫), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3035। আবদুল্লাহ ইবনু শাকীক (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) আমার নিকট বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুজনান ও উসফান নামক জায়গার মাঝে যাত্রাবিরতি করলেন। মুশরিকরা বলল, তাদের নিকট একটি নামায আছে যা তাদের বাপ-দাদা ও সন্তান-সন্ততির চাইতেও বেশি প্রিয়। সেটি হচ্ছে আসরের নামায। কাজেই তোমরা নিজেদের যাবতীয় সাজ সরঞ্জাম প্রস্তুত করে সংকল্পবদ্ধ হয়ে থাক এবং তাদের উপর (নামাযরত অবস্থায়) ঝটিকা আক্রমণ চালাও। এদিকে জিবরীল (আঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নির্দেশ দিলেন, আপনার সংগীদের দু’ভাগে বিভক্ত করুন। এক অংশকে নিয়ে আপনি নামায আদায় করুন। অন্য দল নামাযরতদের পেছনে তাদের ঢাল ও অস্ত্র নিয়ে সতর্কাবস্থায় দাড়িয়ে থাকবে। এরপর দ্বিতীয় দল (যারা নামায আদায় করেনি) আসবে। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে এক রাকাআত নামায আদায় করবে। তারপর তারা তাদের অস্ত্রশস্ত্রসহ সতর্কাবস্থায় থাকবে। ফলে তাদের (উভয় দলের) এক এক রাকাআত হবে। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হবে দুই রাকাআত। সনদ সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ, আবূ হুরাইরাহর বরাতে 'আবদুল্লাহ ইবনু শাকীকের হাদীস হিসেবে গারীব। আবদুল্লাহ ইবনু আয-যুরাকী, ইবনু উমার, হুযাইফাহ, আবূ বাকরাহ ও সাহল ইবনু আবী হাসমা (রাযিঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। আবূ আইয়্যাশ আয-যুরাকীর নাম যাইদ ইবনু সামিত।
3036। কাতাদাহ্ ইবনুন নুমান (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে বানু উবাইরিক নামে একটি পরিবার ছিল। ঐ পরিবারে বিশর, বুশাইর ও মুবাশশির নামে তিনজন লোক ছিল। বুশাইর ছিল মুনাফিক। সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গী সাথীদের কুৎসা বর্ণনামূলক কবিতা রচনা করত, তারপর অপরাপর আরবদের প্রতি সেগুলো আরোপ করে বলত, অমুকে এরূপ এরূপ কথা বলেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবীগণ যখন তা শুনতেন তখন বলতেন, আল্লাহর শপথ। ঐ অপদার্থ (খবীস) লোকটি ব্যতীত আর কেউ এ কবিতা রচনা করেনি বা একই রকম কোন মন্তব্য করতেন। যাই হোক তারা বলতেন, এটা ইবনুল উবাইরকেরই (বুশাইর) কবিতা। বর্ণনাকারী বলেন, জাহিলী ও ইসলামী উভয় যুগে এ পরিবারটি ছিল অভাবগ্রস্ত ও দুর্ভিক্ষ পীড়িত। মাদীনায় লোকদের প্রধান খাদ্য ছিল খেজুর ও আটা। কেউ সম্পদশালী হলে সিরিয়া হতে কোন খাদ্যদ্রব্যের ব্যবসায়ী সাদা আটা বা ময়দা নিয়ে এলে সে ঐ (ব্যবসায়ী) কাফিলা হতে ময়দা কিনে নিয়ে সঞ্চয় করে রাখত নিজের ব্যবহারের জন্য। অবশিষ্ট পরিবার-পরিজনের জন্য থাকতো খেজুর ও গম। একবারের ঘটনা, সিরিয়া হতে একটি খাদ্য ব্যবসায়ী কাফিলা এলো। আমার চাচা রিফা'আহ ইবনু যাইদ (তাদের হতে) এক বস্তা ময়দা কিনলেন এবং ভাড়ার ঘরে রেখে দিলেন। একই জায়গায় অস্ত্রশস্ত্র, বর্ম ও তলোয়ারও ছিল। এদিকে ঘরের নিচ দিয়ে তার মাল আসবাব চুরি হয়ে গেল। গোপনে সিদ কেটে উক্ত ঘরে রক্ষিত ময়দা ও অস্ত্রশস্ত্র লাপাত্তা হয়ে গেল। ভোরবেলা আমার চাচা রিফা'আহ আমার নিকট আসলেন এবং বললেন, হে ভাতিজা! আমার উপর তো এ রাতে যুলুম হয়ে গেল। আমার ভাড়ারের ঘরে সিদ কেটে খাবার (ময়দা) ও অস্ত্রশস্ত্র চুরি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মহল্লায় অনুসন্ধান চালিয়ে দেখলাম ও জিজ্ঞাসাবাদ করলাম। আমাদের বলা হল, আমরা আজ রাতে বানু উবাইরিকদের ঘরে আলো জ্বালাতে দেখেছি। আমাদের ধারণা মতে তারা তোমাদের খাদ্যাদির তালাশেই আলো জ্বালিয়েছিল। রিফা'আহ বললেন, আমরা যখন এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলাম তখন উবাইরিকের লোকেরা বলল, আল্লাহর শপথ আমরা মনে করি তোমাদের এই চোর লাবীদ ইবনু সাহল ব্যতীত আর কেউ নয়। আমরা আগেই মহল্লাবাসীদের এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। লাবীদ ছিলেন আমাদেরই মধ্যকার একজন সৎ ও ভালো মুসলিম। লাবীদ এ কথা শুনামাত্র খাপ হতে তলোয়ার বের করে বললেন, আমি চুরি করি? আল্লাহর কসম! হয় আমার এ তলোয়ারের সাথে তোমার সাক্ষাত হবে অথবা তোমরা এ চুরির সাক্ষ্য-প্রমাণ হাযির করবে। তখন লোকেরা বলল, যাও তুমি আমাদের সামনে থেকে সরে দাড়াও। তুমি এ কাজ করোনি। এরপরও আমরা এ ব্যাপারে মহল্লায় জিজ্ঞাসাবাদ করে নিশ্চিত হলাম যে, বানু উবাইরিকই এ কাণ্ড ঘটিয়েছে। অবশেষে আমার চাচা আমাকে বললেন, হে ভাতিজা! তুমি ঘটনার বৃত্তান্ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট জানালে ভালো হত। কাতাদাহ (রাযিঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে তাকে বললাম, আমাদের মহল্লায় একটি যালিম পরিবার আছে এবং তারা আমার চাচা রিফা'আহ ইবনু যাইদের ভাণ্ডার কক্ষে সিঁদ কেটে তার অস্ত্রশস্ত্র ও খাদ্যাদি চুরি করে নিয়ে গেছে। আমাদের অস্ত্রশস্ত্র ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করুন, খাদ্যদ্রব্যাদির প্রয়োজন নেই। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমি শীঘ্রই এ ব্যাপারে একটা ফাইসালা করে দিচ্ছি। বনু উবাইরিক এ কথা শুনার পর তাদের নিজেদের এক লোকের নিকট এলো, যার নাম ছিল উসাইর ইবনু ‘উরওয়াহ। তারা তার সাথে এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করল। এ বাড়ির কিছু লোক একত্র হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! কাতাদাহ ইবনুন নুমান ও তার চাচা আমাদের এক সৎ ও মুসলিম পরিবারের পেছনে লেগেছে এবং কোন প্রমাণ ব্যতীতই তারা তাদের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ করছে। কাতাদাহ (রাযিঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে (বিষয়টি নিয়ে) তার সাথে কথা বললাম। তিনি বললেনঃ তুমি এমন এক পরিবারের বিরুদ্ধে বিনা প্রমাণে চুরির অপবাদ দিচ্ছ, যাদের সততা ও ইসলাম সম্পর্কে সুনাম আছে। কাতাদাহ (রাযিঃ) বলেন, আমি ফিরে আসলাম। আমি মনে মনে বললাম, আমার এ সামান্য মাল হাতছাড়া হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও আমি যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে এ বিষয়ে আলাপ না করতাম। এরপর আমার চাচা রিফা'আহ আমার নিকট এসে বললেন, হে ভাতিজা! (আমার ব্যাপারে) কি করেছ? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে যা কিছু বলেছেন, আমি তাকে তা জানালাম। তিনি বললেন, আল্লাহ তা'আলাই প্রকৃত সাহায্যকারী। এরপর কিছু সময় না যেতেই কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হয় (ব্যাখ্যাসহ অনুবাদ) “নিশ্চয়ই আমি এ কিতাব সত্য সহকারে তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, যেন আল্লাহ তা'আলা তোমাকে যা জ্ঞাত করেছেন তদনুসারে লোকদের মধ্যে মীমাংসা করতে পার। তুমি খিয়ানাতকারীদের পক্ষে (যেমন বনু উবাইরিকের সমর্থনে) বিতর্ককারী হয়ো না। আর তুমি আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর (কাতাদাহকে যা বলেছ তার জন্য)। নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা বড়ই ক্ষমাশীল ও দয়াবান। যারা নিজেদেরকে প্রতারিত করে তুমি তাদের সাহায্য করো না। আল্লাহ তা'আলা খিয়ানাতকারী পাপিষ্ঠদেরকে পছন্দ করেন না। এরা মানুষের হতে লুকাতে পারে, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা হতে গোপন হতে পারে না, কেননা তিনি তাদের সঙ্গেই থাকেন, যখন তারা রাতের বেলা গোপনে গোপনে তার মর্জি বিরুদ্ধ পরামর্শ করে। এদের সমস্ত কাজই আল্লাহ তা'আলা জ্ঞাত। আহা! তোমরাই এসব অপরাধীর পক্ষ সমর্থনে পার্থিব জীবনে বিতর্ক করছ, কিন্তু কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলার সামনে এদের পক্ষে কে ঝগড়া করবে অথবা কে তাদের উকিল হবে? কেউ কোন পাপকৰ্ম করলে বা নিজের উপর যুলুম করলে তারপর আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলে সে আল্লাহ তা'আলাকে ক্ষমাকারী ও অনুগ্রহশীল পাবে (অর্থাৎ তারা আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন)। কেউ গুনাহের কাজ করলে সে তা নিজের ক্ষতির জন্যই করে। আল্লাহ তা'আলা সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। কেউ কোন সমস্যা বা পাপকৰ্ম করে তারপর তা কোন নির্দোষ ব্যক্তির প্রতি আরোপ করলে (যেমন লাবীদ প্রসঙ্গে তাদের বক্তব্য) সে তো সাংঘাতিক মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে। তোমার প্রতি আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ ও দয়া না থাকলে তাদের একটি দল তোমাকে পথভ্রষ্ট করতে চাইত। কিন্তু তারা নিজেদের ব্যতীত অন্য কাউকে পথভ্রষ্ট করতে পারে না এবং তোমার কোন ক্ষতিও করতে পারে না। আল্লাহ তা'আলা তোমার প্রতি কিতাব ও হিকমাত অবতীর্ণ করেছেন এবং তোমাকে এমন জ্ঞান জানিয়ে দিয়েছেন যা তুমি জানতে না। তোমার প্রতি আল্লাহ তা'আলার বিরাট অনুগ্রহ আছে। তাদের বেশির ভাগ গোপন সলা-পরামর্শে কোন কল্যাণ নেই। অবশ্য কেউ কাউকে দান-খাইরাতের কিংবা কোন ভালো কাজের জন্য অথবা লোকদের মাঝে শান্তি স্থাপনের উপদেশ দিলে তাতে কল্যাণ আছে। আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভের জন্য যে কেউ এরূপ করলে তাকে অবশ্যই আমি মহাপুরস্কার দিব।” (সূরা আন-নিসা ১০৫-১১৪) কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট অপহৃত অস্ত্র ফেরত আনা হল। তিনি তা রিফা'আহ (রাযিঃ)-কে ফিরিয়ে দিলেন। কাতাদাহ (রাযিঃ) বলেন, আমার চাচা ছিলেন বৃদ্ধ। জাহিলিয়াতের যুগে তার রাতকানা রোগ হয়েছিল, অথবা বলেছেন, জাহিলিয়াতের আমলেই বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন (আবূ ঈসার সন্দেহ)। আমার ধারণা ছিল যে, তিনি ইসলামে দাখিল ছিলেন। আমি তার নিকট অস্ত্র ফেরত নিয়ে আসলে তিনি বললেন, হে ভাতিজা এটা আমি আল্লাহ তা'আলার রাস্তায় দান করে দিলাম। এবার আমার প্রত্যয় জন্মালো যে, নিঃসন্দেহে তিনি একজন খাঁটি মুসলিম। কুরআনের উক্ত আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হওয়ার পর বুশাইর মুশরিকদের সাথে গিয়ে মিলিত হয় এবং সা'দ ইবনু সুমাইয়্যার কন্যা সুলাফার নিকট অবস্থান গ্রহণ করে। তখন আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেনঃ কারো নিকট সৎপথ প্রকাশিত হওয়ার পর সে যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের পথ ব্যতীত অন্য পথের অনুসরণ করে, তবে যে দিকে সে ফিরে যায় আমরা সেদিকেই তাকে ফিরিয়ে দিব এবং জাহান্নামে তাকে দগ্ধ করব। আর তা কত মন্দ আবাস। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা তার সাথে শারীক করাকে ক্ষমা করেন না, তা ব্যতীত সবকিছু যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন এবং কেউ আল্লাহ তা'আলার সাথে শরীক করলে সে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হয়"- (সূরা আন-নিসা ১১৫-১১৬)। বুশাইর যখন সুলাফার নিকট আশ্রয় নিল, তখন হাসসান ইবনু সাবিত (রাযিঃ) কিছু কবিতার চরণ দ্বারা সুলাফার নিন্দাবাদ করেন। এতে সুলাফা বুশাইরের মালপত্র নিজ মাথায় তুলে নিয়ে তা আবতাহ নামক স্থানে গিয়ে ফেলে দিল। সে আরো বলল, তুমি আমার জন্য হাসসানের (নিন্দাসূচক) কবিতা উপহার নিয়ে এলে, আমার জন্য উত্তম কিছু নিয়ে আসতে পারলে না হাসান। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি গারীব। মুহাম্মাদ ইবনু সালামাহ আল-হাররানী ব্যতীত আর কেউ এটিকে মুসনাদরূপে রিওয়ায়াত করেছেন বলে আমাদের জানা নেই। এ হাদীসটি মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক-আসিম ইবনু উমার ইবনু কাতাদাহ সূত্রে ইউনুস ইবনু বুকাইর প্রমুখ মুরসালরূপে বর্ণনা করেছেন। তাতে তার বাবা-তার দাদা সূত্রের উল্লেখ নেই। কাতাদাহ্ ইবনুন নুমান মাতার দিক হতে আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাযিঃ)-এর ভাই। আবূ সাঈদ (রাযিঃ)-এর নাম সাদ ইবনু মালিক ইবনু সিনান।
3037। আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমার কাছে কুরআনের এ আয়াত হতে পছন্দনীয় আয়াত আর কোনটি নেইঃ “নিশ্চয় আল্লাহ তার সাথে অংশীদার করাকে মাফ করেন না; তা ছাড়া সব কিছু যাকে ইচ্ছা মাফ করেন”। সনদ দুর্বল আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান গারীব। আবূ ফাখিতার নাম সাঈদ ইবনু ইলাকা। সুআইরের উপনাম আবূ জাহম। ইনি কূফার বাসিন্দা তাবেঈ। তিনি ইবনু উমার (রাঃ), ইবনু যুবাইর (রাঃ) হতে হাদীস শুনেছেন। ইবনু মাহদী তাকে কিছুটা দোষারোপ করতেন।
3038। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “কেউ মন্দ কাজ করলে তার প্রতিফল সে পাবে”— (সূরা আন-নিসা ১২৩) আয়াত অবতীর্ণ হলে মুসলিমদের নিকট বিষয়টি খুবই গুরতর মনে হয়। তাই তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এ ব্যাপারে অভিযোগ করেন। তিনি বললেনঃ তোমরা সত্যের নিকটবর্তী থাক এবং সরল সোজা পথ তালাশ কর। মুমিনের প্রতিটি বিপদ-মুসীবত ও কষ্ট-ক্লেশ, এমনকি তার দেহে কোন কাটা বিদ্ধ হলে বা তার উপর কোন আকস্মিক বিপদ এলে তার দ্বারাও তার গুনাহর কাফফারা (ক্ষতিপূরণ) হয়ে যায়। সহীহঃ তাখরীজুত তাহাবীয়া (৩৯০), যঈফাহ (২৯২৪)নং হাদীসের অধিনে, মুসলিম। ইবনু মুহাইসিনের নাম 'আমর ইবনু আবদুর রাহমান ইবনু মুহাইসিন। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব।
3039। আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে হাজির থাকাবস্থায় তার উপর এ আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ “যে কেউ খারাপ কাজ করবে সে তার প্রতিফল পাবেই এবং সে নিজের জন্য আল্লাহ তা'আলা ছাড়া কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না" (সূরাঃ আন-নিসা১২৩)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ হে আবূ বাকর! আমি কি আপনাকে ঐ আয়াত পাঠ করে শুনাব না যা আমার উপর অবতীর্ণ হয়েছে? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! অবশ্যই। তিনি আমাকে আয়াতটি পাঠ করে শুনান। আমি আর কিছুই জানি না, তবে তখন আমার মনে হল যে, আমার শিরদাঁড়া ভেংগে গেছে। তাই আমি পিঠমোড় দিলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেনঃ হে আবূ বাকর! আপনার কি হল? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার প্রতি আমার পিতামাতা উৎসর্গত হোক। আমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে খারাপ কাজ করে না? আমাদের প্রতিটি কাজের জন্যই কি প্রতিফল ভোগ করতে হবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে আবূ বাকর! আপনি এবং মু’মিনগণ এ দুনিয়াতেই তার প্রতিফল পেয়ে যাবেন। অবশেষে আপনারা আল্লাহ্ তা'আলার সাথে পাপমুক্ত অবস্থায় মিলিত হবেন। পক্ষান্তরে অপরাপর লোকদের খারাপ কাজগুলো তাদের জন্য সঞ্চিত করে রাখা হবে। অবশেষে হাশরের দিন তাদেরকে তার প্রতিফল দেয়া হবে। সনদ দুর্বল আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি গারীব। এটির সনদসূত্র সমালোচিত। এ হাদীসের রাবী মূসা ইবনু উবাইদা হাদীসশাস্ত্রে দুর্বল। ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ ও আহমাদ ইবনু হাম্বল (রাহঃ) তাকে যঈফ বলেছেন। ইবনু সিবার মুক্তগোলাম অখ্যাত ও অজ্ঞাত। হাদীসটি ভিন্নরূপে আবূ বাকর (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে, এর সনদও সহীহ নয়। এ অনুচ্ছেদে আইশা (রাঃ) হতেও হাদীস বর্ণিত আছে।
3040। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, সাওদা (রাযিঃ)-এর আশংকা হল যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তালাক দিবেন। তাই তিনি বললেন, আপনি আমাকে তালাক না দিয়ে আপনার বিবাহবন্ধনে স্থির রাখুন। আমার জন্য নিৰ্দ্ধারিত দিনটি আপনি আয়িশাহর নিকটই থাকুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাই করলেন। এ প্রসঙ্গেই অবতীর্ণ হয়ঃ তবে তারা (স্বামী-স্ত্রী) আপোস-নিম্পত্তি করতে চাইলে তাদের কোন গুনাহ নেই এবং আপোস-নিম্পত্তিই শ্ৰেয়”— (সূরা আন-নিসা ১২৮)। যে বিষয়ের উপর তারা আপোষ করবে তা জায়িয। শেষের বক্তব্যটুকু ইবনু আব্বাস (রাযিঃ)-এর। সহীহঃ ইরওয়াহ (২০২০)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব।
3041। আল-বারাআ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, (উত্তরাধিকার প্রসঙ্গে) সবশেষে যে আয়াত অবতীর্ণ হয় তা হলঃ “লোকেরা তোমার নিকট বিধান জানতে চায়। বল, পিতা-মাতাহীন নিঃসন্তান ব্যক্তি প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে বিধান দিচ্ছেন..." (সূরা আন-নিসা ১৭৬)। সহীহঃ সহীহ আবূ দাউদ (২৫৭০), বুখারী (৪৬০৫), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান। আবূস সাফারের নাম সাঈদ ইবনু আহমাদ আস-সাওরী। তিনি ইবনু ইউহমিদ আস-সাওরী বলেও কথিত।
3042। আল বারাআ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! “লোকেরা আপনার নিকট বিধান জানতে চায়। বলুন, পিতা-মাতাহীন নিঃসন্তান ব্যক্তি প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা তোমাদের বিধান দিচ্ছেন....."— (সূরা আন-নিসা ১৭৬)। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ তোমার জন্য এ ব্যাপারে গ্রীষ্মকালীন ঐ আয়াতটিই (সূরা আন-নিসা ১৭৬) যথেষ্ট। সহীহঃ সহীহ আবূ দাউদ (২৫৭১), মুসলিম উমার (রাযিঃ) হতে।
3043। তারিক ইবনু শিহাব (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ইয়াহুদী উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ)-কে বলল, হে আমীরুল মু'মিনীন! “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত করলাম”— (সূরা আল-মায়িদাহ ৩) আয়াতটি যদি আমাদের উপর অবতীর্ণ হত তাহলে আমরা উক্ত দিনকে ঈদের (উৎসবের) দিন হিসেবে নিৰ্দ্ধারণ করতাম। উমার (রাযিঃ) বললেন, নিশ্চয়ই আমি জানি কোন দিন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। এটি (বিদায় হজ্জে) আরাফার দিন শুক্রবারে অবতীর্ণ হয়েছিল। সহীহঃ বুখারী (৪৬০৬), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3044। আম্মার ইবনু আবী আম্মার (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) নিম্নোক্ত আয়াতটি পাঠ করলেন (অনুবাদ) “আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে তোমাদের জন্য পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত করলাম”— (সূরা আল-মায়িদাহ ৩)। তার নিকট এক ইয়াহুদী উপস্থিত ছিল। সে বলল, আমাদের উপর এরূপ একটি আয়াত অবতীর্ণ হলে সেই দিনকে আমরা অবশ্যই ঈদের দিন হিসেবে পালন করতাম। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) বলেন, এটি তো (আমাদের) ঈদের দিনেই অবতীর্ণ হয়েছেঃ জুমুআর দিন ও আরাফার দিন। সনদ সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি ইবনু আব্বাস (রাযিঃ)-এর রিওয়ায়াত হিসেবে হাসান গারীব। হাদীসটি সহীহ।
3045। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দয়াময় আল্লাহ তা'আলার ডান হাত পূর্ণ। সর্বদা তা অনুগ্রহ ঢালছে। রাত দিনের অবিরাম দান তাতে কখনো কমতি ঘটাতে পারে না। তিনি আরো বলেন, তোমরা লক্ষ্য করেছ কি যেদিন থেকে তিনি আসমান-যামীন সৃষ্টি করেছেন সেদিন হতে কত না দান করে আসছেন, অথচ তার ডান হাতে যা আছে তাতে কিছুই কমতি হয়নি। (সৃষ্টির পূর্বে) তার আরশ ছিল পানির উপর। তার অপর হাতে রয়েছে মীযান (দাঁড়ি-পাল্লা)। তিনি তা নীচু করেন ও উত্তোলন করেন (সৃষ্টির রিযিক নির্ধারণ করেন)। সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (১৯৭)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। এ হাদীসটি হল নিম্নোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যাস্বরূপঃ “ইয়াহুদীরা বলে, আল্লাহ তা'আলার হাত রুদ্ধ। ওরাই আসলে রুদ্ধহস্ত এবং ওরা যা বলে তজ্জন্য ওরা অভিশপ্ত। বরং আল্লাহ তা'আলার উভয় হাতই প্রসারিত, যেভাবে ইচ্ছা তিনি দান করেন”— (সূরা আল-মায়িদাহ ৬৪)। ইমামগণ বলেন, এ হাদীস যেরূপে (আমাদের নিকট) এসেছে, কোনরূপ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও সন্দেহ-সংশয় ব্যতীতই তার উপর সেভাবেই ঈমান আনতে হবে। একাধিক ইমাম এ কথা বলেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন সুফইয়ান সাওরী, মালিক ইবনু আনাস, ইবনু উয়াইনাহ, ইবনুল মুবারাক (রাহঃ) প্রমুখ। তাদের মতে এরূপ বিষয় বর্ণনা করা যাবে, এগুলোর উপর ঈমান রাখতে হবে, কিন্তু তা কেমন এ কথা বলা যাবে না।
3046। আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে (নিরাপত্তামূলক) পাহারা দেয়া হত। তারপর আয়াত অবতীর্ণ হল (অনুবাদ) “আল্লাহ তা'আলা তোমাকে মানুষ হতে তার রক্ষা করবেন"- (সূরা আল-মায়িদাহ ৬৭)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের ঘর হতে মাথা বের করে পাহারাদারগণকে বললেন, হে লোকজন! তোমরা (আমার পাহারা হতে) চলে যাও। কারণ আল্লাহ তা'আলাই আমার হিফাজাতের দায়িত্ব নিয়েছেন। হাসান। নাসর ইবনু ‘আলী মুসলিম ইবনু ইবরাহীম হতে উক্ত সনদে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি গারীব। এ হাদীসটি কেউ কেউ জুরাইরী হতে আবদুল্লাহ ইবনু শাকীকের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে পাহারা দেয়া হত"। তাতে তারা আয়িশাহ (রাযিঃ)-এর উল্লেখ করেননি।
3047। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বানু ইসরাঈল গৰ্হিত কাজে জড়িত হলে তাদের বিজ্ঞ আলিমগণ তাদেরকে বাধা দেন। কিন্তু তারা (পাপাচার থেকে) ক্ষান্ত হয়নি। এতদসত্ত্বেও তাদের আলিমগণ তাদের সাথে তাদের সভা সমিতিতে উঠাবসা ঠিক রাখে এবং তাদের সাথে এক সংগে ভোজসভায় যোগদান করে। ফলে আল্লাহ তা'আলা তাদের কারো হৃদয়সমূহ অন্য কারো (পাপীদের) হৃদয়ের সাথে একাকার করে দিলেন এবং দাউদ (আঃ) ও ঈসা ইবনু মারইয়াম (আঃ)-এর যবানীতে তাদেরকে অভিসম্পাত করলেন। কেননা তারা বিরুদ্ধাচারী হয়ে গিয়েছিল এবং সীমালংঘন করেছিল। রাবী বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেলান দিয়ে বসা ছিলেন। তিনি এবার সোজা হয়ে বসলেন এবং বললেনঃ কসম সেই সত্তার যার হাতে আমার জান! ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা মুক্তি পাবে না যতক্ষণ না তোমরা পথভ্রষ্ট লোকদের (শক্তভাবে) বাধা দিচ্ছ। যঈফ, ইবনু মাজাহ (৪০০৬) আবূ ঈসা বলেনঃ আবদুল্লাহ ইবনু আবদুর রহমান বলেন, ইয়াযীদ বলেছেন, সুফিয়ান সাওরী (রাহঃ) উক্ত হাদীসের সনদে আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর উল্লেখ করেননি। এ হাদীসটি হাসান গারীব। এ হাদীসটি মুহাম্মাদ ইবনু মুসলিম ইবনু আবূল ওয়ায্যাহ-আলী ইবনু বাযীমা হতে তিনি আবূ উবাইদা হতে তিনি আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এরকমই বর্ণনা করেছেন। কেউ কেউ এ হাদীস আবূ উবাইদার সূত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে মুরসালরূপে বর্ণনা করেছেন।
3048। আবূ উবাইদা (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বনী ইসরাঈলের মধ্যে যখন দোষ পদস্খলন ছড়িয়ে পড়তে লাগলো তখন তাদের একজন অন্যজনকে পাপে নিমজ্জিত দেখলে তাকে তা থেকে নিষেধ করত। কিন্তু সে তাকে যা করতে দেখেছে তা পরদিন তাকে তার সাথে পানাহার ও এক সাথে মাজলিসে উঠাবসা হতে নিবৃত্ত রাখল না। অবশেষে আল্লাহ তা'আলা তাদের হৃদয়সমূহকে পরস্পর একাকার করে দিলেন। তাদের প্রসঙ্গেই কুরআন অবতীর্ণ হয়। তিনি পাঠ করেনঃ “বনী ইসরাঈলের মধ্যে যেসব লোক কুফরী করেছিল তাদের প্রতি দাউদ ও মারইয়ামের পুত্র ঈসার যবানে অভিশাপ করা হয়েছে। কেননা তারা ছিল অবাধ্য ও সীমালংঘনকারী”। তিনি তিলাওয়াত করতে করতে “তারা আল্লাহ তা'আলাতে, নবীতে ও তার উপর যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে ঈমান আনলে ওদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করত না, কিন্তু তাদের অনেকেই ফাসিক" (সূরাঃ আল-মায়িদাহ– ৭৯-৮১) পর্যন্ত পৌছলেন। রাবী বলেন, আল্লাহ তা'আলার নবী হেলান দেয়া অবস্থায় ছিলেন। তিনি সোজা হয়ে বসে বলেনঃ না, তোমরা যালিমের হাত ধরে তাকে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত না করা পর্যন্ত রক্ষা পাবে না। যঈফ, দেখুন পূর্বের হাদীস বুন্দার আবু দাউদ আত তাইয়া লিসী হতে তিনি মুহাম্মাদ ইবনু মুসলিম ইবনু আবূল ওয়ায্যাহ হতে তিনি আলী ইবনু বাযীমা হতে তিনি আবূ উবাইদা হতে তিনি আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর সূত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে একই রকম বর্ণনা করেছেন।
3049। উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হে আল্লাহ! শরাবের ব্যাপারে আমাদের জন্য পরিপূর্ণ ও সুস্পষ্ট বর্ণনা দিন। এ প্রসঙ্গেই সূরা আল-বাকারার নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ) “লোকে তোমাকে মদ ও জুয়া প্রসঙ্গে প্রশ্ন করে। বল, উভয়ের মধ্যে আছে মহাপাপ এবং মানুষের জন্য উপকারও। কিন্তু এগুলোর পাপ এগুলোর উপকার অপেক্ষা বেশি” (সূরা আল-বাকারাহ ২১৯)। উমার (রাযিঃ)-কে ডেকে এনে তাকে উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করে শুনানো হল। তিনি বললেন, হে আল্লাহ! শরাবের ব্যাপারে আমাদের আরও সুস্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দিন। তখন সূরা আন-নিসার নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ) “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাযের নিকটেও যেও না, যতক্ষণ না তোমরা যা বল তা বুঝতে পার”— (সূরা আন-নিসা ৪৩)। উমার (রাযিঃ)-কে ডেকে এনে তাকে উক্ত আয়াত পাঠ করে শুনানো হল। উমার (রাযিঃ) আবারো বললেন, হে আল্লাহ! শরাবের ব্যাপারে আমাদের সুস্পষ্ট ও পূর্ণ বিবরণ দিন। তারপর সূরা আল-মাইদার এ আয়াত অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ) শাইতান তো শরাব ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শক্রতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহ তা'আলার স্মরণে ও নামাযে বাধা দিতে চায়। তবে কি তোমরা নিবৃত্ত হবে না?”— (সূরা আল-মায়িদাহ ৯১) উমর (রাযিঃ)-কে ডেকে এনে তাকে এ আয়াত পাঠ করে শুনানো হল। তিনি বললেন, আমরা নিবৃত হলাম, আমরা নিবৃত হলাম। সহীহঃ সহীহাহ (২৩৪৮)। আবূ ঈসা বলেন, ইসরাঈলের সূত্রে এটি মুরসালরূপে বর্ণিত হয়েছে। মুহাম্মাদ ইবনুল আলা-ওয়াকী হতে, তিনি ইসরাঈল হতে, তিনি আবূ ইসহাক হতে, তিনি আবূ মাইসারাহ (রহঃ) হতে এই সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ) বললেন, হে আল্লাহ! শরাব ও মাদক দ্রব্য প্রসঙ্গে আমাদের জন্য সুস্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দিন ..... তারপর তিনি পূর্বোক্ত হাদীসের একই রকম বর্ণনা করেছেন। এটি মুহাম্মাদ ইবনু ইউসুফের হাদীসের চাইতে অনেক বেশি সহীহ।
3050। আল-বারাআ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, শরাব হারাম হওয়ার পূর্বেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীদের বেশ কয়েকজন মারা যান। শরাব হারাম হওয়ার পর লোকেরা বলাবলি করতে লাগল, আমাদের ঐ সকল সাখীদের কি হবে, যারা শরাব পানে অভ্যস্ত থাকা অবস্থায় মারা গেছেন! তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ) “যারা ঈমান এনেছে ও নেক কাজ করেছে, তারা পূর্বে যা ভক্ষণ করেছে সেজন্য তাদের কোনরূপ গুনাহ নেই, যদি তারা সাবধান হয় এবং ঈমান আনে ও উত্তম কাজ করে, সাবধান হয় ও ঈমান আনে, আবার সাবধান হয় ও সৎকর্ম করে এবং আল্লাহ তাআলা সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন”— (সূরা আল-মায়িদাহ ৯৩)। পরবর্তী হাদীসের সহায়তায় সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। শু'বাহ (রাহঃ) আবূ ঈসহাক (রাহঃ) এর বরাতে এটি আল-বারাআ (রাযিঃ) সূত্রে বর্ণনা করেছেন। বুন্দার এটি আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন।
3051। আবূ ইসহাক (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল-বারাআ ইবনু আযিব (রাযিঃ) বলেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বেশ কিছু সাহাবী শরাব নিষিদ্ধ হওয়ার পূর্বে মদ্যপানে অভ্যস্ত অবস্থায় মারা যান। শরাব হারাম হওয়া সম্পর্কিত আয়াত অবতীর্ণ হলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথীদের কেউ কেউ বলেন, আমাদের ঐসব সার্থীদের কি হবে, যারা শরাব পানে অভ্যস্ত থাকাকালে মারা গেছেন! তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ) “যারা ঈমান এনেছে ও নেক কাজ করেছে তারা পূর্বে যা ভক্ষণ করেছে, সেজন্য তাদের কোন গুনাহ নেই.....”— (সূরা আল-মায়িদাহ ৯৩)। সনদ সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3052। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মদ্যপান হারাম হওয়ার পর লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল" মদ্যপান হারাম হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত যারা শরাবপানে অভ্যস্ত থাকাকালে মারা গেছে তাদের সম্পর্কে আপনার অভিমত কি? তখন নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ (অনুবাদ) “যারা ঈমান এনেছে ও নেক কাজ করেছে তারা পূর্বে যা ভক্ষণ করেছে সেজন্য তাদের কোনরূপ গুনাহ নেই, যদি তারা সাবধান হয় এবং ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে”— (সূরা মায়িদাহ ৯৩)। পূর্বের হাদীসের সহায়তায় সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3053। আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “যারা ঈমান এনেছে ও নেক কাজ করেছে তারা পূর্বে যা ভক্ষণ করেছে সেজন্য তাদের কোন গুনাহ নেই...” (সূরা আল-মায়িদাহ ৯৩), এই আয়াত অবতীর্ণ হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেন, তুমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত। সহীহঃ মুসলিম (১/১৪৭)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3054। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি গোশত খেলে স্ত্রীসহবাসের জন্য অস্থির হয়ে পড়ি এবং যৌনাবেগ আমাকে ব্যাকুল করে তোলে। তাই আমি নিজের জন্য গোশত খাওয়া হারাম করে নিয়েছি। এ প্রসঙ্গেই আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন (অনুবাদ) “হে ঈমানদারগণ আল্লাহ তা'আলা তোমাদের জন্য উৎকৃষ্ট ও পবিত্র যেসব বস্তু হালাল করেছেন, তোমরা সেগুলোকে হারাম করে নিও না এবং সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না। আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে যা কিছু হালাল ও উৎকৃষ্ট রিযিক দান করেছেন তোমরা তা হতে খাও এবং আল্লাহ তা'আলাকে ভয় কর, যার প্রতি তোমরা ঈমান এনেছ"- (সূরা আল-মায়িদাহ ৮৭, ৮৮)। সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। উসমান ইবনু সা'দ হতে কেউ কেউ এটিকে মুরসালরূপে বর্ণনা করেছেন। তাতে ইবনু আব্বাস (রাযিঃ)-এর উল্লেখ নেই। খালিদ এ হাদীসটি ইকরিমাহ (রাহঃ) হতে মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
3055। আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, “লোকদের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার ক্ষমতা আছে, আল্লাহ্ তা'আলার উদ্দেশ্যে ঐ ঘরের হাজ্জ করা তার অবশ্য কর্তব্য" (সূরাঃ আলে-ইমরান- ৯৭), এই আয়াত অবতীর্ণ হলে সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! প্রতি বছর (কি হাজ্জ করতে হবে) তিনি নিরব থাকলেন। তারা আবার বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! প্রতি বছর কি? তিনি বললেন, না। তবে আমি যদি হ্যাঁ বলতাম, তাহলে তাই ওয়াজিব হত। তখন পরাক্রমশালী আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা, এমন কোন বিষয়ে প্রশ্ন করো না, যা তোমাদের জন্য প্রকাশ করা হলে তোমাদের মন্দ লাগবে" (সূরাঃ আল-মায়িদাহ– ১০১) যঈফ, পূর্বেও (৮১১) নং হাদীসে বর্ণিত হয়েছে আবূ ঈসা বলেনঃ আলী (রাঃ)-এর হাদীস হিসেবে এটি হাসান গারীব। এ অনুচ্ছেদে আবূ হুরাইরা ও ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতেও হাদীস বর্ণিত আছে।
3056। আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার বাবা কে? তিনি বললেনঃ তোমার বাবা অমুক। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ) “হে ঈমানদারগণ! তোমরা এমন কোন বিষয়ে প্রশ্ন করো না, যা তোমাদের নিকট প্রকাশিত হলে তা তোমাদের কষ্ট দিবে”— (সূরা আল-মায়িদাহ ১০১)। সহীহঃ বুখারী (২৬২১), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ গারীব।
3057। আবূ বাকর সিদ্দীক (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হে লোক সকল! তোমরা এ আয়াত পাঠ করে থাক (অনুবাদ) “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের দায়িত্ব তোমাদেরই উপর। তোমরা যদি সৎপথে পরিচালিত হও তবে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে সে তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না" (সূরা আল-মায়িদাহ ১০৫)। অথচ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ মানুষ কোন যালিমকে যুলুম ও অত্যাচার করতে দেখেও তার হাত ধরে তাকে নিবৃত্ত না করলে অচিরেই আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ব্যাপকভাবে শাস্তি দিবেন। সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। ইসমাঈল ইবনু আবী খালিদের সূত্রে অপরাপর বর্ণনাকারীও এটিকে মারফুরূপে একই রকম বর্ণনা করেছেন। কেউ কেউ ইসমাঈল হতে কাইস (রাহঃ)-এর সূত্রে এটিকে আবূ বাকর (রাযিঃ)-এর বক্তব্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তারা এটিকে মারফুরূপে বর্ণনা করেননি।
3058। আবূ উমাইয়্যা আশ-শাবানী (রাহঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি আবূ সালাবা আল-খুশানী (রাঃ)-এর নিকট এসে তাকে বললাম, এ আয়াত প্রসঙ্গে আপনি কি করণীয় বলে ঠিক করেছেন? তিনি বললেনঃ কোন আয়াত? আমি বললাম, আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের দায়িত্ব তোমাদেরই উপর। তোমরা যদি সৎপথে পরিচালিত হও তবে যে বিপথগামী হয়েছে সে তোমাদের কোন লোকসান করতে পারবে না" (সূরাঃ আল-মায়িদাহ– ১০৫)। আবূ সালাবা (রাঃ) বললেনঃ আল্লাহর কসম! তুমি এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ জেনেছে এমন একজনকে প্রশ্ন করেছ। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করেছি। তিনি বলেছেনঃ বরং তোমরা সৎ কাজের আদেশ দিতে থাক এবং খারাপ কাজ হতে বিরত করতে থাক। অবশেষে যখন দেখবে কৃপণতার বশ্যতা করা হচ্ছে, নাফসের অনুসরণ করা হচ্ছে, দুনিয়াকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে এবং প্রত্যেকে নিজের মতকে সর্বোত্তম মনে করছে, তখন তুমি শুধুমাত্র নিজেকে রক্ষায় নিয়োজিত থেকে এবং সাধারণের ভাবনা ছেড়ে দিও। কারণ তোমাদের পর এমন যুগ আসবে, যখন (দীনের উপর) সবর করে থাকা জ্বলন্ত অঙ্গার হাতের মুঠোয় ধারণ করে রাখার মত (যন্ত্রণাদায়ক) হবে। ঐ সময় দীনের উপর আমলকারীর প্রতিদান হবে তোমাদের মত পঞ্চাশজন আমলকারীর প্রতিদানের সমান। আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারাক (রাহঃ) বলেনঃ উতবা ছাড়া অপরাপর রাবীর রিওয়ায়াত আরো আছে, প্রশ্ন করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যকার পঞ্চাশজন না তাদের মধ্যকার পঞ্চাশজন আমলকারীর সমান? তিনি বললেনঃ না, বরং তোমাদের মধ্যকার পঞ্চাশজনের সমান তার সাওয়াব হবে। যঈফ, নাকদুল কাত্তানী (২৭/২৭), মিশকাত (৫১৪৪) কিন্তু হাদীসের কিছু অংশ সহীহ, দেখুন হাদীস নং (২৩৬১)। সহীহা (৫৯৪) আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান গারীব।
3059। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, তামীম আদ-দারী (রাঃ) নিম্নোক্ত আয়াত প্রসঙ্গে বলেছেন, আমি ও আদী ইবনু বাদ্দা ব্যতীত অপর কারো সাথে তা সম্পর্কিত নয়ঃ “হে ঈমানদারগণ! যখন তোমাদের মধ্যে.কারো মৃত্যু হাযির হয় তখন ওসিয়াত করার সময় তোমাদের মধ্য হতে ন্যায়নিষ্ঠ দু'জনকে সাক্ষী রাখবে” (সূরাঃ আল-মাইদা- ১০৬)। তারা দু’জনই ছিলেন নাসারা। ইসলাম কবুলের পূর্বে বাণিজ্যের উদ্দশ্যে তাদের সিরিয়ায় আসা যাওয়া ছিল। কোন এক সময় তারা ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়া যান। বানু সাহমের গোলাম বুদাইল ইবনু আবূ মারইয়ামও ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে তাদের নিকট আসলো। তার নিকট একটি রূপার পানপাত্র ছিল। তিনি এটি বাদশার নিকট বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে এনেছিলেন। তার ব্যবসায় পণ্যের মধ্যে এটিই ছিল সর্বোৎকৃষ্ট। হঠাৎ তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি তাদের (তামীমুদ দারী ও আদী ইবনু বাদ্দা) উভয়কে ওসিয়াত করেন যে, (তার মারা যাবার পর) তার রেখে যাওয়া মালামাল যেন তারা তার পরিজনকে পৌছে দেয়। তামীম (রাঃ) বলেনঃ তিনি মারা গেলে আমরা পানপত্রটি নিয়ে গিয়ে এক হাজার দিরহামে বিক্রয় করি এবং বিক্রয়লব্ধ টাকা আমি ও আদী ইবনু বাদা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেই। আমরা তার পরিবার-পরিজনের নিকট পৌছে, আমাদের নিকট যা কিছু সঞ্চিত ছিল তা তাদের ফিরিয়ে দিলাম। কিন্তু তারা পানপাত্রটি না পেয়ে আমাদেরকে সেটি প্রসঙ্গে প্রশ্ন করে। আমরা বললাম, সে তো আমাদের নিকট ইহা ব্যতীত আর কিছু রেখে যায়নি। তামীম (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাদীনায় পদার্পণের পর যখন আমি ইসলাম কুবুল করি, তখন আমি আমার এ অপকর্মের জন্য নিজেকে দোষী মনে করলাম (এবং এ হতে মুক্ত হতে চাইলাম)। তাই আমি তার পরিজনের নিকট এসে তাদের আসল ঘটনা খুলে বললাম এবং তাদের পাঁচ শত দিরহাম দিয়ে দিলাম। আমি তাদের এও বললাম, আমার সংগীর (আদী ইবনু বাদা) নিকটও সমপরিমাণ (দিরহাম) রয়েছে। তারা তখন বিষয়টি নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এলো। তিনি তাদের নিকট প্রমাণ চাইলে তারা তা পেশ করতে অক্ষম হয়। তিনি তাদের নির্দেশ দিলেন যে, তারা আদী ইবনু বাদ্দাকে এমনভাবে কসম করতে বলবে যেভাবে কসম করলে তার ধর্মের দৃষ্টিতে তা গুরুত্বপূর্ণ হয়। তারপর আদী শপথ করল (নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের জন্য)। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ “হে মু’মিনগণ! তোমাদের কারও যখন মৃত্যু হাযির হয় তখন ওসিয়াত করার সময় তোমাদের মধ্য হতে দু'জন ন্যায়পরায়ণ লোককে সাক্ষী রাখবে... আল্লাহ তা'আলা সত্যত্যাগী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না” (সূরাঃ আল-মায়িদাহ১০৬-১০৮)। তারপর আমর ইবনুল আস (রাঃ) ও অপর এক ব্যক্তি সাক্ষ্য দিতে উঠলেন এবং শপথ করলেন। অবশেষে আদী ইবনু বাদ্দার নিকট হতে পাঁচ শত দিরহাম আদায় করা হয়। সনদ অত্যন্ত দুর্বল আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি গারীব। এটির সনদ সহীহ নয়। আর যে আবূন নাযরের নিকট হতে মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, আমার মতে তিনি হচ্ছেন মুহাম্মাদ ইবনুস সাইব আল-কালবী। আবূন নাদর হল তার ডাকনাম। মুহাদ্দীসগণ তাকে বর্জন করেছেন। তিনি একজন তাফসীরকারও। আমি মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈলকে বলতে শুনেছি যে, মুহাম্মাদ ইবনুস সাইব আল-কালবীর ডাকনাম আবূন নাযর। উম্মু হানী (রাঃ)-এর মুক্তগোলাম আবূ সালিহ হতে সালিম আবূন নাযর আল-মাদীনীর কোন বর্ণনা আছে বলে আমাদের জানা নেই। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতেও এ বিষয়ে সংক্ষেপিত আকারে ভিন্নরূপে হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
3060। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বানু সাহমের এক লোক তামীমুদ দারী (রা) ও ‘আদী ইবনু বাদ্দার সাথে (সফরে) বের হয়। বানু সাহমের লোকটি এমন এক এলাকায় মারা গেল, যেখানে কোন মুসলিম ছিল না। ঐ দুই ব্যক্তি তার পরিত্যক্ত সম্পদ নিয়ে তার পরিজনের নিকট ফিরে এলে তারা তার মধ্যে স্বর্ণখচিত রূপার পানপত্রটি খুজে পেল না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের উভয়কে শপথ করালেন। তার ওয়ারিশরা পরে মক্কায় ঐ পানপত্রটি দেখতে পায়। তাদের বলা হয়, আমরা এটি তামীম ও আদীর নিকট হতে কিনেছি। সাহমীর ওয়ারিশদের মধ্য হতে দুইজন লোক দাবি নিয়ে উঠে এবং আল্লাহর শপথ করে বলে, আমাদের সাক্ষ্য উক্ত দুইজনের সাক্ষ্যের চাইতে অনেক বেশি সত্য ও গ্রহণযোগ্য। নিঃসন্দেহে এ পানপত্রটি তাদের সাথীরই। এদের সম্পর্কেই এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে (অনুবাদ) “হে মু’মিনগণ! তোমাদের কারও যখন মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন ওয়াসিয়াত করার সময় তোমাদের মধ্য হতে দু’জন ন্যায়পরায়ণ লোককে সাক্ষী রাখবে..."— (সূরা আল-মায়িদাহ ১০৬)। সহীহঃ বুখারী (২৭৮০)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। এটি হল ইবনু আবী যায়িদার রিওয়ায়াত।
3061। আম্মার ইবনু ইয়াসির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আকাশ হতে (ঈসা (আঃ)-এর উম্মাতের জন্য) খাঞ্চাভর্তি রুটি ও গোশত পাঠানো হয়। তাদের প্রতি হুকুম ছিল তারা যেন খিয়ানাত না করে এবং আগামী কালের জন্য তা সঞ্চয় করে না রাখে। কিন্তু তারা এতে খিয়ানাত করল ও তা থেকে জমা করল এবং আগামী কালের জন্য তুলে রাখল। ফলে তাদেরকে বানর ও শূকরে পরিনত করা হল। সনদ দুর্বল আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি গারীব। এ হাদীসটি আবূ আসিম প্রমুখ সাঈদ ইবনু আবূ আরুবা হতে তিনি কাতাদা হতে তিনি খিলাস হতে তিনি আম্মার (রাঃ) সূত্রে মাওকুফরূপে বর্ণনা করেছেন। হাসান ইবনু কাযাআর রিওয়ায়াত ছাড়া অন্য কোন সূত্রে এটিকে আমরা মারফু বলে জানি না। হুমাইদ ইবনু মাসআদা-সুফিয়ান ইবনু হাবীব হতে তিনি সাঈদ ইবনু আবূ আরুবার সূত্রে একই রকম বর্ণিত হয়েছে এবং এই সূত্রে তা মারফুরূপে বর্ণনা করেছেন। এটি হাসান ইবনু কাযাআর রিওয়ায়াতের তুলনায় অনেক বেশি সহীহ। মারফুরূপে বর্ণিত রিওয়ায়াতটির কোন ভিত্তি আছে বলে আমাদের জানা নেই।
3062। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ঈসা (আঃ)-কে তার যুক্তি-প্রমাণ শিখিয়ে দেয়া হয়। আল্লাহ তা'আলাই তাকে তা শিখিয়ে দেন। যেমন নিম্নোক্ত আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (অনুবাদ) “আল্লাহ তা'আলা যখন বললেনঃ হে ঈসা ইবনু মারিয়াম! তুমি কি লোকদের বলেছিলে, তোমরা আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত আমাকে এবং আমার মাকে ইলাহরূপে গ্রহণ কর”— (সূরা আল-মায়িদাহ ১১৬)? আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেনঃ তখন আল্লাহ তা'আলাই ঈসা (আঃ)-কে উত্তর শিক্ষা দিলেনঃ “তিনি বললেন, তুমি মহিমান্বিত। যা বলার অধিকার আমার নেই তা বলা আমার পক্ষে শোভনীয় নয়... তবে তুমি তো পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়"- (সূরা আল-মায়িদাহ ১১৬-১১৮)। সনদ সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3063। আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, সর্বশেষ অবতীর্ণ সূরা হল সূরা আল-মায়িদাহ। সনদ হাসান, হাকিম এটিকে সহীহ বলেছেন এবং এর একটি শাহিদ বর্ণনা করেছেন। ইমাম যাহাবী তাকে সমর্থন করেছেন। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। এ ছাড়া ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতেও একটি বর্ণনা করেছেন। তাতে তিনি বলেছেন, সবশেষে অবতীর্ণ সূরা হচ্ছে “ইয জা-য়া নাসরুল্লা-হ"- (সূরা নাসর)।
3064। আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আবূ জাহল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলল, আমরা তো তোমাকে মিথ্যাবাদী বলি না, বরং তুমি যে জিনিস নিয়ে এসেছ তাকেই আমরা মিথ্যা মনে করি। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেনঃ “কিন্তু তারা তো তোমাকে মিথ্যাবাদী বলে না, বরং যালিমরা আল্লাহ তা'আলার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে..." (সূরাঃ আল-আনআম- ৩৩) সনদ দুর্বল ইসহাক ইবনু মানসূর-আবদুর রহমান ইবনু মাহদী হতে তিনি সুফিয়ান হতে তিনি আবূ ইসহাক-এর সূত্রে নাজিয়া (রাহঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আবূ জাহল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলল.... এরপর এরকমই বর্ণনা করেন। তবে এই সনদে আলী (রাঃ)-এর উল্লেখ নেই এবং এটাই বেশি সহীহ। পূর্বের হাদীসের ন্যায় এটিও দুর্বল
3065। 'আমর ইবনু দীনার (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি জাবির ইবনু 'আবদুল্লাহ (রাযিঃ)-কে বলতে শুনেছেন, যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হল (অনুবাদ) “বল তিনি তোমাদের ঊর্ধ্বদেশ অথবা পাদদেশ হতে তোমাদের উপর শাস্তি প্রেরণ করতে সক্ষম", তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ “(হে আল্লাহ) আমি আপনার (মর্যাদাবান) মুখমণ্ডলের (সত্বার) নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি"। পরে আবার অবতীর্ণ হল (অনুবাদ) “অথবা তোমাদেরকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করতে এবং এক দলকে অপর দলের সংঘর্ষের স্বাদ আস্বাদন করাতে সক্ষম”— (সূরা আল-আন’আম ৬৫)। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ দুটিই অপেক্ষাকৃত সহজতর। সহীহঃ সহীহ আবূ দাউদ (২০৫৮, ২০৫৯)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3066। সা'দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস সূত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত আছে, “বল, তিনি তোমাদের উপর তোমাদের উপর হতে অথবা তোমাদের পদতল হতে শাস্তি প্রেরণে সক্ষম” (সূরাঃ আল-আনআম– ৬৫), এ আয়াত অবতীর্ণ হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ প্রসঙ্গে বলেনঃ এরূপ সংঘটিত হবেই কিন্তু তার ব্যাখ্যা এখনো বাস্তব লাভ করেনি। সনদ দুর্বল আবু ঈসা বলেনঃ এ হাসিসটি হাসান গারীব।
3067। আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন অবতীর্ণ হলঃ “যারা ঈমান এনেছে এবং নিজেদের ঈমানকে যুলুম দ্বারা কলুষিত করেনি..."— (সূরা আল-আনআম ৮২), তখন মুসলিমদের নিকট তা খুবই কঠিন মনে হল। তাই তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে নিজের উপর যুলুম করেনি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ বিষয়টি আসলে তা নয়। এখানে যুলুম অর্থ হল শিরক। তোমরা কি শুনোনি যা লোকমান তার ছেলেকে বলেছিলেনঃ “হে পুত্র! আল্লাহ তা'আলার সাথে কাউকে শরীক করবে না। নিশ্চয়ই শিরক অতি বড় যুলুম”— (সূরা লোকমান ১৩)। সহীহঃ বুখারী (৪৬২৯), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3068। মাসরুক (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আয়িশাহ (রাযিঃ)-এর নিকটে হেলান দিয়ে বসা ছিলাম। তিনি বললেন, হে আবূ আয়িশাহ! তিনটি বিষয় এমন যে, কোন ব্যক্তি এগুলোর কোনটি বললে সে আল্লাহ তা'আলার উপর ভীষণ (মিথ্যা) অপবাদ চাপালো। যে ব্যক্তি এ ধারণা পোষণ করে যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রভুকে দেখেছেন, সে আল্লাহ তা'আলার উপর ভীষণ অপবাদ আরোপ করল। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “দৃষ্টিসমূহ তাকে প্রত্যক্ষ করতে পারে না, কিন্তু তিনি দৃষ্টিসমূহকে অনুধাবণ করেন। তিনি অতিশয় সূক্ষ্মদশী, সম্যক ওয়াকিফহাল"- (সূরা আল-আন’আম ১০৩); “কোন মানুষের এমন মর্যাদা নেই যে, আল্লাহ তা'আলা তার সাথে কথা বলবেন ওয়াহীর মাধ্যম ব্যতীত অথবা পর্দার অন্তরাল ব্যতীত”– (সূরা আশ-শূরা ৫১)। আমি হেলান দেয়া অবস্থায় ছিলাম। আমি উঠে সোজা হয়ে বসে বললাম, হে উন্মুল মু'মিনীন থামুন, আমাকে বলার সুযোগ দিন, তাড়াহুড়া করবেন না। আল্লাহ তা'আলা কি বলেননি? “নিশ্চয়ই সে তাকে আরেকবার দেখেছিল"- (সূরা আন-নাজমঃ ১৩)। সে তো তাকে উজ্জ্বল দিগন্তে দেখেছে"- (সূরা আত-তাকবীর ২৩)। আয়িশাহ্ (রাযিঃ) বললেন, আল্লাহর শপথ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমিই সর্বপ্রথম এ বিষয়ে প্রশ্ন করেছি। তিনি বলেছেনঃ সে তো জিবরীল। আমি তাকে তার আসল আকৃতিতে এ দু'বারই দেখেছি। আমি তাকে আসমান হতে অবতরণ করতে দেখেছি। তার দেহাবয়ব এতো প্রকাণ্ড যে, তা আসমান ও যামীনের মাঝখানের সবটুকু স্থান ঢেকে ফেলেছিল। (দুই) যে ব্যক্তি এ ধারণা করে যে, আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর যা অবতীর্ণ করেছেন, তিনি তার কিছুটা গোপন করেছেন, সেও আল্লাহ তা'আলার উপর ভীষণ অপবাদ আরোপ করল। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “হে রাসূল! তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তোমার উপর যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তা (লোকদের নিকট) পৌছে দাও..." (সূরা আল-মায়িদাহঃ ৬৭)। (তিন) যে ব্যক্তি ধারণা করে যে, আগামী কাল কি ঘটবে তিনি (মুহাম্মাদ) তা জানেন, সেও আল্লাহ তা'আলার উপর ভীষণ মিথ্যারোপ করল। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “বল, আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত আসমান-যামীনে কেউই অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখে না”— (সূরা আন-নামল ৬৫)। সহীহঃ বুখারী, মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। মাসরুক ইবনুল আজদার ডাকনাম আবূ আয়িশাহ। তিনি হলেন মাসরুক ইবনু আবদুর রহমান।
3069। আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট কয়েকজন লোক এসে বললঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমরা যা হত্যা করি তা খাবো আর আল্লাহ তা'আলা যা হত্যা করেন তা খাবো না? তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন (অনুবাদ) ‘তোমরা তার নিদর্শনসমূহে বিশ্বাসী হলে যার উপর আল্লাহ তা'আলার নাম নেয়া হয়েছে তা হতে খাও... তোমরা যদি তাদের কথামত চল তবে অবশ্যই তোমরা মুশরিক হয়ে যাবে" (সূরা আল-আনআম ১১৮-১২১)। সহীহঃ সহীহ আবূ দাউদ (২০৫৮, ২০৫৯)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। এ হাদীসটি ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে অন্যভাবেও বর্ণিত হয়েছে। কেউ কেউ এটিকে আতা ইবনু সায়িব হতে, তিনি সা’ঈদ ইবনু জুবাইর হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সূত্রে মুরসালরূপে বর্ণনা করেছেন।
3070। আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ যে সহীফার (ক্ষুদ্র পুস্তিকা) উপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মোহরাংকিত রয়েছে তার দেখা যাকে আনন্দ দেয় সে যেন এ আয়াতগুলো পাঠ করেঃ “বল! এসো, পড়ে শুনাই তোমাদের জন্য রব যা হারাম করেছেন তা। এভাবে আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে নির্দেশ দিলেন যেন তোমরা সর্তক হও" (সূরা আল-আনআম- ১৫১-১৫৩)। সনদ দুর্বল আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান গারীব।
3071। আবূ সাঈদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলার বাণী “অথবা তোমার প্রতিপালকের কোন নিদর্শন আসবে” (সূরা আন’আম ১৫৮) প্রসঙ্গে বলেন, তা হচ্ছে পশ্চিম দিগন্ত হতে সূর্যোদয়। সহীহঃ মুসলিম (১/৯৫), আবূ হুরাইরাহ হতে আরো পূর্ণাঙ্গ রূপে। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। কেউ কেউ এটিকে বর্ণনা করেছেন তবে তা মারফু' হিসেবে নয়।
3072। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তিনটি নিদর্শন যখন প্রকাশিত হবে “তখন কারো ঈমান আনয়ন তার কোন উপকারে আসবে না-যারা ইতিপূর্বে ঈমান আনেনি বা যারা নিজেদের ঈমান মতো নেক আমল করেনি” (সূরা আন’আম ১৫৮)। সেই তিনটি নিদর্শন হল দাজ্জাল, দাব্বাতুল আরয ও পশ্চিম দিগন্ত হতে সূর্যোদয়। সহীহঃ মুসলিম (১/৯৫-৯৬)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। আবূ হাযিম, তিনি হলেন আল-আশযাঈ আল-কুফী তার নাম সালমান, তিনি আযযাহ আল-আশ জাঈয়্যার মুক্তদাস।
3073। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বারাকাতময় আল্লাহ তা'আলা বলেন, আর তার বাণী সম্পূর্ণ সত্যঃ আমার কোন বান্দা যখন কোন ভালো কাজের ইচ্ছা পোষণ করে তখনই (বলেন) হে ফেরেশতাগণ! তোমরা তার জন্য একটি নেকি লিখো এবং সে যখন কাজটি করে তখন তার দশ গুণ নেকি তার জন্য লিখো। পক্ষান্তরে সে কোন মন্দ কাজের ইচ্ছা পোষণ করলে তবে তোমরা তার কোন গুনাহ লিখো না, যদি সে তা করে তবে একটি মাত্র গুনাহই লিখো এবং যদি সে তা বর্জন করে বা কার্যকর না করে তার জন্য একটি নেকি লিখো। তারপর তিনি এ আয়াত পাঠ করেন (অনুবাদ) “কেউ কোন সৎকাজ করলে সে তার দশ গুণ পাবে এবং কেউ কোন অসৎ কাজ করলে তাকে শুধু এর প্রতিফল দেয়া হবে”— (সূরা আন’আমঃ ১৬০)। সহীহঃ রাওযুন নায়ীর (২/৭৪২), বুখারী, মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3074। আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াত পাঠ করলেন (অনুবাদ) “যখন তার প্রতিপালক পাহাড়ের উপর জ্যোতি প্রকাশ করলেন তখন তা একে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল”— (সূরা আল-আরাফঃ ১৪৩)। হাম্মাদ (রাহঃ) তাজাল্লীর ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দেন এবং সুলাইমান বৃদ্ধাঙ্গুলির কিনারা দিয়ে ডান হাতের আঙ্গুলগুলোর মাথা স্পর্শ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এই জ্যোতিতে পাহাড় ধ্বসে গেল এবং মূসা (আঃ) চেতনা হারিয়ে ফেললেন। সহীহঃ যিলা-লুল জান্নাত (৪৮০)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ গারীব। হাম্মাদ ইবনু সালামার রিওয়ায়াত ব্যতীত অন্য কোনভাবে আমরা এটিকে জানতে পারিনি। আবদুল ওয়াহহাব আল-ওয়াররাক আল-বাগদাদী-মুআয ইবনু মুআয হতে, তিনি হাম্মাদ ইবনু সালামাহ্ হতে, তিনি সাবিত হতে, তিনি আনাস (রাযিঃ) হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সূত্রে একই রকম বর্ণনা করেছেন। আবূ ঈসা বলেনঃ এই সনদে বর্ণিত হাদীসটি হাসান।
3075। মুসলিম ইবনু ইয়াসার আল-জুহানী (রাহঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-কে এ আয়াত প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হয়েছিলঃ “যখন তোমার রব আদম সন্তানের পৃষ্ঠদেশ হতে তাদের বংশধরদের বের করলেন এবং তাদের নিজেদের সম্পর্কে স্বীকারোক্তি করে প্রশ্ন করেনঃ “আমি কি তোমাদের রব নই। তারা বললঃ হ্যাঁ নিশ্চয়ই, আমরা সাক্ষী রইলাম। তা এজন্য যে, তোমরা কিয়ামতের দিন যেন না বল, আমরা তো এ ব্যাপারে বেখবর ছিলাম" (সূরাঃ আল-আরাফ- ১৭২)। উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটও আমি এ আয়াত প্রসঙ্গে প্রশ্ন করতে শুনেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আল্লাহ তা’আলা আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করলেন, তারপর আপন ডান হাত তাঁর পিঠে বুলালেন এবং তা থেকে তার একদল (ভাবী) সন্তান বের করলেন। তিনি বললেন, এদের আমি জান্নাতের জন্য এবং জান্নাতীদের কাজ করতে সৃষ্টি করেছি। সুতরাং এরা জান্নাতীদের আমলই করবে। তিনি পুনরায় আদমের পিঠে হাত বুলালেন এবং সেখান থেকে তার (অপর) একদল সন্তান বের করলেন। তিনি বললেন, এদের আমি জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি। জাহান্নামীদের মত কাজই তারা করবে। একজন বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! তাহলে তদবির আর কিসের জন্য? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল্লাহ তা'আলা যখন কোন বান্দাকে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেন, তখন তার দ্বারা জান্নাতীদের কাজই করিয়ে নেন। সে জান্নাতীদের যোগ্য কাজ করে ইন্তেকাল করে এবং আল্লাহ তা'আলা তাকে জান্নাতে পেশ করেন। অপরদিকে যখন আল্লাহ তা'আলা কোন বান্দাকে জাহান্নামের উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেন, তার দ্বারা জাহান্নামীদের কাজ করিয়ে নেন। সে জাহান্নামীদের কাজ করেই মৃত্যুবরণ করে। শেষে আল্লাহ তা'আলা তাকে জাহান্নামে পেশ করেন। দুর্বল, আয যিলাল (১৯৬), যঈফা (৩০৭১) আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান। মুসলিম ইবনু ইয়াসার (রাহঃ) উমর (রাঃ) হতে (হাদীস) শুনেননি। কেউ কেউ এ হাদীসের সনদে মুসলিম ইবনু ইয়াসার ও উমার (রাঃ)-এর মাঝখানে আরেকজন অপরিচিত রাবীর উল্লেখ করেছেন।
3076। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন আল্লাহ তা'আলা আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করলেন তখন তিনি তার পিঠ মাসেহ করলেন। এতে তার পিঠ থেকে তার সমস্ত সন্তান বের হলো, যাদের তিনি কিয়ামত পর্যন্ত সৃষ্টি করবেন। তিনি তাদের প্রত্যেকের দুই চোখের মাঝখানে নূরের ঔজ্জ্বল্য সৃষ্টি করলেন, অতঃপর তাদেরকে আদম (আঃ)-এর সামনে পেশ করলেন। আদম (আঃ) বললেন হে প্ৰভু! এরা কারা? আল্লাহ বললেন, এরা তোমার সন্তান। আদমের দৃষ্টি তার সন্তানদের একজনের উপর পড়লো যার দুই চোখের মাঝখানের ঔজ্জল্যে তিনি বিস্মিত হলেন। তিনি বললেন, হে আমার প্রভু! ইনি কে? আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ শেষ যামানার উম্মাতের অন্তর্গত তোমার সন্তানদের একজন। তার নাম দাউদ (আঃ)। আদম (আঃ) বললেন, হে আমার রব! আপনি তার বয়স কত নির্ধারণ করেছেন? আল্লাহ বললেন, ৬০ বছর। আদম (আঃ) বললেনঃ পরোয়ারদিগার! আমার বয়স থেকে ৪০ বছর (কেটে) তাকে দিন। আদম (আঃ)-এর বয়স শেষ হয়ে গেলে তার নিকট মালাকুল মাওত এসে হাযির হন। আদম (আঃ) বললেনঃ আমার বয়সের কি আরো ৪০ বছর অবশিষ্ট নেই? তিনি বললেন, আপনি কি তা আপনার সন্তান দাউদকে দান করেননি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আদম (আঃ) অস্বীকার করলেন, তাই তার সন্তানরাও অস্বীকার করে থাকে। আদম (আঃ) ভুলে গিয়েছিলেন, ফলে তার সন্তানরাও ভুলে যায়। আদমের ক্রটি-বিচূতি হয়েছিল, তাই তার সন্তানদেরও ক্রটি-বিচূতি হয়ে থাকে। সহীহঃ আয যিলাল (২০৬), তাখরীজুত তাহাবীয়াহ (২২০, ২২১)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ)-এর বরাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে অন্যভাবেও এটি বর্ণিত হয়েছে।
3077। সামুরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হাওয়া আলাইহিস সালাম গর্ভবতী হলে তার নিকট শাইতান এলো। তার সন্তান জীবিত থাকত না। শাইতান বলল, এর নাম আবদুল হারিস রাখুন। তিনি তার নাম আবদুল হারিস রাখলেন। এ সন্তান জীবিত রইল। আর এটা ছিল শাইতানের কুমন্ত্রণা। যঈফ, যঈফা (৩৪২) আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান গারীব। কাতাদার মাধ্যমে উমার ইবনু ইবরাহীমের বর্ণনা ছাড়া আমরা এটিকে জানি না। কেউ কেউ আবদুস সামাদ হতে এটি বর্ণনা করেছেন, তবে মারফু হিসেবে নয়। উমার ইবনু ইবরাহীম (রাহঃ) বসরার শাইখ।
3078। আবদ ইবনু হুমাইদ আবূ নু'আইম হতে, তিনি হিশাম ইবনু সাদ হতে, তিনি যাইদ ইবনু আসলাম হতে, তিনি আবূ সালিহ হতে, তিনি আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণনা করেন যে, আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হল... পূর্বে বর্ণিত হাদীসের অনুরূপ।
3079। মুসআব ইবনু সা'দ (রাহঃ) হতে তার বাবার সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, বদরের যুদ্ধের দিন আমি একটি তলোয়ার নিয়ে আসলাম। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তা'আলা আমার হৃদয়কে মুশরিকদের পরাজিত করে প্রশান্তি দান করবেন, অথবা অনুরূপ বলেছেন। আপনি আমাকে এ তলোয়ারটি দিন। তিনি বললেনঃ এটা তো আমরও নয়, তোমারও নয়। আমি (মনে মনে) বললাম, তলোয়ারটি হয় তো এমন কাউকে দেয়া হবে যে আমার মত পরীক্ষার মুখোমুখী হতে পারবে না। এমন সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট এসে বললেনঃ তুমি আমার নিকট এ তলোয়ারটি চেয়েছিলে। তখন এটি আমার ছিল না, কিন্তু এখন তা আমার হয়েছে। অতএব এটি তোমাকে দিলাম। বর্ণনাকারী বলেন, এ প্রসঙ্গেই অবতীর্ণ হল (অনুবাদ) “লোকেরা তোমার নিকট যুদ্ধলব্ধ মাল প্রসঙ্গে প্রশ্ন করে। বল, যুদ্ধলব্ধমাল আল্লাহ ও তার রাসূলের..."— (সূরা আল-আনফাল ১)। হাসান সহীহঃ সহীহ আবূ দাউদ (২৭৪৭), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। সিমাক ইবনু হারব (রহঃ) এ হাদীস মুসআব ইবনু সা'দ (রাহঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। উবাদাহ ইবনুস সামিত (রাযিঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে।
3080। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদর যুদ্ধ হতে ফুরসত হলে তাকে বলা হল, আপনি কাফিলার উপর হামলা করুন। কারণ তাদেরকে রক্ষাকারী কেউ নেই। রাবী বলেন, আব্বাস (রাঃ) তখন কাফির কয়েদীদের সাথে আটক থাকা অবস্থায় বলেন, এটা উচিত নয়। কারণ আল্লাহ তা'আলা আপনার সাথে দুই দলের মধ্যে যে কোন একটির উপর বিজয়দানের প্রতিশ্রুতি করেছেন। আল্লাহ্ তা'আলা আপনার সাথে যে প্রতিশ্রুতি করেছিলেন তা তো তিনি আপনাকে দান করেছেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ আপনি সঠিক বলেছেন। সনদ দুর্বল আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান।
3081। উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, (বদর যুদ্ধের দিন) মুশরিকদের উপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দৃষ্টিপাত করলেন। তারা (সংখ্যায়) ছিল এক হাজার। আর তার সাথীরা ছিলেন তিন শত দশজনের কিছু বেশি। আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিবলার দিকে মুখ করে দুই হাত তুলে তার প্রভুর নিকট দু'আ করতে লাগলেনঃ “হে আল্লাহ! তুমি আমার সাথে যে ওয়াদাহ করেছিলে তা পূর্ণ কর। হে আল্লাহ! তুমি আমাকে তা দান কর যার ওয়াদাহ্ তুমি করেছ। হে আল্লাহ! যদি কতিপয় মুসলিমের এ ক্ষুদ্র দলটি ধ্বংস করে দাও তাহলে যমিনে তোমার ইবাদাত অনুষ্ঠিত হবে না”। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিবলামুখী হয়ে দুই হাত তুলে এমনভাবে তার প্রভুর নিকট ফারিয়াদ করেন, তার উভয় কাঁধ হতে তার চাদর গড়িয়ে পড়ে গেল। তখন আবূ বকর (রাযিঃ) তার কাছে এসে চাদরটি উঠিয়ে তার কাধে তুলে দিলেন এবং তার পেছন দিক হতে তাকে চেপে ধরে বললেন, হে আল্লাহর নবী। আপনার প্রভুর সমীপে আপনার যথেষ্ট পরিমাণ ফরিয়াদ করা হয়েছে। আপনার সাথে আল্লাহ তা'আলা যে ওয়াদাহ করেছেন তা অবশ্যই তিনি পূর্ণ করবেন। এ প্রসঙ্গে বারকাতময় আল্লাহ তা'আলা নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন (অনুবাদ) “স্মরণ কর যখন তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করছিলে তখন তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিলেন, আমি তোমাদেরকে পর্যায়ক্রমে এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য করব" (সূরা আল-আনফাল ৯)। অতএব আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদের পাঠিয়ে তাদেরকে সাহায্য করেন। হাসানঃ মুসলিম (৫/১৫৬)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ গারীব। উমার (রাযিঃ)-এর এ হাদীস বিষয়ে ইকরিমা ইবনু আম্মার-আবূ যুমাইল (রাহঃ) সূত্র ব্যতীত আমাদের কিছু জানা নেই। আবূ যুমাইলের নাম সিমাক আল-হানাফী। বর্ণনাকারী (তিরমিয়ী) বলেন, এটা বদর যুদ্ধের সময়কার ঘটনা।
3082। আবূ বুরদা ইবনু আবূ মূসা (রাঃ) হতে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা'আলা আমার উম্মাতের জন্য আমার উপর দু'টি আমান বা সুরক্ষার উপায় অবতীর্ণ করেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা এমন নন যে, তুমি তাদের মধ্যে হাযির থাকা অবস্থায় তিনি তাদেরকে শাস্তি দিবেন এবং আল্লাহ তা'আলা এমনও নন যে, তারা ক্ষমা প্রার্থনারত অবস্থায় তিনি তাদের শাস্তি দিবেন” (সূরাঃ আল-আনফাল- ৩৩)। আমি যখন চলে যাব তখন কিয়ামত পর্যন্ত তাদের মধ্যে ক্ষমা প্রার্থনার উপায়টি রেখে যাব। সনদ দুর্বল আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি গারীব। ইসমাঈল ইবনু ইবরাহীমকে হাদীস শাস্ত্রে যঈফ’ বলা হয়।
3083। উকবাহ ইবনু আমির (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বারে দাঁড়িয়ে এ আয়াত পাঠ করেন (অনুবাদ) “তোমরা যথাসাধ্য তাদের মুকাবিলার জন্য শক্তি ও অশ্ববাহিনী প্রস্তুত রাখবে.....”(সূরা আল-আনফাল ৬০)। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ জেনে রেখ, শক্তি হল তীর নিক্ষেপ। তিনি তিন তিনবার এ কথা বললেন। তিনি আরো বললেনঃ জেনে রেখ, আল্লাহ তা'আলা খুব শীঘ্রই দুনিয়াতে তোমাদেরকে বিজয় দান করবেন এবং তোমাদেরকে নিজেদের ব্যয়ভার সংকুলানের চিন্তা হতে মুক্ত করে দেয়া হবে। সুতরাং তীরন্দাজির অনুশীলন হতে তোমাদের কেউ যেন কাতর হয়ে না পড়ে। হাসান সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (২৮১৩), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি উসামা ইবনু যাইদ আল-লাইসী হতে সালিহ ইবনু কাইসান সূত্রে কোন কোন বর্ণনাকারী বর্ণনা করেছেন। উকবাহ ইবনু আমির হতে আবূ উসামা এবং আরো অনেকে এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তবে ওয়াকী’র রিওয়ায়াতটি অনেক বেশি সহীহ। সালিহ ইবনু কাইসান (রহঃ) উকবাহ ইবনু আমির (রাযিঃ)-এর সাক্ষাৎ পাননি। তবে তিনি ইবনু উমর (রহঃ)-এর সাক্ষাত পেয়েছেন।
3084। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন। বদরের যুদ্ধের দিন যুদ্ধবন্দীদের আনা হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এই যুদ্ধবন্দীদের বিষয়ে তোমাদের কি মত? তারপর রাবী এ হাদীসে একটি বিরাট ঘটনা বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ মুক্তিপণ আদায় বা শিরচ্ছেদ করা ছাড়া এদের মুক্তির বিকল্প কোন পথ নেই। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ আমি বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! তবে সুহাইল ইবনু বাইযা ব্যতীত। যেহেতু আমি তাকে ইসলাম প্রসঙ্গে আলোচনা করতে শুনেছি। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথায় নীরব থাকলেন। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন, ঐ দিনের মত এরকম মারত্মক অবস্থা আমার আর কোন দিন ছিল না। ঐ দিন প্রতি মুহুর্তে আমার মনে হচ্ছিল, আমার মাথার উপর বুঝি আকাশ হতে পাথর বর্ষিত হবে। অবশেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সুহাইল ইবনু বাইযা ব্যতীত। ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন, এদিকে উমার (রাঃ)-এর উক্তি মুতাবেক কুরআনের এ আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ “কোন নবীর জন্য উচিত নয় দেশে ব্যাপক হারে প্রতিপক্ষকে পরাজিত না করা পর্যন্ত আটক রাখা....... " (সূরাঃ আল-আনফাল- ৬৭)। যঈফ, ১৭৬৭ নং হাদীস পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান। আবূ উবাইদা ইবনু আবদুল্লাহ তার পিতা হতে হাদীস শুনেননি।
3085। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের পূর্ববর্তী কোন উম্মাতের লোকদের জন্য গানীমাতের সম্পদ বৈধ ছিল না। আকাশ হতে আগুন অবতীর্ণ হত এবং তা পুড়িয়ে ফেলত। বর্ণনাকারী সুলাইমান আল-আমাশ বলেন, আজকের দিনে এ হাদীস আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) ব্যতীত আর কে বলতে পারে? বাদর যুদ্ধ সংঘটিত হলে লোকেরা গানীমাতের মাল ব্যবহারে লিপ্ত হন, অথচ গানীমাতের মাল তখন পর্যন্ত তাদের জন্য বৈধ ঘোষিত হয়নি। তখন আল্লাহ তা'আলা এ প্রসঙ্গে এ আয়াত অবতীর্ণ করেন (অনুবাদ) “আল্লাহ তা'আলার পূর্ব-বিধান না থাকলে তোমরা যা গ্রহণ করেছ তজ্জন্য তোমাদের উপর মহাশাস্তি আপতিত হত"- (সূরা আনফাল ৬৮)। সহীহঃ সহীহাহ (২১৫৫) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। আ'মাশের হাদীস হিসেবে গারীব।
3086। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি উসমান ইবনু আফফান (রাযিঃ)-কে বললাম, শত আয়াতের চাইতে ক্ষুদ্রতম সূরা আল-আনফালকে শত আয়াত সম্বলিত সূরা বারাআতের পূর্বে স্থাপন করতে কিসে আপনাদেরকে উদ্বুদ্ধ করল? যার ফলে আপনারা এই দুটি সূরাকে একত্রে মিলিয়ে দিলেন, অথচ উভয়ের মাঝখানে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' বাক্যটি লিখেননি এবং এটিকে সপ্ত দীর্ঘ সূরার মধ্যে রেখে দিয়েছেন। আপনাদের এরূপ করার কারণ কি? উসমান (রাযিঃ) বললেন, একই সময়কালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর অনেকগুলো সূরা অবতীর্ণ হত। অতএব তার উপর কোন আয়াত অবতীর্ণ হলে তিনি লেখকদের কাউকে ডেকে বলতেন, এ আয়াতগুলো অমুক সূরায় যোগ কর যাতে এই এই বিষয়ের বর্ণনা রয়েছে। অতএব তার উপর আয়াত অবতীর্ণ হলে তিনি বলতেন, ঐ সূরাতে এ আয়াতটি শামিল কর যাতে এই এই বিষয়ের বর্ণনা রয়েছে। সূরা আল-আনফাল ছিল মাদীনায় অবতীর্ণ প্রাথমিক সূরাসমূহের অন্তর্ভুক্ত। আর বারাআত ছিল (নাযিলের দিক হতে) কুরআনের শেষ দিকের সূরা। সূরা বারাআতের আলোচ্য বিষয় সূরা আল-আনফালের আলোচ্য বিষয়ের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল। তাই আমার ধারণা হল, এটি (বারাআত) তার অন্তর্ভুক্ত। এদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুবরণ করেন। অথচ তিনি আমাদের স্পষ্ট করে বলে যাননি যে, এ সূরা (বারাআত) আনফালের অন্তর্ভুক্ত কি না। তাই আমি উভয় সূরাকে একত্রে মিলিয়ে দিয়েছি এবং সূরাদুটাের মাঝখানে বিসমিল্লাহির রাহমাননির রাহীম বাক্যও লিখিনি, আর এটিকে সপ্ত দীর্ঘ সূরাসমূহের অন্তর্ভুক্ত করেছি। হাসান। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান। আমরা এ হাদীস শুধু ‘আওফ হতে, তিনি ইয়াযীদ আল-ফারিসী হতে, তিনি ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে এই সূত্রেই জেনেছি। ইয়াযীদ আল-ফারেসী বসরাবাসী তাবিঈগণের অন্তর্ভুক্ত। আর ইয়াযীদ ইবনু আবান আর-রাকাশীও বাসরাবাসী তাবিঈগণের অন্তর্ভুক্ত। তবে তিনি পূর্বোক্ত জনের চাইতে কনিষ্ঠ। ইয়াযীদ আর-রাকাশী (রাহঃ) আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতে হাদীস বর্ণনা করেছেন।
3087। সুলাইমান ইবনু আমর ইবনুল আহওয়াস (রাহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার বাবা আমার নিকট বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বিদায় হাজ্জে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা ও তার গুণগান বর্ণনা করলেন, ওয়াজ-নাসীহাত করলেন ও উপদেশ দিলেন। তারপর তিনি বললেনঃ আমি কোন দিনটির মর্যাদা বর্ণনা করছি, আমি কোন দিনটির মর্যাদা বর্ণনা করছি, আমি কোন দিনটির মর্যাদা ঘোষণা করছি? বর্ণনাকারী বলেন, লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসুল! হজ্জের মহান দিনের। তিনি বললেনঃ তোমাদের রক্ত, তোমাদের ধন-মাল ও তোমাদের ইজ্জত-সম্মানে হস্তক্ষেপ তোমাদের উপর হারাম, যেরূপ তোমাদের এ দিনে এ শহরে ও এ মাসে হারাম। জেনে রেখ! অপরাধীই অপরাধ কর্মের জন্য দায়ী ও দোষী। ছেলের অপরাধের জন্য বাবা এবং বাবার অপরাধের জন্য ছেলে অপরাধী নয়। জেনে রেখ! এক মুসলিম অন্য মুসলিমের ভাই। কাজেই এক মুসলিমের জন্য তার ভাইয়ের ঐ জিনিসই হালাল যা সে স্বেচ্ছায় তার জন্য হালাল করে (দান করে)। জেনে রেখ! জাহিলী যুগের প্রাপ্য সকল প্রকার সূদ বাতিল ঘোষণা করা হল। তবে তোমাদের মূলধন ফেরত পাবে। তোমরা কারো প্রতি যুলুম করবে না এবং তোমাদের প্রতিও যুলুম করা হবে না। আব্বাস ইবনু আবদুল মুত্তালিবের সূদের সকল পাওনা বাতিল করা হল। জেনে রেখ! জাহিলিয়াতের সকল প্রকার রক্তের দাবি বাতিল করা হল। জাহিলিয়াতের সর্বপ্রথম যার রক্ত আমি বাতিল ঘোষণা করছি সে হচ্ছে হারিস ইবনু আবদুল মুতালিবের রক্ত। সে শিশু অবস্থায় বনু লাইস গোত্রে দুধ পানরত অবস্থায় হুযাইল গোত্র তাকে হত্যা করেছিল। শোন! আমি তোমাদেরকে নারীদের সাথে ভালো ব্যবহারের উপদেশ দিচ্ছি। তারা তোমাদের নিকট বন্দীর মত যুক্ত। তাদের উপর তোমাদের কোন কর্তৃত্ব নেই, যদি না তারা কোন প্রকাশ্য অশ্লীলতায় জড়িয়ে পড়ে। যদি তারা তাই করে তাহলে তোমরা তাদের বিছানা পৃথক করে দাও এবং একান্ত প্রয়োজন হলে হালকাভাবে আঘাত কর। যদি তারা তোমাদের অনুগত হয়ে যায়, তবে তাদের প্রতি বাড়াবাড়ির পথ অন্বেষণ কর না। জেনে রেখ! তোমাদের যেরূপ অধিকার রয়েছে তোমাদের স্ত্রীদের উপর, তোমাদের স্ত্রীদেরও তদ্রুপ অধিকার রয়েছে তোমাদের উপর (কাজেই উভয়ের প্রতি উভয়ের অধিকার আদায় করা কর্তব্য)। তোমাদের স্ত্রীদের উপর তোমাদের অধিকার এই যে, তারা তোমাদের অপছন্দনীয় লোককে তোমাদের বিছানায় স্থান দিবে না এবং তোমাদের অপছন্দনীয় লোককে তোমাদের ঘরে যাতায়াতের অনুমতি দিবে না। আর তোমাদের উপর তাদের অধিকার এই যে, তোমরা (যথাসম্ভব) তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ ও আহারের সুব্যবস্থা করবে। হাসানঃ ইবনু মা-জাহ (১৮৫১) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। এটি শাবীব ইবনু গারক্বাদাহ হতে আবূল আহওয়াস (রাহঃ) বর্ণনা করেছেন।
3088। আলী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হাজ্জের মহান দিন প্রসঙ্গে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেনঃ কুরবানীর দিন। সহীহঃ (৯৫৭) নং হাদীস পূর্বে বর্ণিত হয়েছে।
3089। আলী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হাজ্জের মহান দিন হচ্ছে কুরবানীর দিন। সহীহঃ দেখুন পূর্বের হাদীস। আবূ ঈসা বলেন, মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাকের হাদিসের চাইতে এটি অনেক বেশি সহীহ। কেননা এ হাদীস বিভিন্ন সূত্রে আবূ ইসহাক-আল হারিস হতে, তিনি আলী (রাযিঃ) হতে এই সূত্রে মাওকুফভাবে বর্ণিত হয়েছে। মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাকের সূত্র ব্যতীত অন্য কেউ এটিকে মারফুভাবে বর্ণনা করেছেন বলে আমাদের জানা নেই। শু'বাহ এ হাদীসটি আবূ ইসহাক হতে, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনু মুররাহ হতে, তিনি আল-হারিস হতে তিনি আলী হতে মাওকুফ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
3090। আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ বকর (রাযিঃ)-কে সূরা বারাআতের প্রাথমিক আয়াতগুলো সহকারে মক্কা মুআজ্জামায় পাঠান। তারপর তাকে ফেরত ডেকে এনে বললেন? আমার পরিবারের কোন সদস্য ব্যতীত অন্য কাউকে দিয়ে এটা পাঠানো উচিত নয়। এরপর তিনি আলী (রাযিঃ)-কে ডাকলেন এবং তাকেই এটি দিলেন। সনদ হাসান। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান; আনাস (রাযিঃ)-এর রিওয়ায়াত হিসেবে গারীব।
3091। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ বকর (রাযিঃ)-কে (আমীরুল হাজ্জ নিয়োগ করে) পাঠান এবং এই বাক্যগুলো ঘোষণার জন্যে তাকে নির্দেশ দেন। তারপর তিনি ‘আলী (রাযিঃ)-কে পাঠান। আবূ বকর (রাযিঃ) পথিমধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উটনী কাসওয়ার শব্দ শুনতে পান। আবূ বকর (রাযিঃ) সন্ত্রস্ত হয়ে বের হলেন। তিনি ভেবেছিলেন হয়ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসেছেন। কিন্তু তিনি ছিলেন আলী (রাযিঃ)। আলী (রাযিঃ) আবূ বকর (রাযিঃ)-কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর লেখা ফরমানটি দিলেন এবং তাতে তাকে এসব বিষয় ঘোষণা দেয়ার জন্য নির্দেশ দেন। তারা দু’জনেই গন্তব্যের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং হজ্জ সম্পন্ন করলেন। আলী (রাযিঃ) আইয়্যামে তাশরীকে (কুরবানীর দিন) দাঁড়িয়ে বললেনঃ প্রত্যেক মুশরিকের সাথে আল্লাহ ও তার রাসূলের সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষনা দেয়া হল। অতএব তোমরা আর চার মাস দেশে চলাফেরা কর। এ বছরের পর আর কোন মুশরিক হাজ্জ করতে পারবে না। নগ্ন অবস্থায় কেউ বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করবে না। শুধু মুমিন ব্যতীত অন্য কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। আলী (রাযিঃ) এভাবে ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়লে আবূ বকর (রাযিঃ) দাঁড়িয়ে একই রকম ঘোষণা দিতে থাকেন। সনদ সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি ইবনু আব্বাস (রাযিঃ)-এর রিওয়ায়াত হিসেবে এই সূত্রে হাসান গারীব।
3092। যাইদ ইবনু ইউসাই (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা আলী (রাযিঃ)-কে প্রশ্ন করলাম, আপনাকে হাজ্জ উপলক্ষে কোন জিনিস সহকারে পাঠানো হয়েছিল। তিনি বললেন, আমাকে (হাজ্জে) চারটি বিষয় সহকারে পাঠানো হয়েছিলঃ (১) কোন উলঙ্গ ব্যক্তি বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করতে পারবে না; (২) যাদের সাথে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চুক্তি আছে তা তার নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে আর যাদের সাথে তার কোন চুক্তি নেই তারা চার মাসের অবকাশ পাবে (নিরাপত্তা সহকারে বিচরণ করার); (৩) মুমিন ব্যতীত কোন ব্যক্তি জান্নাতে যেতে পারবে না এবং (৪) এ বছরের পর মুসলিমগণ ও মুশরিকরা (হাজ্জে) একত্র হতে পারবে না (এরপর হতে মুশরিকদের জন্য হজ্জে যোগদান চিরতরে নিষিদ্ধ)। সহীহঃ (৮৭১) নং হাদীস পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। এটি আবূ ইসহাক হতে ইবনু উয়াইনার বর্ণিত হাদীস। সুফইয়ান সাওরীও এটি আবূ ইসহাক হতে, তিনি তার কোন সহযোগী হতে, তিনি আলী (রাযিঃ) হতে এই সূত্রে বর্ণনা করেছেন। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। নাসর ইবনু আলী প্রমুখ সুফিয়ান ইবনু উয়াইনাহ হতে, তিনি আবু ইসহাক হতে, তিনি যাইদ ইবনু ইউসাই হতে, তিনি আলী (রাযিঃ) সূত্রে পূর্বোক্ত হাদীসের মত বর্ণনা করেছেন। আলী ইবনু খাশরাম-সুফইয়ান ইবনু তিনি আলী (রাযিঃ) হতে এই সূত্রে একই রকম বর্ণনা করেছেন। আবূ ঈসা বলেন, ইবনু উয়াইনাহ উভয় রিওয়ায়াত ইবনু উসাই ও ইবনু ইউসাই উভয়ের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। সঠিক হল যাইদ ইবনু উসাই। শু'বাহ (রাহঃ) উক্ত হাদীস ব্যতীত অন্য হাদীস আবূ ইসহাকের সূত্রে বর্ণনা করেছেন এবং তাতে সন্দেহে পতিত হয়েছেন এবং যাইদ ইবনু উসাইল নাম বলেছেন; কিন্তু এ ক্ষেত্রে শু’বাহর অনুসরণ করা হয়নি।
3093। আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা কোন ব্যক্তিকে মসজিদে যাতায়াতে অভ্যস্ত দেখলে তার ঈমানের সাক্ষী দিও। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আল্লাহ্ তা'আলার মাসজিদসমূহের রক্ষণাবেক্ষণ তো তারাই করে যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান এনেছে......" (সূরাঃ আত-তাওবা-১৮)। দুর্বল, ২৭৫০ নং হাদীস পূর্বে বর্ণিত হয়েছে ইবনু আবূ উমার-আবদুল্লাহ ইবনু ওয়াহব হতে তিনি আমর ইবনুল হারিস হতে তিনি দাররাজ হতে তিনি আবুল হাইসাম হতে তিনি আবু সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) এর সূত্রেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে উপরের হাদীসের মতই বর্ণনা করেছেন। তবে তাতে “তোমরা যাকে মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ করতে দেখ” এরূপ বর্ণিত আছে। দুর্বল, দেখুন পূর্বের হাদীস আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান গারীব। আবূল হাইসামের নাম সুলাইমান ইবনু আমর ইবনু আবদুল উতওয়ারী। তিনি ইয়াতীম ছিলেন এবং আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ)-এর পরিবারে লালিত-পালিত হন।
3094। সাওবান (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “যারা সোনা ও রূপা জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহ তা'আলার পথে ব্যায় করে না তাদেরকে পীড়াদায়ক আযাবের সুসংবাদ দাও”— (সূরা আত-তওবাঃ ৩৪), এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার সময় আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ভ্রমণে ছিলাম। কোন কোন সাহাবী বলেন, এ আয়াতটি সোনা ও রূপার সমালোচনায় অবতীর্ণ হয়েছে। কোন সম্পদ উৎকৃষ্ট আমরা তা জানতে পারলে তা জমা করতাম। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, উৎকৃষ্ট সম্পদ হল (আল্লাহ তা'আলার) যিকরকারী জিহ্বা, কৃতজ্ঞ অন্তর ও ঈমানদার স্ত্রী, যে স্বামীকে দীনদারির ব্যাপারে সহযোগিতা করে। সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (১৮৫৬)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান। আমি মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈলকে প্রশ্ন করে বললাম, সালিম ইবনু আবূল জা'দ (রহঃ) সাওবান (রাযিঃ) হতে (হাদীস) শুনেছেন কি? তিনি বলেন, না। আমি তাকে বললাম, তাহলে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণের মধ্যে কার নিকটে শুনেছেন? তিনি বললেন, তিনি জাবির ইবনু আবদুল্লাহ ও আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ)-এর নিকট শুনেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আরো কয়েকজন সাহাবীর নামও তিনি উল্লেখ করেছেন।
3095। আদী ইবনু হাতিম (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি গলায় স্বর্ণের ক্রুশ পরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে এলাম। তিনি বললেনঃ হে ‘আদী! তোমার গলা হতে এই প্রতিমা সরিয়ে ফেল। (এই বলে) আমি তাকে সূরা বারাআতের নিম্নোক্ত আয়াত পাঠ করতে শুনলাম (অনুবাদ) “তারা আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত তাদের পণ্ডিতগণকে ও সংসারবিরাগীগণকে তাদের প্রভু বানিয়ে নিয়েছে" (সূরা আত-তওবা ৩১)। তারপর তিনি বললেনঃ তারা অবশ্য তাদের পূজা করত না। তবে তারা কোন জিনিসকে যখন তাদের জন্য হালাল বলত তখন সেটাকে তারা হালাল বলে মেনে নিত। আবার তারা কোন জিনিসকে যখন তাদের জন্য হারাম বলত তখন নিজেদের জন্য উহাকে হারাম বলে মেনে নিত। হাসান। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি গারীব। আমরা এ হাদীস শুধু আবদুস সালাম ইবনু হারবের সূত্রে জেনেছি। হাদীস শাস্ত্রে গুতাইফ ইবনু আইয়ান খুবএকটা প্রসিদ্ধ নন।
3096। আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আবূ বাকর (রাযিঃ) তাকে বলেছেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে (সাওর) গিরিগুহায় অবস্থানকালে বললাম, যদি কাফিরদের কেউ তার পদদ্বয়ের দিকে (নীচের দিকে) তাকায়, তাহলে সে নিশ্চত আমাদেরকে তার পায়ের নীচেই দেখবে। তিনি বললেনঃ হে আবূ বাকর! যে দু'জনের সাথে তৃতীয়জন হিসেবে আল্লাহ তা'আলা আছেন সেই দু'জনের ব্যাপারে আপনার কি ধারণা? সহীহঃ তাখরাজু ফিকুহিস সীরাহ (১৭৩), বুখারী ও মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ গারীব। এ হাদীসটি হাম্মামের সূত্রেই বর্ণিত আছে। একমাত্র তিনিই এটি বর্ণনা করেছেন। হাব্বান ইবনু হিলাল প্রমুখও হাম্মামের সূত্রে এ হাদীস একই রকম বর্ণনা করেছেন।
3097। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, "উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ)-কে আমি বলতে শুনেছিঃ আবদুল্লাহ ইবনু উবাই মারা গেলে তার জানাযা আদায়ের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আবেদন করা হয়। তিনি সেখানে যেতে শুরু করলেন। তিনি জানাযার উদ্দেশে দাঁড়ালে আমি ঘুরে গিয়ে তার বুক বারবার সামনে দাড়িয়ে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল আল্লাহ তা'আলার দুশমন ইবনু উবাইর জানাযা কি আপনি আদায় করবেন, যে অমুক দিন এই কথা বলেছে, অমুক দিন এই কথা বলেছে? এভাবে নির্দিষ্ট দিন তারিখ উল্লেখ করে “উমর (রাযিঃ) বলতে লাগলেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হাসি দিতে থাকলেন। এমনকি আমি যখন তাকে অনেক কিছু বললাম, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে উমার! আমার সামনে হতে সরে যাও। আমাকে এখতিয়ার দেয়া হয়েছে। কাজেই আমি (জানাযা আদায়ের) এখতিয়ার গ্রহণ করেছি। আমাকে বলা হয়েছে (আয়াতের অর্থ) “তুমি এদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর বা না কর, এমনকি তুমি যদি সত্তর বারও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর, তবুও আল্লাহ তা'আলা তাদের কখনো ক্ষমা করবেন না”— (সূরা আত-তওবা ৮০)। আমি যদি জানতাম তাদের জন্য সত্তর বারের বেশি ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহ তা'আলা তাদের ক্ষমা করে দিবেন, তাহলে আমি তাই করতাম। উমার (রাযিঃ) বলেন, এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জানাযা আদায় করলেন এবং তার জানাযার সাথে গেলেন। তিনি তার কবরের সামনে দাঁড়ান এবং সকল কাজ শেষ করেন। উমর (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে আমার দুঃসাহসিকতায় আশ্চর্যবোধ হল। আল্লাহ ও তার রাসূলই ভালো জানেন। আল্লাহর শপথ! কিছুক্ষণ পরেই এ দুটি আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ (অনুবাদ) "তাদের কোন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে তুমি কখনো তার জানাযা আদায় করবে না এবং তার কবরের পাশে কখনো দাঁড়াবে না। কেননা তারা আল্লাহ ও তার রাসূলকে অস্বীকার করেছে এবং পাপাচারী অবস্থায় এদের মৃত্যু হয়েছে" (সূরা আত-তওবা্ ৮৪)। উমর (রাযিঃ) বলেনঃ এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত আর কোন মুনাফিকের জানায আদায় করেননি এবং এদের কবরের পাশেও দাঁড়াননি। সহীহঃ আহকা-মুল জানা-য়িয (৯৩, ৯৫)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ গারীব।
3098। ইবনু উমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলে, ‘আবদুল্লাহ্ (রাযিঃ)-এর বাবা ‘আবদুল্লাহ ইবনু উবাই মারা গেলে আবদুল্লাহ্ (রাযিঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে এসে বলেন, আপনার জামাটি আমাকে দিন, তা দিয়ে তাকে (বাবাকে) কাফন দিব এবং আপনি তার জানাযা আদায় করুন, তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তার জামা দিলেন এবং বললেনঃ তোমরা (গোসল, কাফন ইত্যাদি হতে) অবসর হলে আমাকে খবর দিও। তিনি নামায আদায়ের প্রস্তুতি নিলে উমর (রাযিঃ) তাকে টেনে ধরে বললেন, আল্লাহ তা'আলা কি আপনাকে মুনাফিকদের জানায আদায় করতে নিষেধ করেননি? তিনি বললেন; আমাকে দুটাে ব্যাপারেই স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে- “তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর বা না কর"। যাই হোক তিনি তার জানাযা আদায় করলেন। আল্লাহ তা'আলা তখন এ আয়াত অবতীর্ণ করেন (অনুবাদ) “তাদের কোন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে তুমি কখনো তার জানাযা আদায় করবে না এবং তার কবরের পাশেও কখনো দাড়াবে না....” (সূরা আত-তওবা ৮৪)। এরপর তিনি তাদের জানাযা আদায় করা ছেড়ে দেন। সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (১৫২৩), বুখারী (৪৬৭০), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3099। আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “যে মসজিদ প্রথম দিন হতেই তাকওয়ার ভিত্তির উপর নির্মিত হয়েছে" (সূরা আত-তওবা ১০৮), সেই মাসজিদ প্রসঙ্গে দুই ব্যক্তি বিতর্কে লিপ্ত হয়। একজন বলল, তা হচ্ছে মসজিদে কুবা। অন্যজন বলল, তা হচ্ছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাসজিদ (মসজিদে নববী)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তা আমার এই মাসজিদ। সহীহঃ মুসলিম, এর চেয়ে পুর্ণাঙ্গভাবে (৩২৩) নং হাদীসে পূর্বে উল্লেখ হয়েছে। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। ইমরান ইবনু আবী আনাসের হাদীস হিসেবে গারীব। আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাযিঃ) হতে এটি অন্য সূত্রেও বর্ণিত হয়েছে। হাদীসটি উনাইস ইবনু আবী ইয়াহইয়া তার পিতা হতে, তিনি আবূ সাঈদ (রাযিঃ) হতে বর্ণনা করেছেন।
3100। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কুবাবাসীদের সম্পর্কেই এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে (অনুবাদ) “তথায় এমন লোক আছে যারা পবিত্রতা অর্জন করতে ভালোবাসে এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে আল্লাহ তা’আলা ভালোবাসেন”- (সূরা আত-তওবা্ঃ ১০৮)। আবূ হুরাইরাহ্ (রাযিঃ) বলেন, এসব লোক পানি দিয়ে ইস্তিনজা করত। তাই তাদের ব্যাপারে উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়। সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (৩৫৭) আবূ ঈসা বলেন, এ সূত্রে হাদীসটি গারীব। আবূ আইয়ুব, আনাস ইবনু মালিক ও মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাযিঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে।
3101। আলী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এক ব্যক্তিকে তার (মৃত) মুশরিক পিতা-মাতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে শুনলাম। আমি তাকে বললাম, তোমার মৃত পিতা-মাতার জন্য কি তুমি ক্ষমা প্রার্থনার দুআ করছ, অথচ তারা ছিল মুশরিক? সে বলল, ইবরাহীম (আঃ) কি তার বাবার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেননি, অথচ তার বাবা ছিল মুশরিক? আমি বিষয়টি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উল্লেখ করলাম। তখন নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ) “নবী ও ঈমানদার লোকদের পক্ষে শোভনীয় নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে, তারা তাদের আত্মীয়-স্বজনই হােক না কেন....."— (সূরা আত-তওবা ১১৩)। সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (১৫২৩), বুখারী, মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান। সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব (রাহঃ) হতে তার বাবার সূত্রে এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে।
3102। কাব ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যতগুলো যুদ্ধ করেছেন, একমাত্র বদরের যুদ্ধ ব্যতীত অন্য কোন যুদ্ধেই আমি অনুপস্থিত ছিলাম না। এভাবে তাবুকের যুদ্ধ সমুপস্থিত হয়। যারা বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাউকে কোনরূপ ভর্ৎসনা করেননি। কারণ তিনি বের হয়েছিলেন কাফিলা অবরোধের উদ্দেশেই। ওদিকে কুরাইশরাও তাদের কাফিলার সাহায্যার্থে বের হয়েছিল। প্রতিশ্রুত স্থান ব্যতীত উভয় পক্ষ পরস্পর মুকবিলায় অবতীর্ণ হয়, যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন। আমার জীবনের শপথ মানুষদের দৃষ্টিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপস্থিতির সর্বোৎকৃষ্ট স্থান হচ্ছে বদরই কিন্তু আমি আক্বাবার রাতে আমার বাই’আতের উপর মর্যাদা দিয়ে তাতে (বদরে) অংশগ্রহণ করাকে পছন্দ করিনি। কারণ সেই লাইলাতুল আকাবাতেই আমি বাই’আত করেছি এবং আমরা এখানেই ইসলামের উপর সুদৃঢ় হয়ে গিয়েছি। তারপর আমি কখনো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কোন অভিযান হতে পেছনে ছিলাম না। এভাবে তাবুকের যুদ্ধের পালা আসে। আর তাবুক যুদ্ধই ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নেতৃত্বে পরিচালিত সর্বশেষ যুদ্ধ। যোদ্ধাদের যাত্রা শুরুর জন্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিলেন। তারপর বর্ণনাকারী দীর্ঘ হাদীস বর্ণনা করেন। আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গেলাম। তিনি তখন মসজিদে বসা ছিলেন। তার আশেপাশে মুসলিমগণ সমবেত ছিল। তার মুখমণ্ডল চাঁদের ন্যায় চমকাচ্ছিল। তিনি কোন বিষয়ে আনন্দিত হলে তার চেহারা মুবারাক দীপ্তিমান হয়ে উঠত। আমি উপস্থিত হয়ে তার সামনে বসে পড়লাম। তিনি বললেনঃ “হে কাব ইবনু মালিক! তোমার মা তোমাকে প্রসব করার পর হতে যতগুলো দিন তোমার নিকট এসেছে তার মধ্যে একটি সর্বোৎকৃষ্ট দিনের সুসংবাদ তোমার জন্য। আমি বললাম, “হে আল্লাহর নবী। আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে না আপনার পক্ষ হতে? তিনি বললেনঃ বরং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে। তারপর তিনি এ আয়াতগুলো তিলাওয়াত করলেনঃ (অনুবাদ) “আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই অনুগ্রহপরায়ণ হলেন নবীর প্রতি এবং মুহাজির ও আনসারদের প্রতি, যারা বড় দুঃসময়ে তার অনুসরণ করেছিল, এমনকি যখন তাদের মধ্যকার এক দলের হৃদয়-বক্র হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তারপর আল্লাহ তা'আলা তাদের মাফ করলেন। তিনি তো তাদের প্রতি দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু এবং অপর তিনজনকে যাদেরকে পিছনে রাখা হয়েছিল, যখন পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য সংকুচিত হয়ে গেল এবং তাদের জীবন দুৰ্বিসহ হয়ে উঠল, তারা বুঝতে পারলো যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কোন আশ্রয়স্থল নেই, অতঃপর তিনি তাদের প্রতি সদয় হলেন যাতে তারা ফিরে আসে। অবশ্যই আল্লাহ তওবা কুবুলকারী দয়াময়।" (সূরা আত-তওবা ১১৭-১১৮)। বর্ণনাকারী বলেন, এ আয়াতগুলোও আমাদের সম্পর্কেই অবতীর্ণ হয়েছে (অনুবাদ) “হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা আল্লাহ তা'আলাকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গী হও”— (সূরা আত-তওবা ১১৯)। কাব (রাযিঃ) বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী! আমার তাওবার মধ্যে এও অন্তর্ভুক্ত যে, আমি সর্বদা সত্য কথাই বলব এবং আমি আমার সমস্ত মাল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উদ্দেশে দান করে দিব। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমার কিছু মাল তোমার নিজের জন্য রাখ। এটাই তোমার জন্য ভালো। আমি বললাম, আমি আমার নিজের জন্য খাইবারের অংশটুকু রেখে দিচ্ছি। কাব (রাযিঃ) বলেন, ইসলাম কুবুল করার পর হতে আল্লাহ তা'আলা আমাকে যত নি’আমাতে ধন্য করেছেন আমার মতে তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ নি’আমাত হচ্ছে রাসূলুল্লাহ -এর নিকট আমার ও আমার সঙ্গীদ্বয়ের সত্য কথা বলা এবং আমাদের মিথ্যাবাদী না হওয়া। অন্যথায় তারা যেভাৰে ধ্বংস হয়েছে আমরাও তদ্রুপ ধ্বংস হতাম। আমি আশা করি সত্য বলার ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা যেন আমার ন্যায় এতো বড় পরীক্ষায় আর কাউকে না ফেলেন। আমি আর কখনো মিথ্যা বলিনি। আমি আরো আশা করি অবশিষ্ট দিনগুলোও যেন আল্লাহ তা'আলা আমাকে হিফাযাত করেন। সহীহঃ সহীহ আবূ দাউদ (১৯১২), বুখারী (৪৬৭৬), মুসলিম। এ হাদীস উপরোক্ত সনদের বিপরীত সনদে যুহরী (রাহঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে। কথিত আছে যে, সনদটি 'আবদুর রাহমান ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু কা'ব ইবনু মালিক-তার চাচা উবাইদুল্লাহ হতে, তিনি কাব (রাযিঃ) হতে। আবার কেউ কেউ এ ব্যতীত অন্য সূত্রেও বর্ণনা করেছেন। অনন্তর এ হাদীস যুহরী হতে, তিনি আবদুর রাহমান ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু কাব ইবনু মালিক হতে, তিনি তার বাবা হতে, তিনি কাব ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতে এই সূত্রে ইউনুস ইবনু ইয়াযীদ বর্ণনা করেছেন।
3103। যাইদ ইবনু সাবিত (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইয়ামামার যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের শাহাদাতের যমানায় আবূ বাকর সিদ্দীক (রাযিঃ) আমাকে ডেকে পাঠান। আমি গিয়ে দেখলাম, 'উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ)-ও তার নিকট উপস্থিত। আবূ বাকর (রাযিঃ) বললেন, "উমার আমার নিকট এসে বললেন, অসংখ্য কুরআনের কারী (হাফিয) ইয়ামামার যুদ্ধের দিন শহীদ হয়েছেন। আমার আশংকা হচ্ছে, সর্বত্র এভাবে কারীগণ শহীদ হয়ে গেলে কুরআনের অনেক অংশই বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। আমি মনে করি আপনি কুরআন সংকলনের নির্দেশ দিন। আবূ বাকর (রাযিঃ) উমার (রাযিঃ)-কে বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে যে কাজ করে যাননি আমি কিভাবে তা করতে পারি? উমর (রাযিঃ) বললেন, আল্লাহর শপথ! এটা খুবই ভালো কাজ। তিনি আমার নিকট বারবার তার কথার পুনরাবৃত্তি করে যাচ্ছিলেন। অবশেষে সেই কাজের জন্য আল্লাহ তা'আলা আমার বক্ষও উন্মুক্ত করে দিলেন, যার জন্য তিনি (আগেই) উমারের বক্ষ উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। আমিও উক্ত কাজে সেই কল্যাণ লক্ষ্য করলাম যা তিনি (আমার আগেই) লক্ষ্য করেছিলেন। যাইদ ইবনু সাবিত (রাযিঃ) বলেন, আবূ বকর (রাযিঃ) বললেন, তুমি একজন জ্ঞানবান যুবক। আমি তোমাকে কোন বিষয়ে দোষারোপ করিনি। আর তুমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশায় কুরআন লিপিবদ্ধ করতে। অতএব তুমি কুরআনের (বিভিন্ন অংশ) সন্ধানে লেগে যাও। যাইদ (রাযিঃ) বলেন, আল্লাহর শপথ। তারা যদি আমাকে পর্বতমালার মধ্য হতে কোন পাহাড় স্থানান্তরের কষ্টে নিক্ষেপ করতেন তবে তাও আমার জন্য এ মহা দায়িত্বের তুলনায় এত বেশী ভারবহ হত না। আমি বললাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে যে কাজ করেননি আপনারা তা কিভাবে করতে পারেন? আবূ বাকর (রাযিঃ) বললেন, আল্লাহর শপথ! এটা খুবই ভালো কাজ। আবূ বকর ও উমর (রাযিঃ) উভয়ে ঐ কথার পুনরাবৃত্তি করে যাচ্ছিলেন। অবশেষে আল্লাহ তা'আলা আবূ বাকর ও উমারের ন্যায় আমার বক্ষও উন্মুক্ত করে দিলেন। অতএব আমি চামড়ার টুকরাসমূহ, খেজুরপত্র, মসৃণ পাথর ও লোকদের অন্তকরণ হতে খুঁজে খুঁজে সম্পূর্ণ কুরআন একত্র করলাম। সূরা বারাআতের শেষ অংশটুকু আমি খুযাইমাহ ইবনু সাবিত (রাযিঃ)-এর নিকট পেলাম। তা হল (অনুবাদ) “অবশ্যই তোমাদের মধ্য হতে তোমাদের নিকট একজন রাসূল এসেছেন। তোমাদেরকে যা বিপন্ন করে তা তার জন্য কষ্টদায়ক। সে তোমাদের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি দয়ার্দ্র ও অত্যন্ত করুণাসক্ত। এতদসত্ত্বেও তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তুমি বলঃ আল্লাহ তা'আলাই আমার জন্য যথেষ্ট। তিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নেই। আমি তার উপরই নির্ভর করি এবং তিনিই মহান আরশের মালিক”— (সূরা আত-তওবা ১২৮, ১২৯)। সহীহ, বুখারী (৪৬৭৯), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3104। আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুযাইফাহ্ (রাযিঃ) উসমান ইবনু আফফান (রাযিঃ)-এর নিকট এসে উপস্থিতি হলেন। হুযইফা (রাযিঃ) আর্মেনিয়া ও আযারবাইজানের বিজয় অভিযানে ইরাকীদের সঙ্গী হয়ে সিরীয়দের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছিলেন। তখন হুযাইফাহ্ (রাযিঃ) তাদের মধ্যে কুরআন নিয়ে মতের অমিল লক্ষ্য করেন। তিনি (ফিরে এসে) উসমান ইবনু আফফান (রাযিঃ)-কে বললেন, হে আমীরুল মু'মিনীন! যেভাবে ইয়াহুদী-নাসারাগণ তাদের কিতাব নিয়ে মতভেদে লিপ্ত হয়েছিল, সেরূপ এই উম্মাতের লোকদের নিজেদের কিতাব নিয়ে মতভেদে লিপ্ত হওয়ার পূর্বে তাদের খবর নিন। এরপর উসমান (রাযিঃ) এই কথা বলে হাফসাহ (রাযিঃ)-এর নিকট লোক পাঠান যে, আপনার নিকট রক্ষিত কুরআনের সহীফাখানি আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিন। আমরা সেটি হতে কপি করার পর তা আপনাকে আবার ফেরত দিব। উন্মুল মুমিনীন হাফসা (রাযিঃ) তার কপি উসমান ইবনু আফফান (রাযিঃ)-এর নিকট পাঠিয়ে দিলেন। উসমান (রাযিঃ) যাইদ ইবনু সাবিত (রাযিঃ), সাঈদ ইবনুল আস (রাযিঃ), 'আবদুর রাহমান ইবনুল হারিস ইবনু হিশাম (রাযিঃ), 'আবদুল্লাহ ইবনুয যুবাইর (রাযিঃ) প্রমুখের নিকট উক্ত সহীফাখানি পাঠিয়ে দিয়ে বললেন, আপনারা এ সহীফাখানি হতে অনেকগুলো কপি করে নিন। তিনি উক্ত কমিটির তিন কুরাইশ সদস্যকে বললেন, কোন ক্ষেত্রে তোমাদের ও যাইদ ইবনু সাবিতের মধ্যে মতের অমিল হলে তা তোমরা কুরাইশের বাকরীতি মতো লিখবে। কেননা কুরআন তাদের বাকরীতিতে অবতীর্ণ হয়েছে। অবশেষে তারা পূর্ণ কুরআনের কয়েকটি কপি করেন। উসমান (রাযিঃ) সেগুলোর এক একটি কপি রাজ্যের এক এক এলাকায় পাঠিয়ে দিলেন। যুহরী (রাহঃ) বলেন, খারিজা ইবনু যাইদ (রাযিঃ) আমার নিকট বর্ণনা করেছেন; যাইদ ইবনু সাবিত (রাযিঃ) বলেছেন, আমি সূরা আল-আহযাবের একটি আয়াত পেলাম না, যেটি আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তিলাওয়াত করতে শুনাতাম। আয়াতটি এই (অনুবাদ) “মুমিনদের মধ্যে কিছু লোক আল্লাহ তা'আলার সাথে তাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে, তাদের কেউ কেউ শাহাদাত বরণ করেছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষায় রয়েছে। তারা নিজেদের অঙ্গীকারে কোন পরিবর্তন করেনি” (সূরা আল-আহযাব ২৩)। আমি আয়াতটির খোঁজ করছিলাম। অবশেষে তা খুযাইমাহ ইবনু সাবিত (রাযিঃ) বা আবূ খুযাইমাহ (রাযিঃ)-এর নিকট পেলাম। আমি সূরার যথাস্থানে আয়াতটি স্থাপন করলাম। যুহরী (রাহঃ) বলেন, তারা ঐ দিন তাবুত ও তাবূহ শব্দ নিয়ে মতের অমিল করেন। কুরাইশীরা বলেনঃ তাবত, আর যাইদ (রাযিঃ) বলেন, তাবহ। তাদের মতের অমিলের বিষয়টি উসমান (রাযিঃ)-এর নিকট উত্থাপন করা হলে তিনি বললেন, তোমরা তাবত লিখ। কেননা কুরআন কুরাইশদের ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। যুহরী (রাহঃ) বলেন, আমাকে উবাইদুল্লাহ ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু উতবাহ খবর দিয়েছেন যে, যাইদ ইবনু সাবিতের কুরআন লিপিবদ্ধ করাকে 'আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) অপছন্দ করেছেন এবং বলেছেন, হে মুসলিমগণ! কুরআন লিপিবদ্ধ করা হতে আমি বরখাস্ত হবো আর তার দায়িত্বপ্রাপ্ত হবে এমন ব্যক্তি, আল্লাহর শপথ! যে আমার ইসলাম গ্রহণের সময় এক কাফির ব্যক্তির পৃষ্ঠদেশে অন্তৰ্হিত ছিল। এ কথা দ্বারা তিনি যাইদ ইবনু সাবিত (রাযিঃ)-এর প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। তাই আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) বলেনঃ হে ইরাকবাসী! তোমাদের নিকট রক্ষিত কুরআনের লিপিবদ্ধ সংকলন লুকিয়ে রাখ এবং তালাবদ্ধ করে রাখ। কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেন, (অনুবাদ) “এবং কেউ অন্যায়ভাবে কিছু আত্মসাৎ করলে, যা সে অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করেছে কিয়ামতের দিন সে তা নিয়ে উপস্থিত হবে”— (সূরা আল-ইমরান ১৬১)। অতএব তোমরা তোমাদের সংকলনগুলোসহ আল্লাহ তা'আলার সাথে মিলিত হবে। যুহরী (রাহঃ) বলেন, আমি জেনেছি যে, ইবনু মাসউদ (রাযিঃ)-এর এ উক্তিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বহু প্রবীণ সাহাবী অপছন্দ করেছেন। সহীহঃ বুখারী (৪৯৮৭, ৪৯৮৮) সহীহ মাকতু’। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। এটি যুহরীর রিওয়ায়াত। আমরা এই হাদীস শুধু তার সূত্রেই জেনেছি।
3105। সুহাইব (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলার বাণী “যারা উত্তম কাজ করে তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ এবং আরও বেশি”— (সূরা ইউনুস ২৬) প্রসঙ্গে বলেনঃ জান্নাতীরা জান্নাতে প্রবেশ করার পর একজন আহবানকারী ডেকে বলবে, আল্লাহ তা'আলার কাছে তোমাদের জন্য একটি প্রতিশ্রুতি রয়েছে এবং তিনি সেটা পূর্ণ করতে চান। তারা বলবে, আল্লাহ তা'আলা কি আমাদের মুখমণ্ডল উজ্জ্বল করেননি এবং আমাদেরকে জাহান্নাম হতে মুক্তি দিয়ে জান্নাতে দাখিল করেননি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এমন সময় পর্দা উন্মোচিত হবে (এবং তারা আল্লাহ তা'আলাকে দেখতে পাবে)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আল্লাহর শপথ আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভের চাইতে বেশী প্রিয় ও কাঙ্খিত কোন বস্তুই তিনি তাদেরকে দান করেননি। সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (১৮৭), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এটি হাম্মাদ ইবনু সালামার হাদীস। একাধিক বর্ণনাকারী এটি হাম্মাদ ইবনু সালামাহ্ (রহঃ) হতে মারফু’ ভাবে একই রকম বর্ণনা করেছেন। সুলাইমান ইবনুল মুগীরাহ এ হাদীস সাবিত আল-বুনানী-হতে, তিনি আবদুর রাহমান ইবনু আবী লাইলা হতে তার বক্তব্যরূপে বর্ণনা করেছেন এবং তাতে সুহাইব (রাযিঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এ রকম উল্লেখ নেই।
3106। আতা ইবনু ইয়াসার (রহঃ) হতে জনৈক মিসরবাসীর সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবূদ দারদা (রাযিঃ)-কে আল্লাহ তা'আলার বাণী “পার্থিব জীবনে তাদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ”— (সূরা ইউনুস ৬৪) প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলাম। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ আয়াত প্রসঙ্গে প্রশ্ন করার পর হতে আজ পর্যন্ত আর কেউ এ প্রসঙ্গে আমার নিকট জানতে চায়নি। আমিও এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রশ্ন করলে তিনি বলেছিলেনঃ এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়া অবধি তুমি ব্যতীত আর কেউ আমাকে এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেনি। এটা (বুশরা) হচ্ছে সত্য স্বপ্ন, যা মুসলিম ব্যক্তি দেখে বা তাকে দেখানো হয়। সহীহঃ মুসলিম। ইবনু আবী উমার-সুফিয়ান হতে, তিনি আব্দুল আযিয ইবনু রুফাই হতে তিনি আবু সালিহ আস সাম্মান হতে, তিনি আতা ইবনু ইয়াসার হতে, তিনি মিসরীয় ব্যক্তি হতে, তিনি আবূদ দারদা (রাযিঃ) হতে এই সূত্রে পূর্বোক্ত হাদীসের একই রকম বর্ণনা করেছেন। আহমাদ ইবনু আবদাল্লাহ তিনি আবূ সালিহ হতে, তিনি আবূদ দারদা (রাযিঃ) হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সূত্রেও পূর্বোক্ত হাদীসের একই রকম বর্ণনা করেছেন। অবশ্য তাতে আতা ইবনু ইয়াসার-এর উল্লেখ নেই। উবাদা ইবনুস সামিত (রাযিঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে।
3107ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা'আলা ফিরআউনকে যখন পানিতে ডুবিয়ে দিলেন তখন সে বললো, “আমি ঈমান আনলাম বনী ইসরাঈল যার উপর ঈমান এনেছে তার প্রতি। নিশ্চয় তিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নেই”- (সূরা ইউনুস ৯০)। জিবরীল (আঃ) বললেন, হে মুহাম্মাদ! আপনি যদি আমাকে ঐ সময় দেখতেন যখন আমি সমুদ্র হতে কালো কাঁদামাটি তুলে তার মুখে ঢালছিলাম যাতে আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ তাকে পরিবেষ্টন না করে। সহীহঃ পরবর্তী হাদীসের সহায়তায়। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান।
3108ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উল্লেখ করেন যে, জিবরীল (আঃ) এই আশংকায় ফিরআউনের মুখে কাঁদামাটি ঠেসে দিচ্ছিল যে, সে “লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহু” বলবে, ফলে আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি অনুগ্রহ করবেন। অথবা তিনি বলেছেন “এই আশংকায় যে, আল্লাহ তার প্রতি অনুগ্রহ করবেন"। সনদ সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ, অত্র সূত্রে গারীব।
3109। আবূ রাযীন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! জীব সৃষ্টি করার আগে আমাদের প্রতিপালক কোথায় ছিলেন? তিনি বলেনঃ তিনি আমা’ (হালকা মেঘমালা)-এর মধ্যে ছিলেন। এর নিচেও বাতাস ছিল না এবং উপরেও বাতাস ছিল না। তিনি পানির উপর তার আরশ তৈরী করেন। যঈফ, ইবনু মাজাহ (২৭১) আহমাদ (রহঃ) বলেনঃ ইয়াযীদ (রাহঃ) বলেছেন, ‘আমা’ শব্দের অর্থ তার সাথে কিছুই ছিল না। হাম্মাদ ইবনু সালামা ও ওয়াকী ইবনু হুদুস এরকমই বলেন। শুবা, আবূ আওয়ানা ও হুশাইম (রাবীর নামের উচ্চারণ) ওয়াকী ইবনু উদুস বলেছেন। আবূ রাযীন এর নাম লাকীত ইবনু আমির। আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান।
3110। আবূ মূসা (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বারকাতময় আল্লাহ তা'আলা যালিম-অত্যাচারীকে অবকাশ দেন অথবা সুযোগ দেন। অবশেষে তিনি যখন তাকে পাকড়াও করেন তখন আর রেহাই দেন না। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিলাওয়াত করলেন (অনুবাদ): "এরূপই তোমার প্রতিপালকের শাস্তি। তিনি জনপদসমূহকে শাস্তিদান করেন যখন তারা সীমালঙ্ঘন করে। নিশ্চয় তার শাস্তি মর্মস্তুদ, কঠিন"(সূরা হুদ ১০২)। সহীহঃ বুখারী (৪৬৮৬), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ গারীব। আবূ উসামাও বুরাইদ হতে একই রকম বর্ণনা করেছেন এবং তাতে ইউমলী’ শব্দ বলেছেন। ইবরাহীম ইবনু সাঈদ আল-জাওহারী-আবূ উসামাহ হতে, তিনি বুরাইদ ইবনু আবদুল্লাহ হতে, তিনি তার দাদা আবূ বুরদাহ হতে, তিনি আবূ মূসা (রাযিঃ) হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সূত্রে একই রকম বর্ণনা করেছেন। এতে সন্দেহমুক্তভাবে ইউমলী’ শব্দ উল্লেখ আছে।
3111। উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, “তাদের মধ্যে কেউ হবে হতভাগ্য এবং কেউ হবে ভাগ্যবান” (সূরা হদ ১০৫), এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর নবী। তাহলে আমরা কিসের উপর আমল করব, এমন জিনিসের উপর যে প্রসঙ্গে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছে অথবা এমন কোন জিনিসের উপর যে প্রসঙ্গে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি? তিনি বললেনঃ হে উমার! না, বরং এমন জিনিসের উপর যা পূর্বেই চূড়ান্ত হয়ে আছে এবং যার সাথে কলম জারী হয়ে গিয়েছে। তবে প্রত্যেকের করণীয় বিষয় সহজসাধ্য করে রাখা হয়েছে, যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। সহীহঃ আযযিলাল (১৬১, ১৬৬) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি এ সূত্রে হাসান গারীব। আমরা এ হাদীস শুধু আবদুল মালিক হতে জেনেছি।
3112। আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এক ব্যক্তি এসে বলল, আমি মাদীনার শেষ প্রান্তে এক মহিলাকে স্পর্শ করেছি এবং আমি তার সাথে সহবাস ব্যতীত সবই করেছি। আমি এখন আপনার নিকট এসেছি। আপনি যা ইচ্ছা আমার ব্যাপারে ফাঈসালা করেন। উমার (রাযিঃ) তাকে বললেন, আল্লাহ তা'আলা তোমার অপরাধ গোপন রেখেছেন। এখন তুমিও যদি তা গোপন রাখতে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কারো কথায় প্রতিউত্তর করলেন না। লোকটি উঠে চলে যাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে পাঠিয়ে তাকে ডেকে আনেন এবং এই আয়াত পাঠ করে শুনান (অনুবাদ): “তুমি নামায কায়েম কর দিনের দুই প্রান্তভাগে এবং রাতের প্রথমাংশে। সৎকাজসমূহ অন্যায় কাজসমূহকে দুর করে দেয়। যারা উপদেশ গ্রহণ করে তাদের জন্য এটা এক উপদেশ"- ' (সূরা হুদ ১১৪)। উপস্থিত লোকদের মধ্যে একজন বলল, এটা কি শুধু তার বেলায় প্রযোজ্য? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ না, বরং সকলের জন্য। হাসান সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (১৩৯৮), মুসলিম আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। এভাবেই ইসরাঈল সিমাক হতে, তিনি ইবরাহীম হতে, তিনি আলকামাহ ও আসওয়াদ হতে, তিনি আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সূত্রে একই রকম বর্ণনা করেছেন। সুফইয়ান সাওরী (রাহঃ) সিমাক হতে, তিনি ইবরাহীম হতে, তিনি আবদুর রাহমান ইবনু ইয়াযীদ হতে, তিনি আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সূত্রে একই রকম বর্ণনা করেছেন। সাওরীর রিওয়ায়াত অপেক্ষা এদের রিওয়ায়াত অনেক বেশি সহীহ। এটিকে সিমাক ইবনু হারব-ইবরাহীম হতে, তিনি আসওয়াদ হতে, তিনি আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সূত্রে শুবাহও একই রকম বর্ণনা করেছেন। মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াহইয়া নায়সাবুরী মুহাম্মাদ ইবনু ইউসুফ হতে, তিনি সুফইয়ান সাওরী হতে, তিনি আমাশ হতে, তিনি সিমাক হতে, তিনি ইবরাহীম হতে, তিনি আব্দুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ হতে, তিনি আব্দুল্লাহ (রাযিঃ) হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সূত্রে একই রকম বর্ণনা করেছেন। মাহমূদ ইবনু গাইলান-আল-ফাযল ইবনু মূসা হতে, তিনি রাহমান ইবনু ইয়াযীদ হতে, তিনি আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সূত্রেও একই মর্মে একই রকম বর্ণনা করেছেন। উক্ত বর্ণনায় অবশ্য আ'মাশের উল্লেখ নেই। এ হাদীস সুলাইমান আত-তাইনী (রাহঃ) আবূ উসমান আন-নাহদী হতে, তিনি ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
3113। মুআয ইবনু জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! এক ব্যক্তি এক বেগানা নারীর সাথে যৌন মিলন ছাড়া আর সবই করেছে, তার প্রসঙ্গে আপনার কি মত? তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ “তুমি নামায কায়িম কর দিনের দুই প্রান্তভাগে এবং রাতের প্রথমাংশে। সৎ কর্মসমূহ অবশ্যই অসৎ কর্মসমূহ দূর করে দেয়। যারা হিদায়াত গ্রহণ করে তাদের জন্য এটা হিদায়াত" (সূরাঃ হুদ- ১১৪)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ওযু করে এসে নামায আদায়ের হুকুম দেন। মুআয (রাঃ) বলেনঃ আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! এই সুযোগ কি শুধু তার জন্যই না সাধারণভাবে সকল মুমিনের জন্য? তিনি বললেনঃ বরং সাধারণভাবে সকল মু'মিনদের জন্য। সনদ দুর্বল আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসের সনদসূত্র মুত্তাসিল (পরস্পর সংযুক্ত) নয়। আবদুর রহমান ইবনু আবূ লাইলা (রাহঃ) মুআয ইবনু জাবাল (রাঃ) হতে সরাসরি কিছু শুনেননি। মুআয ইবনু জাবাল (রাঃ) উমর (রাঃ)-এর খিলাফাত কালে ইন্তেকাল করেন। উমার (রাঃ) যখন ইন্তেকাল করেন তখন আবদুর রহমান ইবনু আবূ লাইলা ছয় বছরের বালক। তিনি উমার (রাঃ) হতে রিওয়ায়াত করেছেন এবং তিনি তাকে দেখেছেন। শুবা (রাহঃ) এ হাদীসটি আবদুল মালিক ইবনু উমাইর হতে আবদুর রহমান ইবনু আবূ লাইলা-এর সূত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে মুরসালরূপে বর্ণনা করেছেন।
3114ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক লোক এক বেগানা মহিলাকে চুমা দিল, যা তার জন্য হারাম ছিল। সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হয়ে এর কাফফারা প্রসঙ্গে তাকে প্রশ্ন করলো। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ): “তুমি নামায কায়েম কর দিনের দুই প্রান্তভাগে এবং রাতের প্রথমাংশে। ন্যায় কাজসমূহ অন্যায় কাজসমূহকে দূর করে দেয়। যারা উপদেশ গ্রহণ করে তাদের জন্য এটা উপদেশ” (সূরা হুদ ১১৪)। লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! এই সুযোগ কি শুধু আমার জন্য? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমার জন্যও এবং আমার উম্মাতের মধ্যে যে ব্যক্তি এরূপ কাজ করে বসে তার জন্যও। সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3115। আবূল ইয়াসার (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক মহিলা খেজুর ক্রয়ের জন্য আমার নিকট এলে আমি বললাম, ঘরের ভেতর এর চাইতে আরো ভালো খেজুর আছে। অতএব সে আমার সাথে ঘরে প্রবেশ করে। আমি তার প্রতি আকৃষ্ট হলাম এবং তাকে চুমা দিলাম, অতঃপর আমি আবূ বাকর (রাযিঃ)-এর নিকট এসে এ ঘটনা তাকে জানালাম। তিনি বললেন, এটা নিজের কাছেই গোপন রাখ, এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট তাওবা কর এবং আর কউকে বল না। কিন্তু আমি ধৈর্য ধারণ করতে পারলাম না। তাই আমি 'উমার (রাযিঃ)-এর নিকট এসে বিষয়টি তাকে জানালাম। তিনি বললেন, এটা নিজের নিকটেই গোপন রাখ, আল্লাহ তা'আলার নিকট তওবা কর এবং এটা আর কারো নিকট বল না। কিন্তু আমি ধৈর্য ধরতে পারলাম না। তাই আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে তার নিকট বিষয়টি প্রকাশ করলাম। তিনি বললেনঃ তুমি কি আল্লাহ তা’আলার রাস্তায় জিহাদে গমনকারী ব্যাক্তির অনুপস্থিতিতে তার পরিবারের সাথে এই অপকর্ম করেছ? এ কথায় অনুতপ্ত হয়ে আবূল ইয়াসার আক্ষেপ করে বলেন যে, তিনি যদি ইতিপূর্বে ইসলাম গ্রহণ না করে এই মুহুর্তে গ্রহণ করতেন। এমনকি তিনি নিজেকে জাহান্নামী বলে ভাবলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দীর্ঘক্ষণ নীরবে দৃষ্টি অবনমিত করে রইলেন। অবশেষে তার প্রতি ওয়াহী অবতীর্ণ হলঃ “তুমি নামায কায়েম কর দিনের দুই প্রান্তভাগে এবং রাতের প্রথমাংশে। সৎকর্মগুলো অসৎকর্মগুলোকে দূর করে দেয়। যারা উপদেশ গ্রহণ করে এটা তাদের জন্য উপদেশ”— (সূরা হুদ ১১৪)। আবূল ইয়াসার (রাযিঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এলে তিনি আমাকে উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করে শুনান। তখন তার সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এটা তার জন্যই নির্দিষ্ট না সাধারণভাবে সকলের জন্য? তিনি বললেনঃ বরং সাধারণভাবে সকলের জন্য। হাসান। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ গারীব। কাইস ইবনুর রাবী'-কে ওয়াকী প্রমুখ হাদীসশাস্ত্রে দুর্বল বলেছেন। আবূল ইয়াসারের নাম কাব ইবনু আমর। শারীক (রাহঃ) উসমান ইবনু আবদুল্লাহ (রাহঃ) হতে এ হাদীস কাইস ইবনুর রাবী'র মতই বর্ণনা করেছেন। আবূ উমামা, ওয়াসিলা ইবনুল আসকা ও আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে।
3116। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মর্যাদাবানের পুত্র মর্যাদাবানের পুত্র মর্যাদাবানের পুত্রমর্যাদাবান ইউসুফ ইবনু ইয়াকুব ইবনি ইসহাক ইবনি ইবরাহীম 'আলাইহিহমুস সালাম। তিনি বলেনঃ ইউসুফ (আঃ) যত কাল কারাগারে ছিলেন আমি যদি তত কাল কারাগারে থাকতাম এবং অতঃপর রাজদূত আমার নিকট এসে আহবান জানাতো তাহলে আমি (তার আহবানে) সাড়া দিতাম। তারপর তিনি নিম্নোক্ত আয়াত পড়েন (অনুবাদ) “রাজদূত যখন তার নিকট উপস্থিত হল তখন সে বলল, তুমি তোমার মনিবের নিকট ফিরে যাও এবং তাকে জিজ্ঞেস কর- যে নারীরা নিজেদের হাত কেটেছিল তাদের অবস্থা কি"- (সূরা ইউসুফ ৫০) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ লুত (আঃ)-এর উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক! তিনি মজবুত দুর্গে আশ্রয় গ্রহণের আকাংখা করতেন। “সে বলল, তোমাদের উপর যদি আমার জোর খাটত অথবা যদি আমি কোন সুদৃঢ় দুর্গে আশ্রয় নিতে পারতাম”— (সূরা হদ ৮০)। তার পরে আল্লাহ ঐ জাতির মর্যাদাবান গোষ্ঠীর মধ্য থেকেই নবীগণকে পাঠিয়েছেন। যিরওয়াহ শব্দের পরিবর্তে “সারওয়াহ’ শব্দে বর্ণিত হাদীসটি হাসানঃ সহীহাহ (১৬১৭, ১৮৬৭), বুখারী, মুসলিম। আবূ কুরাইব (রাহঃ) আবদাল্লাহ ও আবদুর রহীম হতে, তিনি মুহাম্মাদ ইবনু আমর (রাযিঃ) সূত্রে আল-ফাযল ইবনু মূসার হাদীসের অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। তবে এই বর্ণনায় (যিরওয়াতুন-এর স্থলে) সারওয়াতুন শব্দ উল্লেখ আছে (অর্থ অভিন্ন)। মুহাম্মাদ ইবনু আমর (রাযিঃ) বলেন, “আস-সারওয়াতু" অর্থ প্রচুর, প্রাচুর্য, প্রতিপত্তি ও ক্ষমতা। এটি আল-ফাযল ইবনু মূসার রিওয়ায়াত অপেক্ষা অধিকতর সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান।
3117। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইয়াহুদীরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, হে আবূল কাসিম! আমাদেরকে রা'দ (মেঘের গর্জন) প্রসঙ্গে বলুন, এটা কি? তিনি বললেনঃ মেঘমালাকে হাকিয়ে নেয়ার জন্য ফেরেশতাদের একজন নিয়োজিত আছে। তার সাথে রয়েছে আগুনের চাবুক। এর সাহায্যে সে মেঘমালাকে সেদিকে পরিচালনা করেন, যেদিকে আল্লাহ তা'আলা চান। তারা বলল, আমরা যে আওয়াজ শুনতে পাই তার তাৎপর্য কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এটা হচ্ছে ফেরেশতার হাকডাক। এভাবে হাকডাক দিয়ে সে মেঘমালাকে তার নির্দেশিত স্থানে নিয়ে যায়। তারা বলল, আপনি সত্য বলেছেন। তারা আবার বলল, আপনি আমাদের বলুন, ইসরাঈল ইয়াকুব (আঃ) কোন জিনিস নিজের জন্য হারাম করেছিলেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তিনি ইরকুন নিসা (স্যায়াটিকা) রোগে আক্রান্ত ছিলেন কিন্তু উটের গোশত ও এর দুধ ছাড়া তার উপযোগী খাদ্য ছিল না। তাই তিনি তা হারাম করে নিয়েছিলেন। তারা বলল, আপনি সত্য বলেছেন। সহীহঃ সহীহাহ (১৮৭২) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ গারীব।
3118। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলার বাণী “এদের কতককে কতকের উপর আমি শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে থাকি" (সূরা আর-রাদ ৪) প্রসঙ্গে বলেন; যেমন নিকৃষ্ট খেজুর ও উত্তম খেজুরে এবং মিষ্টি ও টকের মধ্যে পার্থক্য। হাসান। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। যাইদ ইবনু আবী উনাঈসাহ (রাহঃ) আল-আমাশের সূত্রে উপরোক্ত হাদীসের একই রকম বর্ণনা করেছেন। সাইফ ইবনু মুহাম্মাদ (রহঃ) আম্মার ইবনু মুহাম্মাদের ভাই। তার তুলনায় আম্মার অধিক শক্তিশালী বর্ণনাকারী। ইনি সুফইয়ান সাওরীর বোনপুত্র।
3119। আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে টাটকা খেজুরের ছড়া বিতরণ করা হলে তিনি বলেনঃ “সৎ বাক্যের তুলনা তা একটি পবিত্র বৃক্ষের ন্যায় যার শিকড় সুদৃঢ় এবং যার শাখা প্রশাখা উদ্ধে উখিত। যে বৃক্ষ স্বীয় রবের আদেশে প্রত্যেক মওসুমে তার ফলদান করে। (সূরাঃ ইবরাহীম- ২৪, ২৫)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তা হল খেজুর গাছ। “আর নাপাক বাক্যের দৃষ্টান্ত হল একটি মন্দ বৃক্ষ, যার মূল ভূপৃষ্ঠ হতে আলাদা, যার কোন স্থায়িত্ব নেই" (সূরাঃ ইবরাহীম২৬)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তা হল (তিক্ত) মাকাল ফলের গাছ। রাবী বলেন, আমি এ প্রসঙ্গে আবূল আলিয়াকে জানালে তিনি বলেন, (তোমার উস্তাদ) সত্য বলেছেন এবং যথার্থ বলেছেন। মারফু বর্ণনাটি দুর্বল কুতাইবা-আবূ বাকর ইবনু শুআইব হতে তিনি তার পিতা হতে তিনি আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে উক্ত মর্মে একই রকম হাদীস বর্ণনা করেছেন। তবে তিনি এটি মারফুরূপে বর্ণনা করেননি এবং তিনি আবূল আলিয়ার বক্তব্যও উল্লেখ করেননি। হাম্মাদ ইবনু সালামার হাদীসের তুলনায় এটি অনেক বেশি সহীহ। একাধিক রাবী একই রকম মাওকুফ (আনাসের কথা) হিসেবে বর্ণনা করেছেন। হাম্মাদ ইবনু সালামা ছাড়া আর কেউ এটি মারফুরূপে বর্ণনা করেছেন বলে আমাদের জানা নেই। মামার, হাম্মাদ ইবনু যাইদ (রাহঃ) প্রমুখ এটি বর্ণনা করেছেন কিন্তু তাদের কেউ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত এর সনদ পৌছাননি। মাওকুফ বর্ণনার সনদ সহীহ আহমাদ ইবনু আবদা (রাহঃ) হাম্মাদ ইবনু যাইদ হতে তিনি শুআইব ইবনুল হাবহাব হতে তিনি আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) সূত্রে কুতাইবার হাদীসের মতই বর্ণনা করেছেন এবং তিনিও মারফুরূপে বর্ণনা করেননি। মাওকুফ বর্ণনাটি সহীহ
3120। আল-বারাআ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলার বাণী “যারা ঈমান আনে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে পার্থিব জীবনে ও আখিরাতে শাশ্বত বাণীতে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন"- (সূরা ইবরাহীম ২৭) প্রসঙ্গে বলেনঃ কবরে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখা হবে-যখন তাকে বলা হবে, তোমার প্রভু কে, তোমার দীন কি এবং তোমার নবী কে। সহীহঃ বুখারী (৪৬৯৯), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেনঃ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3121। মাসরূক (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আয়িশাহ (রাযিঃ) এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন (অনুবাদ) “যে দিন পৃথিবী পরিবর্তিত হয়ে অন্য পৃথিবী হবে..."— (সূরা ইবরাহীম ৪৮)। আয়িশাহ (রাযিঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে সময় মানুষ কোথায় থাকবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ পুলসিরাতের উপর। সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (৪২৭৯), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। এটি অন্য সূত্রেও আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে।
3122ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক পরমা সুন্দরী মহিলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পেছনে (মহিলাদের কাতারে) নামায আদায় করত। কিছু লোক প্রথম কাতারে এগিয়ে আসত, যাতে উক্ত মহিলা দৃষ্টিগোচর না হয়। আবার কিছু লোক পেছনে সরে গিয়ে (মহিলাদের নিকটবর্তী) পেছনের কাতারে দাঁড়াত এবং রুকূতে গিয়ে বগলের নিচ দিয়ে (উক্ত মহিলার প্রতি) তাকাতো। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেনঃ “তোমাদের মধ্যকার সামনে অগ্রসর হয়ে যাওয়া লোকদেরও আমি জানি এবং পেছনে পিছিয়ে যাওয়া লোকদেরও আমি জানি”— (সূরা আল-হিজর ২৪)। সহীহঃ সহীহাহ (২৪৭২), আস সামার আল-মুসতাতা-ব আবূ ঈসা বলেনঃ জাফর ইবনু সুলাইমানও এ হাদীস আমর ইবনু মালিক হতে, তিনি আবূল জাওযার সূত্রে একই রকম বর্ণনা করেছেন এবং তাতে ইবনু আব্বাস (রাযিঃ)-এর উল্লেখ করেননি। আর এটি নূহ-এর রিওয়ায়াত অপেক্ষা সহীহ হওয়ার অনেক বেশী সামঞ্জস্য।
3123ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জাহান্নামের সাতটি দরজা আছে (১৫ঃ ৪৪ আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত)। তার মধ্যে একটি দরজা সেইসব লোকদের জন্য যারা আমার উম্মাতের বিরুদ্ধে অথবা বলেছেনঃ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উন্মাতের বিপক্ষে তলোয়ার চালিয়েছে। যঈফ, মিশকাত, তাহকীক ছানী (৩৫৩০) আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি গারীব। আমরা শুধুমাত্র মালিক ইবনু মিগওয়ালের সূত্রেই এ হাদীস জেনেছি।
3124। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ "আলহামদু লিল্লাহ" অর্থাৎ সূরা আল-ফাতিহা হচ্ছে উম্মুল কুরআন (কুরআনের মূল), উম্মুল কিতাব (কিতাবের মূল) ও সাবউল মাসানী (বারবার পঠিত সপ্তক)। সহীহঃ সহীহ আবূ দাউদ (১৩১), বুখারী আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3125। উবাই ইবনু কা'ব (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তাওরাত ও ইনজীলে আল্লাহ তা'আলা উম্মুল কুরআনের সমতুল্য কিছু অবতীর্ণ করেননি। আর তা হচ্ছে সাবাউল মাসানী (বারবার পঠিত সপ্তক; সূরা আল-হিজর ৮৭ আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত)। (আল্লাহ - তা'আলা বলেন) তা আমার ও আমার বান্দার মধ্যে বণ্টিত। আমার বান্দার জন্য তা-ই রয়েছে যা সে চায়। সহীহঃ তা’লীকুর রাগীব (২/২১৬), সিফাতুস সালাত। কুতাইবা আবদুল আজীজ ইবনু মুহাম্মাদ হতে, তিনি আলা ইবনু 'আবদুর রাহমান হতে, তিনি তার পিতা হতে, তিনি আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে এই সূত্রে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উবাই (রাযিঃ)-এর নিকট বের হয়ে এলেন। তখন তিনি নামাযরত ছিলেন...পূর্বোক্ত হাদীসের অনুরূপ। আবূ ঈসা বলেনঃ আবদুল আযীয ইবনু মুহাম্মাদের হাদীস অনেক বেশি দীর্ঘ ও পূর্ণাঙ্গ এবং এটি আবদুল হামীদ ইবনু জাফরের হাদীস অপেক্ষা অনেক বেশি সহীহ। একাধিক বর্ণনাকারী আলা ইবনু আবদুর রাহমান (রহঃ) হতে একই রকম বর্ণনা করেছেন।
3126। আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ্ তা'আলার বাণী “আমি অবশ্যই তাদের সবাইকে প্রশ্ন করব তারা যা করে সে বিষয়ে" (সূরাঃ হিজর৯২-৯৩) প্রসঙ্গে বলেনঃ অর্থাৎ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা প্রসঙ্গে। সনদ দুর্বল আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি গারীব। আমরা শুধুমাত্র লাইস ইবনু আবূ সুলাইমের সূত্রে এ হাদীস জেনেছি। আবদুল্লাহ ইবনু ইদরীসও এ হাদীস লাইস ইবনু আবূ সুলাইম হতে তিনি বিশর হতে তিনি আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) সূত্রে একই রকম বর্ণনা করেছেন তবে মারফুরূপে বর্ণনা করেননি।
3127। আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা মুমিনের দূরদৃষ্টি সম্পর্কে সজাগ থাক। কারণ সে আল্লাহ্ তা'আলার নূরের সাহায্যে দেখে। তারপর তিনি পাঠ করেনঃ “নিশ্চয় এতে নিদর্শন রয়েছে অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন লোকদের জন্য" (সূরাঃ আল-হিজর— ৭৫)। যঈফ, যঈফা (১৮২১) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি গারীব। আমরা শুধুমাত্র উপরোক্ত সূত্রেই এ হাদীস জেনেছি। কোন কোন তাফসীরকার আয়াতে উদ্ধৃত “মুতাওয়াসসিমীন" শব্দের অর্থ করেছেন “মুতাফাররিসীন" (দূরদৃষ্টি বা অন্তর দৃষ্টি সম্পন্ন লোক)।
3128আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যুহরের (ফরযের) পূর্বে সূর্য ঢলে যাওয়ার পর যে চার রাকাআত নামায (আদায় করা হয়, সাওয়াবের দিক হতে) তা শেষ রাতের চার রাকাআত নামাযের মত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এমন কোন জিনিস নেই যা ঐ সময় আল্লাহ্ তা'আলার গুণগান করে না। তারপর তিনি এ আয়াত পাঠ করেনঃ “এর ছায়া ডানে ও বায়ে ঢলে পড়ে আল্লাহ তা'আলার প্রতি বিনীতভাবে সিজদাবনত হয়...." (সূরাঃ আন-নাহল- ৪৮-৫০) ..... আয়াতের শেষ পর্যন্ত। যঈফ, সহীহা (১৪৩১) নং হাদীসের অধীনে আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি গারীব। আলী ইবনু আসিমের সূত্র ব্যতীত এটি প্রসঙ্গে আমরা কিছু জানি না।
3129। উবাই ইবনু কাব (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, উহুদের যুদ্ধে চৌষট্টিজন আনসার ও ছয়জন মুহাজির শাহাদাত বরণ করেন। তাদের মধ্যে হামযাহ (রাযিঃ)-ও ছিলেন। কাফিররা তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কর্তন করে লাশ বিকৃত করেছিল। আনসারগণ বলেন, আমরা যদি এসব কাফিরকে কোন দিন কাবু করতে পারি তাহলে তাদের উপর এর দ্বিগুণ বদলা নেব। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর যখন মক্কা বিজয়ের দিন আসলো তখন আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেন (অনুবাদ) “যদি তোমরা শাস্তি দাওই তবে ঠিক ততখানি শাস্তি দিবে যতখানি অন্যায় তোমাদের প্রতি করা হয়েছে। আর যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর তবে ধৈর্যশীলদের জন্য তাইতো উত্তম"- (সূরা আন-নাহল ১২৬)। তখন এক ব্যক্তি বলল, আজকের পর হতে কুরাইশদের নাম থাকবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ চার ব্যক্তি ব্যতীত অন্য লোকদের হত্যা করা হতে তোমরা বিরত থাক। সনদ হাসান সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান এবং উবাই ইবনু কা'ব (রাযিঃ)-এর রিওয়ায়াত হিসেবে গারীব।
3130। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে রাতে আমাকে (উর্ধ্বজগতে) ভ্রমণ করানো হয় সে রাতে আমি মূসা (আঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করি। বর্ণনাকারী বলেন, তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মূসা ("আঃ)-এর দৈহিক গঠনাকৃতির বর্ণনা দেন। (তিনি বলেনঃ) তিনি এমন এক ব্যক্তি যার দেহ মধ্যমাকৃতির, তার চুল মধ্যম গোছের, খুব কোকড়ানোও নয়, আবার একেবারে সোজাও নয়। মনে হয় তিনি শানুআহ বংশের লোক। তিনি আরো বলেনঃ ঈসা (আঃ)-এর সাথেও আমি সাক্ষাৎ করলাম। বর্ণনাকারী বলেন, তার চেহারারও বর্ণনা দিলেন তিনি। তার দেহের গড়ন মধ্যম, শরীরের রং লাল এবং মনে হয় তিনি এইমাত্র গোসলখানা হতে বের হয়েছেন। ইবরাহীম (আঃ)-কেও আমি দেখেছি। তার বংশধরের মধ্যে আমিই তার দৈহিক আকৃতিতে সর্বাধিক সদৃশ। আমার সামনে দুটি পানপত্র পেশ করা হয়ঃ একটি দুধের এবং অন্যটি মদের। আমাকে বলা হল, আপনি এ দু'টির মধ্যে যেটা পান করতে চান সেটা নিন। আমি দুধের পাত্রটি নিয়ে তা পান করলাম। তারপর আমাকে বলা হল, আপনাকে ফিতরাতের (ইসলামের) পথ দেখানো হয়েছে বা আপনি ফিতরাতকে পেয়ে গেছেন। আপনি যদি মদের পাত্র নিতেন তবে আপনার উন্মাত পথভ্রষ্ট হয়ে যেত। সহীহঃ বুখারী (৪৭০৯), মুসলিম আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3131। আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, যে রাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে (মিরাজে) ভ্রমণ করানো হয় সে রাতে তার সামনে জিনপোষ আটা ও লাগাম বাধা একটি বোরাক আনা হয়। বোরাক তার পিঠে সাওয়ার হওয়াটা তার জন্য অসম্ভব করে তুললে জিবরীল (আঃ) তাকে বললেন, তুমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কেন এ রকম আচরণ করছ? অথচ আল্লাহ তা'আলার সমীপে তার চেয়ে বেশি সম্মানিত কেউ তোমার পিঠে সওয়ার হয়নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এতে বোরাক ঘৰ্মাক্ত হয়ে যায়। সনদ সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। এটিকে আমরা শুধুমাত্র 'আবদুর রাজ্জাকের বর্ণিত হাদীস হিসেবেই জানি।
3132। আবদুল্লাহ ইবনু বুরাইদাহ (রহঃ) হতে তার বাবার সূত্রে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমরা যখন বাইতুল মাকদিসে পৌঁছলাম, তখন জিবরীল (আঃ) তার আঙ্গুল দিয়ে পাথর ফাটান এবং তার সাথে বোরাক বাঁধেন। সনদ সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব।
3133। জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কুরাইশরা যখন আমাকে মিথ্যা মনে করল (এবং বলল, আপনার মিরাজে যাওয়ার দাবি সত্য হলে বাইতুল মাকদিসের একটি বর্ণনা দিন)। আমি হাজারে (হাতীমে) দাঁড়ালাম এবং আল্লাহ তা'আলা আমার সামনে বাইতুল মাকদিসের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরলেন। আমি তাদের সামনে এর নিদর্শনসমূহের বর্ণনা দিলাম। মনে হল আমি যেন বাইতুল মাকদিসকেই দেখছি। সহীহঃ তাখরাজু ফিকহিস সীরাহ (১৪৫), বুখারী, মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। মালিক ইবনু সা'সাহ, আবূ সাঈদ ও ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে।
3134। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ “তোমাকে আমরা চাক্ষুষভাবে যা দেখালাম তা এই লোকদের জন্য একটি পরীক্ষার বস্তু বানিয়ে রেখেছি”— (সূরা বনী ইসরাঈল ৬০)। আয়াতে উল্লেখিত “রুইয়া” প্রসঙ্গে ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) বলেন, এটা ছিল চাক্ষুস দর্শন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রাতের বেলা (মিরাজের সময়) বাইতুল মাকদিসে নিয়ে গিয়ে তা (যাবতীয় নিদর্শন) দেখানো হয়েছিল। বর্ণনাকারী বলেন, "কুরআনে উল্লেখিত অভিশপ্ত গাছটি"- (সূরা বনী ইসরাঈল ৬০) হল যাক্কুম গাছ। সহীহঃ বুখারী (৪৭১০) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3135। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ “আর ফজরে কুরআন পাঠের স্থায়ী নীতি অবলম্বন কর। কেননা ফজরের কুরআন পাঠে উপস্থিত থাকা হয়"- (সূরা বনী ইসরাঈল ৭৮)। এ আয়াত প্রসঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এ সময় রাতের ফেরেশতারা এবং দিনের ফেরেশতারা উপস্থিত হয়। সনদ সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। এ হাদীসটি আলী ইবনু মুসহির আমাশ হতে, তিনি আবূ সালিহ হতে তিনি আবূ হুরাইরাহ ও আবূ সাঈদ (রাযিঃ) হতে তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। এটি ‘আলী ইবনু হুজুর আলী ইবনু মুসহির হতে, তিনি আমাশ হতে ...... . অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।
3136। আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ “সেদিন আমরা সব মানুষকে তাদের নেতাসহ আহবান করব।” (সূরা বনী ইসরাঈল- ৭১), এ আয়াত প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ (মুসলিম নেতাদের) একজনকে ডাকা হবে। তার কিতাব (আমলনামা বা কার্যবিবরণী) তার ডান হাতে দেয়া হবে। তার দেহ ষাট গজ লম্বা করা হবে। তার মুখমণ্ডল সাদা (আকর্ষণীয়) করা হবে। তার মাথায় মনিমুক্তার টুপি পরানো হবে এবং তা ঝিলকাতে থাকবে। সে তার সঙ্গীদের কাছে আসবে। তারা দূর হতেই তাকে দেখতে পাবে। তারা বলবে, "হে আল্লাহ! আমাদেরকেও এরূপ দান কর এবং এর মাধ্যমে বারকাত দান কর।” ইতিমধ্যে সে তাদের নিকটে পৌছে যাবে এবং তাদেরকে বলবে, তোমাদের জন্য সুসংবাদ। তোমাদের প্রত্যেকের জন্য এরূপ পুরস্কার আছে। অপর দিকে কাফিরদের নেতার শরীরের রং কালো হবে। তার দেহ আদম আলাইহিস সালাম-এর মতই ষাট গজ লম্বা করা হবে। তাকেও একটি টুপি পরানো হবে। তার সঙ্গীরা দূর হতে তাকে দেখে বলবে, “আমরা এর অনিষ্ট থেকে আল্লাহ্ তা'আলার নিকটে আশ্রয় চাই। হে আল্লাহ! তাকে আমাদের নিকট ফিরিয়ে দিও না। এমতাবস্থায় সে তাদের নিকট এসে যাবে, আর তারা বলতে থাকবে, তুমি তাকে লাঞ্ছিত কর।” তারপর সে বলবে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে অপমান করুন। কেননা তোমাদের প্রত্যেককে এভাবেই লাঞ্ছিত করা হবে। সনদ দুর্বল আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান গারীব। সুদ্দীর নাম ইসমাঈল ইবনু আবদুর রহমান।
3137। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আল্লাহ তা'আলার বাণী (অনুবাদ) “আশা করা যায় যে, তোমার প্রতিপালক তোমাকে মাকামে মাহমুদে পৌছে দিবেন”— (সূরা বনী ইসরাঈল ৭৯) প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হল। তিনি বললেনঃ এটা শাফা’আত। সহীহঃ সহীহাহ (২৬৩৯, ২৩৭০), আয যিলা-ল (৭৮৪)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান। দাউদ আয-যাআফির হলেন দাউদ আল-আওদী, ইবনু ইয়াযীদ ইবনু আবদুল্লাহ। তিনি আবদুল্লাহ ইবনু ইদরীসের চাচা।
3138। ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের বছর মক্কায় প্রবেশ করলেন। তখন কা'বার চারপাশে তিন শত ষাটটি মূর্তি স্থাপিত ছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হাতের লাঠি বা কাঠ দিয়ে মূর্তিগুলোর গায়ে আঘাত করে সেগুলোকে ভূপাতিত করছিলেন আর বলছিলেনঃ সত্য সমাগত, মিথ্যা অপসৃত। আর বাতিলের বিলুপ্তি অবশ্যম্ভাবী"- (সূরা বনী ইসরাঈল ৮১)। "সত্য সমাগত এবং অসত্য কিছুই সৃজন করতে পারে না এবং তা পুনরাবৃত্তিও করতে পারে না”— (সূরা সাবা ৪৯)। সহীহঃ বুখারী (৪৭২০), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। ইবনু উমর (রাযিঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে।
3139ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় অবস্থান করছিলেন। তারপর তাকে (মাদীনায়) হিজরাতের হুকুম দেয়া হয়। তখন তার উপর এ আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ “আর বলুনঃ হে আমার রব! আমাকে দাখিল করাও কল্যাণের সাথে এবং আমাকে বের করাও কল্যাণের সাথে এবং তোমার পক্ষ হতে আমাকে দান কর সাহায্যকারী শক্তি" (সূরাঃ বাণী ইসরাঈল- ৮০) সনদ দুর্বল। আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান সহীহ
3140। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, কুরাইশরা ইয়াহুদীদের বলল, তোমরা আমাদেরকে এমন কিছু শিখিয়ে দাও যে প্রসঙ্গে আমরা এই ব্যক্তিকে (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে) প্রশ্ন করতে পারি। ইয়াহুদীরা বলল, তোমরা রূহ প্রসঙ্গে তাকে প্রশ্ন কর। বর্ণনাকারী বলেনঃ তারা রূহ (বা প্রাণ) বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করল। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ “লোকেরা রূহ প্রসঙ্গে তোমার নিকট প্রশ্ন করে। বল, রূহ আমার প্রতিপালকের আদেশ ঘটিত। জ্ঞানের খুব সামান্যই তোমাদেরকে প্রদান করা হয়েছে"- (সূরা বনী ইসরাঈল ৮৫)। ইয়াহুদীরা বলল, “আমাদের বিরাট বা প্রচুর জ্ঞান দান করা হয়েছে। আমাদেরকে তাওরাত কিতাব দেয়া হয়েছে। আর যাদেরকে তাওরাত গ্রন্থ দেয়া হয়েছে তাদেরকে প্রভূত কল্যাণ দেয়া হয়েছে। এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে এ আয়াত অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ) “বল, আমার প্রতিপালকের কথাগুলো লেখার জন্য সমুদ্রের সমস্ত পানি যদি কালি হয়ে যায় তবুও তা আমার প্রভুর কথাগুলো লিখে শেষ করার পূর্বেই নিঃশেষ হয়ে যবে। আমরা যদি আবার একই রকম কালি নিয়ে আসি তুবও তা যথেষ্ট হবে না"- (সূরা কাহফ ১০৯)। সহীহঃ আত্তা’লীকাত আল-হাসসান (৯৯) আবূ ঈসা বলেন, উল্লেখিত সনদসূত্রে এ হাদীসটি হাসান সহীহ গারীব।
3141। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে মাদীনায় একটি কৃষি খামারে যাচ্ছিলাম। তিনি খেজুর গাছের ডালে ভর দিয়ে যাচ্ছিলেন। পথে তিনি একদল ইয়াহুদীদেরকে অতিক্রম করলেন। তাদের কিছু লোক বলল, তোমরা যদি তাকে প্রশ্ন করতে? তাদের অপর কতক বলল, তাকে কোন প্রশ্ন করো না। অন্যথায় তিনি এমন কিছু শুনিয়ে দিবেন যা তোমাদের মনোপূত হবে না। তারা বলল, হে আবূল কাসিম! আমাদেরকে রূহ (প্রাণ) প্রসঙ্গে বলুন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুক্ষণ দাঁড়ালেন। তিনি তার মাথা আসমানের দিকে উঠালেন। আমি বুঝে ফেললাম যে, তার উপর ওয়াহী অবতীর্ণ হচ্ছে। ওয়াহী অবতরণ শেষে তিনি বললেনঃ “রূহ আমার প্রতিপালকের হুকুম মাত্র। তোমাদেরকে জ্ঞানের খুব অল্পই প্রদান করা হয়েছে"। সহীহঃ বুখারী (৪৭২১), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3142। আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন লোকদেরকে তিন শ্রেণীতে ভাগ করে উঠানো হবে। একদল লোক পায়ে হেঁটে, দ্বিতীয় দল সাওয়ারী অবস্থায় এবং তৃতীয় দল অধঃমুখে (এবং পা উপরে তুলে) হাযির হবে। প্রশ্ন করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! এরা মুখমণ্ডলে ভর করে চলবে কিভাবে? তিনি বললেনঃ যে মহান সত্তা তাদেরকে পায়ের সাহায্যে হাটিয়ে ছিলেন, তিনি তাদেরকে মুখমণ্ডলে ভর করে হাটাতেও সক্ষম। এরা নিজেদের মুখের দ্বারা প্রতিটি উচু-নীচু ও কাটা উপেক্ষা করে রাস্তা পার হবে। যঈফ, মিশকাত, তাহকীক ছানী (৫৫৪৬), তা’লীকুর রাগীব (৪/১৯৪) আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান। উহাইব (রাহঃ) ইবনু তাউসের সূত্রে, তিনি তার পিতা হতে আবূ হুরাইরা (রাঃ)-এর সূত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে একই রকম হাদীস বর্ণনা করেছেন।
3143বাহয ইবনু হাকীম (রহঃ) হতে পর্যায়ক্রমে তার বাবা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত, তিনি (দাদা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামত দিবসে তোমাদেরকে পদব্রজে ও সওয়ারী অবস্থায় সমবেত করা হবে এবং কতককে মুখের উপর (উপুড় করে) হেঁচড়িয়ে হাযির করা হবে। হাসানঃ তা’লীকুর রাগীব। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান।
3144সাফওয়ান ইবনু আসসাল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ কোন এক সময় দুই ইয়াহদীর একজন অপরজনকে বলল, চল আমরা এই নবীর কাছে গিয়ে তাকে কিছু প্রশ্ন করি। অপরজন বললঃ তাকে নবী বল না। কেননা সে যদি এটা শুনে ফেলে যে, তুমি (ইয়াহুদীরাও) তাকে নবী বলছ, তার চার চোখ হয়ে যাবে। তারা উভয়ে তার নিকটে এসে তাকে আল্লাহ তা'আলার নিম্নোক্ত বাণী প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেঃ “আমরা মূসাকে নয়টি নিদর্শন দান করেছিলাম" (সূরাঃ বাণী ইসরাঈল১০১)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সেই নয়টি নিদর্শন (নির্দেশ) হচ্ছেঃ (১) তোমরা আল্লাহ্ তা'আলার সাথে কোন কিছু অংশীদার করো না, (২) যেনা-ব্যভিচার করো না, (৩) যাকে হত্যা করা আল্লাহ তা'আলা নিষিদ্ধ করেছেন ন্যায়সঙ্গত কারণ ছাড়া তার জীবন সংহার করো না, (৪) চুরি করো না, (৫) যাদুটোনা করো না, (৬) কোন নিরপরাধ লোককে সরকারের কাছে অপরাধী বানিয়ে খুন করতে নিয়ে যেও না, (৭) সুদ খেও না, (৮) কোন সতী- সাধ্বী মহিলার বিরুদ্ধে যেনার মিথ্যা অপবাদ দিও না এবং (৯) যুদ্ধক্ষেত্র হতে পালিয়ে যেও না।হে ইয়াহুদী সম্প্রদায়! বিশেষ করে তোমরা শনিবারের বাধ্যবাধকতা অতিক্রম করো না। তারপর ইয়াহুদী শ্রোতা দু'জন তার পা দুটিতে ও হাত দুটিতে চুমা দিয়ে বললঃ আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিঃসন্দেহে আপনি নবী। তিনি বললেনঃ তাহলে তোমাদের দু’জনকে ইসলাম গ্রহণে কিসে বাধা দিচ্ছে? তারা উভয়ে বললঃ দাউদ আলাইহিস সালাম আল্লাহ তা'আলার নিকটে দু'আ করেছিলেন তিনি যেন বরাবর তার বংশধরদের মধ্য হতেই নবী পাঠান। অনন্তর আমাদের আশংকা হচ্ছে, আমরা যদি ইসলাম কুবুল করি তাহলে ইয়াহুদীরা আমাদেরকে মেরে ফেলবে। যঈফ, ইবনু মাজাহ (৩৭০৫) আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3145ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ “তোমার নামাযে স্বর (কিরআত) উচ্চ করো না এবং অতিশয় ক্ষীণও করো না”— (সূরা বনী ইসরাঈল ১১০) মক্কায় অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উচ্চ স্বরে কুরআন তিলাওয়াত করলে মুশরিকরা কুরআনকে গালি দিত এবং এর অবতীর্ণকারী (আল্লাহ তা'আলা) ও এর বাহককেও (জিবরীলকে) গালি দিত। তারপর আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেনঃ “তোমার নামাযের কিরআত উচ্চস্বরে পাঠ করো না” অর্থাৎ আপনি উচ্চ স্বরে কুরআন পাঠ করবেন না, অন্যথায় কুরআন, এর অবতরণকারী ও এর বাহককে গালি দেয়া হবে। “এবং তা ক্ষীণস্বরেও পড়বে না", তাহলে আপনার সাথীরা শুনতে পাবে না, (বরং মধ্যম আওয়াজে তা পাঠ করুন) যাতে তারা আপনার নিকট হতে কুরআন শিখতে পারে। সহীহঃ বুখারী (৪৭২২), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান।
3146। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ “তোমার নামাযের কিরআত না উচ্চস্বরে পড়বে, আর না নিম্ন স্বরে, এ দুইয়ের মধ্যবর্তী মাত্রার আওয়াজ অবলম্বন কর”— (সূরা বনী ইসরাঈল ১১০) অবতীর্ণ হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় আত্মগোপন করে ছিলেন। তিনি তার সাহাবীদের নিয়ে নামায আদায়ের সময় উচ্চস্বরে কিরাআত পাঠ করতেন। মুশরিকরা তা শুনতে পেয়ে কুরআনকে, এর অবতরণকারীকে এবং এর বাহককে গালি দিত। অতএব আল্লাহ তা'আলা তার নবীকে বললেনঃ “তোমার নামাযে উচ্চস্বরে কিরআত পাঠ করো না”, কারণ মুশরিকরা তা শুনে কুরআনকে গালি দেয়। “আবার এত নীচু স্বরেও পড়বে না”, যাতে তোমার সাহাবীদের শুনতে অসুবিধা হয়, বরং “এই দুইয়ের মধ্যবর্তী মাত্রার আওয়াজ অবলম্বন কর”। সহীহঃ বুখারী (৪৭২২), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3147যির ইবনু হুবাইশ (রাহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান (রাযিঃ)-কে প্রশ্ন করলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি বাইতুল মাকদিসে নামায আদায় করেছেন? তিনি বললেন, না। আমি বললাম, হ্যাঁ তিনি নামায আদায় করেছেন। তিনি বললেন, হে টেকো! তুমি এ ধরনের কথা বলছ, তা কিসের ভিত্তিতে বলছ? আমি বললাম, কুরআনের ভিত্তিতে। কুরআন আমার ও আপনার মাঝে ফাঈসালা করবে। হুযাইফা (রাযিঃ) বললেন, কুরআন হতে যে ব্যক্তি দলীল গ্রহণ করল সে কৃতকার্য হল। সুফইয়ান (রাহঃ) বলেন, তিনি (মিসআর) কখনো “কাদ ইহতাজ্জা” আবার কখনো “কাদ ফালাজা” বলেছেন। তারপর তিনি (যির) এই আয়াত তিলাওয়াত করেনঃ “পবিত্র মহান সেই সত্তা, যিনি এক রাতে তার বান্দাকে মাসজিদুল হারাম হতে দূরবর্তী মসজিদে নিয়ে গেলেন"- (সূরা বনী ইসরাঈল ১)। হুযাইফাহ্ (রাযিঃ) বলেন, এ আয়াতের মাধ্যমে কি তুমি প্রমাণ করতে চাও, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে নামায আদায় করেছেন? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, সেখানে যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায আদায় করতেন, তাহলে তোমাদের উপরও সেখানে নামায আদায় করা বাধ্যতামূলক হত, যেমন মাসজিদুল হারামে নামায আদায় করা তোমাদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। হুযাইফাহ্ (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট একটি পশু আনা হল। এর পিঠ ছিল দীর্ঘ এবং (চলার সময়) এর পা দৃষ্টির সীমায় পতিত হয়। তারা দু'জন (মহানবী ও জিবরীল) জান্নাত, জাহান্নাম এবং আখিরাতের প্রতিশ্রুত বিষয়সমূহ দেখার পূর্ব পর্যন্ত বোরাকের পিঠ হতে নামেননি। তারপর তারা দু'জন প্রত্যাবর্তন করেন। তারা যেভাবে গিয়েছিলেন অনুরূপভাবেই ফিরে আসেন (অর্থাৎ সওয়ারী অবস্থায়ই ফিরে আসেন)। হুযাইফাহ (রাযিঃ) বলেন, লোকেরা বলাবলি করে, তিনি বোরাককে বেঁধেছিলেন। কেন এটি তার নিকট হতে পালিয়ে যাবে। অথচ গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছু জানার মালিক (আল্লাহ তা'আলা) বোরাককে তার নিয়ন্ত্রণাধীন করে দিয়েছিলেন। সনদ হাসান। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3148। আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি কিয়ামতের দিবসে সকল আদম সন্তানের নেতা হব। এতে গর্বের কিছু নেই। আমার হাতেই হামদের (প্রশংসার) পতাকা থাকবে। এতেও গর্বের কিছু নেই। সেদিন আমার পতাকার নিচেই আদম (আঃ) এবং অন্য সকল নবী একত্রিত হবেন। আমিই প্রথম ব্যক্তি যার জন্য যামীন বিদীর্ণ করা হবে (অর্থাৎ আমাকেই সর্বপ্রথম উত্থিত করা হবে)। এতেও গর্বের কিছু নেই। লোকেরা তিনবার ভীতসন্ত্রস্ত হবে। তারপর আদম (আঃ)-এর নিকট এসে তারা বলবে, আপনি আমাদের পিতা আদম। আমাদের জন্য আপনার প্রতিপালকের নিকট সুপারিশ করুন। তিনি বলবেন, আমি এমন এক অপরাধ করেছিলাম যার পরিণতিতে আমাকে পৃথিবীতে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। তোমরা বরং নূহ (আঃ)-এর নিকট যাও। তারা নূহ (আঃ)-এর নিকট এলে তিনি বলবেন, পৃথিবীর অধিবাসীদেরকে আমি এমন বদ দুআ করেছিলাম, যার কারণে তারা ধ্বংস হয়েছে (আমি এর কারণে লজ্জিত)। অতএব তোমরা ইবরাহীম (আঃ)-এর নিকট যাও। তারা ইবরাহীম (আঃ)-এর নিকট এলে তিনি বলবেন, আমি তিনটি মিথ্যা বলেছিলাম। (বর্ণনাকারী বলেন) তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তিনি প্রতিটি মিথ্যাকে কৌশল হিসেবে গ্রহণ করে আল্লাহ তা'আলার দীনকে হিফাজাত করেছেন। ইবরাহীম (আঃ) বলবেন তোমরা বরং মূসা (আঃ)-এর নিকট যাও। তারা মূসা (আঃ)-এর নিকট এলে তিনি বলবেন, আমি এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছি। অতএব তোমরা ঈসা (আঃ)-এর নিকট যাও। তারা ঈসা (আঃ)-এর নিকট এলে তিনি বলবেন, আল্লাহ তা'আলাকে বাদ দিয়ে আমার ইবাদাত করা হয়েছে। আমাকে মা’বুদ বানানো হয়েছে। তোমরা মুহাম্মাদ র-এর নিকট যাও। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তারা আমার নিকট আসবে এবং আমি তাদের সাথে যাব। ইবনু জুদ'আন বলেন, আনাস (রাযিঃ) বলেছেন, আমি যেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি তাকিয়ে আছি, আর তিনি বলছেনঃ আমি জান্নাতের দরজার শিকল ধরে তাতে খটখট আওয়াজ করব। ভেতর হতে বলা হবে, কে? বলা হবে, মুহাম্মাদ। ভেতরের অধিবাসীরা সাথে সাথে আমার সৌজন্যে দরজা খুলে দিবে এবং আমাকে মারহাবা মারহাবা বলে অভিনন্দন জানাবে। তখন আমি সিজদায় পতিত হব। এ অবস্থায় আল্লাহ তা'আলা আমার প্রতি বিশেষ হামদ ও সানা (প্রশংসা ও স্তুতিবাক্য) ইলহাম করবেন (গোপনে শিখিয়ে দিবেন এবং আমি তা পাঠ করতে থাকব)। আমাকে বলা হবে, মাথা তোল, প্রার্থনা কর দেয়া হবে, সুপারিশ কর কবুল করা হবে এবং বল, তোমার কথা শুনা হবে। (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন) এটাই হল সেই মাকামে মাহমূদ’ (উচ্চ প্রশংসিত মর্যাদা), যার কথা আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “আশা করা যায় তোমার প্রভু তোমাকে মাকামে মাহমুদে সুপ্রতিষ্ঠিত করবেন"- (সূরা বনী ইসরাঈল ৭৯)। সুফইয়ান (রাহঃ) বলেন, শুধু মাত্র এই কথাটুকুই আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণনা করা হয়েছেঃ “আমি জান্নাতের দরজার শিকল ধরে খটখট আওয়াজ করব"। সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (৪৩০৮)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান। এ হাদীসটি কয়েকজন বর্ণনাকারী আবূ নাযরাহ হতে, তিনি ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে এই সূত্রে দীর্ঘাকারে বর্ণনা করেছেন।
3149। সাঈদ ইবনু জুবাইর (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ইবনু আব্বাস (রাযিঃ)-কে বললাম, নাওফ আল-বিকালী মনে করেন যে, খাযিরের সাথে যে মূসার সাক্ষাৎ হয়েছিল, তিনি বনী ইসরাঈলের নবী মূসা (আঃ) নন (এরা দু’জন ভিন্ন ব্যক্তি)। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) বলেন, আল্লাহর দুশমন মিথ্যা বলছে। উবাই ইবনু কাব (রাযিঃ)-কে আমি বলতে শুনেছি, তিনি বললেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ বনী ইসরাঈলের জনগণের সামনে মূসা (আঃ) বক্তৃতা দিতে দাঁড়ান। তাকে প্রশ্ন করা হয় যে, কে সবচেয়ে বড় জ্ঞানী? তিনি বলেন, আমি সবচেয়ে বড় জ্ঞানী। এতে আল্লাহ তা'আলা তার উপর অসন্তুষ্ট হন। কেননা তিনি আল্লাহ তা'আলার সাথে জ্ঞানকে সম্পৃক্ত করেননি (অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা সবচাইতে বড় জ্ঞানী এ কথা বলেননি)। আল্লাহ তা'আলা তার নিকট ওয়াহী পাঠান, আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত এক বান্দা দুই সমুদ্রের সংগমস্থলে আছে। সে তোমার চাইতে বেশি জ্ঞানী। মূসা (আঃ) বললেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আমি কি উপায়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করব? আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তুমি থলেতে একটি মাছ লও। মাছটি যেখানে হারিয়ে ফেলবে, সেখানেই সে আছে। অতএব তিনি রওয়ানা হলেন এবং ইউশা ইবনু নুন নামক তার যুবক শাগরিদও তার সফরসঙ্গী হলেন। মূসা (আঃ) থলের মধ্যে একটি মাছ ভরে নিলেন। তারা দু’জনে পায়ে হেঁটে চলতে চলতে একটি প্রকাণ্ড পাথরের নিকট (সমুদ্রের তীরে) এসে পৌছেন। এখানে দু’জনই শুয়ে বিশ্রাম নিলেন। থলের মধ্যকার মাছটি নড়াচড়া করতে করতে তা হতে বের হয়ে সমুদ্রে পতিত হল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা মাছটি দিয়ে পানির স্রোতধারা বন্ধ করে দিলেন। ফলে তা প্রাচীরবৎ হয়ে গেল এবং মাছটির জন্য এভাবে একটি পথের ব্যবস্থা হল। মূসা (আঃ) ও তার যুবক সঙ্গীর নিকট এটা খুবই আশ্চর্যজনক মনে হচ্ছিল। তারা দিনের অবশিষ্ট সময় ও রাতে অগ্রসর হতে থাকলেন। তার সঙ্গী মাছের অবস্থা সম্পর্কে তাকে জানাতে ভুলে গেল। ভোর হলে মূসা (আঃ) তার সঙ্গীকে বললেন, “আমাদের সকালের নাশতা নাও। আজকের সফরে আমরা অত্যধিক ক্লান্ত হয়ে পড়েছি”— (সূরা কাহফ ৬২)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তাদেরকে যে স্থানে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, সেখান পর্যন্ত পৌছতে তারা ক্লান্ত হননি। কিন্তু নির্দেশিত স্থান পার হওয়ার পরই তাদেরকে ক্লান্তিতে পেয়ে বসে। “যুবক বলল, আমরা যখন সেই প্রস্তরময় প্রান্তরে আশ্রয় নিয়েছিলাম, তখন কি ঘটনা ঘটেছে তা কি আপনি লক্ষ্য করেননি? মাছের প্রতি আমার কোন লক্ষ্য ছিল না। আর শাইতান আমাকে এমনভাবে ভুলিয়ে দিয়েছে যে, আমি আপনার নিকট তা উল্লেখ করতেও ভুলে গেছি। মাছ তো আশ্চর্য রকমভাবে বের হয়ে সমুদ্রে চলে গেছে। মূসা বললেন, আমরা তো এটাই চেয়েছিলাম”— (সূরা কাহফ ৬৪)। তারা দু'জনেই তাদের পদচিহ্ন ধরে ফিরে এলেন। সুফইয়ান সাওরী (রহঃ) বলেন, কিছু লোকের ধারণা যে, এই প্রস্তরময় ময়দানে (বা সমুদ্র তীরেই) আবে হায়াতের ঝর্ণা রয়েছে। এই পানি মৃত ব্যাক্তির উপর ছিটিয়ে দিলে সে জীবিত হয়ে উঠে। এই মাছের কিছু অংশ খাওয়াও হয়েছিল। ঐ ঝর্ণার পানির ফোটা মাছের গায়ে পড়লে সাথে সাথে মাছটি জীবিত হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তারা উভয়ে তাদের পায়ের চিহ্ন ধরে অগ্রসর হতে হতে পূর্বের সেই প্রান্তরে এসে পৌছলেন। তারা দেখতে পেলেন, এক ব্যক্তি চাদর লম্বা করে গায়ে দিয়ে মুখ ঢেকে শুয়ে আছেন। মূসা (আঃ) তাকে সালাম দিলেন। তিনি সালামের জবাব দিয়ে বললেন, তোমাদের এ জায়গায় তো সালামের প্রচলন নেই (তুমি মনে হয় একজন আগন্তুক)? তিনি বললেন, আমি মূসা (আঃ)। তিনি প্রশ্ন করলেন, বনী ইসরাঈলের মূসা তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, আপনার নিকট আল্লাহ তা'আলার দানকৃত এক বিশেষ জ্ঞান আছে। আমি তা জানি না। আর আল্লাহ তা'আলা আমাকেও এক বিশেষ জ্ঞান দিয়েছেন যা আপনি জানেন না। মূসা (আঃ) বললেনঃ “আপনাকে যে জ্ঞান শিক্ষা দেয়া হয়েছে, তা শিখার উদ্দেশে কি আমি আপনার সঙ্গে থাকতে পারি? তিনি বললেনঃ আপনি আমার সাথে ধৈর্য ধরে থাকতে পারবেন না। আর যে বিষয়ে আপনার কিছুই জানা নেই, সে বিষয়ে আপনি কেমন করেই বা ধৈর্য ধারণ করতে পারেন? তিনি বললেন, ইনশা আল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলই পাবেন। কোন ব্যপারেই আমি আপনার নির্দেশের বিরোধিতা করব না”— (সূরা কাহফ ৬৬-৬৯)। খাযির (আঃ) তাকে বললেন, “ঠিক আছে, আপনি যদি আমার সাথে চলতে থাকেন, তাহলে আপনি আমার নিকট কোন বিষয়ে প্রশ্ন করতে পারবেন না, যতক্ষণ আমি আপনাকে তা না বলি"- (সূরা কাহফ ৭০)। তিনি (মূসা) বললেন, হ্যাঁ ঠিক আছে। খাযির ও মূসা (আঃ) সমুদ্রের তীর ধরে পায়ে হেঁটে চলতে থাকলেন। তাদের সামনে দিয়ে একটি নৌকা অতিক্রম করছিল। তারা উভয়ে তাদের সাথে কথা বললেন এবং তাদেরকে নৌকায় তুলে নেয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। তারা খাযিরকে চিনে ফেলল এবং কোন ভাড়া ছাড়াই তাদের দু’জনকে নৌকায় তুলে নিল। খাযির নৌকার একটি তক্তা খুলে নিলেন। মূসা (আঃ) তাকে বললেন, লোকেরা আমাদেরকে ভাড়া ছাড়াই নৌকায় তুলে নিল, আর আপনি নৌকাটির ক্ষতি সাধন করলেন। আপনি কি তাদের ডুবিয়ে দিতে চান? “আপনার এ কাজটি খুবই আপত্তিকর। খাযির বললেন, আমি কি তোমাকে বলিনি যে, তুমি আমার সাধে ধৈর্য ধরে থাকতে পারবে না? মূসা বললেন, আমার ভুলের জন্য আপনি আমাকে পাকড়াও করবেন না। আমার ব্যাপারে আপনি অতটা কড়াকড়ি করবেন না”— (সূরা কাহফ ৭১-৭৩)। তারা নৌকা হতে নেমে সমুদ্রের তীর ধরে এগিয়ে যেতে থাকেন। পথিমধ্যে দেখা গেল, একটি বালক অপর কয়েকটি বালকের সাথে খেলাধূলা করছে। খাযির (আঃ) নিজের হাতে ছেলেটির মাথা ধরে তা ঘাড় হতে বিচ্ছিন্ন করে দিলেন এবং এভাবে তাকে হত্যা করেন। মূসা (আঃ) তাকে বললেন, “একটা নিষ্পাপ বালককে আপনি মেরে ফেললেন? অথচ সে তো কাউকে হত্যা করেনি! আপনি তো একটা বড় অন্যায় করে ফেলেছেন। খাযির বললেন, আমি কি তোমাকে বলিনি, তুমি আমার সাথে ধৈর্য ধরে চলতে পারবে না"- (সূরা কাহফ ৭৪-৭৫)? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ পূর্বের কথার চেয়ে এ কথাটা বেশি শক্ত ছিল। মূসা (আঃ) বললেন, “অতঃপর আমি যদি আপনার নিকট কোন প্রশ্ন করি, তাহলে আপনি আমাকে আর সঙ্গে রাখবেন না। আমাকে প্রত্যাখ্যান করার মত ত্রুটি আপনি আমার মধ্যে পেয়েছেন। পুনরায় তারা দু'জনে সামনে এগিয়ে গেলেন এবং যেতে যেতে একটি জনপদে এসে পৌছলেন এবং সেখানকার মানুষদের নিকট খাবার চাইলেন। কিন্তু তারা মেহমান হিসেবে তাদেরকে মেনে নিতে রাজী হয়নি। তারা সেখানে একটি দেয়াল দেখতে পেলেন, যা পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল"- (সূরা কাহফ ৭৬-৭৭)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ দেয়ালটি ঝুঁকে পড়েছিল। খাযির তার হাত দিয়ে দেয়ালটি ঠিক করে দিলেন। মূসা (আঃ) তাকে বললেনঃ আমরা এমন এক সম্প্রদায়ের নিকট আসলাম, যারা আমাদেরকে মেহমান হিসেবেও গ্রহণ করেনি বা আহারও করায়নি। “আপনি ইচ্ছা করলে এই কাজের জন্য মুজরী নিতে পারতেন। খাযির বললেন, ব্যাস। এখানেই তোমার ও আমার একত্রে ভ্রমণ শেষ। তুমি যেসব বিষয়ে ধৈর্য ধারণ করতে পারনি, এখন আমি তোমাকে সেসব বিষয়ের তাৎপর্য বলে দিব”— (সূরা কাহফ ৭৭-৭৮)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা মূসা (আঃ)-এর উপর রহমত অবতীর্ণ করুন। আমাদের আশা ছিল যে, তিনি যদি ধৈর্য ধারণ করতেন তাহলে আমাদেরকে তাদের এসব বিষয়ের তথ্য জানানো হত! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মূসা (আঃ) শর্তের কথা ভুলে যাওয়ার কারণেই প্রথম প্রশ্নটি করেছেন। তিনি আরো বলেনঃ একটি চড়ুই পাখি এসে তাদের নৌকার কিনারে বসে, তারপর তা সমুদ্রে নিজের ঠোট ডুবিয়ে দেয়। খাযির তাকে বললেন, এই চড়ুই পাখি সমুদ্রের পানি যতটুকু কমিয়েছে, আমার ও আপনার জ্ঞান আল্লাহ তা'আলার জ্ঞানভাণ্ডার হতে ঠিক ততটুকুই কমিয়েছে। সাঈদ ইবনু জুবাইর (রাহঃ) বলেন, ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) পাঠ করলেনঃ “তাদের সামনে ছিল এক বাদশাহ যে প্রতিটি নিখুঁত নৌকা জোরপূর্বক কেড়ে নিত।” তিনি আরো পাঠ করলেনঃ “আর বালকটি ছিল কাফির”। সহীহঃ বুখারী, মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। যুহরী (রাহঃ) এ হাদীস উবাইদুল্লাহ ইবনু আবদিল্লাহ ইবনু উতবাহ ইবনু আব্বাস হতে, তিনি উবাই ইবনু কা'ব হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সূত্রে বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটি আবূ ইসহাক আল-হামদানী (রাহঃ) সাঈদ ইবনু জুবাইর হতে, তিনি ইবনু আব্বাস হতে, তিনি উবাই ইবনু কাব (রাযিঃ) হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সূত্রে বর্ণনা করেছেন। আবূ মুযাহিম আস-সামারকান্দী বলেন, ‘আলী ইবনুল মাদীনী বলেছেন, আমি হাজ্জে গিয়েছিলাম। আমার হাজ্জের সফরের উদ্দেশ্যই ছিল সুফইয়ান সাওরীকে এ হাদীস বর্ণনা করতে শুনব। তিনি এ হাদীসে একটি বিষয় বর্ণনা করতেন। সুতরাং আমি তাকে বলতে শুনেছি, এ হাদীস আমর ইবনু দীনার আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন। ইতোপূর্বে আমি এ হাদীস সুফইয়ানকে বর্ণনা করতে শুনেছি, কিন্তু তিনি উক্ত বিষয় এতে বর্ণনা করেননি।
3150। উবাই ইবনু কাব (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ছেলেটিকে খাযির (আঃ) হত্যা করেন, সে আল্লাহ তা'আলার নির্ধারিত তাকদীর মতো (সৃষ্টির সূচনাতেই) কাফির ছিল। সহীহঃ যিলা-লুল জান্নাত (১৯৪, ১৯৫), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ গারীব।
3151। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ খাযিরের নাম এজন্যই খাযির (সবুজ) রাখা হয়েছে যে একদা তিনি শুকনা সাদা মাটির উপর বসলে তার নীচের মাটিতে সবুজ, শ্যামলিমার উদগম হয়। সহীহঃ বুখারী, মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3152। আবূদ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আল্লাহ্ তা'আলার বাণী, “এই প্রাচীরের নীচে এই ছেলে দু'টির জন্য একটি সম্পদ রক্ষিত আছে" (সূরাঃ আল-কাহফ- ৮২)। এই আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এখানে 'কান্য’ অর্থ সোনা-রূপা। অত্যন্ত দুর্বল, আর-রাওযুন নায়ীর (৯৪০) হাসান ইবনু আলী আল-খাল্লাল-সাফওয়ান ইবনু সালিহ-ওয়ালীদ ইবনু মুসলিম-ইয়াযীদ ইবনু ইউসুফ আস-সানআনী-ইয়াযীদ ইবনু জাবির-মাকহুল (রাহঃ) হতে এই সনদে উপরের হাদীসের মতই বর্ণিত হয়েছে। আবূ ঈসা বলেনঃ এই হাদীসটি গারীব।
3153। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (ইয়াজুয-মাজুযের) প্রাচীর প্রসঙ্গে বলেনঃ এরা প্রত্যেকদিন বাধার প্রাচীর খনন করতে থাকে। যখন তারা এটাকে চৌচির করে ভেদ করার কাছাকাছি এসে যায়, তখন তাদের সরদার বলে, ফিরে চলো, কাল সকালে এটাকে সম্পূর্ণরূপে ভেঙ্গে ফেলব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা প্রাচীরটিকে পূর্বের ন্যায় পূর্ণাঙ্গ করে দেন। তারা প্রতিদিন এভাবে এই প্রাচীর খুঁড়তে থাকে। অবশেষে যখন তাদের বন্দীত্বের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে এবং আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে জনবসতিতে পাঠানোর ইচ্ছা করবেন তখন ইয়াজুয-মাজু্যদের সরদার বলবে, আজ চলো। আল্লাহ তা'আলা চাইলে আগামী কাল সকালে আমরা এই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলব। সে তার কথার সাথে ইনশাআল্লাহ বলবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তারা ফিরে যাবে। গতকাল দেয়ালটিকে তারা যে অবস্থায় ছেড়ে গিয়েছিল, এবার ফিরে এসে ঠিক সেই অবস্থায়ই পাবে। এরা দেয়াল ভেদ করে জনপদে ছড়িয়ে পড়বে এবং সমস্ত পানি পান করে শেষ করে ফেলবে। মানুষজন এদের ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পালিয়ে যাবে। এরা আকাশের দিকে নিজেদের তীর ছুড়বে। তাদের তীরগুলোকে রক্ত-রঞ্জিত করে ফিরিয়ে দেয়া হবে। এরা বলবে, পৃথিবীর বাসিন্দাদের উপর আমরা প্রতিশোধ নিয়েছি এবং আকাশবাসীদের উপরও আধিপত্য বিস্তার করে তাদেরকে অধীনস্ত করে নিয়েছি। আল্লাহ তা'আলা এদের গলদেশে কীট সৃষ্টি করবেন। ফলে এরা ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ সেই সত্তার শপথ, যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! যমীনের কীট-পতঙ্গ ও জীব-জন্তু এদের গোশত খেয়ে খুব মোটাতাজা হবে, খুব পরিতৃপ্ত হবে এবং এগুলোর দেহে বেশ চর্বি জমবে। সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (৪০৮০) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। আমরা এ হাদীসটি শুধু উপর্যুক্ত সনদেই অনুরূপভাবে জেনেছি।
3154। আবূ সাঈদ ইবনু আবী ফাযালাহ্ আল-আনসারী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি সাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ আল্লাহ তা'আলা যখন কিয়ামত দিবসে, যে দিনের আগমন প্রসঙ্গে কোন সন্দেহ নেই, মানুষদেরকে একত্র করবেন, তখন একজন ঘোষক ঘোষণা করবেঃ আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির উদ্দেশে যে ব্যক্তি কাজ করতে গিয়ে এর মধ্যে কাউকে শরীক করেছে, সে যেন গাইরুল্লাহর নিকট নিজের সাওয়াব চেয়ে নেয়। কেননা আল্লাহ তা'আলা শরীকদের শিরক হতে সম্পূর্ণ মুক্ত। হাসানঃ ইবনু মা-জাহ (৪২০৩) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। আমরা এ হাদীস শুধু মুহাম্মাদ ইবনু বাকর-এর সূত্রে জেনেছি।
3155। মুগীরাহ ইবনু শুবাহ (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে নাজরান নামক জায়গায় পাঠালেন। সে অঞ্চলের (খৃষ্টান) অধিবাসীরা আমাকে বললো, তোমরা কি পাঠ কর নাঃ "হে হারূনের বোন"- (সূরা মারইয়াম ২৮)? অথচ মূসা ও ঈসা (আঃ)-এর মাঝখানে সময়ের যে ব্যবধান ছিল তাতো জানা কথা। তাদের এ প্রশ্নের কি জবাব যে আমি দিতে পারি তা আমি বুঝতে পারিনি। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ফিরে এসে তাকে এ বিষয়ে জানালাম। তিনি বললেনঃ তুমি তাদেরকে এতটুকুও কি জানাতে পারলে না যে, তারা (বনী ইসরাঈল) নিজেদের নাম রাখতো তাদের পূর্ববর্তী নবী-রাসূল ও মহান ব্যক্তিদের নামানুসারে। হাসানঃ মুখতাসার তুহফাতুল ওয়াদুদ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ গারীব। আমরা এ হাদীস শুধু ইবনু ইদরীসের সূত্রেই জেনেছি।
3156। আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঠ করলেনঃ “তাদেরকে সেদিনের ভয় দেখাও, যেদিন চূড়ান্ত ফায়সালা করা হবে এবং পরিতাপ করা ব্যতীত আর কোন বিকল্প থাকবে না”— (সূরা মারইয়াম ৩৯)। তিনি বললেনঃ (কিয়ামতের দিন লোকদের সামনে) মৃত্যুকে হাযির করা হবে, যেন তা সাদা ও কালো মিশ্রিত বর্ণের একটি মেষ। এটাকে জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝের প্রাচীরের সাথে দাড় করিয়ে বলা হবে, হে জান্নাতের অধিবাসীগণ, শোন। তারা মাথা তুলবে। তারপর বলা হবে, হে জাহান্নামের বাসিন্দারা, শোন। তারাও মাথা তুলবে। তারপর বলা হবে, তোমরা কি এটাকে চিনতে পেরেছ? তারা বলবে, হ্যাঁ, এটা মৃত্যু। তারপর এটাকে শুইয়ে যবেহ করা হবে। আল্লাহ তা'আলা যদি জান্নাতবাসীদের সেখানে চিরস্থায়ী জীবনের মীমাংসা না করতেন, তাহলে তারা (এ দৃশ্য দেখে) আনন্দের আতিশয্যে মারা যেত। আল্লাহ তা'আলা যদি জাহান্নামীদের সেখানে চিরস্থায়ী জীবনের মীমাংসা না করতেন, তাহলে তারাও (এ দৃশ্য দেখে) অনুশোচনা ও অনুতাপ করতে করতে মারা যেত। “আল্লাহ তা’আলা যদি জান্নাতীদের সেখানে চিরস্থায়ী জীবনের ফায়সালা না করতেন..." অংশ ব্যতীত হাদীসটি সহীহ। বুখারী, মুসলিম, দেখুন ২৫৫৮ নং হাদীস। আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3157। কাতাদাহ্ (রহঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ “আর আমরা তাকে উচ্চতর স্থানে উন্নীত করেছি"- (সূরা মারইয়াম ৫৭) প্রসঙ্গে তিনি (কাতাদাহ) বলেন, আমাদের নিকট আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) বর্ণনা করেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমাকে যখন মি'রাজে নিয়ে যাওয়া হয় আমি তখন ইদরীস (আঃ)-কে চতুর্থ আসমানে দেখেছি। সহীহঃ মুসলিম (১/১০০), দীর্ঘ বর্ণনা। আবূ সাঈদ (রাযিঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। সাঈদ ইবনু আবী আরূবা-হাম্মাম প্রমুখ-কাতাদাহ হতে, তিনি আনাস হতে, তিনি মালিক ইবনু সাসা'আহ (রাযিঃ)-এর সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে মিরাজের হাদীসটি দীর্ঘ আকারে বর্ণনা করেছেন। আমার মতে এটি তারই সংক্ষিপ্তরূপ।
3158। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, জিবরীল (আঃ)-কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আপনি যে কতবার আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন তার চেয়ে বেশি সাক্ষাৎ করতে কিসে আপনাকে বাধা দেয়? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ) “আপনার রবের নির্দেশ ব্যতীত আমরা অবতীর্ণ হই না। আমাদের যা কিছু সম্মুখে আছে, আমাদের পিছনে যা কিছু আছে এবং এ দুয়ের মাঝখানে যা কিছু আছে, সে সবের প্রভু তিনিই। আপনার প্রতিপালক কখনো ভুলে যান না”— (সূরা মারইয়াম ৬৪)। সহীহঃ বুখারী (৪৭৩১) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। হুসাইন ইবনু হুরাইস ওয়াকী হতে তিনি আমর ইবনু যার হতে এই সনদে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।
3159। সুদ্দী (রহঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, মুররা আল-হামদানীকে আমি প্রশ্ন করলাম, আল্লাহ তা'আলার এ বাণী প্রসঙ্গেঃ “তোমাদের মাঝে এমন কোন ব্যক্তি নেই যে জাহান্নামের উপর দিয়ে অতিক্রম করবে না”— (সূরা মারইয়াম ৭১)। তিনি আমাকে হাদীস বর্ণনা করে শুনান যে, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) তাদেরকে হাদীস বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আগুনের উপর দিয়ে লোকজন অতিক্রম করবে এবং যার যার কৃতকর্ম মোতাবেক তা অতিক্রম করতে থাকবে। বিজলি চমকানোর মতো তাদের প্রথম দল দ্রুত অতিক্রম করে যাবে। পরবর্তী দলটি বাতাসের বেগে, তারপর দ্রুতগামী ঘোড়ার বেগে, তারপর উস্ট্রারোহীর বেগে, তারপর মানুষের দৌড়ের গতিতে, তারপর হেটে চলার গতিতে অতিক্রম করবে। সহীহঃ সহীহাহ (৩১১) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান। এ হাদীস সুদ্দীর সূত্রে শুবাহ (রহঃ) বর্ণনা করেছেন, কিন্তু এটাকে তিনি মারফুরূপে বর্ণনা করেননি।
3160। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ “তোমাদের সকলকেই তার উপর দিয়ে পার হতে হবে”— (সূরা মারইয়াম ৭১) প্রসঙ্গে তিনি বলেন, লোকেরা কিয়ামত দিবসে তার (পুলসিরাত) উপর দিয়ে পার হবে। তারা এটা পার হবে নিজ নিজ কৃতকর্ম মোতাবেক (বিভিন্ন গতিবেগে)। সহীহঃ মাওকুফ তবে মারফু এর মতই তার হুকুম। মুহাম্মাদ ইবনু বাশশার-আবদুর রহমান ইবনু মাহদী হতে, তিনি শুবাহ হতে, তিনি সুদ্দী (রহঃ) হতে উপরের হাদীসের মতো বর্ণনা করেছেন। 'আবদুর রহমান বলেন, আমি শুবাহকে বললাম, উল্লিখিত হাদীসটি ইসরাঈল আমাকে সুদ্দীর সুত্রে, তিনি মুররার সুত্রে, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ)-এর সূত্রে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেছেন। শু'বাহ (রহঃ) বলেন, আমি এ হাদীস সুদ্দীর নিকট মারফুভাবেই শুনেছি। কিন্তু আমি ইচ্ছাকৃতভাবেই (মারফু হিসেবে বর্ণনা করা) ত্যাগ করেছি।
3161। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন বান্দাকে যখন আল্লাহ তা'আলা ভালবাসেন তখন জিবরীলকে ডেকে বলেনঃ আমি অমুক ব্যক্তিকে ভালবাসি। অতএব তুমিও তাকে ভালবাস। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আসমানবাসীদের মধ্যে জিবরীল তখন (এ কথা) ঘোষণা করেন। তারপর যমীনবাসীদের অন্তরে তার জন্য ভালবাসা অবতীর্ণ হয়। এটাই আল্লাহ তা'আলার বাণীর মধ্যে ফুটে উঠেছেঃ “যারা ঈমান আনয়ন করেছে এবং উত্তম কার্য সম্পাদন করেছে খুব শীঘ্রই দয়াময় রহমান (লোকদের অন্তরে তাদের প্রতি) ভালবাসার উদ্রেক করবেন"- (সূরা মারইয়াম ৯৬)। অপর দিকে যখন আল্লাহ তা'আলা কাউকে ঘৃণা করেন তখন জিবরীলকে ডেকে বলেনঃ আমি অমুককে ঘৃণা করি। জিবরীল তখন আসমানবাসীদের মধ্যে এটা ঘোষণা করেন। তারপর যমীনের অধিবাসীদের মনে তার জন্য ঘৃণা অবতীর্ণ হতে থাকে। সহীহঃ যঈফাহ (২২০৭) নং হাদীসের অধীনে। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। এ হাদীসটি আবদুর রহমান ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু দীনার (রাহঃ) তার বাবা হতে, তিনি আবূ সালিহ হতে, তিনি আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সূত্রে একই রকম বর্ণনা করেছেন।
3162। মাসরুক (রহঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, খাব্বাব ইবনুল আরাত্তি (রাযিঃ)-কে আমি বলতে শুনেছিঃ আমার একটি স্বত্ব আস ইবনু ওয়ায়িল আস-সাহমীর যিম্মায় ছিল। এ ব্যাপারে তাগাদা দেয়ার উদ্দেশে আমি তার নিকট আসলাম। সে বলল, যে পর্যন্ত তুমি মুহাম্মাদের নবুওয়াত অস্বীকার না করবে, সে পর্যন্ত আমি তোমার স্বত্ব ফিরিয়ে দিব না। আমি বললাম, তুমি মৃত্যুর পর কিয়ামত দিবসে আবার জীবিত হয়ে না উঠা পর্যন্ত তা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। সে বলল, আমি মৃত্যুবরণ করব এবং আবার জীবিত হব? আমি বললাম, হ্যাঁ। সে বলল, তাহলে আমার ধন-সম্পদ ও, সন্তান-সন্ততিও সেখানে থাকবে আর সেখানে তোমার পাওনাটা ফিরিয়ে দিব। এই কথার পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়ঃ “তুমি কি সেই লোককে দেখেছ, যে আমার আয়াতসমূহ অস্বীকার করেছে এবং সে বলেছে, আমাকে তো ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে ধন্য করা হবে”— (সূরা মারইয়াম ৭৭)। সহীহঃ বুখারী (৪৭৩২), মুসলিম। হান্নাদ-আবূ মু'আবিয়াহ হতে, তিনি আ'মাশ (রহঃ) হতে উপরের হাদীসের মতই বর্ণনা করেছেন। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3163। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, যখন খাইবার যুদ্ধ হতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিরে আসছিলেন এবং রাতে চলতে চলতে তার খুব ঘুম পেল, তখন তিনি তার উট বসিয়ে তা হতে নেমে পড়লেন, তারপর বললেনঃ হে বিলাল! আজ রাতে তুমি আমাদের পাহারা দাও। বর্ণনাকারী বলেন, বিলাল (রাযিঃ) নামায আদায় করলেন, তারপর সূর্যোদয়ের দিকে মুখ ফিরিয়ে হাওদার সাথে হেলান দিয়ে বসে রইলেন। তার চোখ ঘুমের তীব্রতায় বন্ধ হয়ে গেল। কেউই সকাল বেলা ঘুম হতে উঠতে পারলেন না। সর্বপ্রথম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাগ্রত হলেন। তিনি ডাকলেনঃ হে বিলাল! বিলাল (রাযিঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার বাবা আপনার জন্য কুরবান হোক। আপনার জীবন যিনি নিয়েছিলেন, আমার জীবনও তিনিই নিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ উটের পিঠে হাওদা বাধো এবং দ্রুত সফর কর। তারপর তিনি আরেক স্থানে পৌছে উট বসালেন এবং উযূ করলেন। নামাযের উদ্দেশে ইকামাত বলা হল। তিনি যেভাবে ওয়াক্তিয়া নামাযগুলো পড়েন, ঠিক সেভাবে ধীরে সুস্থে এই (কাযা) নামায পড়লেন। তারপর তিনি আয়াত পাঠ করলেনঃ “আমার স্মরণে নামায কায়িম কর” (সূরা ত্ব-হা- ১৪)। সহীহঃ সহীহ আবূ দাউদ (৪৬১, ৪৬৩), ইরওয়া (২৬৩), মুসলিম অনুরূপ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসের সনদ সুরক্ষিত নয়। একাধিক হাফিয যুহরীর সূত্রে এবং তিনি সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাবের সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাম উল্লেখ করে এ হাদীস বর্ণনা করেছেন। তারা নিজ নিজ সনদে আবূ হুরাইরাহর উল্লেখ করেননি। তাছাড়া হাদীস শাস্ত্রে সালিহ ইবনু আবী আখযার দুর্বল। ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ আল-কাত্তান প্রমুখ তাকে স্মরণ শক্তির দিক হতে দুর্বল বলেছেন।
3164। আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ওয়াইল হচ্ছে জাহান্নামের একটি ময়দানের নাম। এটা এতই গভীর যে, এর তলদেশে পৌছা পর্যন্ত কাফির ব্যক্তি চল্লিশ বছর ধরে নীচের দিকে পড়তে থাকবে। যঈফ, তা’লীকুর রাগীব (৪/২২৯) আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি গারীব। আমরা শুধু ইবনু লাহীআর সূত্রেই এটি মারফু হিসেবে জেনেছি।
3165। আয়িশাহ (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মুখে বসে এক লোক বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার কয়েকটি গোলাম আছে। আমার নিকট এরা মিথ্যা কথা বলে, আমার সম্পদে ক্ষতিসাধন (খিয়ানাত) করে এবং আমার অবাধ্যতা করে। এ কারণে তাদেরকে আমি বকাবকি ও মারধর করি। তাদের সাথে এমন ব্যবহারে আমার অবস্থা কি হবে? তিনি বললেনঃ তারা যে তোমার সাথে খিয়ানাত করে, তোমার অবাধ্যতা করে এবং তোমার নিকট মিথ্যা বলে, আর এ কারণে তাদের সাথে তুমি যেমন আচরণ কর- এ সবেরই হিসাব-নিকাশ হবে। যদি তোমার দেয়া শাস্তি তাদের অপরাধের সমান হয় তবে ঠিক আছে। তোমারও কোন অসুবিধা হবে না তাদেরও কোন অসুবিধা হবে না। যদি তোমার দেয়া শাস্তি তাদের অপরাধের তুলনায় কম হয় তাহলে তোমার জন্য অতিরিক্ত (সাওয়াব) রয়ে গেল। তোমার প্রদত্ত শাস্তি যদি তাদের অপরাধের তুলনায় বেশি হয়, তাহলে অতিরিক্ত অংশের জন্য তোমাকে শাস্তি পেতে হবে। বর্ণনাকারী বলেন, এ কথা শুনে লোকটি চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে আলাদা হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল্লাহ তা'আলার কিতাবে তুমি কি এ কথা পড় না (অনুবাদ) “আমরা কিয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের দাড়িপাল্লা স্থাপন করব। সুতরাং কোন লোকের উপর কোন যুলম করা হবে না। কারো বিন্দু পরিমাণও কিছু কৃতকর্ম থাকলে আমরা তাও হাযির করব। আর হিসাব সম্পন্ন করার জন্য আমরাই যথেষ্ট”— (সূরা আম্বিয়া ৪৭)। লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর কসম! তাদের মাঝে এবং আমার মাঝে বিচ্ছিন্নতা ছাড়া আমার ও তাদের কল্যাণের আর কোন পথ দেখছি না। আপনাকে আমি সাক্ষী রেখে বলছি, তাদের সবাই এখন হতে মুক্ত। সনদ সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি গারীব। আবদুর রহমান ইবনু গাযওয়ানের সূত্রেই শুধুমাত্র আমরা এ হাদীস জেনেছি। ইমাম আহমাদও এ হাদীস আবদুর রহমান ইবনু গাযওয়ানের সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
3166। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহঃ বলেছেনঃ ইবরাহীম (আঃ) তিনটি ক্ষেত্র ছাড়া কোন ব্যাপারে কখনো মিথ্যা বলেননি। যেমন তার কথা “আমি অসুস্থ”- (সূরাঃ আস-সাফফাত ৮৯), অথচ তিনি অসুস্থ ছিলেন না, নিজের বিবি সারা'-কে তার বোন বলা এবং তার কথা “বরং এগুলোর ভিতর সর্বাধিক বড়টি এ কাজ করেছে"- (সূরা আম্বিয়া ৬৩)। সহীহঃ সহীহ আবূ দাউদ (১৯১৬), বুখারী, মুসলিম। হাদীসটি একাধিক সূত্রে আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ)-এর বরাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত হয়েছে। ইবনু ইসহাক হতে আবূয যান্নাদ সূত্রে বর্ণিত হাদীসটি গারীব। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ।
3167। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়াজ-নাসীহাত করতে দাড়িয়ে বললেনঃ হে লোকেরা! কিয়ামতের দিন তোমরা নগ্ন ও খাতনাহীন অবস্থায় আল্লাহ তা'আলার নিকট সমবেত হবে। (বর্ণনাকারী বলেন,) তারপর তিনি পড়লেনঃ "যেভাবে প্রথম আমরা সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম, সেভাবেই তার পুনরাবৃত্তি করব। এটা একটা ওয়াদাহ্, যা পূরণ করার দায়িত্ব আমার। আর এ কাজ আমি অবশ্যই করবো”— (সূরা আম্বিয়া ১০৪)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যাকে কাপড় পরানো হবে, তিনি হচ্ছেন ইবরাহীম (আঃ)। আমার উম্মাতের কিছু সংখ্যক ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হবে এবং তাদেরকে ধরে বাঁ দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। আমি তখন বলবঃ হে আমার সৃষ্টিকর্তা! এরা আমার অনুসারী। তখন বলা হবে, আপনি জানেন না, এরা আপনার বিদায়ের পর কি ধরনের বিদ'আতের উদ্ভব ঘটিয়েছিল। আমি সে সময় একজন সৎকর্মশীল বান্দার ঈসা (আঃ)] মত বলবঃ (কুরআনের ভাষায়) “আমি যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের মধ্যে ছিলাম ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের পরিচালক ছিলাম। কিন্তু আপনি যখন আমাকে তুলে নিলেন, তখন আপনিই ছিলেন তাদের তত্ত্বাবধায়ক। আর আপনি তো সকল বিষয়ের সাক্ষী। আপনি যদি তাদেরকে আযাব দেন তবে তারা তো আপনারই বান্দা, আর যদি ক্ষমা করে দেন তাহলে আপনি তো পরাক্রান্তশালী ও প্রজ্ঞাময়"- (সূরা আল-মায়িদাহ ১১৭-১১৮)। তখন বলা হবে, আপনি যখন তাদেরকে রেখে এসেছেন তখন হতে এরা অনবরত মন্দ পথেই চলেছে। সহীহঃ বুখারী, মুসলিম। এটি (২৪২৩) নং হাদীসের পুনরুক্তি। মুহাম্মাদ ইবনু বাশশার-মুহাম্মাদ ইবনু জাফার হতে, তিনি শুবাহ হতে, তিনি মুগীরাহ ইবনু নু'মান হতে এই সনদে উপরের হাদীসের অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটি হাসান সহীহ। সুফইয়ান সাওরীও এ হাদীসটি মুগীরাহ ইবনু নু'মানের সূত্রে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। আবূ ঈসা বলেনঃ সুফইয়ান সাওরী এই হাদীসের মর্মার্থ দ্বারা মুরতাদদেরকে বুঝিয়েছেন যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইন্তিকালের পর মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল।
3168। ইমরান ইবনু হুসাইন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, “হে লোকেরা! তোমাদের প্রভুর গযব হতে নিজকে রক্ষা কর। কিয়ামতের কম্পন বড়ই ভয়াবহ ব্যপার। যেদিন তোমরা তা দেখতে পাবে সেদিনের অবস্থা এমন হবে যে, প্রত্যেক স্তন্যদাত্রী নিজের দুধের শিশুকে দুধ পান করাতে ভুলে যাবে। প্রত্যেক গর্ভবতী গর্ভপাত করবে এবং লোকদেরকে তোমরা মাতালের মতো দেখতে পাবে, অথচ তারা নেশাগ্রস্ত নয়। বরং আল্লাহ্ তা'আলার শাস্তিই এতদূর কঠোর হবে" (সূরাঃ আল-হাজ্জ১-২)। রাবী বলেন, এ আয়াত যখন অবতীর্ণ হয়, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে ছিলেন। তিনি বললেনঃ তোমরা কি জান এটা কোন দিন? সাহাবীগণ বললেনঃ আল্লাহ তা'আলা ও তার রাসূলই সবচাইতে ভাল জানেন। তিনি বললেনঃ এটা সেই দিন, যখন আল্লাহ তা'আলা আদম (আঃ)-কে বলবেনঃ জাহান্নামের বাহিনী প্রস্তুত কর। আদম (আঃ) বলবেনঃ হে প্ৰভু! জাহান্নামের বাহিনীর সংখ্যা কত? তিনি বলবেনঃ (হাজারকে) নয় শত নিরানব্বই জন জাহান্নামের এবং একজন জান্নাতের বাহিনী। একথা শুনে মুসলিমরা কান্নায় ভেংগে পড়েন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সমতল পথে চলো, আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য খোজ কর, সোজা পথ ধর। প্রত্যেক নাবূয়াতের পূর্বেই রয়েছে জাহিলিয়াত। তিনি আরো বললেনঃ জাহিলিয়াত হতেই বেশি সংখ্যক নেয়া হবে। যদি এতে সংখ্যা পূর্ণ হয় তো ভালো, অন্যথায় মুনাফিকদের দিয়ে সংখ্যা পূর্ণ করা হবে। অপরাপর উম্মাতের ও তোমাদের উদাহরণ হচ্ছে, যেমন পশুর বাহুর দাগ অথবা উটের পার্শ্বদেশের তিলক (অর্থাৎ তোমাদের সংখ্যা বেশি হবে)। তিনি আবার বললেনঃ আমি আশা করি তোমরাই হবে জান্নাতের এক-চতুর্থাংশ অধিবাসী। একথা শুনে তারা তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করেন। তারপর তিনি বললেনঃ আমি আশা করি তোমরাই হবে জান্নাতের এক-তৃতীয়াংশ অধিবাসী। একথা শুনে তারা তাকবীর ধ্বনি দেন। তিনি আবার বললেনঃ আমি আশা করি তোমরাই হবে জান্নাতের অর্ধেক অধিবাসী। তারা এবারও তাকবীর ধ্বনি দেন। রাবী বলেন, তিনি দুই-তৃতীয়াংশের কথা বলেছেন কি-না তা আমার মনে নেই সনদ দুর্বল, তা’লীকুর রাগীব
3169। ইমরান ইবনু হুসাইন (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমরা এক সফরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলাম। চলার পথে তিনি ও তার সাহাবীগণ আগে-পিছে হয়ে গেলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সূরা হজ্জের প্রথম) এ দু'টি আয়াতের মাধ্যমে নিজের আওয়াজ বড় করলেনঃ “হে মানুষ! তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর। কিয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়াবহ ব্যাপার... বস্তুত আল্লাহ তা'আলার শাস্তি বড় কঠিন"- (সূরা হাজ্জ ১-২)। তার সাহাবীগণ এই ডাক শুনতে পেয়ে নিজেদের জন্তুযানের গতি দ্রুত করলেন এবং জেনে নিলেন যে, তিনি কিছু বলবেন। (সাহাবীগণ তার নিকট পৌছলে) তিনি বললেনঃ তোমরা কি জান সেই দিন কোনটি? তারা বললেন, আল্লাহ ও তার রাসূলই বেশী ভাল জানেন। তিনি বললেনঃ এটা সেই দিন, যেদিন আল্লাহ তা'আলা আদম (আঃ)-কে ডেকে বলবেনঃ হে আদম! দোযখের ফৌজ তৈরি কর। তিনি বলবেন, হে আমার প্রতিপালক! দোযখের ফৌজ কারা এবং তাদের সংখ্যা কত? তিনি বলবেনঃ প্রতি হাজারে নয় শত নিরানব্বই জন দোযখে যাবে এবং একজন জান্নাতে যাবে। সাহাবীগণ একথা শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। তখন কারো মুখে হাসি ছিল না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের এই অবস্থা দেখে বললেনঃ কাজ করতে থাক এবং সুসংবাদ গ্রহণ কর। সেই সত্তার শপথ, যার হাতে মুহাম্মাদের জীবন! তোমরা দুটি জীবের সাক্ষাৎ পাবে। তাদের সাথে যাদের সাক্ষাৎ হবে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি হবে। এ দুটি জীব হল ইয়া'যুজ ও মাযুজ এবং আদম সন্তান ও ইবলীসের সন্তানদের মধ্যে যারা মরে গেছে তারা। বর্ণনাকারী বলেন, এতে লোকদের চিন্তা ও বিষন্নতা কিছুটা দূর হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা কাজ কর এবং সুসংবাদ গ্রহণ কর। সেই সত্তার শপথ, যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! (অন্যান্য জাতির তুলনায়) তোমাদের দৃষ্টান্ত হল, উটের পার্শ্বদেশের তিলক অথবা চতুষ্পদ জন্তুর বাহুর দাগের মত। সহীহঃ বুখারী (৪৭৪১), মুসলিম (১/১৩৯)। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ।
3170। আবদুল্লাহ ইবনুয যুবাইর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (বাইতুল্লাহর) বাইতুল আতীক নাম এজন্য হয়েছে যে, কোন স্বেচ্ছাচারীই এর উপর কর্তৃত্ব প্রসার করতে সমর্থ হয়নি। যঈফ, যঈফা (৩২২২) আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান গারীব। অন্য এক সূত্রে যুহরী হতে এ হাদীস মুরসাল হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। কুতাইবা হতে তিনি লাইস হতে তিনি আকীল হতে তিনি যুহরী (রাহঃ) হতে এই সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে উপরের হাদীসের মতই বর্ণিত হয়েছে।
3171ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন মক্কাবাসীরা মক্কা হতে নির্বাসিত করে, তখন আবূ বাকর (রাঃ) বললেন, এই লোকেরা তাদের নবীকে বের করে দিয়েছে। এদের নিঃসন্দেহে অনিষ্ট হবে। এ কথার পটভূমিকায় আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ “যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হচ্ছে তাদেরকে অনুমতি দেয়া হল। কেননা তাদের প্রতি যুলুম করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই তাদের সাহায্য করতে সক্ষম। এরা সেই লোক, যাদেরকে অন্যায়ভাবে নিজেদের ঘর-বাড়ী হতে বহিষ্কৃত করা হয়েছে। তাদের দোষ ছিল এই যে, তারা বলতঃ আল্লাহ তা'আলা আমাদের রব" (সূরাঃ আল-হাজ্জ- ৩৯-৪০)। আবূ বাকর (রাঃ) বললেনঃ আমি বুঝে গেলাম, শীঘ্রই লড়াই বেধে যাবে। সনদ দুর্বল আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান। আবদুর রহমান ইবনু মাহদী প্রমুখ-সুফিয়ান হতে তিনি আমাশ হতে তিনি মুসলিম আল-বাতীন হতে তিনি সাঈদ ইবনু যুবাইর-এর সূত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এ হাদীসটি মুরসালরূপে বর্ণনা করেছেন। তাতে ইবনু আব্বাস (রাঃ)-এর উল্লেখ নেই। মুহাম্মাদ ইবনু বাশশার, আবূ আহমাদ আয-যুবাইর সুফইয়ানের সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেছেন, তাতে ইবনু আব্বাসের উল্লেখ আছে। একাধিক রাবী-সুফিয়ান হতে তিনি আমাশ হতে তিনি মুসলিম আল-বাতীন হতে তিনি সাঈদ ইবনু যুবাইর (রাহঃ) সূত্রে উক্ত হাদীস মুরসালরূপে বর্ণনা করেছেন এবং তাতে ইবনু আব্বাস (রাঃ)-এর উল্লেখ নেই।
3172। সাঈদ ইবনু জুবাইর (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মক্কা হতে বের করা হলে এক ব্যক্তি বলেন, তারা তাদের নবীকে বের করে দিয়েছে। তখন অবতীর্ণ হয়ঃ “যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হল তাদেরকে যাদের সাথে যুদ্ধ করা হয়, কেননা তাদের প্রতি যুলুম করা হয়েছে; আর আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করতে অবশ্যই সক্ষম; যারা বহিষ্কৃত হয়েছে অন্যায়ভাবে তাদের ঘর-বাড়ি থেকে" (সূরা আল-হাজ্জ- ৩৯-৪০) অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবীগণকে।
3173। আবদুর রহমান ইবনু আবদুল কারী (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) কে বলতে শুনেছিঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর যখন ওয়াহী অবতীর্ণ হত সে সময় তার মুখমণ্ডলের নিকট হতে মৌমাছির আওয়াজের মত গুনগুন আওয়াজ শোনা যেত। একদিন তার উপর ওয়াহী অবতীর্ণ হল। আমি কিছুক্ষণ প্রতীক্ষা করলাম। তার উপর হতে ওয়াহীর বিশেষ অবস্থা সরে গেলে তিনি কিবলামুখী হয়ে তার দুই হাত তুলে দু’আ করলেনঃ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে বেশি দান কর, আমাদেরকে কম দিও না, আমাদেরকে সম্মান ও মর্যাদা দাও, আমাদেরকে লাঞ্ছিত করো না, আমাদেরকে দান কর, বঞ্চিত করো না, আমাদেরকে অগ্রগামী কর, আমাদের উপর অন্য কাউকে অগ্রগামী করো না, আমাদেরকে সুপ্রসন্ন কর এবং আমাদের উপর সুপ্রসন্ন থাক।” তারপর তিনি বললেনঃ আমার উপর এমন দশটি আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে, যার মানদণ্ডে কেউ কৃতকার্য হলে সে জান্নাতে যাবে। তারপর তিনি “কাঁদ আফলাহাল মু'মিনূন" হতে শুরু করে দশটি আয়াত তিলাওয়াত করেন। যঈফ, মিশকাত, তাহকীক ছানী (২৪৯৪) মুহাম্মাদ ইবনু আবান-আবদুর রাযযাক হতে তিনি ইউনুস ইবনু সুলাইম হতে তিনি ইউনুস ইবনু ইয়াযীদ হতে তিনি যুহরী (রাহঃ) হতে এই সূত্রে উক্ত মর্মে একই রকম হাদীস বর্ণনা করেছেন। আবূ ঈসা বলেনঃ পূর্ববতী সূত্রের তুলনায় এই সনদসূত্রটি অনেক বেশি সহীহ। আমি ইসহাক ইবনু মানসূরকে বলতে শুনেছি, আহমাদ ইবনু হাম্বল, আলী ইবনুল মাদীনী ও ইসহাক ইবনু ইবরাহীম-আবদুর রাযযাক হতে তিনি ইউনুস ইবনু সুলাইম হতে তিনি ইউনুস ইবনু ইয়াযীদ হতে তিনি যুহরী (রাহঃ) সূত্রে এই হাদীস রিওয়ায়াত করেছেন। যিনি প্রথমে আবদুর রাযযাকের নিকট এ হাদীস শুনেছেন তিনি ইউনুস ইবনু সুলাইম-এর পরে ইউনুস ইবনু ইয়াযীদের উল্লেখ করেছেন এবং কিছু রাবী ইউনুস ইবনু ইয়ামীদের উল্লেখ করেননি। সুতরাং যারা ইউনুস ইবনু ইয়ামীদের উল্লেখ করেছেন তাদের রিওয়ায়াতই অনেক বেশি সহীহ। আর আবদুর রাযযাক কখনও তার উল্লেখ করেছেন এবং কখনও করেননি। হাদীসটি মুরসাল। পূর্বের অনুরূপ দুর্বল
3174। আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে, নাযর-এর মেয়ে রুবাই (রাযিঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে উপস্থিত হলেন। উক্ত মহিলার পুত্র হরিসাহ ইবনু সুরাকাহ বদরের যুদ্ধে অদৃশ্য তীরের আঘাতে শহীদ হন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলেন, আমাকে হারিসাহর অবস্থা প্রসঙ্গে বলুন। সে যদি কল্যাণের অধিকারী হয়ে থাকে তবে আমি পুণ্যের আশাবাদী থাকব এবং ধৈর্য ধারণ করব। আর সে যদি কল্যাণ লাভ না করে থাকে তবে আমি তার জন্য দু’আ করতে আপ্রাণ চেষ্টা করব। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে হারিসাহর মা! জান্নাতের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণীর উদ্যান রয়েছে। তোমার ছেলে সুউচ্চ উদ্যান জান্নাতুল ফিরদাউস লাভ করেছে। ফিরদাউস হল জান্নাতের উচ্চ ভূমি, জান্নাতের কেন্দ্রভূমি এবং সর্বশ্রেষ্ঠ উদ্যান। সহীহঃ সহীহাহ (১৮১১, ২০০৩), মুখতাসারুল উলুবি (৭৬), বুখারী। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3175। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী আয়িশাহ (রাযিঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ আয়াত প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলামঃ “তারা যা কিছুই দান করে তাতে তাদের অন্তর প্রকম্পিত থাকে”— (সূরা মু'মিনূন ৬০)। আয়িশাহ (রাযিঃ) বলেন, এরা কি মদখোর ও চোর? তিনি বললেনঃ হে সিদ্দীকের মেয়ে! না এরা তা নয়, বরং যারা নামায আদায় করে, রোযা রাখে, দান-খাইরাত করে এবং মনে মনে এই ভয় পোষণ করে যে, তাদের পক্ষ হতে এগুলো কবুল করা হল কি না? এরাই “কল্যাণের কাজ দ্রুত শেষ করে এবং তাতে অগ্রগামী হয়"- (সূরা মু'মিনূন ৬১)। সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (৪১৯৮)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি আবদুর রহমান ইবনু সাঈদ-আবূ হাযিম হতে, তিনি আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সূত্রেও একই রকম বর্ণিত আছে।
3176। আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম “তারা জাহান্নামে থাকবে বীভৎস চেহারায়” (সূরাঃ আল-মুমিনুনঃ ১০৪) আয়াত প্রসঙ্গে বলেনঃ আগুন তাদেরকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ঝলসিয়ে দিবে। ফলে তাদের উপরের ঠোট কুঞ্চিত হয়ে মাথার মাঝখানে পৌছে যাবে। আর নীচের ঠোঁট এত চিলা হয়ে যাবে যে, তা নাভী পর্যন্ত পৌছে যাবে। যঈফ, ২৭১৩ নং হাদীস পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে। আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান, সহীহ গারীব।
3177আমর ইবনু শু'আইব (রহঃ) হতে পর্যায়ক্রমে তার বাবা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত আছে, মারসাদ ইবনু আবী মারসাদ নামক এক লোক যুদ্ধবন্দীদেরকে মক্কা হতে মদীনায় নিয়ে যেতেন। বর্ণনাকারী বলেন, আনাক্ নামে মক্কার এক দুশ্চরিত্রা নারী এই মারসাদের প্রেমিকা ছিল। সে (আবূ মারসাদ) মাক্কার এক বন্দীকে কথা দিয়েছিল যে, সে তাকে মাদীনায় নিয়ে যাবে। মারসাদ বলেন, আমি এ উদ্দেশে রাওনা হয়ে এক পূর্ণিমা রাতে মক্কার এক প্রাচীরের ছায়ায় পৌছলাম। আনাকও এলো। সে প্রাচীর গোত্রে আমার কালো ছায়া দেখতে পেল। সে আমার নিকট পৌছে আমাকে চিনে ফেলল। সে প্রশ্ন করল, মারসাদ নাকি? আমি বললাম, মারসাদ। সে আমাকে অভ্যর্থনা জানায় এবং বলে, এসো এ রাতটা আমার সাথে কাটাও। আমি বললাম, হে আনাক আল্লাহ তা'আলা যিনা হারাম করে দিয়েছেন। সে (নিজেদের তাবুতে ফিরে গিয়ে) বলল, হে তাবুর অধিবাসীরা এই ব্যক্তি তোমাদের বন্দীদের নিয়ে যাচ্ছে। এ কথা শোনামাত্র আটজন আমার পিছু নিল। আমি চলতে চলতে খানদামা পাহাড়ে গিয়ে একটি গুহা পেয়ে তাতে ঢুকে পড়লাম। লোকগুলিও আমার পিছে পিছে আসল। তারা (গুহাটিকে খালি মনে করে) আমার মাথার উপর থেকে পেশাব করে দিল। তাদের পেশাব আমার মাথায় এসে পড়ল। আল্লাহ তা'আলা এই লোকগুলোকে আমাকে দেখার ব্যাপারে অন্ধ করে দিলেন (তারা আমাকে দেখতে পেল না)। তারা ফিরে গেল, আমিও যাকে আনতে গিয়েছিলাম তার নিকট ফিরে এলাম। আমি তাকে তুলে নিলাম। তার দেহের ওজন খুব বেশি ছিল। আমি তাকে নিয়ে ইযখির নামক স্থানে পৌছে তার জিঞ্জীর খুলে দিলাম। আমি তাকে পিঠে তুলে নিলাম। তাকে বহন করা আমার জন্য কষ্টদায়ক হয়ে পড়ল। অবশেষে আমি মাদীনায় পৌছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আনাককে কি আমি বিয়ে করতে পারি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নীরব থাকলেন এবং আমার কথার কোন উত্তর দিলেন না। অবশেষে এই আয়াত অবতীর্ণ হলঃ “যিনাকারী পুরুষ যিনাকারিণী নারী অথবা মুশরিক নারীকেই বিবাহ করবে। আর যিনাকারিণী নারীকে শুধু যিনাকারী অথবা মুশরিক পুরুষরাই বিবাহ করবে আর মু'মিনদের জন্য তা হারাম করা হয়েছে”— (সূরা আন-নূর ৩)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে মারসাদ ব্যভিচারী পুরুষ শুধু ব্যভিচারী নারীকে অথবা মুশরিক নারীকেই বিবাহ করবে। আর ব্যভিচারিণীকে শুধু ব্যভিচারী পুরুষ অথবা মুশরিক লোকই বিবাহ করবে। অতএব তুমি তাকে বিয়ে করো না। সনদ হাসান। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। শুধু উল্লেখিত সনদেই আমরা এ হাদীস জেনেছি।
3178। সাঈদ ইবনু জুবাইর (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, মুস’আব ইবনুয যুবাইরের শাসনামলে আমাকে লি’আনকারী দম্পত্তি প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলঃ তাদেরকে পৃথক করে দিতে হবে কি না? আমি এর কি উত্তর দিব তা বুঝতে পাচ্ছিলাম না। আমি আমার ঘর হতে উঠে 'আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাযিঃ)-এর ঘরের দিকে রওনা হলাম। আমি তার নিকট প্রবেশ করার অনুমতি চাইলাম। আমাকে বলা হল, তিনি বিশ্রাম নিচ্ছেন। তিনি আমার আওয়াজ শুনতে পেয়ে বললেন, ইবনু জুবাইর! ভিতরে এসো। নিশ্চয়ই তুমি কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ে এসেছ। তিনি বলেন, আমি ভিতরে ঢুকলাম। তিনি তার হাওদার চাটাই বিছিয়ে উহার উপর শুয়ে ছিলেন। আমি বললাম, হে আবূ আবদুর রহমান! লি আনকারী স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শেষ করে দিতে হবে কি? তিনি বললেন, সুবহানাল্লাহ! হ্যাঁ। অমুকের ছেলে অমুকই এ সম্পর্কে সর্বপ্রথম প্রশ্ন করেছিল। সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার কি মত, যদি আমাদের কোন লোক তার স্ত্রীকে অশ্লীল কাজে (ব্যভিচারে) লিপ্ত দেখে তখন সে কি করবে? সে যদি মুখে তা বলে, তবে সে একটা মারত্মক বিষয়ে (যিনার অপবাদে) মুখ খুলল। আর সে যদি চুপ থাকে তাহলেও সে একটা চরম গৰ্হিত বিষয়ে মুখ বন্ধ রাখল। বর্ণনাকারী বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুপ থাকলেন এবং তাকে কিছুই বলল না। লোকটি আবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, ইতোপূর্বে যে বিষয়ে আপনার নিকট জিজ্ঞেস করছিলাম, এখন আমি নিজেই সে পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছি। এর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা সূরা আন-নূরের আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ (অনুবাদ) “আর যারা নিজেদের স্ত্রীদের বিরুদ্ধে যিনার অভিযোগ উত্থাপন করে, অথচ তাদের দলে তারা নিজেরা ব্যতীত আর কোন প্রমাণ নেই, তাদের প্রত্যেকের কথা হবে যে, সে চারবার আল্লাহ তা'আলার নামে শপথ করে বলবে, সে যদি মিথ্যাবাদী হয় তবে তার উপর আল্লাহ তা'আলার আযাব পতিত হোক"(সূরা আন-নূর ৬-৭)। তিনি আয়াতের শেষ পর্যন্ত তিলাওয়াত করলেন। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি লোকটিকে ডেকে এ আয়াতগুলো পড়ে শুনান, তাকে ওয়াজ-নাসীহাত করে বুঝান এবং তাকে আরো অবহিত করেন যে, আখিরাতের শাস্তির তুলনায় দুনিয়ার শাস্তি অনেক হালকা ও সহজ। সে বলল, না, সেই সত্তার শপথ যিনি আপনাকে সত্য দীন সহকারে পাঠিয়েছেন! আমি তার ব্যাপারে মিথ্যা অপবাদ আনিনি। তারপর তিনি স্ত্রীলোকটিকে ডাকেন, তাকে ওয়াজ-নসীহাত করে শুনান এবং বুঝান যে, আখিরাতের কষ্টের তুলনায় দুনিয়ার কষ্ট খুবই হালকা। স্ত্রীলোকটি বলল, না, সেই সত্তার শপথ যিনি আপনাকে সত্য দীন সহ পাঠিয়েছেন। সে সত্য কথা বলেনি। তারপর তিনি পুরুষ লোকটিকে ডাকলেন। সে আল্লাহ তা'আলার নামে শপথ করে চারবার সাক্ষ্য দিল যে, সে সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত এবং পঞ্চম বারে বলল, সে যদি মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হয় তাহলে তার উপর আল্লাহ তা'আলার অভিশাপ পতিত হোক। তিনি স্ত্রীলোকটিকেও এভাবে শপথ করান। সে আল্লাহ তা'আলার নামে প্রতিজ্ঞা করে চারবার বলল, সে (স্বামী) মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত এবং পঞ্চম বারে বলল, সে (স্বামী) যদি সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হয় তাহলে তার (স্ত্রীর) উপর আল্লাহ তা'আলার গযব পতিত হোক। তারপর তিনি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শেষ করে দিলেন। সহীহঃ মুসলিম (২০৬, ২০৭) এ অনুচ্ছেদে সাহল ইবনু সা'দ (রাযিঃ) হতেও হাদীস বর্ণিত আছে। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3179। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, হিলাল ইবনু উমাইয়্যাহ (রাযিঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট শারীক ইবনু সাহমার সাথে তার স্ত্রীর যিনার অভিযোগ দায়ের করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ প্রমাণ হাযির কর, অন্যথায় তোমার পিঠে চাবুক পড়বে। বর্ণনাকারী বলেন, হিলাল (রাযিঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের কেউ যদি তার স্ত্রীর সাথে কোন পুরুষ লোককে গৰ্হিত কাজে লিপ্ত দেখে, তখন সে কি সাক্ষী খুঁজে বেড়াবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতে থাকেনঃ প্রমাণ দাও, অন্যথায় তোমার পিঠে শাস্তির চাবুক পড়বে। বর্ণনাকারী বলেন, হিলাল (রাযিঃ) বললেন, সেই সত্তার কসম যিনি আপনাকে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন! অবশ্যই আমি সত্যবাদী। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমার বিষয়ে ওয়াহী অবতীর্ণ হবে যা আমার পিঠকে কষ্ট হতে রেহাই দিবে। তারপর অবতীর্ণ হলঃ “যারা নিজেদের স্ত্রীদের বিরুদ্ধে (যিনার) অভিযোগ আনে, অথচ নিজেরা ব্যতীত তাদের কোন সাক্ষী নেই তাদের প্রত্যেকের সাক্ষ্য এই হবে যে, সে চারবার আল্লাহ তা'আলার নামে কসম করে সাক্ষ্য দিবে যে, সে (তার আনীত অভিযোগে) অবশ্যই সত্যবাদী এবং পঞ্চম বারে বলবে, সে মিথ্যাবাদী হলে তার উপর আল্লাহ তা'আলার অভিসম্পাত হোক। আর স্ত্রীলোকটির কষ্ট রহিত হবে যদি সে চারবার আল্লাহ তা'আলার নামে কসম করে সাক্ষ্য দেয় যে, এ লোক (তার উত্থাপিত অভিযোগে) মিথ্যাবাদী। সে পঞ্চম বারে বলবে, সে (অভিযোগকারী স্বামী) সত্যবাদী হলে তার (স্ত্রীর) উপর আল্লাহ তা'আলার গযব পতিত হোক"- (সূরা আন-নূর ৬-৯)। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবসর হয়ে তাদের (স্বামী-স্ত্রী) উভয়কে ডেকে পাঠান। তারা উভয়ে হাযির হলে হিলাল (রাযিঃ) দাড়িয়ে সাক্ষ্য দিলেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতে থাকেন? নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা অবগত আছেন যে, তোমাদের একজন মিথ্যাবাদী, তোমাদের মধ্যে কে তওবা করতে প্রস্তুতঃ তারপর মেয়েলোকটি দাড়িয়ে সাক্ষ্য দিল। সে যখন পঞ্চম বারে বলতে যাচ্ছিল যে, সে (স্বামী) যদি সত্যবাদী হয়, তাহলে তার (স্ত্রীর) উপর আল্লাহ তা'আলার গযব নিপতিত হোক, তখন লোকেরা তাকে বলল, এ কথা (শাস্তিকে) অবশ্যম্ভাবী করে তুলবে। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) বলেন, এ কথা শুনে সে থেমে গেল এবং পিছনে সরে আসল। আমরা ধারণা করলাম যে, সে তার কথা হতে ফিরে আসবে। অতঃপর মেয়েলোকটি বলল, আমি চিরকালের জন্য আমার গোত্রে কালিমা লেপন করতে পারি না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা এই স্ত্রীলোকটির উপর নজর রেখ। সে যদি কাজল বর্ণের চোখ, প্রশস্ত নিতম্ব ও পায়ের গোশত গোছাযুক্ত সন্তান প্রসব করে তবে সে সন্তান শারীক ইবনু সাহমারই। পরবর্তীতে মহিলাটি ঐ রূপ সন্তানই প্রসব করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যদি আগেই আল্লাহ তা'আলার হুকুম (লি'আনের বিধান) না এসে যেত, তাহলে আমাদের এবং তার মধ্যে একটা বিরাট কিছু ঘটে যেত (তাকে শাস্তি দেয়া হত)। সহীহঃ ইবনু মা-জাহ, (২০৬৭) বুখারী (৪৭৪৭)। আবূ ঈসা বলেন, হিশাম ইবনু হাসসানের বর্ণনা হিসেবে এ হাদীসটি হাসান গারীব। আব্বাদ ইবনু মানসূর-ইকরিমাহ হতে, তিনি ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সনদে পূর্বোক্ত হাদীসের একই রকম বর্ণনা করেছেন। আইয়ূব এ হাদীস ইকরিমার সনদে মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং তাতে ইবনু আব্বাসের উল্লেখ করেননি।
3180। আয়িশাহ (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, যখন আমার বিষয়ে চর্চা হচ্ছিল যে বিষয়ে আমি কিছুই জানতাম না, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার প্রসঙ্গে বক্তব্য দিতে দাঁড়ালেন। তিনি তাশাহহুদ পড়ে আল্লাহ তা'আলার যথোপযুক্ত সুনাম ও গুণগান করার পর বলেনঃ তারপর তোমরা আমাকে ঐ সব ব্যক্তির বিষয়ে বুদ্ধি দাও, যারা আমার সহধর্মিণীর ব্যাপারে অপবাদ দিয়েছে। আল্লাহর কসম! আমি আমার পরিবারের (স্ত্রীর) মধ্যে কখনো কোন দোষ দেখিনি। এসব ব্যক্তি যার ব্যাপারে বদনাম রটিয়ে বেড়াচ্ছে। আল্লাহর কসম! আমি এ ধরনের কোন দুষ্কর্ম তার মধ্যে কখনো দেখিনি। সে (সাফওয়ান) আমার অনুপস্থিতিতে কখনো আমার ঘরে ঢুকেনি। আমি যখন উপস্থিত থাকতাম তখনই সে আমার ঘরে ঢুকত। আমি যখন সফরের কারণে ঘরে অনুপস্থিত থাকতাম, তখন সেও আমার সঙ্গেই থাকত। সা'দ ইবনু মুআয (রাযিঃ) উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে অনুমতি দিন, আমি এদের ঘাড় উড়িয়ে দেই। তখন খাযরাজ বংশের এক লোক উঠে দাঁড়ালো। হাসসান ইবনু সাবিতের মা এই বংশের সন্তান। লোকটি বলল, তুমি মিথ্যাবাদী। আল্লাহর কসম! এরা যদি আওস গোত্রের লোক হত, তাহলে তুমি তাদের ঘাড় উড়িয়ে দেয়া কখনো পছন্দ করতে না। তর্ক-বিতর্ক এমন পর্যায়ে পৌছে গেল যে, আওস ও খাযরাজ বংশদ্বয়ের মধ্যে মসজিদের ভিতরেই মারামারি লেগে যাওয়ার উপক্রম হল। অথচ এ (অপবাদ) বিষয়ে আমি কিছুই জানতাম না। ঐ দিন সন্ধ্যা রাতে আমি প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে গেলাম। আমার সাথে মিসতাহর মা ও ছিল। সে হোচট খেয়ে পড়ে গিয়ে বলল, মিসতাহ শেষ হোক। আমি তাকে বললাম, হে! তুমি মা হয়ে তোমার ছেলের অমঙ্গল কামনা করছ? সে চুপ হয়ে গেল। সে আবার হোচট খেল এবং বলল, মিসতাহ শেষ হোক। আমি তাকে তিরস্কার করে বললাম, হে! তুমি কেমন মা, নিজের ছেলের অমঙ্গল ডাকছ। সে চুপ হয়ে গেল। সে তৃতীয়বার হোচট খেল এবং বলল, মিসতাহর সর্বনাশ হোক। আমি তাকে কঠোরভাবে বললাম, তুমি কেমন মা, নিজের ছেলের অমঙ্গল চাচ্ছ! সে বলল, আল্লাহর কসম! আমি তোমার জন্যই তাকে গালমন্দ করছি। আমি প্রশ্ন করলাম, আমার কারণে কিভাবে? আয়িশাহ (রাযিঃ) বলেন, সে আমার নিকট সমস্ত ব্যাপার বর্ণনা করল। আমি (তা শুনে) বললাম, এই সব কথা রটেছে নাকি? সে বলল, হ্যাঁ। ["আয়িশাহ (রাযিঃ) বলেন, আমি বাড়িতে ফিরে আসলাম। আল্লাহর কসম! আমার এমন অবস্থা হল যে, যেজন্য এসেছিলাম সে প্রয়োজনের কথা ভুলেই গেলাম। আমার গায়ে জ্বর এসে গেল। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললাম, আমাকে আমার বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিন। তিনি আমার সাথে একটি বালককে দিয়ে আমাকে পাঠিয়ে দিলেন। আমি ঘরে ঢুকে উম্মু রুমানকে (মাকে) ঘরের নীচের অংশে দেখতে পেলাম। আর আবূ বাকর (রাযিঃ) ঘরের উপরি তলে কুরআন পড়ছিলেন। মা প্রশ্ন করলেন, কন্যা! তুমি কেন এসেছ? আয়িশাহ (রাযিঃ) বলেন, আমি মাকে বিষয়টি সম্পূর্ণ খুলে বললাম। কিন্তু আমি যেভাবে ভেঙ্গে পড়েছি সে তুলনায় তিনি ততটা ভারাক্রান্ত নন। তিনি বললেন, কন্যা! ব্যাপারটিকে হালকাভাবে নাও। আল্লাহর কসম! কোন পুরুষের সুন্দরী স্ত্রী থাকলে, সে তার প্রিয়পাত্রী হলে এবং তার সতীন থাকলে তারা তার সাথে হিংসা করবে না, তার বিষয়ে কিছু রটাবে না এরূপ কমই হয়ে থাকে। মোটকথা আমি যতটা দুঃখ পেলাম মা ততটা পেলেন না। আমি মাকে প্রশ্ন করলাম, আব্বাও কি ব্যাপারটি জানেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি আবার প্রশ্ন করলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি ভারাক্রান্ত হয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম। আবূ বকর (রাযিঃ) আমার কান্নার শব্দ শুনতে পেলেন। তিনি ঘরের উপরি তলে কুরআন পাঠ করছিলেন। তিনি নেমে এসে মাকে বললেন, ওর কি হয়েছে? মা বললেন, ওর বিষয়ে যেসব মিথ্যা বলা হচ্ছে, এ সংবাদ সে শুনে ফেলেছে। এ কথা জেনে বাবার দু'চোখে পানি এলো। তিনি বললেন, কন্যা! তোমাকে আল্লাহ তা'আলার নামে কসম করে বলছি, তুমি তোমার ঘরে ফিরে যাও। আমি ঘরে ফিরে এলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে এসে আমার কাজের মেয়েকে আমার বিষয়ে প্রশ্ন করলেন। সে বলল, আল্লাহর কসম! আমি তার মধ্যে কোন দোষ দেখিনি, তবে এতটুকু যে, সে ঘুমিয়ে পড়ত, আর বকরী এসে তার পেষা আটা খেয়ে যেত। তার কিছু সাহাবী মেয়েটিকে ধমক দিয়ে বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট সত্য কথা বল। তারা তাকে অনেক দাবালেন এবং ধমকালেন। সে বলল, সুবহানাল্লাহ আল্লাহর কসম! আমি তার ব্যাপারে তা-ই জানি স্বর্ণকার খাটি রঙ্গিন সোনা প্রসঙ্গে যা জানে। যে ব্যক্তিকে এই অপবাদের সাথে জড়ানো হয়েছিল তার কানেও এ খবর পৌছল। সে বলল, সুবহানাল্লাহ আল্লাহর কসম! আমি কখনো কোন নারীর সতর খুলিনি। আয়িশাহ (রাযিঃ) বলেন, সে আল্লাহ তা'আলার রাস্তায় শহীদ হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করে। তিনি বলেন, আমার পিতা-মাতা খুব ভোরে আমার নিকট এলেন। আমার ঘরে এলেন। আমার পিতা-মাতা ডান দিক-বা দিক হতে আমাকে ঘিরে বসেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কালিমা শাহাদাত পাঠ করলেন, আল্লাহ তা'আলার যথোপযুক্ত সম্মান ও গুণগান করলেন, তারপর বলেনঃ হে আয়িশাহ! তুমি যদি কোন মন্দ কাজ করে থাক অথবা নিজের উপর যুলুম করে থাক, তবে আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা চাও। কেননা আল্লাহ তা'আলা তার বান্দাদের তওবা কবুল করেন। আয়িশাহ (রাযিঃ) বলেন, এ সময় আনসার বংশের একটি স্ত্রীলোক আসে। সে দরজার নিকট বসে ছিল। আমি বললাম, আপনি কি এ মহিলাটির সামনে এ কথা বলতে লজ্জাবোধ করছেন না? মোটকথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়াজ-নাসীহাত করলেন। আমি আমার পিতার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললাম, আপনি তার কথার উত্তর দিন। তিনি বললেন, আমি তাকে কি উত্তর দিব? আমি আমার মায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললাম, আপনি তাকে এর উত্তর দিন। তিনিও বলেন, আমি তাকে কি বলব? তাদের কেউই যখন উত্তর দেননি, তখন আমি কলেমা শাহাদাত তিলাওয়াত করলাম, আল্লাহ তা'আলার যথোপযুক্ত সুনাম ও প্রশংসা করলাম, তারপর বললাম, আল্লাহর কসম! আমি যদি আপনাদের বলি, আমি কখনো তা করিনি এবং আল্লাহ তা'আলা সাক্ষী আছেন, আমি সত্যবাদিনী, তা আপনাদের নিকট আমার কোন উপকারে আসবে না। কেননা আপনারা তা আলোচনা করেছেন এবং তাতে আপনাদের মন রঞ্জিত হয়েছে। আর আমি যদি বলি, আমি করেছি এবং আল্লাহ তা'আলা জানেন আমি তা করিনি, তখন আপনারা বলবেন, সে নিজেই নিজের অপরাধ স্বীকার করেছে। আল্লাহর কসম! আমি আপনাদের এবং আমার জন্য কোন উদাহরণ খুঁজে পাচ্ছি না। আয়িশাহ (রাযিঃ) বলেন, আমি ইয়াকুব (আঃ)-এর নাম স্মরণ করতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না। শুধু "ইউসুফের বাবা” স্মরণে আসছিল। তিনি যখন বলেছিলেনঃ “পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়, তোমরা যা বলছ সে প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা আমার সাহায্য স্থল”- (সূরা ইউসুফ ১৮)। আয়িশাহ্ (রাযিঃ) বলেন, ঠিক সে সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর ওয়াহী অবতীর্ণ হতে লাগল। আমরা চুপ থাকলাম। তার উপর হতে ওয়াহীর অবস্থা দূর হলে আমি তার মুখমণ্ডলে আনন্দের ছাপ দেখতে পেলাম। তিনি তার মুখমণ্ডলের ঘাম মুছছেন আর বলছেনঃ হে আয়িশাহ! তোমার জন্য সুসংবাদ। আল্লাহ তা'আলা তোমাকে নির্দোষ ঘোষণা করেছেন। আয়িশাহ (রাযিঃ) বলেন, আমি তখন উত্তেজিত অবস্থায় ছিলাম। আমার পিতা-মাতা আমাকে বললেনঃ উঠে তার নিকট যাও। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমি তার নিকট উঠে যাব না, তার সুনামও করব না এবং আপনাদের প্রশংসাও করব না। বরং আমি সেই আল্লাহ তা'আলার সুনাম করব যিনি আমার নির্দোষিতার ওয়াহী অবতীর্ণ করেছেন। আপনারা এ অপবাদ শুনেছেন, কিন্তু তা প্রত্যাখ্যানও করেননি বা প্রতিহতও করেননি। ‘আয়িশাহ (রাযিঃ) বলেন, জাহাশ-কন্যা যাইনাবের দীনদারীর জন্য আল্লাহ তা'আলা তাকে হিফাযাত করেছেন। সে ভাল ব্যতীত কখনো অন্য কিছু বলেনি। কিন্তু তার বোন হামনা ক্ষতিগ্রস্তদের সাথে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যারা এ অপবাদ রটায় তাদের মধ্যে ছিলঃ মিসতাহ, হাসসান ইবনু সাবিত ও মুনাফিক সরদার আবদুল্লাহ ইবনু উবাই। সে অপবাদ রটাত এবং তা ছড়িয়ে বেড়াত। সে ও হামনা ছিল এই আপত্তিকর অপবাদ ছড়ানোর বড় হোতা। আয়িশাহ (রাযিঃ) বলেন, আবূ বাকর (রাযিঃ) কসম করেন যে, তিনি আর কখনো মিসতাহর কোনভাবে উপকার করবেন না (ভরণ-পোষণ বহন করবেন না)। এ প্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ “তোমাদের মধ্যে যারা (আবূ বাকরকে লক্ষ্য করে বলা হচ্ছে) ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী তারা যেন কসম না করে যে, তারা আত্মীয়, গারীব ও আল্লাহ তা'আলার পথের মুহাজিরদের (মিসতাহকে লক্ষ্য করে বলা হচ্ছে) কিছুই দিবে না.....তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের মাফ করুনঃ আল্লাহ তা'আলা বড়ই ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়"- (সূরা আন-নূর ২২)। আবূ বাকর (রাযিঃ) বলেন, হে আমাদের প্রতিপালক! হ্যাঁ, আমরা অবশ্যই আপনার ক্ষমাপ্রার্থী। তিনি আগের মতো মিসতাহর ভরণ-পোষণের ভার বহন করেন। সহীহঃ বুখারী (৪৭৫৭), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান, সহীহ হিশাম ইবনু উরওয়াহর রিওয়ায়াত হিসেবে গারীব। ইউনুস ইবনু ইয়াযীদ, মা'মার প্রমুখ-যুহরী হতে, তিনি উরওয়াহ ইবনুয যুবাইর হতে, তিনি সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব হতে, তিনি "আলকামাহ্ ইবনু ওয়াক্কাস আল-লাইসী ও উবাইদুল্লাহ ইবনু আবদুল্লাহ হতে, তিনি আয়িশাহ্ (রাযিঃ) হতে এই সূত্রে উপর্যুক্ত হাদীসের মত বর্ণনা করেছেন। হিশাম ইবনু উরওয়াহর রিওয়ায়াতের তুলনায় এই রিওয়ায়াতটি পূর্ণাঙ্গ ও দীর্ঘতর।
3181। আয়িশাহ্ (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমার নির্দোষিতা বর্ণনা করে আয়াত অবতীর্ণ হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বারে উঠে তা বর্ণনা করেন, তারপর কুরআন তিলাওয়াত করেন। মিম্বার হতে অবতরণ করে তিনি দুইজন পুরুষ ও একজন মহিলাকে বেত্ৰাঘাত করার নির্দেশ দিলেন এবং তদনুযায়ী তাদেরকে (অপবাদ রটনাকারীদেরকে) হাদের আওতায় শাস্তি দেয়া হয়। হাসানঃ ইবনু মা-জাহ (২৫৬৭) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। আমরা শুধু মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাকের সনদে এই হাদীস জেনেছি।
3182। আবদুল্লাহ (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সবচেয়ে মারাত্মক গুনাহ কি? তিনি বললেনঃ তুমি কাউকে আল্লাহ তা'আলার শারীক বা সমকক্ষ বানালে, অথচ তিনিই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেন, আমি বললাম, তারপর কোনটি? তিনি বললেনঃ তোমার সন্তানরা তোমার খাদ্যে ভাগ বসাবে এই ভয়ে তাদেরকে হত্যা করা। তিনি বলেন, আমি প্রশ্ন করলাম, তারপর কোনটি? তিনি বললেনঃ তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে তোমার যিনায় লিপ্ত হওয়া। সহীহঃ ইরওয়াহ (২৩৩৭), সহীহ আবূ দাউদ (২০০০), বুখারী (৪৭৬১), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। বুনদার-আবদুর রহমান ইবনু মাহদী হতে, তিনি সুফইয়ান হতে, তিনি মানসূর হতে, তিনি আমাশ হতে, তিনি আবূ ওয়ায়িল হতে, তিনি আমর ইবনু শুরাহবীল হতে, তিনি 'আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সনদেও উপরের হাদীসের একই রকম বর্ণনা করেছেন। আবূ ঈসা বলেন, এ সনদে বর্ণিত হাদীসটি হাসান সহীহ।
3183। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রশ্ন করলাম, সবচেয়ে মারাত্মক গুনাহ কোনটি? তিনি বললেনঃ (১) আল্লাহ তা'আলার সাথে কাউকে তোমার শারীক বানানো, অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন; (২) তোমার সন্তানরা তোমার সাথে আহার করবে অথবা তোমার খাবারে ভাগ বসাবে এই ভয়ে তাদেরকে হত্যা করা; (৩) তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে তোমার যিনা করা। বর্ণনাকারী বলেন, তারপর তিনি এ আয়াত পাঠ করেন (অনুবাদ) যারা আল্লাহ তা'আলার সাথে কোন মা’বুদকে ডাকে না, আল্লাহ তা'আলা যাকে হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচারেও জড়িত হয় না। যে এগুলো করে সে শাস্তি ভোগ করবে। কিয়ামতের দিন তার আযাব দ্বিগুণ করা হবে এবং সেখানে সে অনন্ত কাল লাঞ্ছিত অবস্থায় থাকবে”— (সূরা আল-ফুরকান ৬৮-৬৯)। সহীহঃ বুখারী ও মুসলিম,প্রাগুক্ত। আবূ ঈসা বলেন, মানসূর ও আ'মাশ-এর সনদে বর্ণিত সুফইয়ানের হাদীসটি ওয়াসিলের সনদে বর্ণিত হাদীসের তুলনায় অনেক বেশী সহীহ। কেননা তিনি (ওয়াসিল) তার সনদে আরো একজন বর্ণনাকারীর উল্লেখ করেছেন। মুহাম্মাদ ইবনুল মুসান্না-মুহাম্মাদ ইবনু জাফার হতে, তিনি শুবাহু হতে, তিনি ওয়াসিল হতে, তিনি আবূ ওয়ায়িল হতে, তিনি আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে, এ সূত্রে উপরের হাদীসের মত বর্ণনা করেছেন। এই সনদে আমর ইবনু শুরাহবীলের উল্লেখ নেই।
3184। আয়িশাহ (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, “তোমার নিকটাত্মীয়-স্বজনদের সতর্ক কর”— (সূরা শু'আরা ২১৪)। এ আয়াত অবতীর্ণ হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে আবদুল মুত্তালিবের কন্যা সাফিয়্যাহ্, হে মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমাহ, হে “আবদুল মুত্তালিবের গোত্রের লোকেরা! তোমাদেরকে আল্লাহ তা'আলার পাকড়াও হতে রক্ষা করার কোন ক্ষমতা আমার নেই। আমার সম্পদ হতে যত ইচ্ছা তোমরা চেয়ে নিতে পার। সহীহঃ মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। ওয়াকী প্রমুখ-হিশাম ইবনু উরওয়াহ্ হতে, তিনি তার পিতা হতে, তিনি আয়িশাহ্ (রাযিঃ) সূত্রে এ হাদীস মুহাম্মাদ ইবনু আবদুর রামান আত-তুফাবীর রিওয়ায়াতের একই রকম বর্ণনা করেছেন। কোন কোন বর্ণনাকারী এ হাদীসটি হিশাম ইবনু উরওয়াহ্ হতে, তিনি তার পিতা হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সূত্রে এ হাদীস মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং আয়িশাহ্ (রাযিঃ)-এর উল্লেখ করেননি। এ অনুচ্ছেদে আলী ও ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতেও হাদীস বর্ণিত আছে।
3185। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, “ওয়া আনযির আশীরাতাকাল আকরাবীন”— (সূরা শু'আরা ২১৪) আয়াত অবতীর্ণ হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশ গোত্রের সাধারণ-বিশেষ সকলকে ডেকে একত্র করে বলেনঃ হে কুরাইশ গোত্রের লোকেরা! তোমরা নিজেদেরকে আগুন হতে রক্ষা কর। আল্লাহ তা'আলার দরবারে তোমাদের উপকার বা অপকার করার কোন ক্ষমতা আমার নেই। হে আবদে মানাফ বংশের লোকেরা! তোমরা নিজেদেরকে ‘আগুন হতে রক্ষা কর। আল্লাহ তা'আলার দরবারে তোমাদের কোন উপকার বা অপকার করার ক্ষমতা আমার নেই। হে কুসাই বংশের ব্যক্তিরা! তোমরা নিজেদেরকে আগুন হতে রক্ষা কর। আল্লাহ তা'আলার দরবারে তোমাদের কোন উপকার বা অপকার করার কোন ক্ষমতা আমার নেই। হে “আবদুল মুত্তালিব বংশের ব্যক্তিরা! তোমরা নিজেদেরকে আগুন হতে রক্ষা কর। আল্লাহ তা'আলার দরবারে তোমাদের কোন উপকার অথবা ক্ষতি করার ক্ষমতা আমার নেই। হে মুহাম্মাদের মেয়ে ফাতিমাহ! নিজেকে আগুন হতে রক্ষা কর। কেননা তোমার কোন উপকার বা ক্ষতি করার ক্ষমতা আমার নেই। অবশ্য তোমার সাথে আমার রক্তের সম্পর্ক রয়েছে। আমি এই সম্পর্কের অধিকার সজীব রাখার চেষ্টা করব। সহীহঃ মুসলিম (১/১৩৩), বুখারী (৪৭৭১) সংক্ষেপিত। আবূ ঈসা বলেন, উল্লেখিত সনদ সূত্রে এ হাদীসটি হাসান সহীহ গারীব। এটি শুধুমাত্র মূসা ইবনু তালহার সূত্রেই জানা যায়। আলী ইবনু হুজর-শু'আইব ইবনু সাফওয়ান হতে, তিনি আবদুল মালিক ইবনু উমাইর হতে, তিনি মূসা ইবনু ত্বালহা হতে, তিনি আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সনদে উক্ত মর্মে একই রকম হাদীস বর্ণনা করেছেন।
3186। আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রাযিঃ) বলেনঃ “ওয়া আনযির আশীরাতাকাল আক্করাবীন”— (সূরা শু'আরা ২১৪) আয়াত অবতীর্ণ হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হাতের দুই আঙ্গুল তার দুই কানের মধ্যে স্থাপন করে উচ্চ কণ্ঠে বলেন, হে “আবদে মানাফ বংশের লোকেরা! ইয়া সবাহা (হে প্রভাতকালে বিপদ)। হাসান সহীহঃ বুখারী (৪৮০১)। আবূ ঈসা বলেন, আবূ মূসার হাদীস হিসেবে উল্লেখিত সনদসূত্রে এ হাদীসটি গারীব। কিছু বর্ণনাকারী আওফ হতে, তিনি কসিামাহ্ ইবনু যুহাইর হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সনদে এ হাদীস মুরসালরূপে বর্ণনা করেছেন এবং এ সনদে আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রাযিঃ)-এর উল্লেখ নেই এবং এ সূত্রটিই অনেক বেশি সহীহ। আমি (তিরমিয়ী) হাদীসটি মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈলের নিকট উল্লেখ করলাম কিন্তু তিনি এটিকে আবূ মূসার হাদীসরূপে চিনতে পারেননি।
3187। আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ একটি জানোয়ার বের হয়ে আসবে এবং তার সাথে সুলাইমান আলাইহিস সালাম-এর আংটি ও মূসা আলাইহিস সালাম-এর লাঠি থাকবে। সে (লাঠি দিয়ে) মুমিনদের চেহারা সাফ ও দীপ্তিমান করবে এবং আংটি দিয়ে কাফিরদের নাকে মোহর মেরে দিবে। পরিশেষে তারা একই ভোজসভায় একত্রে মিলিত হবে এবং সেই জানোয়ারটি ডেকে বলবে, এই যে মু’মিন, এই যে কাফির। অতঃপর সে বলবে হে মুমিন, আর সে বলবে হে কাফির। যঈফ, যঈফা (১১০৮)। আবূ ঈসা বলেন এই হাদীসটি হাসান গারীব। এই হাদীসটি অন্য সূত্রে আবূ হুরাইরা হতেও বর্ণিত আছে, এ অনুচ্ছেদে আবূ ওমামা এবং হুযাইফা ইবনু উসাইদ হতেও হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
3188। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার চাচাকে বললেনঃ আপনি "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বলুন, আমি কিয়ামতের দিন এই কালেমার সাহায্যে আপনার পক্ষে সাক্ষ্য দিব। আবূ ত্বালিব বললেন, আমি এরূপ করলে কুরাইশরা আমাকে তিরস্কার করবে এই বলে যে, সে মৃত্যুর ভয়ে এই কালেমা পাঠ করেছে (এবং পূর্বপুরুষের ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করেছে)। এভাবে দোষারোপ করার আশংকা না থাকলে আমি তা স্বীকার করে তোমার আঁখি শীতল করতাম। এই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন (অনুবাদ): “তুমি যাকে ভালবাস, ইচ্ছা করলেই তাকে হিদায়াত করতে পারবে না, তবে আল্লাহ তা'আলা যাকে ইচ্ছা তাকে হিদায়াত দান করেন”— (সূরা কাসাস ৫৬)। সহীহঃ মুসলিম (১/৪১) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। ইয়াযীদ ইবনু কাঈসানের সনদেই শুধু আমরা এ হাদীসটি জেনেছি।
3189। সা'দ (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমার প্রসঙ্গে চারটি আয়াত অবতীর্ণ হয়। তারপর তিনি একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। সা'দ (রাযিঃ)-এর মা বলল, আল্লাহ তা'আলা কি (পিতা-মাতার) সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দেননি? আল্লাহর কসম যতক্ষণ পর্যন্ত আমি না মরব অথবা তুমি কুফরীতে প্রত্যাবর্তন না করবে (ইসলাম ত্যাগ না করবে) ততক্ষণ পর্যন্ত আমি পানাহার করব না। বর্ণনাকারী বলেন, লোকেরা তাকে আহার করাতে চাইলে কাঠ দিয়ে তার মুখ ফাক করে তাকে আহার করাতো। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াত অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ): “আমি মানুষকে তাদের বাবা-মার সাথে ভাল ব্যবহার করার আদেশ দিয়েছি। কিন্তু তারা যদি আমার সাথে এমন কিছু শারীক করার জন্য তোমার উপর চাপ সৃষ্টি করে, যে প্রসঙ্গে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তবে তুমি তাদের আনুগত্য করো না। আমার নিকটই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। পার্থিব জীবনে তোমরা যা করছিলে, তখন আমি তোমাদের তা জানিয়ে দিব”— (সূরা আল-আনকাবূত ৮)। সহীহঃ মুসলিম (৭/১২৫, ১২৬) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3190। উম্মু হানী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, আল্লাহ্ তা'আলার বাণীঃ “তোমরাই তো নিজেদের মাজলিসসমূহে প্রকাশ্যে গৰ্হিত কাজ কর"। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এই লোকেরা (কাওমে লুত) দুনিয়াবাসীদের উপর কাকর ছুড়ে মারতো এবং তাদের সাথে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করত। সনদ অত্যন্ত দুর্বল আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান। আমরা শুধুমাত্র হাতিম ইবনু আবূ সাগীরার সূত্রেই এ হাদীস জেনেছি এবং তিনি সিমাকের বরাতে এ হাদীস রিওয়ায়াত করেছেন। আহমাদ ইবনু আবদাহ সুলাইম ইবনু আখযার হাতিম ইবনু আবূ সাগীরা এই সূত্রে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।
3191। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম “আলিফ, লাম, মীম, গুলিবাতির রূম" শীর্ষক আয়াতের সাথে সংশ্লিষ্ট আবূ বাকর (রাঃ)-এর বাজি প্রসঙ্গে বলেছেনঃ আবূ বাকর! তুমি সাবধানতা গ্রহণ করলে না কেন? কেননা ... শব্দটি তো তিন হতে নয় পর্যন্ত সংখ্যা বুঝাতে ব্যবহৃত হয়। যঈফ, যঈফা (৩৩৫৪) আবূ ঈসা বলেনঃ উল্লেখিত সনদসূত্রে অর্থাৎ যুহরীর সনদে এ হাদীস হাসান ও গারীব। তিনি উবাইদুল্লাহ হতে, তিনি ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে তা বর্ণনা করেছেন।
3192। আবূ সাঈদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, যখন বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয়, ঠিক এই সময়ে রূমের এশিয়া মাইনরে খৃষ্টান বাহিনী পারস্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করে। এ বিষয়টি মুসলিমদেরকে খুবই আনন্দিত করে। এ প্রেক্ষিতে আয়াত অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ): “আলিফ, লাম, মীম। রোমকগণ নিকটবর্তী ভূখণ্ডে পরাজিত হয়েছে। তাদের এই পরাজয়ের কয়েক বছরের মধ্যেই তারা আবার বিজয়ী হবে। আগের ও পরের ফাঈসালা আল্লাহ তা'আলারই। সেদিন আল্লাহ তা'আলার সাহায্যে মু’মিনগণ আনন্দিত হবে। তিনি যাকে ইচ্ছা সাহায্য করেন। তিনি মহা পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু”— (সূরা আর-রূম ১-৫)। বর্ণনাকারী বলেন, পরবর্তী হাদীসের সহায়তায় এ হাদীসটি সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, উল্লেখিত সনদসূত্রে এ হাদীসটি হাসান গারীব। নাসর ইবনু আলী (গলাবাতির রূম) পাঠ করেছেন।
3193। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ (অনুবাদ) আলিফ, লাম, মীম। রোমকগণ নিকটবর্তী ভূখণ্ডে পরাজিত হয়েছে, এ আয়াত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এতে দুই রকমের কিরআত আছে, “গুলিবাত” (পরাজিত হল) এবং “গালাবাত” (বিজয়ী হল)। তিনি আরো বলেন, মুশরিকরা চাইত যে, পারস্য শক্তি রোমান শক্তির উপরে জয়ী হোক। কেননা (মক্কার) মুশরিকরা এবং পারস্যের অধিবাসীরা উভয়ে ছিল পৌত্তলিক। আর মুসলিমরা আকাঙ্ক্ষা করত যে, রোমান শক্তি পারস্য শক্তির বিরুদ্ধে বিজয়ী হোক। কেননা তারা ছিল আহলে কিতাব। তারা ব্যাপারটি আবূ বাকর (রাযিঃ)-এর সামনে উল্লেখ করলে তিনি তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানান। তিনি বললেনঃ অচিরেই রোমান শক্তি পারস্য শক্তির উপরে বিজয়ী হবে। আবূ বাকর (রাযিঃ) এ কথা তাদের নিকট উল্লেখ করলে তারা বলল, আপনি আমাদের ও আপনার মাঝে এর একটি সময়সীমা নির্দিষ্ট করুন। এ সময়সীমার মধ্যে আমরা যদি বিজয়ী হই তবে (এত এত মাল আমাদেরকে) দিতে হবে। আর যদি আপনারা বিজয়ী হন তবে আমরা আপনাদেরকে এই এই (পরিমাণ মাল) দিব। তিনি পাঁচ বছরের সময়সীমা নির্দিষ্ট করেন। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে কোন বিজয় সূচিত হল না। লোকেরা তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উল্লেখ করলে তিনি বললেনঃ (হে আবূ বাকর!), তুমি কেন আর কিছু বেশি সময়সীমা ধার্য করলে না? বর্ণনাকারী বলেন, আমার মনে হয় তিনি দশ বছরের কাছাকাছি সময়ের কথা বলেছেন। সাঈদ (রাহঃ) বলেন, বিযউ’ শব্দের অর্থ দশের চেয়ে কম। বর্ণনাকারী বলেন, পরবর্তীকালে রোমান শক্তি বিজয়ী হল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এটাই আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ আলিফ, লাম, মীম!... ইয়াফরাহুল মুমিনুনা বিনাসরিল্লাহ" এর তাৎপর্য। সুফইয়ান বলেন, আমি শুনেছি, রোমান শক্তি ঠিক বদরের যুদ্ধের দিন পারস্য শক্তির উপরে বিজয়ী হয়। সহীহঃ যঈফাহ (২২৫৪) নং হাদীসের অধীনে। আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান, সহীহ গারীব। আমরা শুধু সুফইয়ানের রিওয়ায়াত হিসেবে এ হাদীস জেনেছি। তিনি হাবীব ইবনু আবী আমর’র সনদে এ হাদীস বর্ণনা করেছেন।
3194। নিয়ার ইবনু মুকরাম আল-আসলামী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, যখন অবতীর্ণ হলঃ (অনুবাদ) “আলিফ, লাম, মীম; রোমকরা নিকটবর্তী ভূখণ্ডে পরাজিত হয়েছে; তাদের এই পরাজয়ের পর অচিরেই কয়েক বছরের মধ্যে তারা বিজয়ী হবে", তখন পারস্য শক্তি রোমকদের উপর প্রভুত্ব করছিল। মুসলিমরা আকাঙ্ক্ষা করত যে, রোমক শক্তি পারস্য শক্তির বিরুদ্ধে বিজয়ী হোক। কেননা মুসলিমরা ছিল আহলে কিতাব এবং রোমান খৃষ্টানরাও ছিল আহলে কিতাব। এ বিষয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “সেদিন আল্লাহর দেয়া বিজয়ে মুমিনগণ আনন্দিত হবে। তিনি যাকে ইচ্ছা সাহায্য করেন। তিনি মহা পরাক্রমশালী পরম দয়াময়।” কুরাইশরা চাইতো যে, পারস্যশক্তি বিজয়ী হোক। কেননা এ দুই গোত্রের কেউই আহলে কিতাব ছিল না, তারা আখিরাতের প্রতিও বিশ্বাসী ছিল না। আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করলে আবূ বাকর সিদ্দীক (রাযিঃ) মক্কার অলিতে গলিতে ঘুরে ঘুরে উচ্চ কণ্ঠে ঘোষণা করেনঃ আলিফ, লা-ম, মী-ম। রোমান শক্তি নিকটবর্তী অঞ্চলে পরাজিত হয়েছে। তাদের এ পরাজয়ের পর অচিরেই কয়েক বছরের মধ্যে তারা বিজয়ী হবে।” কুরাইশদের একদল লোক আবূ বাকর (রাযিঃ)-কে বলল, আমাদের ও তোমাদের মাঝে একটি চুক্তি হোক। তোমার সাথী (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন যে, রোমানরা কয়েক বছরের মধ্যেই পারস্য শক্তির উপরে বিজয়ী হবে। আমরা এ বিষয়ে তোমাদের সাথে বাজি রেখে মাল বন্ধক রাখি না কেন? আবূ বাকর (রাযিঃ) বলেন, ঠিক আছে। বর্ণনাকারী বলেন, বাজি হারাম ঘোষিত হওয়ার পূর্বে এই চুক্তি হয়েছিল। আবূ বাকর (রাযিঃ) এবং (রাযিঃ)-কে বলল, আপনি বিযুউ-কে কত নির্ধারণ করতে চান? এ তো তিন হতে নয় বছর পর্যন্ত বুঝা যায়। আপনি আমাদের এবং আপনার মধ্যে একটি মধ্যবর্তী সময় নির্দিষ্ট করুন। আমরা উভয়ে ততক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা করব। বর্ণনাকারী বলেন, তারা নিজেদের মধ্যে ছয় বছরের সময়সীমা নির্ধারণ করে। বর্ণনাকারী বলেন, ছয় বছর পার হয়ে গেলেও কিন্তু রোমানরা পারসিকদের উপর বিজয়ী হয়নি। অতএব মুশরিকরা আবূ বাকর (রাযিঃ)-এর অর্থ নিয়ে নিল। কিন্তু সপ্তম বছরে রোমানরা পারসিকদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করে। মুসলিমরা আবূ বাকর (রাযিঃ)-এর ছয় বছর বরাদ্ধ করাটাকে দোষারোপ করল। কেননা আল্লাহ তা'আলা “কয়েক বছরের মধ্যেই” বলেছেন। বর্ণনাকারী বলেন, এ সময় (ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হলে) অনেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে। হাসানঃ যঈফাহ (৩৩৫৪) নং হাদীসের অধীনে। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ, নিয়ার ইবনু মুকরামের হাদীস হিসেবে গারীব। আবদুর রহমান ইবনু আবূয যিনাদের সনদেই শুধু আমরা এ হাদীস জেনেছি।
3195। আবূ উমামাহ্ (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা গায়িকা নারীদের ক্রয়-বিক্রয় করো না, তাদেরকে গান-বাজনা শিক্ষা দিও না, তাদের (ব্যবসায়িক পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা) ব্যবসায়ের মধ্যে কোন মঙ্গল নেই এবং এদের মূল্যও হারাম। এ প্রসঙ্গেই এই আয়াত অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ) “এমনও কিছু লোক আছে, যারা বাতিল অশ্লীল কাহিনীসমূহ ক্রয় করে আনে, যেন লোকদের অজ্ঞতাবশত আল্লাহ্ তা'আলার পথ হতে আলাদা করতে পারে এবং এ পথকে ঠাট্টা-বিদ্ধপ করতে পারে। এ ব্যক্তিদের জন্য রয়েছে অপমানকর আযাব"- (সূরা লুকমান ৬)। হাসানঃ (১২৮২) নং হাদীস পূর্বে উল্লেখ হয়েছে। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি গারীব। এটি শুধুমাত্র আবূ উমামাহ (রাযিঃ) সূত্রে কাসিম হতে বর্ণিত হয়েছে। কাসিম নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী ‘আলী ইবনু ইয়াযীদ হাদীস শাস্ত্রে যঈফ। আমি মুহাম্মাদকে বলতে শুনেছি আল-কাসিম নির্ভরযোগ্য এবং ‘আলী ইবনু ইয়াযীদ দুর্বল।
3196। আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে, “তাদের দেহপাশ বিছানা হতে আলগা হয়ে যায়..."— (সূরা সিজদা্ ১৬) আয়াতটি আতামার (ইশার) নামাযের জন্য অপেক্ষা করার ফায়ীলাত প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়েছে। সহীহঃ তা’লীকুর রাগীব (১/১৬০) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান, সহীহ গারীব। আমরা শুধু উল্লেখিত সনদেই এ হাদীস জেনেছি।
3197। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ আমি আমার নেক বান্দাদের জন্য এমন কিছু তৈরি করে রেখেছি, যা কোন চোখ কখনো দেখেনি, কোন কান (এর বর্ণনা) কখনো শুনেনি এবং মানুষের অন্তর তা কল্পনাও করতে পারবে না। এর সত্যতা আল্লাহ তা'আলার কিতাবেই বিদ্যমানঃ “তাদের ভাল কাজের ফল স্বরূপ তাদের চক্ষু শীতলকারী কী লুকায়িত রাখা হয়েছে তা কেউই জানে না”— (সূরা সিজদা ১৭)। সহীহঃ রাওয়ূন নায়ীর (১১০৬), বুখারী (৪৭৭৯), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3198। মুগীরাহ ইবনু শুবাহ (রাযিঃ) মিম্বারে দাঁড়িয়ে বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মূসা (আঃ) নিজ সৃষ্টিকর্তার নিকট আরজ করলেনঃ হে প্রভু! সর্বাপেক্ষা নিম্ন শ্রেণীর জান্নাতী কে? তিনি (আল্লাহ) বললেনঃ জান্নাতবাসীরা জান্নাতে চলে যাওয়ার পর এক লোক উপস্থিত হবে। তাকে বলা হবে, প্রবেশ কর। সে বলবে, আমি কি করে জান্নাতে প্রবেশ করব, লোকেরা তো নিজ নিজ স্থানে পৌছে তা দখল করে নিয়েছে! তখন তাকে বলা হবে, দুনিয়ার বাদশাদের মধ্যে একজন বাদশার যত বড় রাজত্ব হতে পারে, তোমাকে যদি ততটুকু দেয়া হয় তবে তুমি কি খুশি হবে? সে বলবে, হে প্ৰভু! হ্যাঁ আমি তাতে খুশি হব। তাকে বলা হবে, তোমাকে এ পরিমাণ এবং এর অতিরিক্ত তিন গুণ স্থান দেয়া হল। সে বলবে, হে প্ৰভু! আমি এতে খুশি আছি। তাকে বলা হবে, তোমাকে এই পরিমাণ দেয়া হল এবং তার দশ গুণ দেয়া হল। সে বলবে, হে প্ৰভু! আমি সন্তুষ্ট হলাম। তাকে বলা হবে, এ ব্যতীতও তোমার আত্মা যা কামনা করবে এবং তোমার চোখ যা পেয়ে শীতল হবে তাও তোমাকে দেয়া হবে। সহীহঃ মুসলিম (৬/৪৫-৪৬) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। কিছু বর্ণনাকারী শা'বী হতে, তিনি মুগীরাহ (রাযিঃ) হতে, এই সনদে এ হাদীস বর্ণনা করেছেন, কিন্তু মারফুরূপে নয়। তবে মারফুরূপে বর্ণিত হাদীসটি অনেক বেশি সহীহ।
3199। কাবুস ইবনু আবূ যাবইয়ান (রহঃ) বলেন যে, তার পিতা তাকে বলেছেন, আমরা ইবনু আব্বাস (রাঃ)-কে প্রশ্ন করলামঃ আপনি কি বলেন, আল্লাহ তা'আলার বাণী “আল্লাহ তা'আলা কোন ব্যক্তির বক্ষে দুটি হৃদয় তৈরী করেননি" (সূরাঃ আল-আহ্যাব-৪), এর অর্থ কি? তিনি বললেন, একদিন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উঠে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করলেন। নামাযে তার কিছু (ওয়াসওয়াসা জাতীয়) ক্রটি হয়। যেসব মুনাফিক তার সাথে নামায আদায় করে তারা একে অপরকে বলল, তোমরা কি দেখতে পাচ্ছ না যে, তার দুটি হৃদয় আছে? একটি হৃদয় তোমাদের সাথে, অন্যটি হৃদয় তাদের সাথে থাকে। এই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেনঃ “কোন ব্যক্তির বক্ষে আল্লাহ তা'আলা দুটি হৃদয় তৈরী করেননি”। সনদ দুর্বল আবদ ইবনু হুমাইদ-আহমাদ ইবনু ইউনুস হতে তিনি যুহাইর (রহঃ) সূত্রে উপরের হাদীসের মতই হাদীস বর্ণনা করেছেন। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান। এ সনদটিও দুর্বল
3200। আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, আমার চাচা আনাস ইবনু নাযর- যার নামানুসারে আমার নাম রাখা হয়েছে- বলেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। ব্যাপারটি তার নিকট অসহনীয় লাগছিল। তিনি বলেন, মুশরিকদের সাথে প্রথম যে যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত ছিলেন আমি তাতে অনুপস্থিত রইলাম। আল্লাহর কসম! যদি তিনি আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কোন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার সুযোগ দেন তবে আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই দেখবেন আমি কি করি। এ কথা বলার সাথে সাথে তার ভয় হল যে, তিনি বিপরীতের কিছু বলেন কি না। পরবর্তী বছর তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে উহুদের যুদ্ধে শরীক হন। উহুদে যেতে পথিমধ্যে সা’দ ইবনু মুআয (রাযিঃ)-এর সাথে তার দেখা হয়। তিনি প্রশ্ন করেন, হে আবূ আমর! কোথায় যাচ্ছ? তিনি বললেন, আহা! জান্নাতের ঘ্রাণের দিকে। আমি উহুদের দিকে তা অনুভব করছি। (বর্ণনাকারী বলেন), তিনি যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হন। তার শরীরে আশিরও বেশি জখম ছিল। এর মধ্যে কিছু ছিল তরবারির আঘাত, কিছু বর্শার আঘাত এবং কিছু তীরের আঘাত। আমার ফুফু রুবাই বিনতু নাযর (রাযিঃ) বলেন, জখমের কারণে আমি আমার ভাইকে চিনতে পারছিলাম না। শুধু তার আঙ্গুলের গোছা দেখেই তাকে চিনতে পেরেছি। তার সম্পর্কেই এ আয়াত অবতীর্ণ হলঃ (অনুবাদ) “ঈমানদার ব্যক্তিদের মধ্যে কিছু লোক আল্লাহ তা'আলার সাথে তাদের কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছে, তাদের কেউ কেউ নিজের ইচ্ছা পূর্ণ করেছে (শহীদ হয়েছে) এবং কেউ অপেক্ষায় রয়েছে। তারা নিজেদের অঙ্গীকারে কোন পরিবর্তন করেনি"- (সূরা আহযাব ২৩)। সহীহঃ মুসলিম (৬/৪৫-৪৬) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3201। আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তার চাচা বদরের যুদ্ধে অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি (চাচা) বলেন, এটাই ছিল প্রথম যুদ্ধ যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুশরিকদের বিরুদ্ধে পরিচালনা করেন। অথচ এই প্রথম যুদ্ধেই আমি অংশগ্রহণ করতে পারলাম না। আল্লাহ তা'আলা যদি ভবিষ্যতে মুশরিকদের বিরুদ্ধে আমাকে কোন যুদ্ধে অংশগ্রহণের সুযোগ দেন, তবে তিনি দেখবেন আমি কি করি। তারপর উহুদের যুদ্ধে মুসলিমরা পরাজয়ের সম্মুখীন হলে তিনি বলেন, “হে আল্লাহ! মুশরিকরা যে বিপদ নিয়ে এসেছে আমি তা হতে তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আর মুসলিমরা যা করেছে সে প্রসঙ্গে তোমার নিকট ওজরখাহি করছি।" তারপর তিনি সামনে আগালেন। তার সঙ্গে সা'দ (রাযিঃ)-এর সাক্ষাৎ হলে তিনি বলেন, হে ভাই! তুমি কি করছ, আমি তোমার সাথে আছি। (সা'দ বলেন) কিন্তু সে যা করল আমি তা করতে ব্যর্থ হলাম। তার দেহে আশির বেশি জখম পাওয়া গেল। এর কতগুলো ছিল তরবারির আঘাত, কতগুলো বর্শার আঘাত এবং কতগুলো তীরের আঘাত। আমরা বলাবলি করতাম যে, তার ও তার বন্ধুদের বিষয়ে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছেঃ (অনুবাদ) তাদের ভিতর কেউ কেউ ইচ্ছা পূর্ণ করেছে এবং কেউ সময় আসার অপেক্ষায় রয়েছে"- (সূরা আহযাব ২৩)। সহীহঃ বুখারী (২৮০৫) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ)-এর চাচার নাম আনাস ইবনু নাযর।
3202। মূসা ইবনু ত্বালহা (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি মুআবিয়াহ (রাযিঃ)-এর নিকট প্রবেশ করলে তিনি বললেন, আমি কি তোমাকে একটি সুসংবাদ শুনাব না? আমি বললাম, হ্যাঁ অবশ্যই। তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ যারা নিজেদের ইচ্ছা পূর্ণ করেছে, ত্বালহা (রাযিঃ) তাদের দলে। হাসানঃ ইবনু মা-জাহ (১২৬) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি গারীব। আমরা শুধু উল্লেখিত সনদসূত্রে মু'আবিয়াহ (রাযিঃ) হতে এ হাদীস জেনেছি এবং এটি মূসা ইবনু ত্বালহা হতে তার বাবার সনদে বর্ণিত হয়েছে।
3203। তালহা (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণ এক মূৰ্খ বেদুঈনকে বলল, তুমি গিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রশ্ন কর, “যারা নিজেদের মানৎ পূর্ণ করেছে" দ্বারা কাদের বুঝানো হয়েছে? সাহাবীগণ সরাসরি তার নিকট এ কথা প্রশ্ন করতে সাহস পাননি। তারা তাকে সম্মান ও সমীহ করতেন। বিদুঈন তার নিকট ব্যাপারটা জিজ্ঞেস করলে তিনি মুখ ফিরিয়ে নেন। সে আবারো তাকে প্রশ্ন করলে তিনি এবারও মুখ ফিরিয়ে নেন। সে আবারো তাকে প্রশ্ন করলে তিনি এবারও মুখ ফিরিয়ে নেন। তারপর আমি মসজিদের দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। আমার পরনে ছিল সবুজ কাপড়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দেখে বললেনঃ প্রশ্নকারী কোথায়, যে মানৎ পূর্ণকারীদের বিষয়ে প্রশ্ন করেছে? বেদুঈন বলল, হে আল্লাহর রাসূল! এই আমি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যারা নিজেদের মানৎ পূর্ণ করেছে এ লোক (ত্বালহা) তাদের একজন। হাসান সহীহঃ সহীহাহ (১/৩৬) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। আমরা শুধু ইউনুস ইবনু বুকাইরের সনদে এ হাদীস জেনেছি।
3204আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তার সহধর্মিণীগণকে (তার স্ত্রীত্বে থাকার বা পার্থিব ভোগবিলাস গ্রহণ করার) এখতিয়ার দেয়ার নির্দেশ দেয়া হলে তিনি প্রথমে আমাকেই প্রশ্ন করেন। তিনি বলেন, হে ‘আয়িশাহ! তোমাকে একটি কথা বলতে চাচ্ছি। তুমি ধীরস্থিরভাবে উত্তর দিবে, তাড়াহুড়া করবে না এবং প্রয়োজনে তোমার বাবা-মার সাথেও শলা-পরামর্শ করবে। আয়িশাহ (রাযিঃ) বলেন, তিনি ভাল করেই জানতেন যে, আমার পিতামাতা কখনো আমাকে তার হতে পৃথক হওয়ার অনুমতি দিবেন না। আয়িশাহ (রাযিঃ) বলেন, তারপর তিনি বললেন যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে নবী! তোমার স্ত্রীদের বল, তোমরা যদি পার্থিব জীবন ও তার চাকচিক্য কামনা কর তবে এসো, আমি তোমাদের কিছু ভোগসামগ্ৰী দিয়ে ভদ্রভাবে বিদায় করে দেই। আর যদি তোমরা আল্লাহ, তার রাসূল ও আখিরাতের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য লাভ করতে চাও, তবে তোমাদের ভিতর যারা সৎকর্মশীল তাদের জন্য আল্লাহ তা'আলা মহান পুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন"- (সূরা আহযাব ২৮-২৯)। আমি বললাম, আমি কি বিষয়ে আমার পিতা-মাতার সাথে পরামর্শ করব! আমি তো আল্লাহ, তার রাসূল ও আখিরাতের জীবনই কামনা করি। আয়িশাহ (রাযিঃ) বলেন, আমি যে উত্তর দিয়েছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অপর স্ত্রীগণও একই রকম উত্তর দেন। সহীহঃ বুখারী (৪৭৮৬), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। ইমাম যুহরী (রহঃ) উরওয়াহ (রাহঃ) হতে এবং তিনি আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে এই সূত্রেও এ হাদীস বর্ণিত আছে।
3205। উমার ইবনু আবী সালামাহ্ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, যিনিরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আশ্রয়ে লালিত পালিত হন। তিনি বলেন, উম্মু সালামাহ (রাযিঃ)-এর ঘরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হল (অনুবাদ) “আল্লাহ তা'আলা তো চান আহলে বাইত হতে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে”– (সূরা আহযাবঃ ৩৩), তখন তিনি ফাতিমাহ, হাসান ও হুসাইন (রাযিঃ)-কে ডাকলেন এবং তাদেরকে একটি কম্বলের ভিতর ঢেকে নিলেন। আলী (রাযিঃ) তার পিছনে ছিলেন। তিনি তাকেও কম্বলের ভিতর নিয়ে নিলেন। তারপর তিনি বললেনঃ “হে আল্লাহ! এরা আমার আহলে বাইত' (পরিবারের সদস্য)। তুমি তাদের ভিতর হতে অপরিচ্ছন্নতা দূর করে দাও এবং সম্পূর্ণরূপে পরিচ্ছন্ন করে দাও।” উম্মু সালামাহ (রাযিঃ) বলেন, হে আল্লাহর নবী! আমিও কি তাদের অন্তর্ভুক্ত? তিনি বললেনঃ তুমি স্ব-স্থানে থাক এবং তুমি কল্যাণের মধ্যেই আছ। সহীহঃ রাওয়ূন নায়ীর (৯৭৬, ১১৯০), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, আমর ইবনু আবূ সালামাহ হতে আতার রিওয়ায়াত হিসেবে এ হাদীসটি গারীব।
3206। আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছয় মাস পর্যন্ত এই চর্চা ছিল যে, তিনি ফজরের নামাযের জন্য ফাতিমা (রাঃ)-এর ঘরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় বলতেনঃ “হে আহলে বাইত! তোমরা নামায কায়িম কর। আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছা করেন, তোমাদের নবীর ঘরের লোকদের মধ্য হতে ময়লা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে”। যঈফ, প্রাগুক্ত আবূ ঈসা বলেনঃ উল্লেখিত সনদসূত্রে এ হাদীসটি হাসান গারীব। আমরা শুধুমাত্র হাম্মাদ ইবনু সালামার সূত্রেই এ হাদীস জেনেছি। এ অনুচ্ছেদে আবূল হামরাআ, মাকিল ইবনু ইয়াসার ও উম্মু সালামা (রাঃ) হতেও হাদীস বর্ণিত আছে।
3207। আইশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি ওয়াহীর কোন অংশ গোপন করতেন তাহলে এই অংশ গোপন করতেনঃ “স্মরণ কর, যার প্রতি আল্লাহ তা'আলা (ইসলাম গ্রহণ করার) অনুগ্রহ করেছেন এবং আপনিও যার উপর (দাসত্বমুক্ত করে) অনুগ্রহ করেছেন আপনি তাকে বলেছেন, তুমি তোমার স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখ এবং আল্লাহ্ তা'আলাকে ভয় কর। আপনি আপনার মনের মধ্যে যে কথা লুকিয়েছেন, তা আল্লাহ তা'আলা প্রকাশ করে দিচ্ছেন। আপনি লোকভয় করছিলেন, অথচ আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করা আপনার পক্ষে অধিকতর সংগত। পরে যাইদ যখন তার (যাইনাবের) সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে (যাইনাবকে) আপনার নিকট বিয়ে দিলাম, যেন মুমিনদের পালিত ছেলেরা নিজ স্ত্রীর সাথে বিবাহ সূত্র ছিন্ন করলে সেই সব নারীদের বিবাহ করায় মু'মিন লোকদের কোন অসুবিধা না থাকে। আল্লাহ্ তা'আলার নির্দেশ কার্যকারী হয়েই থাকে" (সূরাঃ আল-আহযাব-৩৭)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাকে (যাইনাবকে) বিয়ে করলেন তখন লোকেরা বলতে লাগল, তিনি নিজের ছেলের বিবিকে বিয়ে করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ “মুহাম্মাদ তোমাদের পুরুষ লোকদের মধ্যে কারো পিতা নন, বরং আল্লাহর রাসূল ও সর্বশেষ নবী" (সূরাঃ আল-আহ্যাব- ৪০)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে পালিত পুত্র বানিয়েছিলেন। তিনি (যাইদ) তখন বালক ছিলেন। তিনি তার কাছে থাকলেন এবং ধীরে ধীরে বেড়ে উঠলেন। তাকে যাইদ ইবনু মুহাম্মাদ বলে ডাকা হত। এর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ “পালিত ছেলেদেরকে তোমরা তাদের পিতার সাথে সম্পর্ক সূত্রে ডাকো, এটা আল্লাহ্ তা'আলার নিকটে বেশি ন্যায়সংগত। আর তোমরা যদি তাদের পিতার পরিচয় না জান, তবে তারা তোমাদের দীনী ভাই এবং সাখী" (সূরাঃ আল-আহযাব- ৫) অর্থাৎ অমুক অমুকের বন্ধু এবং অমুক অমুকের ভাই। এটাই আল্লাহ্ তা'আলার নিকট বেশি ন্যায়সংগত কথা অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলার নিকটে বেশি ন্যায়ানুগ কথা। সনদ অত্যন্ত দুর্বল আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি গারীব। অন্য এক সূত্রে এ হাদীস আইশা (রাঃ) হতে সংক্ষিপ্ত আকারে বর্ণনা করেছেন। আইশা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি ওয়াহীর কোন অংশ গোপন করতেন, তবে এই আয়াত গোপন করতেনঃ যখন তুমি সেই ব্যক্তিকে বলেছিলে, যার প্রতি আল্লাহ তা'আলা এবং তুমি অনুগ্রহ করেছিলে..." আয়াতের শেষ পর্যন্ত। এ সূত্রে হাদীসটি বিস্তারিত আকারে বর্ণিত হয়নি। এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন আব্দুল্লাহ ইবনু ওয়াযযাহ হতে।
3208। আয়িশাহ্ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি ওয়াহীর কোন অংশ গোপনকারী হতেন, তাহলে অবশ্যই তিনি এ আয়াত গোপন করতেন (অনুবাদ): “যখন তুমি সে লোককে বলেছিলে যার প্রতি আল্লাহ তা'আলা এবং তুমি দয়া করেছিলে....."— (সূরা আহযাব ৩৭) শেষ পর্যন্ত। সহীহঃ বুখারী ও মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3209। ইবনু উমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, আমরা যাইদ ইবনু হারিসাহ না ডেকে বরং যাইদ ইবনু মুহাম্মাদ ডাকতাম। অবশেষে নাযিল হলঃ “তোমরা তাদেরকে তাদের পিতার পরিচয়ে ডাকো। এটাই আল্লাহ তা'আলার নিকট বেশি ন্যায়সঙ্গত”– (সূরা আহযাব ৫)। সহীহঃ বুখারী (৪৭৮২), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3210। আমির আশ-শাবী (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি আল্লাহর বাণীঃ “মুহাম্মাদ তোমাদের মধ্যে কোন পুরুষের পিতা নন" (সূরাঃ আল-আহযাব- ৪০) প্রসঙ্গে বলেনঃ এ আয়াতের ভাবার্থ হচ্ছেঃ তোমাদের মাঝে তার কোন ছেলে সন্তান জীবিত থাকবে না। যঈফ, সনদ বিচ্ছিন্ন
3211। উম্মু উমারাহ আল-আনসারিয়্যাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেনঃ আমি (কুরআনে) প্রতিটি প্রসঙ্গ পুরুষদের জন্যই উল্লেখিত দেখতে পাচ্ছি। অথচ মহিলাদের প্রসঙ্গে কোন বিষয়ে আলোচনা দেখছি না। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ) “নিশ্চয় যেসব পুরুষ ও স্ত্রীলোক মুসলিম, মু'মিন, আল্লাহ তা'আলার অনুগত, সত্য পথের পথিক, ধৈর্যশীল, আল্লাহ তা’আলাকে ভয়কারী, এবং বেশি পরিমাণে আল্লাহ তা'আলাকে মনে করে, আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপুরস্কার রেখেছেন"- (সূরা আহযাব ৩৫)। সনদ সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। উল্লেখিত সনদেই শুধু আমরা এ হাদীস জেনেছি।
3212। আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, (অনুবাদ) “তুমি (নবী) নিজের মনে সে কথা লুকিয়ে রেখেছিলে, যা আল্লাহ তা'আলা প্রকাশ করবেন”— (সূরা আহযাব ৩৭), এ আয়াত তখন অবতীর্ণ হয় যাইদ (রাযিঃ) যখন যাইনাব বিনতু জাহশ (রাযিঃ) প্রসঙ্গে অভিযোগ করতে এলেন। তিনি যাইনাবকে ত্বালাক দেয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট অনুমতি চান। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ “তোমার স্ত্রীকে স্বীয় বিবাহধীনে রাখ এবং আল্লাহ তা'আলাকে ভয় কর”— (সূরা আহ্যাব ৩৭)। সহীহঃ বুখারী (৭৪২০) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি সহীহ।
3213। আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, যাইনাব বিনতু জাহশ সম্পর্কে যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হলঃ (অনুবাদ) “তারপর যাইদ যখন তার (যাইনাবের) সাথে বিয়ের সম্পর্ক শেষ করল তখন আমরা তাকে (যাইনাবকে) তোমার কাছে বিয়ে দিলাম,” তখন যাইনাব বিনতু জাহশ (রাযিঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর স্ত্রীদের সামনে গর্ব ভরে বলতেন, তোমাদেরকে তোমাদের পরিবারের লোকেরা বিয়ে দিয়েছেন, আর আমাকে বিয়ে দিয়েছেন সাত আসমানের উপর হতে আল্লাহ তা'আলা। সহীহঃ মুখাতাসার আল-উলুয়ি (৮৪/৬), বুখারী। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3214। আবূ তালিব-কন্যা উম্মু হানী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বিয়ে করার পয়গাম পাঠান। আমি তাকে নিজের অক্ষমতা জানালাম। তিনি আমার আপত্তি গ্রহণ করলেন। তারপর আল্লাহ তা'আলা আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ “হে নবী! আমরা তোমার জন্য বৈধ করেছি তোমার সেই স্ত্রীদের, যাদের মোহরানা তুমি আদায় করেছ এবং সেই মহিলাদেরকেও (বৈধ করেছি), যারা আল্লাহ্ তা'আলার দেয়া দাসীদের মধ্য হতে তোমার মালিকানাভুক্ত হয়েছে, তোমার সেই চাচাতো, ফুফাতো ও মামাতো বোনদেরকেও (বৈধ করেছি), যারা তোমার সাথে হিযরাত করে এসেছে, সেই মু'মিন মহিলাকেও, যে নিজেকে নবীর জন্য হেবা করে, যদি নবী তাকে বিয়ে করতে চায়। এই সুবিধাদান বিশেষভাবে তোমার জন্য, অন্যান্য ঈমানদার লোকদের জন্য নয়" (সূরাঃ আল-আহযাব- ৫০)। রাবী (উম্মু হানী) বলেনঃ এ কারণেই আমি তার জন্য বৈধ ছিলাম না। কেননা আমি তার সাথে হিযরাত করিনি, আমি ছিলাম তুলাকাভুক্ত। সনদ অত্যন্ত দুর্বল আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান সহীহ। আমরা শুধু উল্লেখিত সূত্রেই সুদ্দীর হাদীস হিসেবে জেনেছি।
3215। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হিযরাতকারিনী মু’মিন স্ত্রীলোকদের ছাড়া অন্য স্ত্রীলোকদেরকে বিয়ে করতে মানা করা হয়েছে। অতএব আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “এরপর তোমার জন্য কোন নারী হালাল নয় এবং তোমার স্ত্রীদের পরিবর্তে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করারও অনুমতি নেই, যদিও তাদের রূপ সৌন্দর্য তোমাকে মুগ্ধ করে। তবে তোমার অধিকারভুক্ত দাসীদের ব্যাপার স্বতন্ত্র" (সূরাঃ আল-আহযাব- ৫২)। আল্লাহ তা'আলা তোমাদের মু'মিন দাসীদের বৈধ করেছেন। "এবং সেই মু’মিন নারীকেও (বৈধ করা হয়েছে) যে নিজেকে নবীর জন্য হেবা করে” (সূরা আল-আহযাব- ৫০)। মুসলিম স্ত্রীলোক ব্যাতিত অন্যান্য ধর্মের স্ত্রীলোকদের বিয়ে করা তার জন্য অবৈধ করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ "কেউ ঈমান অস্বীকার করলে তার সকল কর্মফল নিস্ফল হবে এবং আখিরাতে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে" (সূরাঃ আল-মায়িদাহ – ৫)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেছেনঃ “হে নবী! আমরা তোমার জন্য বৈধ করেছি তোমার সেই স্ত্রীদের যাদের মোহরানা তুমি পরিশোধ করেছ, সেই মহিলাদেরকেও যারা আল্লাহ তা'আলার দেয়া দাসীদের মধ্য হতে তোমার মালিকানাভুক্ত হয.... এই বিশেষ সুবিধা শুধু তোমাকেই দেয়া হয়েছে, মুমিনদেরকে নয়" (সূরাঃ আল আহযাব- ৫০)। এ ছাড়া অন্য সব ধরনের মহিলাদের অবৈধ করা হয়েছে। সনদ দুর্বল আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান। আমরা শুধু আব্দুল হামীদ ইবনু বাহরামির রিওয়ায়াত হিসেবেই এ হাদীস জেনেছি। আমি আহমাদ ইবনুল হাসানকে বলতে শুনেছি, ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রাহঃ) বলেন, শাহর ইবনু হাওশাবের সূত্রে আবদুল হামীদ ইবনু বাহরামের বর্ণিত হাদীসে আপত্তির কিছু নেই।
3216। আয়িশাহ (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তিকালের পূর্বেই এ সব স্ত্রীলোক তার জন্য হালাল করা হয়। সনদ সহিহ। আবু ঈসা বলেন, এ হাদিসটি হাসান।
3217। আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি তার সদ্য বিয়ে করা স্ত্রীর ঘরের দরজায় এসে দেখেন যে, তার ঘরে কিছু সংখ্যক লোক কথাবার্তায় ব্যস্ত। তিনি ফিরে গেলেন এবং নিজের কিছু কাজ করলেন। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর তিনি আবার ফিরে এলেন। তখনো তার ঘরে লোকেরা আলাপে লিপ্ত ছিল। তিনি এবারও ফিরে গেলেন এবং নিজের কিছু কাজ করলেন। তিনি আবার তার ঘরের দিকে রাওয়ানা হলেন। এ সময়ের মধ্যে তারা সেখান হতে চলে গেছে। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি ঘরের মধ্যে ঢুকে আমার ও তার মধ্যে একটি পর্দা ঝুলিয়ে দিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমি এ ঘটনা আবূ ত্বালহা (রাযিঃ)-এর নিকট বর্ণনা করলাম। তিনি বললেন, তুমি যা বলছ তা যদি ঠিক হয়, তবে এ বিষয়ে নিশ্চয়ই কোন আয়াত অবতীর্ণ হবে। বর্ণনাকারী বলেন, এই প্রেক্ষিতেই পর্দা সম্পর্কিত আয়াত (সূরা আহযাব ৫৩-৫৫) অবতীর্ণ হয়। সহীহঃ বুখারী (৫১৬৬, ৫৪৬৬, ৬২৩৮) অনুরূপ। আবূ ঈসা বলেন, উল্লেখিত সনদসূত্রে এ হাদীসটি হাসান গারীব।
3218। আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিয়ে করলেন এবং নিজের ঘরে গেলেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমার মা উম্মু সুলাইম (রাযিঃ) হাইস (খেজুর, ঘি ও ছাতু সহযোগে এক প্রকার মিষ্টান্ন) বানালেন। তিনি একটি ছোট পাত্রে তা রেখে বললেন, হে আনাস! এটা নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট যাও। তাকে বল, এটা আমার মা আপনার জন্য পাঠিয়েছেন, আর তিনি আপনাকে সালাম জানিয়েছেন এবং বলেছেন, হে আল্লাহর রাসূল! এটা আমাদের দিক হতে আপনার জন্য একটি নগণ্য উপহার। বর্ণনাকারী বলেন, আমি এই হাইস’ নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট গেলাম এবং বললাম, আমার মা আপনাকে সালাম জানিয়েছেন এবং তিনি বলেছেন, এটা আমাদের দিক হতে আপনার জন্য খুব সামান্য উপহার। তিনি বললেনঃ এটা রাখ। তারপর তিনি বললেনঃ তুমি গিয়ে অমুক, অমুক ও অমুক লোককে এবং পথিমধ্যে যাদের সঙ্গে তোমার কথা হবে তাদেরকেও দা'ওয়াত দিয়ে নিয়ে আস। তিনি কয়েক লোকের নামও বলে দিলেন। আনাস (রাযিঃ) বলেন, তিনি যাদের নাম উল্লেখ করে বলে দিয়েছেন এবং পথিমধ্যে আমার সঙ্গে যাদের দেখা হয়েছে আমি তাদের সবাইকে দাওয়াত করে নিয়ে এলাম। অধঃস্তন বর্ণনাকারী (জা'দ আবূ উসমান) বলেন, আমি আনাস (রাযিঃ)-কে প্রশ্ন করলাম, তাদের মোট সংখ্যা কত ছিল? তিনি বললেন, প্রায় তিন শত। আনাস (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেনঃ হে আনাস! ছোট পাত্রটি নিয়ে এসো। আনাস (রাযিঃ) বলেন, দাওয়াতকৃত ব্যক্তিরা এলে তাদের ভীড়ে চত্বর ও হুজরাহ ভরে গেল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ দশ দশজন করে গোলাকারে বসে যাও এবং প্রতিটি লোক যেন নিজের নিকটের দিকে থেকে খায়। বর্ণনাকারী বলেন, লোকেরা পরিতৃপ্তি সহকারে খেল। একদল খেয়ে চলে গেলে অপর দল খেতে বসত। এভাবে সবাই আহার করল। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি আমাকে বললেনঃ হে আনাস! পাত্রটি তুলে নিয়ে যাও। আনাস (রাযিঃ) বলেন, আমি তা উঠিয়ে নিলাম, কিন্তু বলতে পারব না, যখন আমি হাইসের পাত্র রেখে ছিলাম তখন কি তাতে অনেক হাইস ছিল না যখন তুলে নিলাম তখন বেশী ছিল! আনাস (রাযিঃ) বলেন, দাওয়াতকৃতদের গল্পে রত কিছু লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘরে বসে আলাপে রত রইল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বিদায় হওয়ার অপেক্ষায় বসে রইলেন। তার স্ত্রী দেয়ালের দিকে মুখ করে বসে রইলেন। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য একটি বিরক্তিকর বোঝা হল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উঠে গিয়ে তার স্ত্রীদের সালাম করলেন, তারপর আবার ফিরে এলেন। তারা যখন দেখল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিরে আসছেন, তখন তারা অনুভব করল যে, তারা তার জন্য বিরক্তির বিষয় হয়ে পড়েছে। অতএব তারা সকলে উঠে দরজা দিয়ে বের হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে পর্দা ছেড়ে দিয়ে হুজরায় প্রবেশ করলেন। আমি হুজরার মধ্যে (পর্দার এ পাশে) বসে থাকলাম। কিছু সময় পর তিনি বের হয়ে আমার নিকট এলেন। তখন নিম্নের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইরে বের হয়ে গিয়ে লোকদের সামনে তা পড়লেনঃ (অনুবাদ) “হে ঈমানদারগণ! তোমরা বিনা অনুমতিতে নবীর ঘরের মধ্যে প্রবেশ করো না এবং আহারের জন্য এসে অপেক্ষায় বসে থেকো না। যদি তোমাদের আহারের জন্য দাওয়াত দেয়া হয় তবে অবশ্যই আসবে, কিন্তু খাওয়া-দাওয়া শেষ করার সাথে সাথে সরে পড়বে এবং কথাবার্তায় মাশগুল হবে না। তোমাদের এ ধরনের আচরণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দুঃখ দেয় কিন্তু সে লজ্জায় কিছুই বলে না। আর আল্লাহ তা'আলা সত্য কথা বলতে লজ্জা বোধ করেন না। নবীর স্ত্রীদের নিকট তোমাদের কিছু চাওয়ার প্রয়োজন হলে পর্দার আড়াল হতেই তাদের নিকট তা চাও। তোমাদের এবং তাদের অন্তরের পবিত্রতা রক্ষার জন্য এটাই ভাল কাজ। আল্লাহ তা'আলার রাসূলকে কষ্ট দেয়া এবং তার ইন্তিকালের পর তার স্ত্রীদের বিয়ে করা তোমাদের জন্য কখনো জায়িয নয়। এটা আল্লাহ তা'আলার নিকট অতি বড় গুনাহ।” (সূরা আহযাব ৫৩) জা'দ (রহঃ) বলেন, আনাস (রাযিঃ) বলেছেন, আমিই সকলের আগে এ আয়াত প্রসঙ্গে অবগত হই এবং সেদিন হতেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীগণ পর্দা করেন। সহীহঃ বুখারী, মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। জা'দ হলেন উসমানের পুত্র। তাকে দীনারের ছেলেও বলা হয়। তার উপনাম আবূ উসমান আল-বসরী। হাদীস বিশারদদের মতে তিনি সিকাহ বর্ণনাকারী। ইউনুস ইবনু উবাইদ, শুবাহ ও হাম্মাদ ইবনু যাইদ (রাহঃ) তার সনদে হাদীস বর্ণনা করেছেন।
3219। আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এক স্ত্রীর সাথে বাসর যাপন করলেন। তিনি লোকদেরকে বিয়ের অনুষ্ঠানের দাওয়াত দেয়ার জন্য আমাকে পাঠান। আমি লোকদের খাবারের দা'ওয়াত দিলাম। লোকেরা আহার করে বেরিয়ে চলে গেলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়িশাহ (রাযিঃ)-এর ঘরের দিকে গেলেন। তিনি দুই ব্যক্তিকে বসা দেখে আবার ফিরে এলেন। তারপর লোক দুটি উঠে চলে গেল। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা বিনা অনুমতিতে নবীর ঘরে ঢুকো না এবং আহারের অপেক্ষায়ও বসে থেকো না। তবে তোমাদের খাওয়ার দা'ওয়াত করা হলে তোমরা অবশ্যই আসবে, কিন্তু আহার শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরে পড়বে এবং কথাবার্তায় মাশগুল হবে না”— (সূরা আহযাব ৫৩)। সহীহঃ বুখারী (৪৭৯১, ৬২৩৯, ৬২৭১) অনুরূপ। এ হাদীসে দীর্ঘ ঘটনা রয়েছে। আবূ ঈসা বলেন, বাইয়ানের রিওয়ায়াত হিসেবে এটা হাসান গারীব হাদীস। সাবিত (রাহঃ) আনাস (রাযিঃ) হতে এ হাদীস দীর্ঘাকারে বর্ণনা করেছেন।
3220। আবূ মাসউদ আল-আনসারী (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট আসলেন। আমরা এ সময় সা'দ ইবনু উবাদাহর মাজলিসে হাযির ছিলাম। বাশীর ইবনু সা'দ (রাযিঃ) তাকে বললেন, আল্লাহ তা'আলা আপনার উপর দরূদ পড়ার জন্য আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা কিভাবে আপনার উপর দরূদ পড়ব? বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিচুপ রইলেন। এমনকি আমাদের মনে হল, আমরা যদি তাকে জিজ্ঞেস না করতাম। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা বল- “আল্লাহুমা সল্লি 'আলা মুহাম্মাদিও ওয়া 'আলা আ-লি মুহাম্মাদিন কামা সল্লাইতা 'আলা ইবরাহীম, ওয়া বারিক 'আলা মুহাম্মাদিও ওয়া আলা আ-লি মুহাম্মাদিন কামা বারাকতা 'আলা ইবরাহীমা ফিল আলামীন। ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ।” আর সালাম তো সেভাবেই যেভাবে তোমাদেরকে শেখানো হয়েছে। সহীহঃ সিফাতুস সালাত, সহীহ আবূ দাউদ (৯০১), মুসলিম। এ অনুচ্ছেদে আলী, আবূ হুমাইদ, কাব ইবনু উজরাহ, তালহা ইবনু উবাইদুল্লাহ, আবূ সাঈদ, যাইদ ইবনু খারিজাহ বা জারিয়াহ এবং বুরাইদাহ (রাযিঃ) হতেও হাদীস বর্ণিত আছে। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3221। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেনঃ মূসা (আঃ) খুবই লজ্জাশীল লোক ছিলেন। তিনি নিজের শরীর ভালভাবেই ঢেকে রাখতেন। লজ্জার কারণে তার গায়ের কোন অংশই প্রকাশ পেত না। বনী ইসরাঈলের মন্দ প্রকৃতির কয়েক লোক তাকে বিভিন্নভাবে দুঃখ দিত। এরা বলত, তার এভাবে দেহ ঢেকে রাখার কারণ তার গায়ের কোন সমস্যা আছে অথবা তার গায়ে ধবল রোগ আছে অথবা তার অণ্ডকোষ খুব বড় অথবা অন্য কোন সমস্যা আছে। আল্লাহ তা'আলা তাদের এসব অপবাদ হতে তাকে মুক্ত করার ইচ্ছা করলেন। মূসা (আঃ) এক দিন একাকী নিজের পোশাক খুলে তা একটি পাথরের উপর রেখে গোসল করতে নামলেন। গোসল শেষে তিনি কাপড় নেয়ার জন্য উঠে এলে পাথরটি তার কাপড়সহ দৌড়াতে থাকে। মূসা (আঃ) নিজের লাঠি তুলে নিয়ে পাথরের পিছে পিছে ছোটেন এবং বলতে থাকেনঃ হে পাথর! আমার কাপড় (ফিরিয়ে দাও), হে পাথর! আমার কাপড় (ফিরিয়ে দাও)। এই বলে পাথরের পিছু ধাওয়া করতে করতে তিনি বনী ইসরাঈলের একটি দলের নিকট পৌছে গেলেন। তারা তাকে বস্ত্রহীন অবস্থায় দেখতে পেল। তারা তার সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সুষ্ঠ সুন্দর দেখল। আল্লাহ তাকে তাদের অপবাদ হতে সম্পূর্ণ মুক্ত করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ পাথর থেমে গেল এবং তিনি তার বস্ত্র নিয়ে পরিধান করলেন। তিনি নিজের লাঠি দিয়ে পাথরটিকে আঘাত করতে লাগলেন। আল্লাহর কসম! পাথরের উপর তার লাঠির আঘাতের তিন, চার অথবা পাঁচটি দাগ পড়ে গেল। এ প্রসঙ্গেই আল্লাহ তা'আলা ফরমানঃ “হে ঈমানদারগণ যেসব ব্যক্তি মূসাকে দুঃখ দিয়েছিল তোমরা তাদের মত হয়ো না। আল্লাহ তা'আলা তাদের বানানো কথাবার্তা হতে তার নির্দোষিতা প্রমাণ করেছেন। তিনি আল্লাহ তা'আলার নিকট সম্মানের পাত্র ছিলেন"- (সূরা আহযাব ৬৯)। সহীহঃ বুখারী ও মুসলিম আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। এ হাদীসটি আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ)-এর বরাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে একাধিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
3222। ফারওয়াহ ইবনু মুসাইক আল-মুরাদী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার গোত্রের যেসব ব্যক্তি অগ্রসর হয়েছে (ইসলাম গ্রহণ করেছে) তাদেরকে নিয়ে আমি কি আমার গোত্রের পিছে পড়া ব্যক্তিদের (ইসলাম প্রত্যাখ্যানকারীদের) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না? বর্ণনাকারী বলেন, তিনি আমাকে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অনুমতি দিলেন এবং আমাকেই আমীর নিযুক্ত করলেন। আমি তার নিকট হতে বিদায় নিয়ে আসার পর তিনি আমার প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেনঃ গুতাইকী কোথায়? তাকে জানানো হল যে, আমি চলে গেছি। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি আমার পিছে পিছে এক লোক পাঠিয়ে আমাকে আবার ফিরিয়ে আনলেন। আমি যখন ফিরে আসি তখন তিনি তার সাহাবা পরিবেষ্টিত অবস্থায় ছিলেন। তিনি বললেনঃ তুমি তোমার গোত্রের লোকদের প্রথমে ইসলামের দা'ওয়াত দিবে। তাদের মধ্যে কেউ ইসলাম গ্রহণ করলে তা তুমি অনুমোদন করবে। আর যে লোক ইসলাম গ্রহণ করবে না, আমার পরবর্তী আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে অন্ত্র ধারণ করার বিষয়ে ধৈর্যহারা হবে না। রাবী বলেন, তারপর সাবা প্রসঙ্গে যা অবতীর্ণ হওয়ার ছিল তা নাযিল হল। এক লোক বলল, হে আল্লাহর রাসূল! সাবা কি? কোন এলাকার নাম না কোন স্ত্রীলোকের নাম? তিনি বললেনঃ কোন এলাকারও নাম নয় বা কোন স্ত্রীলোকেরও নাম নয়, বরং একজন পুরুষ ব্যক্তির নাম। তার ঔরসে আরবের দশজন লোক জন্মগ্রহণ করে। তাদের ছয়জন ইয়ামানে (দক্ষিণ দিকে) এবং চারজন সিরিয়ায় (বা দিকে) বসতি স্থাপন করে। বা দিকের ব্যক্তিদের নাম হলঃ লাখম, জুযাম, গাসসান ও আমিলা (গোত্র)। আর ডান দিকে গড়ে উঠা বংশের নাম হলঃ আযদ, আশ'আরী, হিমইয়ার, কিনদাহ্, মাযহিজ ও আনমার। এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আনমার কওমের ব্যক্তি কারা? তিনি বললেনঃ খাস'আম ও বাজীলাহ বংশের লোকেরা এদের দলে। হাসান সহীহ। হাদীসটি ইবনু আব্বাসের বরাতেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত আছে। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব।
3223। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা'আলা যখন আসমানে কোন নির্দেশ ঘোষণা করেন, তখন ফেরেশতারা এই আদেশের উপর আনুগত্য প্রদর্শনার্থে ভয় ও বিনম্রতার সাথে নিজেদের পাখায় শব্দ করেন। মনে হয় যেন পাখাগুলো শিকলের মতো মসৃণ পাথরের উপর আঘাত করছে। তাদের মন হতে ভয়ের ভাব কেটে গেলে তারা একে অপরকে প্রশ্ন করেনঃ “তোমাদের প্রতিপালক কি বললেন? তারা বলেন, তিনি সঠিক বলেছেন। তিনি তো অতীব মহান ও শ্রেষ্ঠ”— (সূরা সাবা ২৩)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শাইতানেরা তখন একে অপরের কাছে সমবেত হয় (উর্ধ্ব জগতের কথা শুনার জন্য)। সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (১৯৪), বুখারী। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3224। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এক দল সাহাবীর সঙ্গে বসা ছিলেন। এমন সময একটি উল্কা পতিত হল এবং আলোকিত হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এরূপ উল্কাপাত হতে দেখলে তোমরা জাহিলী যুগে কি বলতে? তারা বলল, আমরা বলতাম, কোন মহান লোকের মৃত্যু হবে অথবা কোন মহান লোকের জন্ম হবে (এটা তারই আলামাত)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ কোন লোকের মৃত্যু অথবা জন্মগ্রহণের আলামাত হিসেবে এটা পতিত হয় না, বরং মহা বারাকাতময় ও মহিমান্বিত নামের অধিকারী আমাদের প্রতিপালক যখন কোন আদেশ জারী করেন তখন আরশ বহনকারী ফেরেশতারা তার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করেন। তারপর তাদের নিকটতম আসমানের অধিবাসীরা তাসবীহ পড়তে থাকে। এভাবে তাসবীহ ও মহিমা ঘোষণার ধারা এই নিম্নবর্তী আসমানে এসে পৌছে যায়। তারপর ষষ্ঠ আসমানের অধিবাসীরা সপ্তম আসমানের অধিবাসীদের প্রশ্ন করেন, তোমাদের প্রতিপালক কি বলেছেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তারা তাদেরকে ব্যাপারটি জানান। এভাবে প্রত্যেক আসমানের অধিবাসীরা তাদের উপরের আসমানের অধিবাসীদের একইভাবে প্রশ্ন করেন। এভাবে পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে এ খবর পৌছে যায়। শাইতানেরা এ তথ্য শুনবার জন্য ওঁৎ পেতে থাকে। তখন এদের উপর উল্কা ছুড়ে মারা হয়। এরা কিছু তথ্য এদের সহগামীদের নিকট পাচার করে। এরা যা সংগ্রহ করে তা তো সত্য, কিন্তু তারা এতে কিছু পরিবর্তন ও কিছু বৃদ্ধি ঘটায়। সহীহঃ মুসলিম (৭/৩৬-৩৭) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। ইমাম যুহরী (রহঃ) এ হাদীস আলী ইবনু হুসাইনের সূত্রে ইবনু আব্বাস হতে তিনি একদল আনসার সাহাবীর সনদে বর্ণনা করেছেন। তারা বলেছেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত ছিলাম.... হাদীসের শেষ অবধি। এটি আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন আল-হুসাইন ইবনু হুরাইস-ওয়ালীদ ইবনু মুসলিম হতে, তিনি আওযাঈ হতে।
3225। আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ (অনুবাদ) “তারপর আমাদের বান্দাদের ভিতর হতে বাছাই করা ব্যক্তিদেরকে আমরা এ কিতাবের উত্তরাধিকারী বানিয়েছি। তাদের কেউ নিজেদের উপরই যুলমকারী হয়েছে, কেউ মধ্যম পন্থা অবলম্বন করেছে এবং কেউ আল্লাহ তা'আলার অনুমতিক্রমে নেক কাজসমূহে অগ্রগামী হয়েছে"- (সূরা ফাত্বির ৩২)। এ প্রসঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এ আয়াতে বর্ণিত তিন শ্রেণীর ব্যক্তিরা একই মর্যাদা সম্পন্ন (মু'মিন) এবং এরা সকলেই জান্নাতবাসী। সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি গারীব হাসান। আমরা এ হাদীসটি শুধুমাত্র উক্ত সনদেই জেনেছি।
3226। আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, বানু সালিমাহ বংশের বসতি মাদীনার এক পাশে ছিল। তারা সেখান হতে তাদের বসতি তুলে মসজিদে নাবাবীর নিকট চলে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। এই কারণে এ আয়াত অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ): “আমরা নিশ্চয়ই মৃতকে জীবিত করি এবং তারা যা আগে পাঠায় আর যা পিছনে রেখে যায় আমরা তা লিখে রাখি"- (সূরা ইয়াসীন ১২)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমাদের পদচিহ্ন লেখা হবে। অতএব তোমরা বসতি স্থানান্তর করো না। সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (৭৮৫) আবূ ঈসা বলেন, সাওরী (রহঃ)-এর বর্ণনা হিসেবে এ হাদীসটি হাসান গারীব। আবূ সুফইয়ানের নাম তরীফ আস-সাদী।
3227। আবূ যার (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, সূর্য ডুবার সময় আমি মসজিদে ঢুকলাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন (মসজিদে) বসা ছিলেন। তিনি বললেনঃ হে আবূ যার! তুমি কি জান, এটা (সূর্য) কোথায় যায়? বর্ণনাকারী বলেন, আমি বললাম, আল্লাহ ও তার রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেনঃ এটা গিয়ে সিজদার অনুমতি প্রার্থনা করে। তাকে সিজদার অনুমতি দেয়া হয়। এমন এক দিন আসবে যখন তাকে বলা হবে, তুমি যেখানে এসেছ সেখান হতে উদিত হও। অতএব তা অস্ত যাওয়ার স্থান হতে উদিত হবে। বর্ণনাকারী বলেন, তারপর তিনি পড়েনঃ “এটাই তার একমাত্র আশ্রয়স্থল"- (সূরা ইয়াসীন ৩৮)। বর্ণনাকারী বলেন, এটা আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদের কিরআত। সহীহঃ বুখারী, এটি (২১৮৬) নং হাদীসের পুনরাবৃত্তি। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3228। আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন লোককে কোন মতবাদের দিকে ডেকেছে, তাকে কিয়ামতের দিন থামানো হবে, সে মাত্র এক ব্যক্তিকে সেদিকে ডেকে থাকলেও। তাকে তার আহবানের পরিণতি ভোগ না করিয়ে রেহাই দেয়া হবে না। তারপর তিনি আল্লাহ্ তা'আলার কিতাবের এই আয়াত পাঠ করেনঃ “এই লোকদের একটু থামাও, এদের নিকট কিছু প্রশ্ন করার আছে। তোমাদের কি হল, তোমরা এখন পরস্পরের সাহায্যে এগিয়ে আস না কেন?" (সূরাঃ আস-সাফফাত- ২৪-২৫) যঈফ, তা’লীকুর রাগীব (১/৫০) যিলালুল জুন্নাহ (১১২) আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান গারীব।
3229। উবাই ইবনু কাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ “আমরা তাকে (ইউনুস) এক লাখ বা ততোধিক লোকের নিকটে পাঠালাম" (সূরাঃ আস-সাফফাত- ১৪৭) প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলাম। তিনি বলেনঃ (এক লাখ) বিশ হাজার। সনদ দুর্বল আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি গারীব।
3230। সামুরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ “আমরা তার (নূহের) বংশধরদের বাঁচিয়ে রাখলাম বংশপরম্পরায়" (সূরাঃ আস-সাফফাত- ৭৭)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেনঃ এরা হল হাম, সাম ও ইয়াফিস। সনদ দুর্বল আবূ ঈসা বলেনঃ তা’ অথবা ‘সা’ অক্ষর সহযোগে ইয়াফিত-ও বলা হয় এবং ইয়াফিস-ও বলা হয়, ইয়াফুসও বলা হয়। এ হাদীসটি হাসান গারীব। আমরা শুধুমাত্র সাঈদ ইবনু বাশীরের সূত্রেই হাদীসটি জেনেছি।
3231। সামুরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আরবদের আদি পিতা সাম, হাবশীদের (আবিসিনীয়াদের) আদি পিতা হাম এবং রূমীয়দের (বাইজানটাইনদের) আদি পিতা ইয়াফিস। যঈফ, যঈফা
3232। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আবূ তালিব রোগাক্রান্ত হলে কুরাইশরা তার নিকটে আসে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও আসেন। আবূ তালিবের নিকট এক ব্যক্তির বসার মত স্থান ছিল। আবূ জাহল তাকে মানা করতে উঠে। রাবী বলেনঃ এসব লোক আবূ তালিবের নিকট রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে। আবূ তালিব বলেন, হে ভাতিজা! তুমি তোমার জাতির নিকটে কি চাও? তিনি বললেনঃ আমি তাদের কাছে একটি বাক্য মেনে নেয়ার ইচ্ছা করছি। তারা এটা মেনে নিলে আরবরা তাদের মতানুবর্তী হবে এবং অনারবরা তাদেরকে জিযিয়া দিবে। আবূ তালিব বললেন, একটি বাক্য? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, একটি বাক্য। তিনি আবার বললেনঃ হে চাচা! আপনারা বলুন, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ"। তারা বলল, শুধু মাত্র একজন মা’বুদ? “এধরনের কথা তো আমরা নিকট অতীতের জাতিসমূহের নিকটে শুনিনি? এটা একটা অলীক উক্তিমাত্র" (সূরাঃ সা’দ- ৭)। রাবী বলেনঃ তাদের প্রসঙ্গে কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ “সা’দ। উপদেশে পূর্ণ কুরআনের শপথ! বরং এই সত্য প্রত্যাখ্যানকারী লোকেরাই চরম অহংকার ও হঠকারিতায় ডুবে আছে। এদের পূর্বে আমরা এমন কত জাতিকেই না ধ্বংস করেছি। তখন তারা চিৎকার করে উঠেছে। কিন্তু তখন আর মুক্তি পাওয়ার উপায় ছিল না। ........ এমন কথা তো আমরা নিকট অতীতের জাতিসমূহের নিকটে শুনিনি! এটা একটা অলীক কথামাত্র" (সূরাঃ সা’দ- ১-৭)। সনদ দুর্বল আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান সহীহ। ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ সুফইয়ান আ'মাশের সূত্রে অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন।
3233। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আজ রাতে আমার মহান ও বারাকাতময় প্ৰভু সবচেয়ে সুন্দর চেহারায় আমার নিকট এসেছেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমার মতে তিনি বলেছেনঃ ঘুমের মধ্যে স্বপ্নযোগে। তারপর তিনি বললেনঃ হে মুহাম্মাদ! তুমি কি জান, এ সময় উচ্চতর জগতের অধিবাসীরা কি নিয়ে বিবাদ করছে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি বললাম, না। তিনি তার হাত আমার দুই কাঁধের মধ্যখানে রাখলেন। এমনকি আমি আমার দুই স্তনের বা বুকের মাঝে এর শীতলতা অনুভব করলাম। আসমান-যামীনে যা কিছু আছে আমি তা অবগত হলাম। তিনি বললেনঃ হে মুহাম্মাদ! তুমি কি জান, এ সময় উচ্চতর জগতের অধিবাসীরা কি নিয়ে বিবাদ করছে? আমি বললামঃ হ্যাঁ, কাফফারাত নিয়ে বিবাদ করছে। কাফফারাত অর্থ “নামাযের পর মসজিদে বসে থাকা, নামাযের জামা'আতে উপস্থিতির জন্য হেঁটে যাওয়া এবং কষ্টকর সময়েও সুষ্ঠভাবে উযূ করা"। যে লোক এসব কাজ করবে সে কল্যাণের মধ্যে বেঁচে থাকবে, কল্যাণের সাথে মরবে এবং তার জন্ম দিনের মত গুনাহ হতে পবিত্র হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা আরো বললেনঃ হে মুহাম্মাদ! তুমি যখন সালাত আদায় করবে তখন এই দুআ পড়বেঃ “আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা ফি’লাল খাইরাতি ওয়া তারকাল মুনকারাতি ওয়া হুব্বাল মাসাকীনি ওয়া ইযা আরাদতা বি-ইবাদিকা ফিতনাতান ফাকবিযনী ইলাইকা গাইরা মাফতুনিনা” (হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট ভাল কাজ করার, খারাপ কাজ ত্যাগ করার এবং গারীব-নিঃস্বদের ভালবাসার মনোস্কামনা চাই। তুমি যখন তোমার বান্দাদের কঠিন পরীক্ষায় নিক্ষেপ করার ইচ্ছা কর, তখন আমাকে এ ফিতনায় জড়িয়ে পড়ার আগেই তোমার নিকট উঠিয়ে নাও)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেনঃ দারাজাত ও মর্যাদার স্তর বলতে বুঝায়ঃ সালামের প্রচার প্রসার ঘটানো, মানুষকে খাওয়ানো এবং রাতের অন্ধকারে মানুষ যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে তখন (তাহাজ্জুদ) নামায আদায় করা। সহীহঃ আয যিলা-ল (৩৮৮), তা’লীকুর রাগীব (১/৯৮, ১২৬/১)। আবূ ঈসা বলেন, বর্ণনাকারীগণ আবূ কিলাবাহ ও ইবনু আব্বাস (রাযিঃ)-এর মধ্যখানে আরও একজন বর্ণনাকারীর উল্লেখ করেছেন। কাতাদাহ এ হাদীস আবূ কিলাবাহ হতে, তিনি খালিদ ইবনুল লাজলাজ হতে, তিনি ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে, এই সনদে বর্ণনা করেছেন।
3234। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার প্রতিপালক প্রভু সর্বোত্তম চেহারায় আমার নিকট আসলেন। তিনি বললেনঃ হে মুহাম্মাদ। আমি বললাম, হে আমার রব! আমি উপস্থিত, আমি হাযির। তিনি প্রশ্ন করেনঃ উর্ধ্ব জগতের অধিবাসীরা কি নিয়ে বিবাদ করছে? আমি উত্তর দিলাম, প্ৰভু! আমি জানি না। তিনি তার হাত আমার দুই কাধের মধ্যখানে রাখলেন। এমনকি আমি এর শীতলতা আমার ভয় স্তনের মধ্যখানে (বুকে) অনুভব করলাম। পূর্ব-পশ্চিমের মাঝে যা কিছু আছে তা আমি জেনে নিলাম। অতঃপর তিনি বললেন, হে মুহাম্মাদ! আমি বললাম, হে আমার রব! আমি আপনার সামনে উপস্থিত আছি। তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, ঊর্ধ্বলোকের অধিবাসীরা কি নিয়ে বিতর্ক করছে? আমি জবাব দিলাম, মর্যাদা বৃদ্ধি, কাফফারাত লাভ, পদব্রজে জামাআতে যোগদান, কষ্টকর অবস্থায়ও উত্তমরূপে উযূ করা এবং এক ওয়াক্তের নামায আদায় করার পর পরের ওয়াক্তের নামাযের অপেক্ষায় থাকা ইত্যাদি বিষয়ে তারা বিতর্ক করছে (একে অপরকে অতিক্রম করার চেষ্টা করছে)। যে লোক এগুলোর হিফাযাত করবে সে কল্যাণের মধ্যে বেঁচে থাকবে, কল্যাণময় মৃত্যুবরণ করবে এবং তার জননী তাকে প্রসব করার সময়ের মত গুনাহ মুক্ত হয়ে যাবে। সহীহঃ দেখুন পূর্বের হাদীস। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান এবং উল্লেখিত সনদসূত্রে গারীব। মুআয ইবনু জাবাল ও ‘আবদুর রহমান ইবনু আয়িশ –এর বরাতেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। এ হাদীস মুআয ইবনু জাবাল (রাযিঃ)-এর বরাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে অনেক দীর্ঘাকারে বর্ণিত হয়েছে। তাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম। ফলে আমার গভীর ঘুম এসে গেল। ঘুমের ভিতর আমি আমার প্রতিপালককে সুন্দরতম চেহারায় দেখতে পেলাম। তিনি প্রশ্ন করলেন, উর্ধ্বজগতের অধিবাসীরা কি বিষয়ে বিবাদ করছে... শেষ পর্যন্ত।
3235। মু'আয ইবনু জাবাল (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, একদিন প্রত্যুষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সাথে ফজরের নামায আদায় করতে আসতে বাধাপ্রাপ্ত হন। এমনকি আমরা সূর্য উদিত হয়ে যাওয়ার আশংকা করলাম। তিনি তাড়াতাড়ি বের হয়ে এলে সালাতের জন্য ইকামাত দেয়া হল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংক্ষেপে সালাত আদায় করলেন। তিনি সালাম ফিরানোর পর উচ্চস্বরে আমাদেরকে ডেকে বললেনঃ তোমরা যেভাবে সারিবদ্ধ অবস্থায় আছ সেভাবেই থাক। তারপর তিনি আমাদের দিকে ফিরে বসলেন অতঃপর বললেনঃ সকালে তোমাদের নিকট আসতে আমাকে কিসে বাধাগ্রস্ত করেছে তা এখনই তোমাদেরকে বলছি। আমি রাত্রে উঠে উযূ করলাম এবং সামর্থ্যমত নামায পড়লাম। নামাযের মধ্যে আমি তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম। অতঃপর আমি ঘুমিয়ে পড়লাম, এমন সময় আমি আমার বারাকাতময় প্রভুকে খুব সুন্দর অবস্থায় (স্বপ্নে) দেখতে পেলাম। তিনি বললেন, হে মুহাম্মাদ। আমি বললামঃ প্ৰভু! আমি উপস্থিত। তিনি বললেন, উর্ধ্বজগতের অধিবাসীগণ (শীর্ষস্থানীয় ফেরেশতাগণ) কি ব্যাপারে বিতর্ক করছে? আমি বললামঃ প্ৰভু! আমি জানি না। আল্লাহ তা'আলা এ কথা তিনবার বললেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি তাকে দেখলাম যে, তিনি তার হাতের তালু আমার দুই কাঁধের মাঝখানে রাখলেন। আমি আমার বক্ষস্থলে তার হাতের আঙ্গুলের শীতলতা অনুভব করলাম। ফলে প্রতিটি জিনিস আমার নিকট আলোকোদ্ভাসিত হয়ে উঠল এবং আমি তা জানতে পারলাম। আল্লাহ তা'আলা বললেন, হে মুহাম্মাদ! আমি বললামঃ প্ৰভু! আমি আপনার নিকট হাযির। তিনি বললেন, উর্ধ্বজগতের বাসিন্দাগণ কি ব্যাপারে বিতর্ক করছে? আমি বললামঃ কাফফারাত প্রসঙ্গে (তারা বিতর্ক করছে)। তিনি বলেন, সেগুলো কি? আমি বললামঃ হেঁটে সালাতের জামা'আতসমূহে হাযির হওয়া, নামাযের পর মসজিদে বসে থাকা এবং কষ্টকর অবস্থায়ও উত্তমরূপে উযূ করা। তিনি বললেন, তারপর কি ব্যাপারে (তারা বিতর্ক করেছে)? আমি বললামঃ খাদ্যপ্রার্থীকে আহার্যদান, নম্রতার সাথে কথা বলা এবং রাতে মানুষ যখন ঘুমিয়ে পড়ে সেই সময় সালাত আদায় করা প্রসঙ্গে। আল্লাহ তা'আলা বললেন, তুমি কিছু চাও, বলঃ “হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে ভাল ও কল্যাণকর কাজ সম্পাদনের, মন্দ কাজসমূহ বর্জনের, দরিদ্রজনদের ভালবাসার তাওফীক চাই, তুমি আমায় ক্ষমা কর ও দয়া কর। তুমি যখন কোন গোত্রকে বিপদে ফেলার ইচ্ছা কর তখন তুমি আমাকে বিপদমুক্ত রেখে তোমার কাছে তুলে নিও। আমি প্রার্থনা করি তোমার ভালবাসা, যে তোমায় ভালবাসে তার ভালবাসা এবং এমন কাজের ভালবাসা যা তোমার ভালবাসার নিকটবর্তী করে দেয়।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ স্বপ্লটি অবশ্যই সত্য। অতএব তা পড়, তারপর তা শিখে নাও। সহীহঃ মুখতাসার আল উলুব্বি (১১৯/৮০), আয যিলা-ল (৩৮৮)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। আমি মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈলকে এ হাদীস প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে তিনি বললেন, এ হাদীস হাসান সহীহ। তিনি আরো বললেন, ‘আবদুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ ইবনু জাবির হতে ওয়ালীদ ইবনু মুসলিম বর্ণিত হাদীসের তুলনায় উক্ত হাদীস অনেক বেশী সহীহ। খালিদ ইবনুল লাজলাজ-আবদুর রহমান ইবনু আয়িশ আল-হাযরামী (রাযিঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি...। এ হাদীসটি সংরক্ষিত নয়। ওয়ালীদ তার হাদীসে একই রকম উল্লেখ করেছেন-আবদুর রহমান ইবনু আয়িশ (রাযিঃ) বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে শুনেছি। বিশর ইবনু বাকর এ হাদীস বর্ণনা করেছেন আবদুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ ইবনু জাবির এই সনদে আবদুর রহমান ইবনু আয়িশ (রাযিঃ)-এর বরাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে। এটি অনেক বেশী সহীহ। আবদুর রহমান ইবনু আয়িশ (রাযিঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে কিছু শুনেননি।
3236। আবদুল্লাহ ইবনুয যুবাইর (রাযিঃ) হতে তার বাবার সনদে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হল (অনুবাদ) তারপর কিয়ামতের দিন নিশ্চয় তোমরা নিজেদের প্রভুর সামনে পরস্পর বাক-বিতণ্ডায় জড়িত হবে”— (সূরা যুমারঃ ৩১), তখন যুবাইর (রাযিঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল পার্থিব জীবনে আমাদের মধ্যে যে ঝগড়া-বিবাদ হয়েছে তার মীমাংসা হওয়ার পর কি তার পুনরাবৃত্তি ঘটবে? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। যুবাইর (রাযিঃ) বললেন, তাহলে বিষয়টি তো খুবই কঠিন। হাসানঃ সহীহাহ (৩৪০) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3237। আসমা বিনতু ইয়াযীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ আয়াত পাঠ করতে শুনেছিঃ “হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের উপর যুলুম করেছ, আল্লাহ্ তা'আলার রহমত হতে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা সকল গুনাহ মাফ করে দিবেন" (সূরাঃ আয-যুমার- ৫৩)। তিনি (এ ব্যাপারে) কারো ভয় করেন না। সনদ দুর্বল আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান গারীব। আমরা হাওশাবের সূত্রে শুধুমাত্র সাবিত হতেই এ হাদীসটি জানতে পেরেছি। তিনি আরও বলেন, শাহর ইবনু হাওশাব উম্মু সালমা আনসারিয়া হতে হাদীস বর্ণনা করেন। উম্মু সালামা আন-সারিয়ার নাম আসমা বিনতু ইয়ামীদ।
3238। আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, জনৈক ইয়াহুদী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, হে মুহাম্মাদ। আল্লাহ তা'আলা আসমানসমূহ এক আঙ্গুলে, পাহাড়গুলো এক আঙ্গুলে, যামীনসমূহ এক আঙ্গুলে এবং অপরাপর সৃষ্টিকে এক আঙ্গুলে ধারণ করে বলবেনঃ আমিই রাজাধিরাজ। বর্ণনাকারী বলেন, তার এ কথায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে দিলেন, এমনিক তার সামনের মাড়ির দাঁতগুলো প্রকাশ হয়ে পড়ল। তিনি বলেনঃ “এই লোকেরা আল্লাহ তা'আলার যথোপযুক্ত কদর করল না। কিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবী তার মুঠোর মধ্যে আবদ্ধ থাকবে এবং আকাশমণ্ডলী তার ডান হাতে ভাঁজ করা অবস্থায় থাকবে”— (সূরা যুমার ৬৭)। সহীহঃ আয যিলা-ল (৫৪১, ৫৪৪), বুখারী ও মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3239। আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (ইয়াহুদীর কথায়) আশ্চর্য হয়ে এবং এর সমর্থন করে হেঁসে দিলেন। সহীহঃ প্রাগুক্ত। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3240। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ এক ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট দিয়ে যাচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ হে ইয়াহুদী! কিছু শুনাও। সে বলল, হে আবূল কাসিম যখন আল্লাহ তা'আলা আকাশসমূহ এক আঙ্গুলে, যমিনসমূহ এক আঙ্গুলে, পানি এক আঙ্গুলে, পাহাড়গুলো এক আঙ্গুলে এবং আর সকল সৃষ্টি এক আঙ্গুলে ধারণ করবেন এ প্রসঙ্গে আপনি কি বলেন? রাবী আবূ জাফর মুহাম্মাদ ইবনুস সালত তার হাত মুষ্টিবদ্ধ করে কনিষ্ঠা হতে বৃদ্ধ আঙ্গুলী পর্যন্ত ইঙ্গিত করে দেখালেন। এ প্রসঙ্গেই আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ “এই লোকেরা আল্লাহর প্রতি যতটুকু মর্যাদা দেয়া উচিত, তারা তাকে তা দেয়নি।” (সূরাঃ আয-যুমার-৬৭) যঈফ, প্রাগুক্ত আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান গারীব সহীহ। এটা শুধু উল্লেখিত সনদসূত্রেই আমরা জেনেছি। আবূ কুদাইনার নাম ইয়াহইয়া ইবনুল মুহাল্লাব। মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল এ হাদীস হাসান ইবনু শুজার সূত্রে, তিনি মুহাম্মাদ ইবনুস সালতের সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
3241। মুজাহিদ (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) (আমাকে) প্রশ্ন করেন, তুমি কি জান জাহান্নাম কত প্রশস্ত? আমি বললাম, না। তিনি বলেন, হ্যাঁ, আল্লাহর শপথ! তুমি জান না। আয়িশাহ (রাযিঃ) আমার নিকট বর্ণনা করেছেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিম্নের আয়াত প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেছিলেন (অনুবাদ) “কিয়ামতের দিন সমস্ত পৃথিবী তার কব্জার ভিতর থাকবে এবং আকাশমণ্ডলী তার ডান হাতে গুটানো থাকবে”— (সূরা যুমার ৬৭)। আয়িশাহ (রাযিঃ) বলেন, আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! সেদিন লোকেরা কোথায় থাকবে? তিনি বললেনঃ জাহান্নামের উপরকার পুলসিরাতের উপর। সনদ সহীহ এ হাদীসে একটি ঘটনা আছে। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ, উল্লেখিত সনদসূত্রে গারীব।
3242। আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! “কিয়ামতের দিন সমস্ত পৃথিবী তার হাতের মুষ্টিতে এবং আকাশমণ্ডলী থাকবে তার ডান হাতে ভাজ করা অবস্থায়"- (সূরা যুমার ৬৭), সেদিন মু’মিনগণ কোথায় থাকবে? তিনি বললেনঃ হে আয়িশাহ! পুলসিরাতের উপর। সহীহঃ দেখুন পূর্বের হাদীস। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3243। আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শিঙ্গা ফুৎকারকারী মুখে শিঙ্গা নিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে কান খাড়া করে অপেক্ষায় আছেন, শিঙ্গায় ফুঁ দেয়ার আদেশ পাওয়া মাত্র তিনি ফুঁ দিবেন। এ অবস্থায় আমি কিভাবে নিশ্চিন্তে আরামে বসে থাকতে পারি? মুসলিমরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কিভাবে দুআ করব? তিনি বললেনঃ তোমরা বলঃ “হাসবুনাল্লাহু ওয়া নিমাল ওয়াকীল, তাওয়াককালনা আলাল্লাহি রাব্বিনা” আল্লাহ-ই আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনিই আমাদের অতি উত্তম অভিভাবক, আমরা আমাদের রব আল্লাহ তা'আলার উপর নির্ভর করি। সুফইয়ান তার বর্ণনায় কখনো "তাওয়াককালনা 'আলাল্লাহ"-এর পরিবর্তে “আলাল্লাহি তাওয়াককালনা” বর্ণনা করেছেন। সহীহঃ সহীহাহ (১০৭৮, ১০৭৯) আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান। আ'মাশ হাদীসটি আতিয়্যার সূত্রে আবূ সাঈদ হতে বর্ণনা করেছেন।
3244। আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, এক বেদুঈন বলল, হে আল্লাহর রাসূল! সূর কি? তিনি বললেনঃ একটি শিং, তাতে ফুঁ দেয়া হবে। সহীহঃ সহীহাহ (১০৮০) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান। আমরা শুধু সুলাইমান আত-তাইনী কর্তৃক হাদীসটি সম্পর্কে জেনেছি।
3245। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, এক ইয়াহুদী মদীনার বাজারে উচ্চস্বরে বললঃ না! সেই সৃষ্টিকর্তার শপথ, যিনি মূসাকে মানবজাতির উপর মর্যাদা দিয়েছেন। বর্ণনাকারী বলেন, এক আনসার লোক এ কথা শুনার সাথে সাথে হাত তুলে ইয়াহুদীর মুখে থাপ্পর মেরে দেয়। সে বলল, তুমি এই কথা বলছ, অথচ আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মধ্যে বর্তমান আছেন? (উভয়ে মহানবীর নিকট উপস্থিত হলে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ “আর শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে। তখন আসমান-জামীনের সকলে মূৰ্ছিত হয়ে পড়বে, আল্লাহ তা’আলা যাকে জ্যান্ত রাখতে চান সে ছাড়া। তারপর আবার শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে। সহসা তারা দণ্ডায়মান হয়ে তাকাতে থাকবে”— (সূরা যুমার ৬৮)। আমিই সবার আগে মাথা তুলে দেখতে পাব যে, মূসা (আঃ) আরশের পায়াসমূহের একটি ধরে আছেন। আমি জানি না, তিনি কি আমার আগে মাথা তুলেছেন, না তিনি ঐ সব লোকের দলে যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা (জ্ঞানশূন্য হওয়া হতে) মুক্ত রেখেছেন। যে লোক বলে যে, আমি ইউনুস ইবনু মাত্তা (আঃ)-এর চেয়ে শ্ৰেষ্ঠ সে মিথ্যা বলে। হাসান সহীহঃ তাখরীজুত তাহাবিয়াহ (১৬২), বুখারী অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3246। আবূ সাঈদ ও আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ একজন ঘোষক (জান্নাতের মধ্যে) ঘোষণা দিবে, এখন হতে তোমরা জীবিত থাকবে, আর কখনো মরবে না। তোমরা সুস্থ থাকবে, কখনো অসুস্থ হবে না। তোমরা যুবক থাকবে, কখনো বৃদ্ধ হবে না। তোমরা অফুরন্ত ভোগবিলাসের ভিতর থাকবে, অভাব-অনটন কখনো তোমাদের স্পর্শ করবে না। এটাই আল্লাহ তা'আলার নিম্নোক্ত বাণীর তাৎপর্যঃ “তোমরা পার্থিব জীবনে যেসব কাজ করেছ তার বিনিময়ে এ জান্নাতের উত্তরাধিকারী হলে”— (সূরা যুখরুফ ৭২)। সহীহঃ মুসলিম (৮/১৪৮)। আবূ ঈসা বলেন, ইবনুল মুবারাক প্রমুখ সুফইয়ান সাওরীর সূত্রে এ হাদীস বর্ণনা করেছেন, কিন্তু মারফুরূপে নয়।
3247নুমান ইবনু বাশীর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ দু'আটাই হল ইবাদাত। তারপর তিনি পাঠ করেন (অনুবাদ) "তোমাদের রব বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো। আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব। যারা অহংকারবশতঃ আমার ইবাদাত হতে বিমুখ হয়, নিশ্চিত তারা অচিরেই লাঞ্চিত হয় জাহান্নামে যাবে”— (সূরা মু'মিন ৬০)। সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (৩৮২৮) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3248। ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, তিন লোক কা'বা ঘরের নিকট বিবাদ করে। তাদের দু'জন ছিল কুরাইশ বংশীয় এবং একজন সাকীফ বংশীয় অথবা দু’জন সাকীফ বংশীয় এবং একজন কুরাইশ বংশীয়। তাদের অন্তরে বুদ্ধি ছিল খুব অল্পই কিন্তু তাদের পেট ছিল মেদবহুল। তাদের একজন বলল, তোমাদের কি মনে হয়, আমরা যা বলি তা আল্লাহ তা'আলা শুনেন? দ্বিতীয় লোক বলল, আমরা জোরে বললে শুনেন, আস্তে বললে শোনে না, তৃতীয়জন বলল, আমরা জোরে কিছু বললে যদি তিনি তা শুনেন তাহলে আস্তে বা গোপনে বললেও তা শুনেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেন (অনুবাদ) “তোমাদের কান, চোখ ও ত্বক তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে না এই বিশ্বাসে তোমরা কিছুই গোপন করতে না। উপরন্তু তোমরা মনে করতে যে, তোমরা যা করতে তার অনেক কিছুই আল্লাহ তা'আলা জানেন না”— (সূরা হা-মীম আস্-সিজদাঃ ২২)। সহীহঃ বুখারী (৪৮১৬, ৪৮১৭, ৭৫২১), মুসলিম (৮/১২০-১২১)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3249। আবদুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, ‘আবদুল্লাহ (রাযিঃ) বলেছেনঃ আমি কা'বার পর্দার আড়ালে লুকিয়েছিলাম। তখন তিনজন লোক সেখানে আসে। তাদের পেট ছিল মেদবহুল এবং অন্তর ছিল কম বুদ্ধিসম্পন্ন। তাদের একজন ছিল কুরাইশ বংশীয় এবং অপর দু'জন ছিল তার জামাতা, সাকীফ বংশীয় কিংবা একজন ছিল সাকীফ বংশীয় এবং অপর দু'জন ছিল তার জামাতা, কুরাইশ বংশীয় তারা এমন কথাবার্তা বলতে লাগলো যা আমি বুঝিনি। তারপর তাদের একজন বলল, তোমরা কি মনে কর, আমাদের এসব আলাপ আল্লাহ তা'আলা শুনেন? দ্বিতীয় ব্যক্তি বলল, আমরা প্রকাশ্যে (জোরে) কিছু বললে তিনি তা শুনেন এবং উচ্চস্বরে না বললে শুনেন না। তৃতীয়জন বলল, তিনি যদি কোন কথা শুনেন তা হলে সব কথাই শুনেন। আবদুল্লাহ (রাযিঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে বিষয়টি উল্লেখ করলাম। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ (অনুবাদ) “তোমাদের কান, চোখ ও ত্বক তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে না এই বিশ্বাসে তোমরা কিছুই গোপন করতে না। উপরন্তু তোমরা মনে কর যে, তোমরা যা করতে তার অনেক কিছুই আল্লাহ তা'আলা জানেন না। তোমাদের রবের ব্যাপারে তোমাদের এ ধারণাই তোমাদের ধ্বংস এনেছে। ফলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছ"- (সূরা হা-মীম আস-সিজদা ২২-২৩)। সহীহঃ মুসলিম (৮/১২১) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। মাহমূদ ইবনু গাইলান-ওয়াকী হতে, তিনি সুফইয়ান হতে, তিনি আমাশ হতে, তিনি 'আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে উপরোক্ত হাদীসের একই রকম হাদীস বর্ণনা করেছেন।
3250। আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াত তিলাওয়াত করলেনঃ “যারা বলে, আমাদের রব আল্লাহ, তারপর তাতেই অবিচল থাকে" (সূরাঃ হা-মীম আস-সিজদা– ৩০)। তিনি বলেনঃ অনেক লোক এ কথা বলার পর কাফির হয়ে যায়। অতএব যে ব্যক্তি উল্লেখিত কথার উপর মারা যায় সে-ই অবিচলদের অন্তর্ভুক্ত। সনদ দুর্বল আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান গারীব। আমরা শুধু উপরোক্ত সূত্রেই এ হাদীস জেনেছি। আমি আবূ যুরআকে বলতে শুনেছি যে, আফফান (রহঃ) আমর ইবনু আলীর সূত্রে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। এ আয়াত প্রসঙ্গে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আবূ বাকর ও উমর (রাঃ) হতে “ইসতাকামূ” (অবিচল থাকে)-এর তাৎপর্য বর্ণিত আছে।
3251। তাউস (রহঃ) বলেন, ইবনু আব্বাস (রাযিঃ)-কে এ আয়াত প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হল (অনুবাদ) “বলুন, আমি এর (দাওয়াতের) বিনিময়ে তোমাদের নিকট হতে স্বজনদের সৌহার্দ্য ছাড়া অন্য কোন প্রতিদান চাই না"- (সূরা শুরা ২৩)। এ প্রসঙ্গে সাঈদ ইবনু যুবাইর (রহঃ) বলেন, কুরবা (আত্মীয়) অর্থ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরিবারের লোক। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) বলেন, তুমি কি জান না কুরাইশ বংশের যত শাখা-প্রশাখা আছে, তাদের সকলের সঙ্গে তার আত্মীয়তার সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল? তাই তিনি বলেছেন, তবে আমার ও তোমাদের মাঝে যে সম্পর্ক আছে তার কারণে আমার সাথে ভাল ব্যবহার কর। সহীহঃ বুখারী (৪৮১৮) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। আরো কয়েকটি সনদসূত্রে ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে এ হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
3252। মুররা গোত্রের কোন এক লোক হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ একদা আমি কূফায় পৌঁছে বিলাল ইবনু আবূ বুরদা প্রসঙ্গে অবহিত হলাম। আমি বললাম, তার এ শোকাভূত অবস্থাতে অবশ্যই কোন শিক্ষণীয় বিষয় আছে। তারপর আমি তার নিকটে আসলাম এবং তিনি ছিলেন তার নিজ তৈরী ঘরে বন্দি। তার সমস্ত মালসামান মারপিট ও নির্যাতনের ফলে পরিবর্তিত (উলেট-পালোট) হয়ে আছে। তার পরনের পোশাক ছিল ছিন্নভিন্ন। আমি বললাম, আলহামদুলিল্লাহ', হে বিলাল! আমি তোমাকে দেখেছি যে, তুমি আমাদের সামনে দিয়ে ধুলোবালি না থাকা সত্ত্বেও নাক চেপে চলে যেতে। আর আজ তোমার এ অসহায় অবস্থা! সে বলল, আপনি কোন গোত্রের লোক? আমি বললাম, মুররা ইবনু আব্বাদ গোত্রের। এবার তিনি বললেন, আমি কি আপনার নিকট একটি হাদীস বর্ণনা করব না, যার দ্বারা আশা করা যায় আল্লাহ তা'আলা আপনাকে উপকৃত করবেন? আমি বললাম, হ্যাঁ শুনাও সে হাদীস। তিনি বললেন, আবূ বুরদা তার পিতা আবূ মূসা (রাঃ)-এর সূত্রে এ হাদীস আমার নিকটে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ কোন বান্দার উপর ছোট-বড় যে কোন মুসিবতই আসে তা তার পাপের জন্যই আসে। আর আল্লাহ তা'আলা অনেক পাপই মাফ করে দেন। তিনি বললেন, তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াত পাঠ করেনঃ “আর যেসব বিপদ-আপদ তোমাদের উপর আপতিত হয়, তা তো তোমাদের স্বহস্তার্জিত কর্মেরই কারণে এবং অনেক পাপ তো তিনি ক্ষমা করে দেন।" (সূরাঃ আশ-শূরা-৩০) সনদ দুর্বল আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি গারীব। আমরা শুধু উপরোক্ত সনদসূত্রেই এ হাদীস জেনেছি।
3253। আবূ উমামাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন সম্প্রদায় হিদায়াতের রাস্তা পেয়ে আবার পথভোলা হয়ে থাকলে তা শুধু তাদের বিবাদ ও বাক-বিতণ্ডায় জড়িত হওয়ার কারণেই হয়েছে। তারপর তিনি এ আয়াত পাঠ করেন (অনুবাদ) “এরা শুধু বাকবিতণ্ডার উদ্দেশেই আপনাকে এ কথা বলে। বস্তুত এরা তো এক ঝগড়াটে সম্প্রদায়"- (সূরা যুখরুফ ৫৮)। হাসানঃ ইবনু মা-জাহ (৪৮) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। আমরা শুধু হাজ্জাজ ইবনু দীনারের সূত্রেই এ হাদীস জেনেছি। তিনি সিকাহ বর্ণনাকারী ও মধ্যম ধরনের হাদীস বিশারদ। আবূ গালিবের নাম হাযাওয়ার।
3254। মাসরূক (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, এক লোক 'আবদুল্লাহ (রাযিঃ)-এর নিকট এসে বলল, কোন এক বক্তা বলছে যে, যামীন হতে একটি ধোয়া বের হবে। তা কাফিরদের কান বধির করে দিবে এবং মু'মিনদের সর্দিতে আক্রান্ত করবে। মাসরূকু (রাহঃ) বলেন, এতে 'আবদুল্লাহ (রাযিঃ) রাগান্বিত হন। তিনি হেলান দিয়ে বসা ছিলেন, এবার সোজা হয়ে বসলেন, তারপর বললেন, তোমাদের কাউকে তার জ্ঞাত (বিষয়) সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে সে যেন তার উত্তর দেয় বা সেই প্রসঙ্গে অবহিত করে। আর তাকে তার না জানা বিষয় প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে সে যেন বলে, আল্লাহ তা'আলাই ভাল জানেন। কেননা এটাও লোকের জ্ঞানের কথা যে, তাকে এমন কোন ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলো যা সে জানে না, সে বলবে যে, আল্লাহ তা'আলাই ভাল জানেন। কেননা আল্লাহ তা'আলা তার নবীকে বলেছেনঃ “আপনি বলুন, আমি তোমাদের নিকট এর জন্য (হিদায়াতের বিনিময়ে) কোন পরিশ্রমিক চাই না এবং আমি কৃত্রিমতা প্রদর্শনকারীদের অন্তর্ভুক্ত নই”- (সূরা দুখান ৮৬)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দেখতে পেলেন যে, কুরাইশরা তার অবাধ্যতা ও বিরোধিতায় চরম পরাকাষ্ঠা দেখাচ্ছে, তখন তিনি বললেনঃ হে আল্লাহ ইউসুফ (আঃ)-এর সময়কার সাত বছরের দুর্ভিক্ষের মত এদেরকেও সাত বছর দুর্ভিক্ষে নিক্ষেপ করে আমাকে সাহায্য করুন। তারপর তাদের উপর দুর্ভিক্ষ ও অনাবৃষ্টি নেমে এলো এবং সব কিছু নিঃশেষ হয়ে গেল। এমনকি তারা চামড়া, হাড় ও মৃত জীব ভক্ষণ করতে লাগল। আবদুল্লাহ (রাযিঃ) বলেন, এ সময় মাটি হতে ধোয়ার মত এক পদার্থ বের হতে লাগল। বর্ণনাকারী বলেন, তখন আবূ সুফইয়ান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলেন, আপনার জাতি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং তাদের জন্য আল্লাহ তা'আলার দরবারে দু’আ করুন। 'আবদুল্লাহ (রাযিঃ) বলেন, এটাই আল্লাহ তা'আলার এই বাণীর “যেদিন স্পষ্টই ধোয়াচ্ছন্ন হবে এবং তা মানবজাতিকে গ্রাস করে ফেলবে, এটা হবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি” তাৎপর্য- (সূরা দুখান ১০-১১)। মানসূর (রাহঃ) বলেন, এটাই নিম্নোক্ত আয়াতের তাৎপর্যঃ “হে আমাদের রব! আমাদের উপর হতে শাস্তি দূরীভূত কর নিশ্চয় আমরা মুমিন”- (সূরা দুখান ১২)। আখিরাতের শাস্তি দূরীভূত করা হবে কি? আবদুল্লাহ (রাযিঃ) বলেন, ধরপাকড়, কঠিন বিপদ ও ধোঁয়া সবই অতিবাহিত হয়েছে। আ'মাশ ও মানসূরের মধ্যে একজন বলেন, চন্দ্র বিদীর্ণ হওয়ার ঘটনা অতিক্রান্ত হয়েছে এবং অপরজন বলেন, রোম বিজয়ের ঘটনা (অতিবাহিত হয়েছে)। সহীহঃ বুখারী ও মুসলিম আবূ ঈসা (রাহঃ) বলেন, লিযাম বলতে সেই হত্যা বুঝানো হয়েছে যা বদরের দিন সংঘটিত হয়েছে। এই হাদীসটি হাসান সহীহ।
3255। আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রত্যেক মুমিনের জন্যই উদ্ধ জগতে দু’টি দরজা আছে। একটি দরজা দিয়ে তার আমল উপরে উঠে যায় এবং অপরটি দিয়ে তার রিযিক নেমে আসে। তারপর সে যখন মারা যায় তখন দরজা দু’টি তার জন্য কাঁদে। এই পর্যায়ে আল্লাহ বলেনঃ “আসমান-যমিনে কেউ তাদের জন্য কাঁদেনি এবং তাদেরকে অবকাশও দেয়া হয়নি" (সূরা আদ-দুখান-২৯)। যঈফ, যঈফা (৪৪৯১) আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি গারীব। আমরা শুধু উপরোক্ত সনদেই এ হাদীস মারফু হিসেবে জেনেছি। মূসা ইবনু উবাইদা ও ইয়াযীদ ইবনু আবান আর-রাকাশী হাদীস শাস্ত্রে দুর্বল।
3256। আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাঃ)-এর ভাতিজা বলেনঃ লোকেরা যখন উসমান (রাঃ)-কে (খুনের) ইচ্ছা করল তখন আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাঃ) তার নিকটে আসলেন। উসমান (রাঃ) বললেন, আপনি কেন এসেছেন? তিনি বললেন, আপনার সাহায্যের জন্য। তিনি বলেন, আপনি ঘেরাওকারীদের নিকটে গিয়ে তাদেরকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে দিন এবং আপনার ভেতরে থাকার চাইতে বাইরে থাকা আমার জন্য বেশি উপকারী। রাবী বলেন, তারপর আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাঃ) লোকদের নিকটে এসে বললেন, হে জনমণ্ডলী জাহিলিয়া যুগে আমার অমুক নাম (হুসাইন) ছিল। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নাম রাখেন আবদুল্লাহ। আর আমার সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার কিভাবে কয়েকটি আয়াত অবতীর্ণ হয়। তার মধ্যে আমার সম্পর্কে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ আর বানু ইসরাঈলের একজন এর মতই কিতাব প্রসঙ্গে সাক্ষ্য দিয়েছে এবং এর প্রতি ঈমান এনেছে। অথচ তোমরা অহংকার প্রকাশ কর। আল্লাহ তা'আলা যালিমদেরকে হিদায়াত করেন না" (সূরাঃ আল-আহুকাফ- ১০)। তিনি আরো বলেন, আমার সম্পর্কে এ আয়াতও অবতীর্ণ হয়েছেঃ “আমার ও তোমাদের মাঝে সাক্ষী হিসেবে আল্লাহ তা'আলাই যথেষ্ট এবং সেই ব্যক্তি যার নিকটে কিতাবের জ্ঞান আছে" (সূরাঃ আর-রা’দ- ৪৩)। আল্লাহ্ তা'আলার একটি তরবারি আছে যা তোমাদের হতে গোপন আছে। আর এ শহরেই ফিরিশতারা তোমাদের প্রতিবেশী যেখানে তোমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসেছেন। অতএব এ লোকটিকে হত্যা সংঘটনে তোমরা আল্লাহ তা'আলাকে ভয় কর। আল্লাহ্ তা'আলার শপথ! তোমরা তাকে মেরে ফেললে তোমাদের প্রতিবেশী ফিরিশতারা এখান হতে দূরে চলে যাবে এবং আল্লাহ্ তা'আলার যে তরবারি তোমাদের হতে লুকায়িত আছে তা তোমাদের উপর আঘাত হানবে, তারপর কিয়ামত পর্যন্ত আর কোষবদ্ধ হবে না। রাবী বলেনঃ তার এ কথা শুনে ঘেরাওকারীদের একজন বলল, এই ইয়াহুদীকেও (আবদুল্লাহ ইবনু সালাম) মেরে ফেল এবং উসমানকেও মেরে ফেল। সনদ দুর্বল আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। শুআইব ইবনু সফওয়ান-আবদুল মালিক ইবনু উমাইর হতে তিনি, ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু সালাম হতে তিনি নিজ দাদা আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাঃ) সূত্রেও এ হাদীস বর্ণনা করেছেন।
3257। আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আকাশ মেঘাচ্ছন্ন দেখতেন তখন (অস্থির হয়ে) একবার সামনে যেতেন আবার পেছনে যেতেন। তারপর বৃষ্টি বর্ষিত হলে তার অস্থিরতা দূর হত। তিনি (আয়িশাহ) বলেন, আমি তাকে এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে তিনি বলেনঃ আমি জানি না, এটা সেই আযাব কি না যে প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “তারপর তারা যখন তাদের উপত্যকার দিকে মেঘ আসতে দেখল তখন বলতে লাগল, এ তো মেঘ, আমাদেরকে বৃষ্টি দান করবে”— (সূরা আহ্ক্বাফ ২৪)। সহীহঃ সহীহাহ (২৭৫৭) বুখারী, মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান।
3258। আলকামাহ্ (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি ইবনু মাসউদ (রাযিঃ)-কে প্রশ্ন করলাম, জিনের রাতে আপনাদের কেউ কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথী ছিলেন? তিনি বললেন, আমাদের কেউ তাঁর সঙ্গে ছিল না। তবে তিনি মক্কাতে থাকার সময় এক রাতে আমাদের হতে হারিয়ে গেলেন। আমরা বলাবলি করলাম, তাকে হত্যা করা হয়েছে অথবা অপহরণ করা হয়েছে, এরকম কিছু করা হয়েছে। আমরা খুবই অশান্তিতে রাত কাটালাম। তারপর খুব ভোরে হঠাৎ দেখলাম তিনি হেরা পর্বতের দিক হতে আসছেন। রাবী বলেনঃ তার নিকটে সকলে বিগত রাতের অস্থিরতার কথা বর্ণনা করলে তিনি বললেনঃ আমার নিকট জিনদের এক প্রতিনিধি এসেছিল। আমি তাদের কাছে গিয়ে কুরআন পাঠ করেছি। তারপর তিনি এগিয়ে গিয়ে তাদের বিভিন্ন প্রমাণ ও আগুনের চিহ্ন দেখান। শা'বী (রাহঃ) বলেনঃ জিনেরা তার নিকটে তাদের খাবার চাইল। তারা ছিল কোন এক উপদ্বীপের অধিবাসী। তিনি তাদের বলেনঃ যে সব হাড়ে আল্লাহ্ তা'আলার নাম নেয়া হয়েছে সেগুলো তোমাদের হাতে আসার সাথে সাথে গোশত পূর্ণ হয়ে যাবে, যেমন পূর্বে তা গোশতে পূর্ণ ছিল। আর সব রকমের বিষ্ঠা ও গোবর তোমাদের পশুর খাদ্য। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (আমাদেরকে) বললেনঃ তোমরা এগুলো ঢিলা হিসেবে ব্যবহার করবে না। কেননা এগুলো তোমাদের ভাই জিনদের খাদ্য। যে হাড়ে “আল্লাহর নাম নেয়া হয়েছে" এবং “তোমাদের পশুর খাদ্য” এই শব্দ ব্যতীত হাদীসটি সহীহ। যঈফাহ (১০৩৮) আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3259। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, “তোমার দোষের জন্য এবং ঈমানদার নারী-পুরুষদের জন্য তুমি ক্ষমা চাও”— (সূরা মুহাম্মাদ ১৯)। উক্ত আয়াত প্রসঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রতিদিন সত্তরবার ক্ষমা প্রার্থনা করি। সহীহঃ বুখারী (৬৩০৭), তাতে আছে সত্তর বারেরও বেশী ক্ষমা প্রার্থনা করি। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ)-এর সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অপর একটি হাদিসে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ .... আমি আল্লাহ তা'আলার নিকট দৈনিক এক শতবার ক্ষমা প্রার্থনা করি”। একাধিক সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত আছেঃ “নিশ্চয় আমি দৈনিক এক শতবার আল্লাহ তা'আলার কাছে ক্ষমা চাই! এ হাদীসটি মুহাম্মাদ ইবনু আমর-আবূ সালামাহ হতে, তিনি আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে এই সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
3260। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন (অনুবাদ): “যদি তোমরা বিমুখ হও, তাহলে তিনি অন্য জাতিকে তোমাদের স্থলবর্তী করবেন। তারপর তারা তোমাদের মত হবে না”— (সূরা মুহাম্মাদ ৩৮)। উপস্থিত সাহাবীগণ প্রশ্ন করেন, কোন লোকদেরকে আমাদের স্থলবর্তী করা হবে? বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালমান (রাযিঃ)-এর কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে বলেনঃ এ লোক ও তার জাতি, এ লোক ও তার জাতি। সহীহঃ সহীহাহ ২য় সংস্করণ (১০১৭) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি গারীব। এর সনদসূত্র প্রসঙ্গে বিরূপ মন্তব্য রয়েছে। ‘আবদুল্লাহ ইবনু জাফারও এ হাদীস 'আলা ইবনু আবদুর রহমান হতে বর্ণনা করেছেন।
3261। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কয়েকজন সাহাবী প্রশ্ন করেন, হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহ তা'আলা যে বলেছেন, যদি আমরা বিমুখ হই তবে আমাদের বাদে অন্যদেরকে প্রতিষ্ঠিত করা হবে, তারপর তারা আমাদের ন্যায় হবে না, সেসব ব্যক্তি কারা হবে? বর্ণনাকারী বলেন, সালমান ফারসী (রাযিঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটেই ছিলেন। সালমান (রাযিঃ)-এর উরুতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃদু আঘাত করে বলেন, ইনি ও তার সাথীরা। সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! ঈমান যদি সুরাইয়াহ নক্ষত্রের সাথেও ঝুলন্ত থাকত, তবুও পারস্যের কিছু ব্যক্তি তা নিয়ে আসত। সহীহঃ প্রাগুক্ত, বুখারী ও মুসলিমে হাদীসের শেষ অংশ বর্ণিত হয়েছে। আবূ ঈসা বলেন, ‘আবদুল্লাহ ইবনু জাফার ইবনু নাজীহ্ হলেন আলী ইবনুল মাদীনীর পিতা। ‘আলী ইবনু হুজর (রাহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু জাফরের সূত্রে অনেক কিছু বর্ণনা করেছেন। আমার নিকট এ হাদীস বর্ণনা করেছেন আলী (রাহঃ)-ইসমাঈল ইবনু জাফার ইবনু নাজীহ সূত্রে 'আবদুল্লাহ ইবনু জাফার হতে। বিশর ইবনু মুআয আবদুল্লাহ ইবনু জাফার হতে, তিনি আল-আলা হতে অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন তবে তাতে মানুতান শব্দের পরিবর্তে' মু'আল্লাকান শব্দ আছে।
3262। 'উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ) বলেন, এক সফরে আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলাম। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট কিছু বললে তিনি নির্বাক থাকেন। আমি আমার কথার পুনরাবৃত্তি করলে তিনি এবারও নীরব রইলেন। আমি আমার কথা পুনর্ব্যক্ত করলে এবারও তিনি নীরব থাকেন। অতএব আমি আমার জন্তুযান হাকিয়ে এক পাশে চলে গেলাম এবং মনে মনে বললাম, হে খাত্তাবের পুত্র! তোমার মা তোমাকে হারাক। তুমি তিন তিনবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রশ্ন করে বিরক্ত করলে, অথচ একবারও তিনি কথা বলেননি। এখন তোমার প্রসঙ্গে কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তিনি বলেন, মুহুর্তকাল অতিবাহিত না হতেই আমি শুনতে পেলাম, কে যেন চিৎকার করে আমাকে ডাকছে। অতএব আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এলাম। তিনি বললেনঃ হে ইবনুল খাত্তাব। আজ রাতে আমার উপর এমন একটি সূরা অবতীর্ণ হয়েছে, যার পরিবর্তে সারা জগতের সকল কিছু আমাকে দেয়া হলেও আমি তা পছন্দ করব না। সেই সূরাটি হল (অনুবাদ): “নিশ্চয়ই আমি তোমাকে দিয়েছি সুস্পষ্ট বিজয়"- (সূরা ফাত্হ ১)। সহীহঃ বুখারী (৪৮৩৭) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান, সহীহ গারীব। কোন কোন বর্ণনাকারী হাদীসটি মালিক হতে মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
3263। আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ হুদাইবিয়া হতে প্রত্যাবর্তনের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ “যেন আল্লাহ তা'আলা তোমার অতীত ও ভবিষ্যৎ ভুলসমূহ মাফ করেন”— (সূরা আল-ফাত্হ ২), তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমার উপর এমন একটি আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে যা আমার নিকটে দুনিয়ার সব কিছু হতে বেশি প্রিয়। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণের সামনে আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন। তারা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! মুবারাকবাদ! এটি আপনার জন্য অভিনন্দন। আপনার সাথে কেমন আচরণ করা হবে, তাতো আল্লাহ তা'আলা স্পষ্ট বলে দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের সাথে কেমন ব্যবহার করা হবে? তখন তার উপর এ আয়াত অবতীণ হয়ঃ “তা এজন্য যে, তিনি ঈমানদার পুরুষ ও মহিলাদের জান্নাতে দাখিল করাবেন, যার নিম্নদেশে প্রবাহিত হয় নহরসমূহ। সেখানে তারা অনন্তকাল থাকবে এবং তিনি তাদের পাপসমূহ মার্জনা করবেন। এটাই আল্লাহ তা'আলার সমীপে মহা সাফল্য।" (সূরা আল-ফাত্হ ২) সনদ সহীহ, বুখারী (৪৭১২) আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে মুবারকবাদ..... এই অংশটুকু মুরসাল, মুসলিম (৫/১৭৬) আনাস হতে ঐ অতিরিক্ত অংশ ব্যতীত, তা শাজ। আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান সহীহ এ অনুচ্ছেদে মুজাম্মি ইবনু জারিয়াহ্ (রাযিঃ) হতেও হাদীস বর্ণিত আছে।
3264। আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, একদা আশিজন কাফির ফজরের সময় তান'ঈম পাহাড় হতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবীগণকে হত্যা করার উদ্দেশে নেমে আসে। তারা সকলেই গ্রেপ্তার হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে ছেড়ে দিলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন (অনুবাদ) “তিনি সেই সত্তা যিনি (মক্কা উপত্যকায় তাদের উপর তোমাদেরকে বিজয়ী করার পর) তাদের হাত তোমাদের হতে এবং তোমাদের হাত তাদের হতে নিবারিত করেছেন। তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ তা'আলা তা দেখেন”- (সূরা ফাত্হ ২৪)। সহীহঃ সহীহ আবূ দাউদ (২৪০৮), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3265। উবাই ইবনু কাব (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলার বানী (অনুবাদ) “তিনি তাদেরকে তাকওয়ার বাক্যে সুদৃঢ় করলেন"- (সূরা ফাত্হ ২৬) প্রসঙ্গে বলেনঃ এ বাক্যের অর্থ হল, কালিমা “লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহ"। সহীহ আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি গারীব। আমরা শুধু হাসান ইবনু কাযা'আর সনদে এ হাদীস মারফুরূপে জেনেছি। এ হাদীস প্রসঙ্গে আমি আবূ যুর'আকে প্রশ্ন করলে তিনি উপর্যুক্ত সূত্র ব্যতীত এটিকে মারফুরূপে রিওয়ায়াত হওয়া প্রসঙ্গে অজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
3266। আবদুল্লাহ ইবনুয যুবাইর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, আল-আকরা ইবনু হাবিস রাসূলুল্লাহ -এর কাছে এলে আবূ বাকর (রাযিঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! তাকে তার গোত্রের কর্মকর্তা নিয়োগ করুন। উমার (রাযিঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! তাকে কর্মচারীর পদে নিয়োগ করবেন না। তারা পরস্পরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মুখে বিষয়টি নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হন এবং তাদের কণ্ঠস্বর চরমে পৌছে। আবূ বাকর (রাযিঃ) উমর (রাযিঃ)-কে বললেন, আমার বিরোধিতা করাই আপনার একমাত্র লক্ষ্য। উমার (রাযিঃ) বলেন, আমার লক্ষ্য আপনার বিরোধিতা করা নয়। বর্ণনাকারী বলেন, এ আয়াতটি তখন অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ): “হে ঈমানদারগণ! নবীর কণ্ঠস্বরের উপর তোমরা নিজেদের কণ্ঠস্বর উচু করো না"- (সূরা হুজুরাত ২)। বর্ণনাকারী বলেন, তারপর হতে উমর (রাযিঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কথা বললে তার কথা শুনা যেত না, এমনকি তা বুঝার জন্য আবার ব্যাখ্যা চাওয়ার প্রয়োজন হত। সহীহঃ বুখারী (হাঃ ৪৮৪৫, ৪৮৪৭)। আবূ ঈসা বলেন, ইবনুয যুবাইর তার নানা আবূ বাকর (রাযিঃ)-এর প্রসঙ্গ উল্লেখ করেননি। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। এ হাদীসটি কিছু বর্ণনাকারী ইবনু আবী মুলাইকাহর সূত্রে মুরসালরূপে বর্ণনা করেছেন এবং তাতে আবদুল্লাহ ইবনুয যুবাইর (রাযিঃ)-এর উল্লেখ করেননি।
3267। আল-বারাআ ইবনু আযিব (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, “যারা আপনাকে উচ্চস্বরে ঘরের বাইরে হতে ডাকে, তাদের বেশির ভাগই নির্বোধ"- (সূরা ফাত্হ ৪)। বর্ণনাকারী বলেন, জনৈক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার প্রসঙ্গে প্রশংসা হল সৌন্দর্য এবং আমার প্রসঙ্গে নিন্দা হল অপমান। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ মর্যাদা শুধুমাত্র মহান আল্লাহ তা'আলার। সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব।
3268। আবূ জুবাইরাহ ইবনুয যাহহাক (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমাদের কারো কারো দু'তিনটি নাম থাকতো। কোন কোন নামে সম্বোধন করা তাদের কাছে মন্দ লাগত। এ প্রসঙ্গেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ): “তোমরা একে অন্যকে মন্দ নামে সম্বোধন করো না....."— (সূরা ফাত্হ ১১)। সহীহঃ ইবনু মাজাহ (হাঃ ৩৭৪১)। আবূ ঈসা বলেন, এটি হাসান সহীহ হাদীস। আবূ জুবাইরাহ ইবনুয যাহহাক (রাযিঃ) হলেন সাবিত ইবনুয যাহহাক আল-আনসারী (রাযিঃ)-এর সহোদর ভাই। আল-হারাভীর সঙ্গী আবূ যাইদের নাম সাঈদ ইবনুর রাবী' বাসরার অধিবাসী নির্ভরযোগ্য রাবী। আবূ সালামাহ ইয়াহইয়া ইবনু খালফ-বিশর ইবনুল মুফাযযাল হতে, তিনি দাউদ ইবনু আবু হিন্দ হতে, তিনি শা'বী হতে, তিনি আবূ জুবাইরাহ ইবনুয যাহহাক (রাযিঃ) হতে উপরে বর্ণিত হাদীসের একই রকম বর্ণনা করেছেন। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3269। আবূ নাযরাহ্ (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাযিঃ) তিলাওয়াত করেন (অনুবাদ): “তোমরা জেনে রাখ যে, আল্লাহর রাসূল তোমাদের মাঝে আছেন। তিনি অনেক বিষয়ে তোমাদের কথা শুনলে তোমরাই ব্যথিত হতে, কিন্তু তোমাদের কাছে আল্লাহ তা'আলা ঈমানকে প্রিয় করেছেন এবং তাকে তোমাদের হৃদয়গ্রাহী করেছেন......”— (সূরা ফাত্হ ৭)। তারপর তিনি বলেন, ইনিই তোমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তার কাছে ওয়াহী পাঠানো হয় এবং তিনি হচ্ছে তোমাদের সবচেয়ে উত্তম নেতা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বহু বিষয়ে তাদের কথা শুনলে তারাই সমস্যায় পড়ে যেতেন। অতএব যদি আজকাল তোমাদের কথা শুনা হয় তাহলে কি পরিস্থিতি হবে! হাদীসটির সানাদ সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ গারীব। আলী ইবনুল মাদীনী বলেন, আমি ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ আল-কাত্তানের কাছে মুসতামির ইবনু রাইয়্যানের অবস্থা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন যে, তিনি নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী।
3270। ইবনু উমার (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত জনতার উদ্দেশে ভাষণ দেন এবং বলেনঃ হে জনমণ্ডলী! তোমাদের হতে আল্লাহ তা'আলা জাহিলিয়াত যুগের দম্ভ ও অহংকার এবং পূর্বপুরুষের গৌরবগাথা বাতিল করেছেন। এখন মানুষ দুই অংশে বিভক্তঃ এক দল মানুষ নেককার, পরহেজগার, আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রিয় ও সম্মানিত এবং অন্য দল পাপিষ্ঠ, দুর্ভাগা, আল্লাহ তা'আলার নিকট অত্যন্ত নিকৃষ্ট, নিচু ও ঘৃণিত। সকল মানুষই আদমের সন্তান। আল্লাহ তা'আলা আদম (আঃ)-কে মাটি দিয়ে তৈরী করেছেন। মহান আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “হে লোক সকল! তোমাদেরকে আমি একজন পুরুষ ও একজন নারী হতে তৈরী করেছি, তারপর বিভিন্ন বংশ ও গোত্রে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি, তোমরা যাতে একে অন্যকে চিনতে পার। যে লোক তোমাদের মাঝে বেশি পরহেজগার সেই আল্লাহ তা'আলার নিকট বেশী মর্যাদার অধিকারী। আল্লাহ তা'আলা সবকিছু সম্পর্কে জ্ঞাত, সব খবর রাখেন"- (সূরা ফাত্হ ১৩)। সহীহঃ সহীহাহ (হাঃ ২৭০০)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি গারীব। এ হাদীসটি আমরা শুধুমাত্র আবদুল্লাহ ইবনু দীনার হতে, তিনি ইবনু উমর (রাযিঃ) হতে, এ সনদেই জেনেছি। আবদুল্লাহ ইবনু জা'ফার হাদীস শাস্ত্রে অত্যন্ত দুর্বল। তাকে ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন প্রমুখ দুর্বল বলে আখ্যায়িত করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনু জাফার হলেন ‘আলী ইবনুল মাদীনীর বাবা। এ অনুচ্ছেদে আবূ হুরাইরাহ ও ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতেও হাদীস উল্লেখিত রয়েছে।
3271। সামুরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ধন-সম্পদ হল আভিজাত্যের প্রতীক এবং পরহেজগারী হল সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। সহীহঃ ইরওয়াহ (হাঃ ১৮৭০)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি সামুরাহ (রাযিঃ)-এর উদ্ধৃত হিসেবে হাসান, সহীহ গারীব। এ হাদীস আমরা শুধুমাত্র সাল্লাম ইবনু আবী মুত্ত্ব'-এর সনদে জেনেছি।
3272। আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ “অবিরত জাহান্নাম বলতে থাকবে, আরো আছে কি?” (সূরা কাফ ৩০)। অবশেষে জাহান্নামের উপর মহামহিম আল্লাহ তা'আলা তাঁর পা রাখবেন। তখন সে বলবে, যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে, আপনার ইজ্জতের কসম। তারপর তার এক ভাগ অপর ভাগের সঙ্গে কুঞ্চিত হয়ে যাবে। সহীহঃ জিলালুল জান্নাত (হাঃ ৫৩১, ৫৩৪), বুখারী, মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান, সহীহ এবং উপর্যুক্ত সূত্রে গারীব। এ অধ্যায়ে আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) সূত্রেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে হাদীস বর্ণিত আছে।
3273। আবূ ওয়ায়িল (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাবী'আহ গোত্রের এক লোক বলেন, আমি মাদীনায় পৌছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হলাম। তার নিকট আমি আদ জাতির দূত প্রসঙ্গে বললাম, আমি আদ জাতির দূতের মত হওয়া হতে আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রশ্ন করেন; আদ জাতির দূতের কি হয়েছিল? আমি বললাম, আপনি ওয়াকিফহাল ব্যক্তিরই সাক্ষাৎ পেয়েছেন। আদ জাতি দুর্ভিক্ষে পতিত হলে তারা কায়ল নামক এক লোককে প্রেরণ করে এবং সে (মাক্কার কাছাকাছি) বাকর ইবনু মু'আবিয়াহর বাড়ীতে উপস্থিত হয়। বাকর তাকে মদ পান করায় এবং তার সম্মুখে দুটি গায়িকা বাদী গান পরিবেশন করে। তারপর সে মাহরা (গোত্রের) অঞ্চলের পর্বতমালায় যাওয়ার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। সে এ বলে প্রার্থনা করেঃ হে আল্লাহ! তোমার কাছে আমি কোন অসুখ হতে নিরাময় পাওয়ার জন্য আসিনি এবং কোন বন্দীকে মুক্তিপণ দিয়ে মুক্ত করার জন্যও আসিনি। অতএব আপনার এ বান্দাকে আপনি যত পারেন বৃষ্টিতে সিক্ত করুন এবং এর সঙ্গে বাকর ইবনু মু'আবিয়াহকেও সিক্ত করুন। বাকর তাকে যে মদ পান করায়, সে তার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছিল। অতএব তার জন্য মেঘমালা উত্থিত হল এবং তাকে বলা হল, তুমি এগুলোর মাঝে যে কোন একটি মেঘখণ্ড বেছে নাও। সে মেঘমালার মাঝ হতে একখণ্ড কালো মেঘ বেছে নিল। তাকে বলা হল, কবুল কর, এটা জ্বলে পুড়ে ছাইয়ের ন্যায় করে ফেলবে, যা আদ জাতির কাউকে পরিত্রাণ দিবে না। উল্লেখ্য যে, একটি আংটির বৃত্তের পরিমাণ বাতাসের ঝাপটা তাদের উপর পাঠানো হয়েছিল মাত্র। তারপর এ আয়াতটি তিনি পাঠ করেনঃ (অনুবাদ): “তাদের উপর যখন আমি বিধ্বংসী বায়ু পাঠিয়ে ছিলাম তা তখন যা কিছুর উপর দিয়ে বয়ে গিয়েছিল সমস্ত কিছু চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছিল"- (সূরা যারিয়াত ৪১-৪২)। হাসানঃ যঈফ হাদীস সিরিজ (হাঃ ১২২৮)-এর অংশ। আবূ ঈসা বলেন, একাধিক বর্ণনাকারী এ হাদীসটি আবূল মুনযির সাল্লাম (রহঃ)-এর সূত্রে তিনি আসিম ইবনু আবী নাজুদ হতে, তিনি আবূ ওয়ায়িল হতে, তিনি হারিস ইবনু হাসসান হতে এই সূত্রে বর্ণনা করেছেন। এই আল-হারিসকে ইবনু ইয়াযীদও বলা হয়।
3274। আল-হারিস ইবনু ইয়াযীদ আল-বাকরী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, মাদীনায় পৌছে আমি মসজিদে প্রবেশ করে দেখতে পেলাম যে, তা লোকে পরিপূর্ণ। আর কালো পতাকাগুলো আওয়াজ সৃষ্টি করে উড়ছে এবং বিলাল (রাযিঃ) তার গলায় তরবারি ঝুলিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মুখে উপস্থিত। আমি প্রশ্ন করলাম, এতো লোকজন জড়ো হওয়ার কারণ কি? তারা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমর ইবনুল আস (রাযিঃ)-কে জিহাদের লক্ষ্যে কোথাও পাঠানোর ব্যবস্থা করছেন। তারপর বর্ণনাকারী সুফইয়ান ইবনু উয়াইনাহর হাদীসের ন্যায় দীর্ঘ হাদীস রিওয়ায়াত করেন। হাসানঃ দেখুন পূর্বের হাদীস। আবূ ঈসা বলেন, আল-হারিস ইবনু ইয়াযীদ আল-বাকরীকে আল-হারিস ইবনু ইবনু হাসসানও বলা হয়।
3275। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “নক্ষত্রের অস্তগমন” (সূরাঃ আত-তুর- ৪০) অর্থ ফজরের ফরয নামাযের আগেকার দুই রাকাআত এবং “নামাযের পর” (সূরাঃ কাফ- ৪০) অর্থ মাগরিবের ফরযের পর দুই রাকাআত সুন্নাত নামায। যঈফ, যঈফা (২১৭৭) আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি গারীব। আমরা শুধু মুহাম্মাদ ইবনু ফুযাইল হতে রিশদীন ইবনু কুরাইব (রহঃ) সূত্রে এ হাদীস মারফু হিসেবে জেনেছি। আমি মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈলের নিকট মুহাম্মাদ ও রিশদীন প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলাম যে, তাদের মধ্যে কে বেশি নির্ভরযোগ্য? তিনি বলেনঃ তারা দু’জনই সমান, তবে আমার নিকট মুহাম্মাদ শ্রেষ্ঠ। আবদুল্লাহ ইবনু আবদুর রহমানের নিকট আমি একথাটি জানতে চাইলে তিনি বলেনঃ তারা উভয়ে সমান, তবে আমার মতে রিশদীন উল্লেখযোগ্য। রিশদীন ইবনু আব্বাসের সাক্ষাৎ পেয়েছেন।
3276। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (মি'রাজের রাতে) যখন সিদরাতুল মুন্তাহায় পৌছালেন। আবদুল্লাহ (রাযিঃ) বলেন, সিদরাতুল মুন্তাহা হল একটি কেন্দ্র যেই পর্যন্ত পৃথিবীর যা কিছু উপরে চলে যায় এবং যেখান হতে নিচের দিকে কোন কিছু অবতরণ হয়ে আসে। এখানে আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে এমন তিনটি জিনিস উপহার দেন যা তিনি ইতোপূর্বে কোন নবীকেই দেননি। পাঁচ ওয়াক্ত নামায তার উপর ফরয করা হয়, সূরা আল বকারার শেষের কয়েকটি আয়াত তাকে দেয়া হয় এবং তাঁর উম্মাতের কাবীরাহ গুনাহসমূহ (তাওবার মাধ্যমে) ক্ষমা করা হয়, যদি তারা আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে কোন কিছু অংশীদার না করে থাকে। তারপর এ আয়াতটি ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) পাঠ করেনঃ (অনুবাদ) “যখন কুলগাছটি যা দ্বারা আচ্ছাদিত হওয়ার তা দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল"- (সূরা নাজম ১৬)। তিনি বলেন, ৬ষ্ঠ আকাশে সিদরাতুল মুন্তাহা অবস্থিত। সুফইয়ান (রহঃ) বলেন, এটি সোনার পাখিসমূহ দ্বারা আচ্ছাদিত, এই বলে তিনি তাঁর হাতের ইশারায় তাদের উড়ন্ত অবস্থা বুঝালেন। মালিক ইবনু মিগওয়াল ছাড়া অন্যান্য বর্ণনাকারীগণ বলেন, সিদরাতুল মুন্তাহা পর্যন্ত পৌছালে সৃষ্টির জ্ঞান শেষ হয়ে যায়, এর ঊর্ধ্বজগৎ সম্পর্কে সৃষ্টির কোন জ্ঞান নেই। সহীহঃ মুসলিম (হাঃ ১/১০৯)। আবূ ঈসা বলেন, এটি হাসান সহীহ হাদীস।
3277। আশ-শায়বানী (রহঃ) বলেন, আমি যির ইবনু হুবাইশ (রাযিঃ)-এর নিকট আল্লাহ তা'আলার বাণী “তারপর তাদের মাঝে দুই ধনুক অথবা তারও কম পার্থক্য থাকল”— (সূরা নাজম ৯) প্রসঙ্গে জানতে চাইলাম। তিনি বলেন, ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) আমাকে জানিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরীল (আঃ)-কে দেখেছেন এবং তার ছয়শ ডানা ছিল। সহীহঃ বুখারী ও মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এটি হাসান সহীহ গারীব হাদীস।
3278। আশ-শাবী (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ ইবনু আব্বাস (রাঃ) আরাফাতের মায়দানে কা'ব (রাঃ)-এর সাথে দেখা করে একটি কথা (আল্লাহ তা'আলার দেখা প্রসঙ্গে) জিজ্ঞেস করেন। এতে তিনি এত উচ্চ স্বরে তাকবীর ধ্বনি দিলেন যে, পাহাড় পর্যন্ত উচ্চ গম্ভীর আওয়াজ করে উঠল (প্রতিশব্দ ভেসে এলো)। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ আমরা হাশিম গোত্রীয়। কাব (রাঃ) বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা তার দীদার (দর্শন) ও কালাম (সরাসরি সংলাপ) মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মূসা আলাইহিস সালামের মাঝে বাটোয়ারা করেছেন। সুতরাং মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহ তা'আলার সাথে দু’বার কথা বলেছেন এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’বার তার দেখা পেয়েছেন। মাসরূক (রহঃ) বলেনঃ এ কথা শুনে আমি আইশা (রাঃ)-এর নিকটে গিয়ে তাকে প্রশ্ন করলাম, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি আল্লাহ তা'আলাকে দেখেছেন? তিনি বললেনঃ তুমি এমন একটি বিষয়ে কথা বললে যার ফলে আমার শরীরের লোম পর্যন্ত খাড়া হয়ে গেছে। আমি বললাম, একটু অপেক্ষা করুন। তারপর আমি এ আয়াত তিলাওয়াত করলামঃ “তিনি তো স্বীয় রবের মহান নিদর্শনসমূহ দৰ্শন করেছেন। (সূরাঃ আন-নাজম- ১৮)। তিনি বললেনঃ তোমার বুদ্ধি তোমাকে কোথায় নিয়ে গেছে। তিনি হলেন জিবরীল (যাকে তিনি দেখেছেন)। যে ব্যক্তি তোমাকে বলেছে যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার রবকে দেখেছেন বা এমন কোন বিষয় তিনি লুকায়িত করেছেন যার (প্রচারের) হুকুম তাকে দেয়া হয়েছে অথবা সেই পাঁচটি বিষয়ে তার জ্ঞান আছে, যে প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “কিয়ামতের জ্ঞান শুধু আল্লাহ তা'আলার নিকট আছে, তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন.... ” (সূরাঃ লুকমান- ৩৪), তাহলে সে একটি সাংঘাতিক অসত্য রটনা করেছে। বরং তিনি জিবরীল (আঃ)-কে তার আসল চেহারায় দু’বার দেখেছেনঃ একবার সিদরাতুল মুন্তাহার সামনে, আর একবার জিয়াদ নামক জায়গায় (মক্কার একটি জায়গা)। তার ছয় শত ডানা আকাশের দিগন্ত ঢেকে ফেলেছিল। সনদ দুর্বল, হাদীসটি কা'ব ইবনু আব্বাসের ঘটনা ব্যতীত নাসাঈ সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করেছেন। আবূ ঈসা বলেন, দাউদ ইবনু আবূ হিন্দ (রহঃ) শাবী হতে তিনি মাসরুক হতে তিনি আইশা (রাঃ) হতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূত্রে উপরোক্ত হাদীসের মতই বর্ণনা করেছেন। দাউদের রিওয়ায়াত মুজালিদের রিওয়ায়াতের তুলনায় সংক্ষিপ্ততর।
3279ইকরিমা (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে, ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার রবকে দেখেছেন। আমি বললাম, আল্লাহ কি বলেননি যে, “চোখের দৃষ্টি তাকে পরিবেষ্টন করতে পারে না, কিন্তু তিনি পরিবেষ্টন করেন সকল দৃষ্টি" (সূরাঃ আল-আনআম- ১০৩)? তিনি বললেনঃ তোমার জন্য আফসোস! তা তো সেই অবস্থায় যখন তিনি তার সত্তাগত নূরে আলোকিত হবেন। আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রভুকে দু’বার দেখেছেন। যঈফ, যিলালুল জুন্নাহ (১৯০/৪৩৭) আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান গারীব।
3280। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ “তিনি নিশ্চয়ই তাকে নিকটবর্তী কুল গাছের কাছে প্রত্যক্ষ করেছেন"- (সূরা নাজম ১৩-১৪)। "আল্লাহ তা'আলা তখন তার বান্দার জন্য যা ওয়াহী করার তা ওয়াহী করলেন"- (সূরা নাজম ১০) এবং “ফলে তাদের মধ্যে দুই ধনুক পরিমাণ বা তারও কম পার্থক্য রইল"- (সূরা নাজমঃ ৯)। আয়াতসমূহ প্রসঙ্গে ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) বলেন, নিশ্চয়ই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে প্রত্যক্ষ করেছেন। হাসান সহীহঃ আযযিলাল (হাঃ ১৯১, ৪৩৯), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এটি হাসান হাদীস।
3281। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, “তিনি যা দেখেছেন, তার মন তা অস্বীকার করতে পারেনি"- (সূরা নাজম ১১) তিনি এ আয়াত প্রসঙ্গে বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলাকে তার অন্তরের চোখ দ্বারা প্রত্যক্ষ করেছেন। সহীহঃ প্রাগুক্ত, মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এটি হাসান হাদীস।
3282। আবদুল্লাহ ইবনু শাকীক (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি আবূ যার (রাযিঃ)-কে বললাম, যদি আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দেখা পেতাম তাহলে একটি বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করতাম। তিনি বললেন, তুমি তাকে কি প্রসঙ্গে প্রশ্ন করতে? আমি বললাম, আমি প্রশ্ন করতাম যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার রবকে দেখেছেন কি? আবূ যার (রাযিঃ) বললেন, আমি তাকে এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেছি। তিনি বলেছেন যে, তিনি (আল্লাহ তা'আলা) হলেন নূর, তাকে আমি কিভাবে দেখতে পারি! সহীহঃ প্রাগুক্ত (১৯২-৪৪১), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এটি হাসান হাদীস।
3283। আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, “তিনি যা প্রত্যক্ষ করেছেন, তার মন তা অস্বীকার করেনি"- (সূরা নাজমঃ ১১); এ আয়াতটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরীল (আঃ)-কে রেশমী কাপড় পরিহিত অবস্থায় দেখেছেন। তিনি আকাশ ও মাটির মধ্যে অবস্থিত জায়গা পূর্ণ করে রেখেছিলেন। সহীহঃ বুখারী (হাঃ ৪৮৫৮) সংক্ষেপিত। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ।
3284। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ “তারা ছোটখাট অন্যায় করলেও গুরুতর পাপ ও খারাপ কাজ হতে বিরত থাকে"- (সূরা নাজম ৩২) এ আয়াতটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হে আল্লাহ! যদি আপনি মাফই করেন তাহলে সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিন, আর আপনার এমন কোন বান্দা কি আছে যে অন্যায় করেনি। সহীহঃ মিশকাত তাহকীক সানী (হাঃ ২৩৪৯)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ গারীব। এ হাদীস আমরা শুধুমাত্র যাকারিয়া ইবনু ইসহাকের সনদে অবহিত হয়েছি।
3285। ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, একদিন আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে মিনায় অবস্থানরত ছিলাম। সে সময় হঠাৎ চাঁদ বিদীর্ণ হয়ে দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। এর একটি অংশ পাহাড়ের পিছন দিকে এবং অন্য অংশ পাহাড়ের সম্মুখে পড়ে গেল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বললেনঃ তোমরা প্রত্যক্ষ কর এবং সাক্ষী থাকঃ “কিয়ামত নিকটবর্তী হয়েছে এবং চাঁদ বিদীর্ণ হয়েছে"- (সূরা কামার ১)। সহীহঃ বুখারী ও মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এটি হাসান সহীহ হাদীস।
3286। আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, যখন মাক্কাবাসীরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট একটি নিদর্শন পেশ করার দাবি করল, সে সময় মক্কাতে চাঁদটি দুইবার বিদীর্ণ হয়। এ সম্পর্কে আয়াত অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ) “কিয়ামত নিকটবর্তী হয়েছে এবং চাঁদ বিদীর্ণ হয়েছে। তারা কোন মু'জিযা (নিদর্শন) প্রত্যক্ষ করলে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে, এটা তো চিরাচরিত যাদু”— (সূরা কুমার ১-২) যা এ মুহুর্তে শেষ হয়ে যাবে। সহীহঃ বুখারী (হাঃ ৩৬৩৭, ৪৮৬৭, ৪৮৬৮), মুসলিম (হাঃ ৮/১৩৩); তবে এতে “নাযালাত” (অতঃপর নাযিল হল) শব্দের উল্লেখ নেই। বুখারীর বর্ণনায় “মাররাতাইন” (দুইবার)-এর স্থলে “ফিরকাতাইন" (দুই টুকরা) শব্দের উল্লেখ আছে। "মাররাতাইন” (দুইবার) শব্দ মুসলিমের বর্ণনায় আছে। আবূ ঈসা বলেন, এটি হাসান সহীহ হাদীস।
3287। ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে চাঁদ বিদীর্ণ হয়। সে সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বলেনঃ তোমরা সাক্ষী থাক। সহীহঃ বুখারী ও মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3288। ইবনু উমার (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে চাঁদ বিদীর্ণ হল। সে সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরা সাক্ষী থাক। সহীহঃ মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3289। জুবাইর ইবনু মুতাইম (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে চাঁদ বিদীর্ণ হল এবং দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেলে, এক অংশ এই পাহাড়ের উপর এবং অপর অংশ ঐ পাহাড়ের উপর পড়ে গেল। তারা (মাক্কাবাসী কাফিররা) বলল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে যাদু করেছেন। কেউ কেউ বলল, তিনি আমাদের যাদু করে থাকলে সব মানুষকে যাদু করতে পারবেন না। হাদীসটির সানাদ সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, কোন কোন বর্ণনাকারী এ হাদীস হুসাইন হতে, তিনি জুবাইর ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু জুবাইর ইবনু মুতাইম হতে, তিনি তার পিতা হতে, তিনি তার দাদা জুবাইর ইবনু মুতাইম (রাযিঃ) হতে, এই সূত্রে একই রকম বর্ণনা করেছেন।
3290। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, একদিন কুরাইশ মুশরিকরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসে। তারা ভাগ্য প্রসঙ্গে বাদানুবাদ করছিল। সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ) "যেদিন তাদেরকে উপুর করে জাহান্নামের দিকে টেনে নিযে যাওয়া হবে (আর বলা হবে), জাহান্নামের যন্ত্রণার স্বাদ গ্রহণ কর। প্রতিটি জিনিস আমরা নির্ধারিত পরিমাণে সৃষ্টি করেছি"- (সূরা কামার ৪৮-৪৯)। সহীহ, ইবনু মাজাহ (হাঃ ৮৩), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3291। জাবির (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবীদের উদ্দেশে বের হলেন। তিনি তাদের সম্মুখে শুরু হতে শেষ পর্যন্ত সূরা আর-রহমান পাঠ করলেন কিন্তু তারা নিশ্চুপ রইলেন। তিনি বলেনঃ এ সূরাটি আমি জিনদের সঙ্গে সাক্ষাতের রাতে তাদের সম্মুখে পাঠ করেছি। তোমাদের তুলনায় তারা ভাল উত্তর দিয়েছে। যখনই আমি তিলাওয়াত করছি, “তোমরা জিন ও মানুষ নিজেদের প্রভুর কোন নিয়ামাতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে" তখনই তারা বলেছে, “হে আমাদের রব! আমরা আপনার কোন নি’আমাতই অস্বীকার করছি না, আপনার জন্যই সমস্ত প্রশংসা"। হাসানঃ সহীহাহ (হাঃ ২১৫০)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি গারীব। এ হাদীস আমরা শুধুমাত্র ওয়ালীদ ইবনু মুসলিম হতে, যুহাইর ইবনু মুহাম্মাদ-এর সূত্রে জেনেছি। আহমাদ ইবনু হাম্বল (রহঃ) বলেন, যে যুহাইর ইবনু মুহাম্মাদ সিরিয়া চলে গেছেন তিনি সে লোক নন যার মাধ্যমে ইরাকবাসী হাদীস রিওয়ায়াত করেন। মনে হয় তিনি স্বতন্ত্র লোক, লোকজন তার নামে বিভ্রাট করেছে, তার হতে লোকেরা মুনকার হাদীস রিওয়ায়াত করেছেন। আমি মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈলকে বলতে শুনেছি, সিরিয়াবাসী যুহাইর ইবনু মুহাম্মাদ হতে মুনকার হাদীস রিওয়ায়াত করেন এবং ইরাকবাসী তার মাধ্যমে সহীহ হাদীসের পর্যায়ের হাদীস রিওয়ায়াত করেন।
3292। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহঃ বলেছেনঃ আল্লাহ তা'আলা বলেন, আমার নেক বান্দাদের জন্য আমি এমন কিছু তৈরি করে রেখেছি যা কোন চোখ কখনও প্রত্যক্ষ করেনি, কোন কান কখনও (তার বর্ণনা) শ্রবণ করেনি এবং মানুষের মন তার ধারণাও করতে পারে না। এ আয়াতটি তোমরা ইচ্ছা করলে পাঠ করতে পার (অনুবাদ) “তাদের জন্য নয়নমুগ্ধকর কি জিনিস লুকিয়ে রাখা হয়েছে তাদের কৃতকর্মের পুরস্কার স্বরূপ তা সবারই অজানা"- (সূরা সিজদা ১৭)। আর জান্নাতে এরূপ একটি গাছ আছে যার ছায়াতলে কোন আরোহী এক শত বছর চলতে থাকবে কিন্তু তা পার হতে পারবে না। তোমরা চাইলে পাঠ করতে পারঃ “আর সম্প্রসারিত ছায়া”— (সূরা ওয়াকি'আহ ৩০)। জান্নাতের এক চাবুক পরিমাণ জায়গা পৃথিবী ও তার মাঝখানে সব কিছুর চাইতে উত্তম। তোমরা চাইলে পাঠ করতে পারঃ “জাহান্নাম হতে যাকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সেই সফলকাম। আর পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ছাড়া আর কিছুই নয়” (সূরা ইমরান ১৮৫)। হাসান সহীহঃ সহীহ হাদীস সিরিজ (হাঃ ১৯৭৮), বুখারী "ইকরাউ” (তোমরা পাঠ কর) শব্দ ব্যতীত বর্ণনা করেছেন। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3293। আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন জান্নাতে এমন একটি গাছ রয়েছে কোন আরোহী যার ছায়াতলে শত বছর ধরে চলতে থাকলেও তা অতিক্রম করতে পারবে না। তোমরা চাইলে পাঠ করতে পারঃ “সম্প্রসারিত ছায়া ও প্রবাহিত পানি”— (সূরা ওয়াকি’আহ ৩০-৩১) সহীহঃ বুখারী (হাঃ ৪৮৮১)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। এ অনুচ্ছেদে আবূ সাঈদ (রাযিঃ) হতেও হাদীস উদ্ধৃত আছে।
3294। আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বাণী “উচু উঁচু বিছানা” (সূরা আল-ওয়াকিয়াহ- ৩৪) প্রসঙ্গে বলেনঃ এই বিছানার উচ্চতা আসমান-যমীনের মাঝের উচ্চতার সমান এবং এতদুভয়ের মাঝের দূরত্ব পাঁচ শত বছর চলার রাস্তার সমান। যঈফ, তা’লীকুর রাগীব (৪/২৬২) আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান গারীব। আমরা শুধু রিশদীনের রিওয়ায়াত হিসাবে-এ হাদীস জেনেছি।
3295। আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর এ বাণীঃ “আর তোমরা মিথ্যা বলাকে তোমাদের উপজীব্য করে নিয়েছ" (সূরাঃ আল-ওয়াকিয়াহ- ৮২) প্রসঙ্গে বলেনঃ তোমাদের কৃতজ্ঞতা হল এই যে, তোমরা বলে থাকঃ অমুক অমুক তারকার উসীলায় আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। সনদ দুর্বল আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান গারীব। আমরা শুধুমাত্র ইসরাঈলের সূত্রেই এ হাদীসটি মারফুরূপে জেনেছি। সুফিয়ান এ হাদীস আবদুল আলী হতে উপরোক্ত সনদে বর্ণনা করেছেন, কিন্তু মারফু হিসেবে নয়।
3296। আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বাণী, “আমি তাদের বিশেষভাবে সৃষ্টি করেছি" (সূরাঃ আল-ওয়াকিয়াহ-৩৫) প্রসঙ্গে বলেনঃ যে সব নারী পৃথিবীতে বৃদ্ধা, ছানি পড়া চোখ বা দুর্বল দৃষ্টিসম্পন্ন তারা (জান্নাতে) বাড়ন্ত বয়সের তরুণীদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সনদ দুর্বল আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি গারীব। আমরা শুধু মূসা ইবনু উবাইদার রিওয়ায়াত হিসেবে এ হাদীস মারফু হিসেবে জেনেছি। মূসা ইবনু উবাইদা ও ইয়াযীদ ইবনু আবান আর-রাকাশী উভয়ে হাদীস শাস্ত্রে দুর্বল বলে সমালোচিত।
3297। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, আবূ বাকর (রাযিঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি তো বৃদ্ধ হয়ে গেলেন। তিনি জবাবে বলেনঃ সূরা হুদ, ওয়াকি'আহ, ওয়াল মুরসালাত, আম্মা ইয়াতাসাআলুন ও ওয়াইযাশ-শামসু কুববিরাত আমাকে বৃদ্ধ করে দিয়েছে। সহীহঃ সহীহ হাদীস সিরিজ (হাঃ ৯৫৫)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। এ হাদীস আমরা শুধু ইবনু আব্বাস (রাযিঃ)-এর বর্ণনার পরিপ্রেক্ষিতে উপর্যুক্ত সূত্রে অবগত হয়েছি। এ হাদীস আলী ইবনু সালিহ (রহঃ) আবূ ইসহাকু হতে, তিনি আবূ জুহাইফাহ্ (রাযিঃ) হতে এই সূত্রে একই রকম রিওয়ায়াত করেছেন। এ হাদীসের অংশবিশেষ আবূ ইসহাক হতে, তিনি আবূ মাঈসারাহ হতে এই সূত্রে মুরসালরূপে বর্ণিত আছে। আর আবূ বাকর ইবনু আইয়্যাশ আবূ ইসহাকু হতে, তিনি ইকরিমাহ হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সূত্রে শাইবানের হাদীসের অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। তবে এ সনদে ইবনু "আব্বাস-এর উল্লেখ নেই।
3298। আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ কোন এক সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবীগণ এক সাথে বসা ছিলেন। হঠাৎ তাদের উপর মেঘরাশি প্রকাশিত হল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের প্রশ্ন করেনঃ তোমরা জান এটা কি? তারা বললেনঃ আল্লাহ তা'আলা ও তার রাসূলই বেশি ভালো জানেন। তিনি বললেনঃ এটা হল যমিনের পানিবাহী উট। আল্লাহ তা'আলা একে এমন জাতির দিকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন যারা তার কৃতজ্ঞতাও আদায় করে না এবং তার কাছে মুনাজাতও করে না। তিনি আবার প্রশ্ন করলেনঃ তোমাদের উপরে কি আছে তা জান? তারা বললেনঃ আল্লাহ তা'আলা ও তার রাসূলই বেশি ভালো জানেন।তিনি বলেনঃ এটা হল সুউচ্চ আকাশ, সুরক্ষিত ছাদ এবং আটকানো তরঙ্গ। তিনি আবার প্রশ্ন করলেনঃ তোমাদের এবং এর মাঝে কতটুকু ব্যবধান তা তোমাদের জানা আছে কি? তারা বললেন, আল্লাহ তা'আলা ও তার রাসূলই বেশি ভালো জানেন। তিনি বললেনঃ তোমাদের ও এর মাঝে পাঁচ শত বছরের পথের ব্যবধান। তিনি আবার প্রশ্ন করলেনঃ এর উপরে কি আছে তা তোমরা জান কি? তারা বললেন, আল্লাহ ও তার রাসূলই বেশি ভালো জানেন। তিনি বললেনঃ এর উপরে দুইটি আকাশ আছে যার মাঝে পাঁচ শত বছরের দূরত্ব, এমনকি তিনি সাতটি আকাশ গণনা করেন এবং বলেনঃ প্রতি দুটি আকাশের মাঝে পার্থক্য আকাশ ও যমিনের ব্যবধানের সমপরিমাণ। তিনি আবার প্রশ্ন করলেনঃ এর উপরে কি আছে তা কি তোমরা জান? তারা বললেন আল্লাহ তা'আলা ও তার রাসূলই বেশি ভালো জানেন। তিনি বললেনঃ এগুলোর উপরে আছে (আল্লাহর) আরশ। আরশ ও আকাশের মাঝের পার্থক্য দুই আকাশের মধ্যকার দূরত্বের সমান। তিনি আবার বললেনঃ তোমরা কি জান তোমাদের নিচে কি আছে? তারা বললেনঃ আল্লাহ ও তার রাসূলই বেশি ভালো জানেন। তিনি বললেনঃ উহা হল যমিন, তারপর আবার বললেন, তোমরা কি জান এর নিচে কি আছে? তারা বলল আল্লাহ ও তার রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেনঃ এর নিচে আরো এক ধাপ যমিন আছে এবং এতদুভয়ের মধ্যে পাঁচ শত বছরের দূরত্ব। তারপর সাত স্তর যমিন গুণে বলেনঃ প্রতি দুই স্তরের মাঝে পাঁচ শত বছরের দূরত্ব বর্তমান। তিনি আবার বললেনঃ সেই সত্তার শপথ যার হাতে মুহাম্মাদের জীবন! তোমরা যদি একটি রশি নিম্নতম যমিনের দিকে ছেড়ে দাও তাহলে তা আল্লাহ তা'আলা পর্যন্ত গিয়ে পৌছবে। তারপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করেনঃ “তিনিই প্রথম, তিনিই সর্বশেষ তিনিই প্রকাশ্য এবং তিনিই গুপ্ত। তিনিই সর্ববিষয়ে সর্বশেষ পরিজ্ঞাত" (সূরাঃ আল-হাদীদ- ৩) যঈফ, যিলালুল জুন্নাহ, (৫৭৮) আবূ ঈসা বলেনঃ উপরোক্ত সূত্রে এ হাদীসটি গারীব। আইউব, ইউনুস ইবনু উবাইদ ও আলী ইবনু যাইদ হতে বর্ণিত আছে যে, তারা বলেছেন, আল-হাসান আল-বাসরী (রহঃ) আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে সরাসরি কিছু শুনেননি। কিছু বিশেষজ্ঞ আলিম উক্ত হাদীসের (আল্লাহ পর্যন্ত পৌছে) ব্যাখ্যায় বলেনঃ উক্ত রশি আল্লাহ তা'আলার জ্ঞান, তার নিদর্শনাবলী ও তার সার্বভৌম ক্ষমতা সর্বত্র বিস্তৃত। তিনি তার আরশে উপবিষ্ট, যেমন তিনি তার পাক কালামে বলেছেন।
3299। সালামাহ ইবনু সাখর আল-আনসারী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি এমন এক পুরুষ, যাকে এত যৌনশক্তি দেয়া হয়েছে যা অন্য কাউকে দেয়া হয়নি। রমাযান মাস এলে আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে যিহার করি, যাতে রমাযান মাসটা অতিক্রম হয়ে যায় এবং রাতে সহবাসের আশংকা হতে বেঁচে থাকতে পারি। একই ধারাবাহিকতায় আমার দিনগুলো (সঙ্গমহীন) অতিক্রম হবে এবং তাকে আমি ত্যাগও করতে পারি না। এ পরিপ্রেক্ষিতে একদিন সে রাতের বেলা আমার সেবা করছিল, হঠাৎ তার কোন জিনিস আমার সম্মুখে উম্মুক্ত হয়ে গেলে আমি তার উপর ঝাপিয়ে পড়ি (সঙ্গম করি)। সকালে উপনিত হয়ে আমি আমার গোত্রের লোকের কাছে উপস্থিত হয়ে তাদেরকে আমার বিষয়টি জানাই। আমি বললাম, আমাকে নিয়ে তোমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে চলো এবং আমার বিষয়টি তাকে জানাই। তারা বলল, না আল্লাহর কসম! আমরা তা করতে অপারগ। আমাদের মনে হচ্ছে যে, আমাদের প্রসঙ্গে কুরআনে আয়াত অবতীর্ণ হবে কিংবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের প্রসঙ্গে এরূপ মন্তব্য করবেন আমাদের জন্য যা লজ্জার বিষয় হয়ে থাকবে। বরং তুমি একাই যাও এবং যা তোমার’ উপর্যুক্ত মনে হয় তাই কর। বর্ণনাকারী বলেন, আমি রওয়ানা হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গিয়ে উপস্থিত হলাম এবং তাকে আমার বিষয়টি জানালাম। তিনি বললেনঃ এ কাজ তুমি করেছ। আমি বললাম, এমন কাজ আমি করেছি। তিনি আবার বললেনঃ এ কাজ তুমি করেছ! আমি বললাম, এমন কাজ আমি করেছি। তিনি বললেনঃ এ কাজ তুমি করেছ! আমি বললাম, এমন কাজ আমি করেছি। আমি উপস্থিত। অতএব আল্লাহর বিধান আমার উপর কার্যকর করুন, আমি ধৈর্য ধারণ করব। তিনি বললেনঃ একটি দাসী মুক্ত কর। বর্ণনাকারী বলেন, আমি আমার ঘাড়ের উপরাংশে আমার হাত দিয়ে আঘাত করে বললাম, না সেই সত্তার কসম, আপনাকে যিনি সত্যসহ প্রেরণ করেছেন! তাকে ছাড়া আমি আর কিছুর মালিক নই। তিনি বললেনঃ তাহলে ধারাবাহিকভাবে দুই মাস রোযা রাখ। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! যে বিপদ আমার উপর এসেছে তা তো এ রোযার কারণেই। তিনি বললেনঃ তাহলে ষাটজন দরিদ্রকে আহার করাও। আমি বললাম, সেই সত্তার কসম, আপনাকে সত্যসহ যিনি পাঠিয়েছেন। আজ রাতে আমরাই অভুক্ত ছিলাম, আমাদের কাছে রাতের খাবার ছিল না। তিনি বললেনঃ যে লোক যুরাইক গোত্রের যাকাত আদায় করে, তার কাছে তুমি যাও এবং তাকে বল, তাহলে তোমাকে সে কিছু দিবে। তার এক ওয়াসাক এর মাধ্যমে তুমি ষাটজন মিসকীনকে আহার করাবে এবং বাকি যা থাকে তা তুমি ও তোমার পরিজনের জন্য খরচ করবে। বর্ণনাকারী বলেন, তারপর আমি আমার গোত্রের কাছে প্রত্যাবর্তন করলাম এবং তাদেরকে বললাম, তোমাদের কাছে আমি পেয়েছি সংকীর্ণতা ও কুপরামর্শ, আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট পেয়েছি প্রশস্ততা ও প্রাচুর্য। তিনি তোমাদের যাকাত আমাকে দান করার আদেশ দিয়েছেন। অতএব তা আমার কাছে তোমরা অর্পণ কর। অতএব তারা আমার কাছে তা অর্পণ করে। সহীহঃ ইবনু মাজাহ (হাঃ ২০৬২)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান। মুহাম্মাদ বলেন, আমার মতে সুলাইমান ইবনু ইয়াসার সালামাহ্ ইবনু সাখর-এর কোন বর্ণনা শুনেননি। তিনি আরো বলেন, তার নাম সালামাহ ইবনু সাখর, তবে সালমান ইবনু সাখর নামেও পরিচিত। এ অনুচ্ছেদে সালাবাহ (রাযিঃ)-এর কন্যা ও আওস ইবনুস সামিত (রাযিঃ)-এর সহধর্মিণী খাওলাহ (রাযিঃ) হতেও হাদীস বর্ণিত রয়েছে।
3300। আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হলঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা রাসূলের সাথে চুপি চুপি কথা বলার ইচ্ছা করলে তার পূর্বে সদাকা দেবে" (সূরাঃ আল-মুজাদালাহ-১২), তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেনঃ এক দীনার নিদ্ধারণের ব্যাপারে তোমার কি মত? আমি বললাম, লোকদের সামর্থে কুলাবে না। তিনি বললেনঃ তাহলে অর্ধ দীনার? আমি বললাম, তাও তাদের সামর্থে কুলাবে না। তিনি বললেনঃ তাহলে কত নিৰ্দ্ধারণ করা যায়? আমি বললাম, এক বালির দানা পরিমাণ (সোনা)। তিনি বললেনঃ তুমি খুব কম নিৰ্দ্ধারণকারী। রাবী বলেন, তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ “তোমরা কি চুপে চুপে কথা বলার পূর্বে সদাকা প্রদানকে কষ্টকর মনে কর” (সূরাঃ আল-মুজাদালাহ- ১৩)? আলী (রাঃ) বলেন, আমার কারণে আল্লাহ তা'আলা এই উন্মাতের জন্য বিধানটি হালকা (বাতিল) করেন। সনদ দুর্বল
3301। আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, এক ইয়াহুদী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবীগণের কাছে এসে বলল, “আস-সামু আলাইকুম” (তোমাদের মরণ হোক)। লোকেরা তার উত্তর দিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সে কী বলেছে তোমরা কি তা বুঝতে পেরেছ? তারা বলেন, আল্লাহ তা'আলা ও তার রাসূল ভালো জানেন। হে আল্লাহর নবী! সে সালাম দিয়েছে। তিনি বললেনঃ না, অথচ সে এই এই কথা বলেছে। আমার কাছে তাকে তোমরা ফিরিয়ে নিয়ে আস। অতঃপর তারা তাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসলে তিনি বললেনঃ তুমি কি বলেছ আস-সামু আলাইকুম? সে বলল, হ্যাঁ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে সময় বললেনঃ তোমাদেরকে আহলে কিতাবের কেউ সালাম করলে তোমরা বলবে, “আলাইকা মা কুলতা” (যা তুমি বলেছ তোমার উপর তা-ই বর্ষিত হোক)। তারপর এ আয়াত তিনি পাঠ করেন (অনুবাদ), “যখন এরা তোমার কাছে আসে তখন তোমাকে এরূপ কথা দ্বারা অভিবাদন করে যার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা তোমাকে অভিবাদন করেননি"- (সূরা মুজাদালাহ্ ৮)। সহীহঃ ইরওয়া (হাঃ ৫/১১৭), মুসলিম আয়াতের উল্লেখ ব্যতীত। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3302। ইবনু উমার (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বানু নাযীরের আল-বুওয়াইরা নামক খেজুর বাগানটি অগ্নিসংযোগ করে পুড়ে ফেলেন এবং কেটে ফেলেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেনঃ “যে খেজুর গাছগুলো তোমরা কেটেছ এবং যেগুলো তাদের কাণ্ডের উপর স্থির রেখে দিয়েছ তা তো আল্লাহ তা'আলার আদেশানুসারেই এবং এ কারণে যে, তিনি পাপাচারী ও অন্যায়কারীদেরকে লাঞ্ছিত করবেন"- (সূরা হাশ্বর ৫)। সহীহঃ ইবনু মাজাহ (হাঃ ২৮৪৪), বুখারী ও মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3303। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ “যে খেজুর গাছগুলো তোমরা কেটেছ এবং তার কাণ্ডের উপর যেগুলো স্থির রেখে দিয়েছ" এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আল-লীনাহ অর্থঃ খেজুর গাছ। “এবং এ কারণে যে, তিনি পাপাচারী ও অন্যায়কারীদেরকে লাঞ্ছিত করবেন" আয়াতটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অর্থাৎ মুসলিমরা তাদেরকে তাদের দুর্গগুলো হতে বহিষ্কার করে দেয়। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) আরো বলেন, যখন তাদেরকে খেজুর গাছগুলো কেটে ফেলার আদেশ দেয়া হয় সে সময় তাদের মনে ধারণা (সন্দেহ) হয়। মুসলিমরা বলেন, আমরা কিছু বৃক্ষ কেটে ফেলেছি এবং কিছু বৃক্ষ বহাল রেখেছি। এ বিষয়ে অবশ্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমরা প্রশ্ন করবো যে, যে গাছগুলো আমরা কেটেছি তার কারণে আমাদেরকে সাওয়াব প্রদান করা হবে কি এবং যে বৃক্ষগুলো বহাল রেখেছি তার জন্য আমাদের কোন গুনাহ হবে কি? তখন আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেনঃ “যে খেজুর গাছগুলো তোমরা কেটেছ এবং তাদের কাণ্ডের উপর যেগুলো স্থির রেখে দিয়েছ তা তো আল্লাহ তা'আলার অনুমতিক্রমেই”- (সূরা হাশূর ৫)। হাদীসটির সানাদ সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। এ হাদীসটি কিছু বর্ণনাকারী হাফস ইবনু গিয়াস হতে, তিনি হাবীব ইবনু আবী আমরাহ হতে, তিনি সাঈদ ইবনু জুবাইর (রহঃ) হতে এই সূত্রে মুরসালরূপে রিওয়ায়াত করেছেন এবং তার মধ্যে ইবনু আব্বাস (রাযিঃ)-এর উল্লেখ করেননি। আবদুল্লাহ ইবনু আবদুর রহমান-হারূন ইবনু মু'আবিয়াহ হতে, তিনি হাফস ইবনু গিয়াস হতে, তিনি হাবীব ইবনু আবী আমরাহ হতে, তিনি সাঈদ ইবনু জুবাইর (রাহঃ) হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সূত্রে মুরসালরূপে উক্ত হাদীস বর্ণনা করেছেন। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল আমার কাছে শুনেছেন।
3304। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, এক রাতে আনসার লোকের এখানে একজন মেহমান আসে। তার কাছে তার ও তার সন্তানদের খাবার ছাড়া অতিরিক্ত খাবার ছিল না। তার সহধর্মিণীকে তিনি বলেন, বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে দাও, আলো নিভিয়ে ফেল এবং তোমার কাছে যে খাবার রয়েছে তা মেহমানের সম্মুখে পরিবেশন কর। এই পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়ঃ “আর নিজেদের উপর অন্যকে তারা অগ্রাধিকার দেয়, নিজেরা অভাবপীড়িত হয়েও” –(সূরা হাশর ৯)। সহীহঃ সহীহ হাদীস সিরিজ (হাঃ ৩২৭২), বুখারী ও মুসলিম আরও পূর্ণাঙ্গরূপে বর্ণনা করেছেন। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ।
3305। উবাইদুল্লাহ ইবনু আবূ রাফি (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি আবূ তলিব-এর পুত্র ‘আলী (রাযিঃ)-কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে অর্থাৎ আমাকে, যুবাইরকে ও মিক্দাদ ইবনুল আসওয়াদকে (চিঠি উদ্ধারের জন্য) পাঠিয়ে বললেনঃ তোমরা রাওনা হয়ে রাওযা খাখ’ নামক জায়গায় পৌছে যাও, সেখানে (মাক্কার লক্ষ্যে) গমনরত এক নারীকে পাওয়া যাবে। তার নিকট একটি পত্র আছে। তোমরা তার নিকট হতে সেই পত্র উদ্ধার করে তা সরাসরি আমার নিকট নিয়ে আসবে। অতঃপর আমরা রাওনা হয়ে গেলাম। আমাদেরকে নিয়ে আমাদের ঘোড়া অতীব দ্রুত গতিতে এগিয়ে গেল এবং আমরা সেই রাওযা খাখ’ নামক জায়গায় গিয়ে পৌছলাম। আমরা সেই নারীকে সেখানে পেয়ে গেলাম। আমরা তাকে বললাম, পত্রটি বের করে দাও। সে বলল, আমার সঙ্গে কোন পত্র নেই। আমরা বললাম, অবশ্যই তুমি পত্রটি বের করে দাও, তা না হলে তোমার পরিধেয় পোশাক ত্যাগ কর। আলী (রাযিঃ) বলেন, সে তার চুলের খোপা হতে অবশেষে পত্রটি বের করে দিল এবং তা নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আমরা হাযির হলাম। দেখা গেল যে, এটি মাক্কার কিছু সংখ্যক মুশরিকের লক্ষ্যে লিখিত হাতিব ইবনু আবী বালতা'আর পত্র। তিনি এই পত্রের মাধ্যমে তাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কিছু পদক্ষেপ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে হাতিব! এ কি? হাতিব (রাযিঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার সম্পর্কে তাড়াতাড়ি করে কোন পদক্ষেপ নিবেন না। আমি কুরাইশদের সঙ্গে বসবাস করতাম, কিন্তু আমি তাদের সম্প্রদায়ের লোক নই। যে সকল মুহাজির আপনার সঙ্গে রয়েছেন মক্কায় পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারে। আমি চিন্তা করলাম, মক্কায় আমার কোন আত্মীয়-স্বজন নেই। যদি আমি তাদের প্রতি কোন রকম উপকার করতে পারি তবে তার বিনিময়ে তারা আমার আত্মীয়-স্বজনকে সাহায্য-সহযোগিতা করবে। আমি কাফির হয়ে কিংবা আমার ধর্ম ছেড়ে দিয়ে বা কুফরীর প্রতি খুশী হয়ে এ কাজ করিনি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সে সত্য কথা বলেছে। উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে অনুমতি দিন, আমি এ মুনাফিকের ঘাড় উড়িয়ে দেই। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সে বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। তুমি কি জান! নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা বদরের মুজাহিদদের প্রতি উকি মেরেছেন এবং বলেছেনঃ “তোমরা যা চাও কর, আমি তোমাদেরকে মাফ করে দিয়েছি”। আলী (রাযিঃ) বলেন, উক্ত বিষয়েই এই সূরা অবতীর্ণ হয়েছেঃ “হে মু’মিনগণ! তোমরা আমার শক্র ও তোমাদের শক্রকে বন্ধুর মতো করে গ্রহণ করো না। তোমরা তাদের নিকট বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও; অথচ তারা তোমাদের নিকট যে সত্য এসেছে তা স্বীকার করেনি....”। আমর (রহঃ) বলেন, আমি উবাইদুল্লাহ ইবনু আবী রাফি'কে দেখেছি। তিনি আলী (রাযিঃ)-এর সচিব ছিলেন। সহীহঃ সহীহ আবূ দাউদ (হাঃ ২৩৮১), বুখারী ও মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। এ অনুচ্ছেদে উমার ও জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতেও হাদীস বর্ণিত আছে। সুফইয়ান ইবনু উয়াইনাহ হতেও একাধিক বর্ণনাকারী একই অর্থে হাদীসটি রিওয়ায়াত করেছেন। তাতে এ কথা রয়েছেঃ “তোমাকে পত্র বের করে দিতে হবে, তা না হলে তোমার বস্ত্র ত্যাগ করতে হবে"। এ হাদীসটি 'আবদুর রাহমান আস-সুলামীর সূত্রে ‘আলী (রাযিঃ) হতে একই রকম বর্ণিত হয়েছে। কেউ কেউ এ কথাগুলো উল্লেখ করেছেনঃ “তোমাকে অবশ্যই পত্রটি বের করে দিতে হবে, নতুবা তোমাকে আমরা উলঙ্গ করব।
3306। আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াতটির জন্য লোকদের পরীক্ষা করতেন (অনুবাদ) “হে নবী! মু'মিন মহিলারা তোমার নিকট এসে এই মর্মে যদি বাই’আত করে যে, তারা আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে কোন শারীক স্থির করবে না, চুরি করবে না, যিনা করবে না....."— (সূরা মুমতাহিনাহ ১২)। মামার (রহঃ) বলেন, ইবনু তাউস তার বাবার সূত্রে আমার কাছে রিওয়ায়াত করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাত নিজস্ব মালিকানাধীন স্ত্রীলোক ব্যতীত অপর কারো হাত স্পর্শ করেনি। সহীহঃ বুখারী (হাঃ ৪৮৯১), মুসলিম (হাঃ ৬/২৯)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3307। উম্মু সালামাহ্ আল-আনসারিয়্যাহ (রাযিঃ) বলেন, মহিলাদের মধ্য থেকে একজন প্রশ্ন করল, মা’রূফ’ বলতে কি বুঝায়, যাতে আপনার নাফরমানী করা আমাদের জন্য বৈধ নয়? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরা বিলাপ করো না। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! অমুক সম্প্রদায়ের নারীরা আমার চাচার বিলাপে আমাকে সাহায্য করেছে। কাজেই তাদের প্রতিদান দেয়া আমারও কর্তব্য। আমার কথায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একমত হলেন না। অতঃপর আমি পর্যায়ক্রমে তার নিকট অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে তাদের প্রতিদান দেয়ার অনুমতি দিলেন। আমি তাদের বিলাপের প্রতিদান দেয়ার পর কিয়ামত পর্যন্ত আর কোন দিন বিলাপ করব না। কিন্তু আমি ব্যতীত অপর সব মহিলাই পরবর্তীতে বিলাপ করেছে। হাসানঃ তা’লীক আ'লা ইবনু মাজাহ। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান গারীব। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় উম্মু আতিয়াহ (রাযিঃ) হতেও হাদীস বর্ণিত আছে। "আবদ ইবনু হুমাইদ (রহঃ) বলেন, উম্মু সালামাহ্ আল-আনসারিয়্যাহ (রাযিঃ)-এর নাম আসমা বিনতু ইয়াযীদ ইবনুস সাকান।
3308। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, “তোমাদের নিকট মু'মিন নারীরা হিযরাত করে এলে তোমরা তাদের পরীক্ষা কর” (সূরাঃ আল-মুমতাহিনাহ- ১০) শীর্ষক আল্লাহর বাণী প্রসঙ্গে তিনি বলেনঃ কোন স্ত্রীলোক ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট হাযির হলে তিনি তাকে আল্লাহ তা'আলার নামে শপথ করাতেনঃ আমি আমার স্বামীর প্রতি বিরাগভাজন হয়ে চলে আসিনি, আমি শুধু আল্লাহ তা'আলা ও তার রাসূলের প্রতি ভালোবাসায় জাগ্রত হয়েই চলে এসেছি। যঈফ, বিচ্ছিন্ন, ইতহাফুল খাইরাহ আল মাহরাহ (৮/১৭৪) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি গারীব।
3309। আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কতক সংখ্যক সাহাবী একসাথে বসে নিজেদের মাঝে আলোচনা করতে গিয়ে বললাম যে, আল্লাহ তা'আলার নিকট কোন কাজ সবচেয়ে প্রিয় তা জানতে পারলে সেই কাজটি করতে আমরা ব্ৰতী হতাম। সে সময় আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন (অনুবাদ): “আকাশ ও যামীনে বিদ্যমান সমস্ত কিছুই আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করে, তিনিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। হে ঈমানদারগণ! তোমরা এরূপ কথা কেন বল যা কার্যকর করো না”— (সূরা সাফ ১-২)? আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাযিঃ) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াতটি পাঠ করে আমাদেরকে শুনান। সনদ সহীহ। আবূ সালামাহ্ (রহঃ) বলেনঃ এ আয়াত আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাযিঃ) আমাদেরকে পাঠ করে শুনান। ইয়াহইয়া (রহঃ) বলেন, এ আয়াত আবূ সালামাহ্ (রহঃ) আমাদেরকে পাঠ করে শুনান। ইবনু কাসীর (রহঃ) বলেন, এ আয়াত আমাদেরকে আওযাঈ (রহঃ) পাঠ করে শুনান। 'আবদুল্লাহ (রহঃ) বলেন, ইবনু কাসীর (রহঃ) আমাদেরকে এ আয়াতটি পাঠ করে শুনান। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীস মুহাম্মাদ ইবনু কাসীর কর্তৃক আওযাঈর সূত্রে রিওয়ায়াতের প্রসঙ্গে মতের অমিল আছে। আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারাক (রহঃ) আওযাঈ হতে, তিনি ইয়াহইয়া ইবনু আবী কাসীর হতে, তিনি হিলাল ইবনু আবী মাইমূনাহ হতে, তিনি আতা ইবনু ইয়াসার হতে, তিনি আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাযিঃ) কিংবা আবূ সালামাহ হতে, তিনি আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাযিঃ) হতে এই সূত্রে এ হাদীস রিওয়ায়াত করেছেন। আর ওয়ালীদ ইবনু মুসলিম এ হাদীসটি আওযাঈর সূত্রে মুহাম্মাদ ইবনু কাসীর বর্ণিত হাদীসের একই রকম রিওয়ায়াত করেছেন।
3310। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ সূরা আল-জুমুআহ অবতীর্ণ হওয়াকালে আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটেই ছিলাম। তিনি তা পাঠ করলেন। “আর তিনি তাদের জন্যও (রাসূল) যারা এখনো তাদের সঙ্গে মিলিত হয়নি”— (সূরা জুমুআহ ৩) পর্যন্ত পৌছলে এক লোক তাকে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! এখনো যারা আমাদের সঙ্গে মিলিত হয়নি তারা কারা? রাসূলুল্লাহঃ তার কথায় জবাব দিলেন না। বর্ণনাকারী বলেন, তখন সালমান (রাযিঃ) আমাদের সঙ্গেই ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালমান (রাযিঃ)-এর উপর তার হাত রেখে বললেনঃ সেই মহান সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! যদি ঈমান সুরাইয়্যাহ নক্ষত্রেও থাকে তবুও তাদের মাঝের কিছু লোক তা নিয়ে আসবে। সহীহঃ সহীহ হাদীস সিরিজ (হাঃ ১০১৭), বুখারী ও মুসলিম। সাওর ইবনু যাইদ হলেন মাদানী এবং সাওর ইবনু ইয়াযীদ হলেন শামী (সিরীয়)। আবূল গাইসের নাম সালিম, আবদুল্লাহ ইবনু মুতীর মুক্তদাস। তিনি মাদীনার অধিবাসী একজন নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি গারীব। আবদুল্লাহ ইবনু জাফার হলেন ‘আলী ইবনুল মাদীনীর বাবা, ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন তাকে যঈফ বলেছেন।
3311। জাবির (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, একদা জুমুআহর সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে খুতবাহ দিচ্ছিলেন। সে সময় মাদীনার একটি (ব্যবসায়ী) কাফিলা এসে হাযির হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীদের মাঝ হতে আবূ বাকর ও উমর (রাযিঃ)-সহ বারোজন ব্যতীত প্রত্যেকেই সেদিকে তাড়াতাড়ি চলে যায়। এই পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়ঃ “যখন তারা দেখল ব্যবসায় বা কৌতুক, সে সময় আপনাকে দাড়ানো অবস্থায় রেখে তারা সেদিকে ছুটে গেল”— (সূরা জুমুআহ ১১) সহীহঃ বুখারী ও মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ। আহমাদ ইবনু মানী হুশাইম হতে, তিনি হুশাইম হতে, তিনি সালিম ইবনু আবিল জা'দ হতে, তিনি জাবির (রাযিঃ) হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সূত্রে উপর্যুক্ত হাদীসের একই রকম বর্ণনা করেছেন। আবূ ঈসা বলেন, এ বর্ণনাটিও হাসান সহীহ।
3312। যাইদ ইবনু আরকাম (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি আমার চাচার সঙ্গে ছিলাম। আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ইবনু সালুলকে আমি তার সঙ্গীদের উদ্দেশে বলতে শুনলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গীদের জন্য তোমরা আর অর্থ খরচ করবে না, তারা যতক্ষণ পর্যন্ত না (তার হতে) আলাদা হয়ে যায়। আমরা মাদীনায় ফিরে গেলে তখন অবশ্যই সেখানে প্রবলরা হীনদেরকে বহিষ্কার করবে। এ কথা আমি আমার চাচাকে জানলে তা তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানান। আমাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ডাকেন এবং তার নিকট আমি ঘটনা ব্যক্ত করি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ও তার সঙ্গীদেরকে ডেকে পাঠান। শপথ করে তারা বলে যে, তারা (এ কথা) বলেনি। সে সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে মিথ্যাবাদী ও তাকে সত্যবাদী ধারণা করলেন। এতে আমার এত কষ্ট লাগল যে, আগে কখনও এ রকম কষ্ট হয়নি। আমি ভারাক্রান্ত মনে ঘরে বসে রইলাম। আমার চাচা বললেন, তুমি এমন ব্যাপারে কেন জড়িত হতে গেলে যার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট তুমি মিথ্যাবাদী হলে ও তার অসন্তুষ্টির কারণ হলে? এ পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা যখন “মুনাফিকুরা যখন তোমার নিকট আসে” (অর্থাৎ সূরা আল-মুনাফিকূন) অবতীর্ণ করেন। তখন আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ডেকে পাঠান এবং তিনি উক্ত সূরা তিলাওয়াত করেন, তারপর বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা তোমার সত্যবাদিতার সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। সহীহঃ বুখারী (হাঃ ৪৯০০, ৪৯০৪), মুসলিম (হাঃ ৮/১১৯)। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ।
3313। যাইদ ইবনু আরকাম (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে যুদ্ধে গেলাম। কিছু সংখ্যক বেদুঈনও আমাদের সঙ্গে ছিল। আমরা পানির উৎসের দিকে যাচ্ছিলাম। কিন্তু আমাদের পূর্বেই বেদুঈনরা পানির উৎসে গিয়ে পৌছায়। এক বেদুঈন তার সঙ্গীদের পূর্বে পৌছে। সে হাউয (চৌবাচ্চা) সম্পূর্ণ করে তার চতুর্দিকে পাথর রেখে দিত এবং তার উপর চামড়া বিছিয়ে দিয়ে তা ঢেকে দিত, যাতে তার সাথী এসে যায় (এবং অন্যরা পানি নিতে না পারে)। উক্ত বেদুঈনের কাছে এসে এক আনসারী লোক তার উটকে পানি পান করানোর জন্য এর লাগাম (নাসারন্দ্রের দড়ি) হালকা করে ছেড়ে দিল, কিন্তু বেদুঈন তার উটকে পানি পান করতে বাধা দেয়। এতে আনসারী ব্যক্তি (ক্রুদ্ধ হয়ে) পানির উৎসগুলো সরিয়ে ফেলে। সে সময় একটি কাষ্ঠ খণ্ড তুলে নিয়ে বেদুঈন আনসারীর মাথায় জোরে আঘাত করে এবং এর ফলে তার মাথা ফেটে যায়। উক্ত আনসারী মুনাফিক্ সরদার আবদুল্লাহ ইবনু উবাইর নিকট গিয়ে তাকে ঘটনা সম্পর্কে জানায়। আনসারী তার দলেরই লোক ছিল। ‘আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ক্ষিপ্ত হয়ে বলে, যে বেদুঈনরা আল্লাহ তা'আলার রাসূলের সঙ্গে রয়েছে তাদেরকে সহায়তাদান বন্ধ করে দাও। তবেই তার চারপাশ হতে তারা আলাদা হয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আহার করার সময় তার নিকট বেদুঈনরা হাজির হত (এবং তার সঙ্গে আহার করত)। তাই আবদুল্লাহ বলল, যে সময় বেদুঈনরা মুহাম্মাদের নিকট হতে অন্যত্র চলে যাবে তার নিকট তখন খাবার উপস্থিত করবে; যাতে তিনি ও তার নিকট উপস্থিত (অন্যরা) তা আহার করেন। তারপর আবদুল্লাহ তার সাথীদেরকে আরো বলল, আমরা যদি মাদীনায় ফিরে যেতে পারি তবে সম্মানিতরা তোমাদের মাঝের হীনদেরকে তাড়িয়ে দিবে। যাইদ ইবনু আরকাম (রাযিঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিছনে একই সওয়ারীতে ছিলাম। আবদুল্লাহর কথা আমি শুনে ফেললাম এবং আমার চাচাকে জানালাম। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে গিয়ে তা অবহিত করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে (আবদুল্লাহ ইবনু উবাই-কে) ডেকে পাঠান। সে শপথ করে এবং অস্বীকার করে। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বিশ্বাস করলেন এবং আমাকে অবিশ্বাস করলেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমার চাচা আমার নিকট এসে বললেন, এটাই তো তুমি চেয়েছিলে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমার প্রতি অসন্তুষ্ট হোন এবং তিনি ও মুসলিমগণ তোমাকে মিথ্যুক বলে আখ্যায়িত করুন। বর্ণনাকারী বলেন, আমি এতটাই ভারাক্রান্ত হলাম যতটা কখনো কেউ হয়নি। তিনি আরো বলেন, তারপর আমি ভারাক্রান্ত হয়ে মাথা নত করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গেই সফর অব্যাহত রাখলাম। এ পরিস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট এসে আমার কান মললেন এবং আমার সম্মুখে হেসে দিলেন। যদি আমি চিরস্থায়ী জীবন (বা জান্নাত) লাভ করতাম তবুও এতটা খুশী হতাম না। তারপর আবূ বাকর (রাযিঃ) এসে আমার সঙ্গে দেখা করে প্রশ্ন করলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাকে কি বলেছেন? আমি বললাম, আমাকে তিনি কিছুই বলেননি; তিনি কেবল আমার কান মলেছেন এবং আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছেন। আবূ বাকর (রাযিঃ) বললেন, তোমার জন্য সুখবর। অতঃপর আমার সঙ্গে উমার (রাযিঃ) এসে দেখা করেন। যে কথা আমি আবূ বাকর (রাযিঃ)-কে বলেছিলাম তাকেও তাই বললাম। অতঃপর আমরা ভোরে উপনিত হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরা আল-মুনাফিকূন পাঠ করলেন। হাদীসটির সানাদ সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এটি হাসান সহীহ হাদীস।
3314। আল-হাকাম ইবনু উতাইবাহ্ (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, মুহাম্মাদ ইবনু কাব আল-কুরাযীকে আমি চল্লিশ বছর আগে যাইদ ইবনু আরকুম (রাযিঃ)-এর মাধ্যমে রিওয়ায়াত করতে শুনেছি যে, তাবুক যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আব্দুল্লাহ ইবনু উবাই বলল, আমরা মদিনায় ফিরে যেতে পারলে সেখান হতে সম্মানিতরা অবশ্যই হীন লোকদের বের করে দিবে। বর্ণনাকারী বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে তাকে বিষয়টি জানালাম। কিন্তু সে এ কথা বলেনি বলে শপথ করে। এতে আমার গোত্রের লোকেরা আমাকে দোষারোপ করে এবং বলে, তুমি কি এটাই চেয়েছিলে? আমি দুশ্চিন্তগ্রস্ত অবস্থায় বাড়ীতে ফিরে এসে আসার হয়ে শুয়ে রইলাম। আমার নিকট রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে বলেন বা আমি তার নিকট গেলে তিনি বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা তোমাকে সত্যবাদী ঘোষণা করেছেন। বর্ণনাকারী বলেন, (এই পরিপ্রেক্ষিতে) এ আয়াত অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ) “এরা সেই লোক যারা বলে, রাসূলের সঙ্গী-সাথীদের জন্য তোমরা অর্থব্যয় বন্ধ করে দাও, যার ফলে তারা আলাদা হয়ে যায়"- (সূরা মুনাফিকূন ৭)। সহীহঃ বুখারী (হাঃ ৪৯০২)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3315। আমর ইবনু দীনার (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাযিঃ)-কে বলতে শুনেছেন, একটি যুদ্ধে আমরা উপস্থিত ছিলাম। সুফইয়ান বলেন, তা বানী মুসতালিকের যুদ্ধ ছিল। এক মুহাজির এক আনসারীর নিতম্বে আঘাত করলে মুহাজির লোক ডাকেন, হে মুহাজির ভাইয়েরা। আনসারী লোকটিও ডাকেন, হে আনসার ভাইয়েরা। তা শুনতে পেয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ জাহিলী যুগের ডাকাডাকি হচ্ছে কেন? লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! এক মুহাজির এক আনসারীর নিতম্বে আঘাত করেছে। তিনি (রাসূলুল্লাহ) বলেনঃ এ ডাকাডাকি বন্ধ কর, কারণ এটা ঘৃণিত ডাক। বিষয়টি আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ইবনু সালুলের কানে পৌছলে সে বলল, এত বড় সাহস! এ কাজ তারা করেছে? আল্লাহর কসম! যদি আমরা মাদীনায় ফিরে যেতে পারি তাহলে অবশ্যই সেখান হতে সম্মানিতরা হীনদেরকে বিতাড়িত করবে। উমর (রাযিঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে অনুমতি দিন, এই মুনাফিকের ঘাড় আমি উড়িয়ে দেই। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তাকে এড়িয়ে চল। লোকেরা যেন বলতে না পারে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সঙ্গীদেরকে খুন করেন। আমর ইবনু দীনার (রহঃ) ছাড়া অপর এক বর্ণনাকারী বলেন, ‘আবদুল্লাহ ইবনু উবাইর ছেলে 'আবদুল্লাহ (রাযিঃ) (তার বাবাকে) বলেন, আল্লাহর কসম! আপনি এ কথা যতক্ষণ স্বীকার না করবেন যে, “আপনিই হীন আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন মহাসম্মানিত", ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি মাদীনায় ফিরে যেতে পারবেন না। তারপর সে তা স্বীকার করে। সহীহঃ বুখারী ও মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3316। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, যার নিকটে তার রবের (প্রতিপালকের) ঘর (কাব্য) যিয়ারাতের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ আছে অথচ হাজ্জ করে না, অথবা এতটা সম্পদ আছে যাতে তার উপর যাকাত ওয়াজিব হয় কিন্তু যাকাত আদায় করে না, সে মৃত্যুর সময় দুনিয়াতে আবার ফিরে আসার আরজ করবে। তখন এক ব্যক্তি বললেন, হে ইবনু আব্বাস আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করুন, দুনিয়াতে ফিরে আসার আর্জি তো শুধু কাফিররাই করবে। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বললেন, আমি এখনই তোমাকে কুরআন পাঠ করে শুনাচ্ছিঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি যেন তোমাদেরকে আল্লাহ তা'আলার স্মরণ থেকে গাফিল না করে, যারা গাফিল হবে তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত। আমি তোমাদেরকে যে জীবিকা দিয়েছি, তা হতে খরচ কর তোমাদের কারো মৃত্যু আসার পূর্বে। অন্যথায় (মৃত্যু আসলে) সে বলবে, হে আমার রব। আমাকে তুমি আরো কিছুকালের জন্য ছাড় দিলে আমি দান-খাইরাত করতাম এবং সৎকর্মপরায়ণ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। কিন্তু যখন কারো নিৰ্দ্ধারিতকাল (মৃত্যু) চলে আসবে, তখন আল্লাহ তা'আলা তাকে কিছুই ছাড় দিবেন না। তোমরা যা কর আল্লাহ তা'আলা সে প্রসঙ্গে পূর্ণ অবগত" (সূরাঃ আল-মুনাফিকুন- ৯-১১)। লোকটি বলল, কি পরিমাণ সম্পদে যাকাত ওয়াজিব হয়? তিনি বললেন, দুই শত দিরহাম বা ততোধিক মালে। সে বলল, কিসে হাজ্জ ওয়াজিব হয়? তিনি বললেনঃ পাথেয় ও যানবাহন থাকলে। সনদ দুর্বল আবদ ইবনু হুমাইদ-আবদুর রাযুযাক হতে তিনি সুফিয়ান সাওরী হতে তিনি ইয়াহইয়া ইবনু আবূ হাইয়্যা হতে তিনি দাহহাক হতে তিনি ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূত্রে উপরোক্ত হাদীসের মতই বর্ণনা করেছেন। ইবনু উয়াইনা প্রমুখ এ হাদীস আবূ জানাব হতে তিনি দাহহাক হতে তিনি ইবনু আব্বাস (রাঃ) সূত্রে তার বিবৃতরূপে একই রকম বর্ণনা করেছেন এবং মারফু হিসেবে বর্ণনা করেননি। আবদুর রাযযাকের রিওয়ায়াতের তুলনায় এটি (মাওকুফ বর্ণনাটি) অনেক বেশি সহীহ। আবূ জানাবের নাম ইয়াহইয়া ইবনু আবূ হাইয়্যা এবং তিনি হাদীসশাস্ত্রে তেমন মজবুত নন।
3317। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, এক লোক তার নিকট নিম্নোক্ত আয়াত প্রসঙ্গে প্রশ্ন করে (অনুবাদ) “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের সহধর্মিণী ও সন্তান-সন্ততিদের মাঝে কেউ কেউ তোমাদের দুশমন। অতএব তাদের ব্যাপারে তোমরা সাবধান থাকবে”— (সূরা তাগাবুন ১৪)। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) বলেন, এরা হল মাক্কাবাসীদের মাঝ হতে ইসলাম গ্রহণকারী, এরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে (হিজরত করে) চলে আসতে চাচ্ছিল, কিন্তু তাদের স্ত্রী ও সন্তানরা তাদেরকে বাধা দিচ্ছিল যেন তারা তাদেরকে ছেড়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট চলে না আসে। পরে তারা (হিজরত করে) যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এখানে (মাদীনায়) চলে এসে প্রত্যক্ষ করেন যে, লোকেরা (তাদের আগে আগত ব্যক্তিগণ) দীন বিষয়ে প্রচুর জ্ঞান লাভ করেছে, তখন তারা তাদের স্ত্রীগণ ও সন্তানদের সাজা দেয়ার প্রতিজ্ঞা করে। আল্লাহ তা'আলা তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন (অনুবাদ) “হে মু’মিনগণ! তোমাদের সহধর্মিণী ও সন্তানদের মাঝে কেউ কেউ তোমাদের দুশমন....."— (সূরা তাগাবুন ১৪)। হাদীসটি হাসান। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ।
3318। উবাইদুল্লাহ ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু আবী সাওর (রহঃ) বলেন, ইবনু আব্বাস (রাযিঃ)-কে আমি বলতে শুনেছি, আমি উমার (রাযিঃ)-এর নিকট রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সেই দু’জন সহধর্মিণী প্রসঙ্গে প্রশ্ন করতে চাচ্ছিলাম যাদের প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “যদি তোমরা দু’জন অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহ তা'আলার দিকে রুজু হও তবে তা ভাল, কারণ তোমাদের দু'জনের মন ঝুঁকে পড়েছে"- (সূরা তাহরীম ৪)। অবশেষে উমার (রাযিঃ) হজ্জে গেলেন এবং আমিও তার সঙ্গে হাজ্জে গেলাম। পাত্র হতে আমি পানি ঢেলে দিলাম এবং তিনি উযূ করলেন। আমি বললাম, হে আমীরুল মুমিনীন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সেই দু’জন স্ত্রী কে যাদের প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “যদি তোমরা দু’জন অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহ তা'আলার দিকে রুজু হও তবে ভাল, কেননা তোমাদের দু'জনের মন ঝুঁকে পড়েছে"- (সূরা তাহরীম ৪)। উমার (রাযিঃ) বলেন, হে ইবনু আব্বাস! আশ্চর্য (তুমি এটুকুও জান না) যুহরী (রহঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! এ কথায় প্রশ্ন করা তার নিকট মন্দ লেগেছে, কিন্তু তিনি তা লুকিয়ে রাখেননি। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) বলেন, তিনি আমাকে বললেন, তারা দু’জন আয়িশাহ ও হাফসাহ। তারপর তিনি ঘটনাটির ব্যাখ্যা দিতে আরম্ভ করেন। তিনি বলেন, আমরা কুরাইশগণ মহিলাদের উপর প্রভাবশালী ছিলাম। কিন্তু মাদীনায় পৌছে আমরা দেখলাম, এখানকার পুরুষদের উপর মহিলারা প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। সুতরাং আমাদের মহিলারা এখানকার মহিলাদের অভ্যাস আয়ত্ত করে। একদিন আমি আমার সহধর্মিণীর উপর রাগ করলে সে আমার কথার প্রত্যুত্তর করে। কিন্তু তার প্রত্যুত্তর করাটাকে আমি অপছন্দ করলাম। সে বলল, এতে আপনার মন্দ লাগার কি আছে। আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সহধর্মিণগণও তার কথার প্রত্যুত্তর করেন এবং সকাল হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের কেউ কেউ তো তার সংস্পর্শ থেকে চলে যান। উমার (রাযিঃ) বলেন, আমি মনে মনে বললাম, যে তাদের মাঝে তা করে সে তো বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হল। উমর (রাযিঃ) বলেন, আমার বসতি ছিল মাদীনার উচ্চভূমিতে বনু উমাইয়্যার এলাকায়। আমার এক আনসার প্রতিবেশী ছিল। পর্যায়ক্রমে আমরা দু’জনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাজলিসে আসা-যাওয়া করতাম। তদনুযায়ী একদিন সে তার মাজলিসে গিয়ে ওয়াহী ও অন্যান্য বিষয়ের খবর নিয়ে এসে তা আমাকে জানাত এবং একদিন আমি তথায় গিয়ে (ফিরে এসে) তাকে একই রকম খবর দিতাম। উমার (রাযিঃ) বলেন, আমাদের মাঝে আলোচনা হচ্ছিল যে, আমাদের বিপক্ষে গাসসানীরা যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য তাদের ঘোড়াগুলো তৈরী করছে। একদা রাতের বেলা সে আমার দরজায় এসে করাঘাত করলে আমি তার নিকটে বেরিয়ে এলাম। সে বলল, একটি মারাত্মক ঘটনা ঘটেছে। আমি বললাম, গাসসানীরা কি এসে গেছে? সে বলল, তার তুলনায়ও আরো মারাত্মক ঘটনা ঘটেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন। উমার (রাযিঃ) বলেন, আমি মনে মনে বললাম, হাফসাহ হতভাগিনী ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমি পূর্বেই ভাবছিলাম এমন একটা কিছু ঘটবে। তিনি বলেন, আমি ফজরের নামায আদায় করে কাপড়-চোপড় পরিধান করে রাওয়ানা হলাম এবং হাফসাহর কক্ষে গিয়ে প্রত্যক্ষ করলাম যে, সে কাঁদছে। আমি বললাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদেরকে তালাক দিয়েছেন কি? হাফসাহ (রাযিঃ) বলেন, আমি জানি না, তবে তিনি ঐ উপরের কুঠরিতে নির্জনতা অবলম্বন করেছেন। তিনি বলেন, তারপর ওখান হতে আমি বের হয়ে এক কৃষ্ণাঙ্গ গোলামের কাছে এসে বললাম, উমারের জন্য ঢোকার অনুমতি চাও। উমার (রাযিঃ) বলেন, তখন সে ভিতরে ঢুকল, তারপর আমার কাছে ফিরে এসে বলল, তার নিকট আমি আপনার কথা বলেছি কিন্তু তিনি নিশ্চুপ ছিলেন। উমার (রাযিঃ) বলেন, অতঃপর আমি মসজিদে চলে এলাম। সেখানে মিম্বারের আশেপাশে আমি কিছু সংখ্যক লোককে কান্নারত দেখলাম। তাদের নিকট আমিও বসলাম, কিন্তু আমার অস্থিরতা বেড়ে গেল। তাই আমি পুনরায় ঐ দাসের নিকট এসে বললাম, তুমি উমারের জন্য ঢোকার অনুমতি চাও। অতঃপর সে ভিতর বাড়িতে প্রবেশ করে আবার ফিরে এসে বলল, আপনার কথা আমি তাকে বলেছি কিন্তু তিনি কিছুই বলেননি। আমি পুনরায় মসজিদে ফিরে এলাম এবং বসে পড়লাম, কিন্তু আমাকে একই চিন্তা চিন্তান্বিত করে তুলল। তাই আমি সেই গোলামের নিকট গিয়ে বললাম, 'উমারের জন্য ঢোকার অনুমতি চাও। সে ভিতরে ঢুকে ফিরে এসে বলল, আপনার কথা আমি তাকে বলেছি কিন্তু তিনি কিছুই বলেননি। উমার (রাযিঃ) বলেন, আমি ফিরে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ দাসটি আমাকে ডেকে বলল, ভিতরে প্রবেশ করুন। তিনি আপনাকে ঢোকার অনুমতি দিয়েছেন। তারপর ভিতরে প্রবেশ করে আমি প্রত্যক্ষ করলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাটাইয়ের উপর হেলান দিয়ে শুয়ে আছেন এবং তার প্রত্যেক বাহুতে চাটাইয়ের দাগ পড়ে আছে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আপনার স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন কি? তিনি বলেনঃ না। আমি বললাম, আল্লাহু আকবার (আল্লাহ মহান)। হে আল্লাহর রাসূল! আপনি দেখুন, আমরা কুরাইশগণ মহিলাদের উপরে প্রভাব বিস্তার করে রাখতাম। কিন্তু মাদীনায় পৌছে আমরা দেখলাম যে, একদল ব্যক্তিদের উপর তাদের নারীরাই প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে। আমাদের মহিলারা তাদের নারীগণের এ অভ্যাস আয়ত্ত করে নিয়েছে। একদিন আমি আমার স্ত্রীর উপর রাগান্বিত হলাম, কিন্তু সে আমার প্রতিটি কথার প্রত্যুত্তর করল। আমি তার এমন আচরণকে অতীব মন্দ মনে করলাম। সে বলল, কেন এটা আপনি পছন্দ করছেন না। আল্লাহর শপথ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীগণও তো তার কথার প্রত্যুত্তর করেন, এমনকি তাদের কেউ কেউ সকাল হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার সঙ্গ ত্যাগ করে কাটান। উমার (রাযিঃ) বলেন, আমি হাফসাকে প্রশ্ন করলাম, তুমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কি কথা কাটাকাটি কর? সে বলল, হ্যাঁ, আর আমাদের কেউ কেউ তো সকাল হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার সঙ্গ ত্যাগ করে কাটিয়ে দেয়। আমি বললাম, তোমাদের মাঝে যে এমন করেছে সে তো হতভাগিনী ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ সম্পর্কে তোমাদের কেউ কি নিরাপদ হয়ে গেছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কারো প্রতি নাখোশ হওয়ার কারণে আল্লাহ তা'আলাও তার উপর নাখোশ হবেন এবং ফলে সে ধ্বংস হবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অল্প হাসলেন। উমার (রাযিঃ) বলেন, অতঃপর আমি হাফসাহকে বললাম, তুমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে ঝগড়া করবে না এবং তার নিকট কোন কিছুর বায়না ধরবে না। যা কিছুর তোমার দরকার হয় আমার কাছে চাইবে। আর তুমি ধোকা খেও না, তোমার সতীন তোমার তুলনায় সুন্দরী এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খুব বেশি প্রিয়। উমার (রাযিঃ) বলেন, (এ কথা শুনে) তিনি আবার মুচকি হাসি দিলেন। অতঃপর আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার সঙ্গে আরো কিছু সময় কাটাই তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। উমর (রাযিঃ) বলেন, মাথা তুলে ঘরের মাঝে তাকিয়ে আমি কেবল তিনটি চামড়া ব্যতীত আর কিছুই দেখিনি। তাই আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আপনার উম্মাতের আর্থিক স্বচ্ছলতার জন্য আল্লাহ তা'আলার নিকট দু'আ করুন। তিনি তো পারস্য ও রোমের বসবাসকারীদেরকে প্রাচুর্য দান করেছেন, অথচ তারা আল্লাহ তা'আলার ইবাদাত করে না। (এ কথায়) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উঠে সোজা হয়ে বসলেন এবং বললেনঃ হে খাত্তাবের ছেলে! তুমি এখনো সন্দেহের মাঝে আছ কি? এরা তো এরূপ লোক যাদেরকে নিজস্ব সৎকর্মের প্রতিদান পার্থিব জীবনেই দেয়া হয়েছে। উমার (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মাস তার সহধর্মিণীদের সঙ্গে মেলামেশা না করার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। এজন্য আল্লাহ তা'আলা তার উপর অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের কাফফারার (ক্ষতিপূরণ) বন্দোবস্ত করেন। যুহরী (রহঃ) বলেন, উরওয়াহ্ (রহঃ) আমার নিকট আয়িশাহ (রাযিঃ)-এর সূত্রে রিওয়ায়াত করেছেন যে, তিনি বলেছেন, উনত্রিশ দিন পার হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রথমে আমার নিকট আসেন। তিনি বলেনঃ হে আয়িশাহ! আমি তোমার নিকট একটি বিষয় উল্লেখ করছি, তোমার পিতা-মাতার সঙ্গে তুমি এ প্রসঙ্গে আলোচনা না করেই তাড়াহুড়া করে জবাব দিবে না। আয়িশাহ (রাযিঃ) বলেন, অতঃপর এ আয়াতটি তিনি পাঠ করেন (অনুবাদ): “হে নবী। আপনি আপনার স্ত্রীগণকে বলুন, যদি তোমরা পার্থিব জীবন ও তার সৌন্দর্য কামনা কর....."— (সূরা আহযাব ২৮)। আয়িশাহ (রাযিঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! তিনি অবগত যে, আমার পিতা-মাতা আমাকে তার হতে আলাদা হওয়ার অনুমতি না। আয়িশাহ্ (রাযিঃ) বলেন, আমি বললাম, এ প্রসঙ্গে আমার পিতা-মাতার কি পরামর্শ চাইব? আমি তো আল্লাহ ও তার রাসূল এবং আখিরাতের বাসস্থান প্রত্যাশা করি। সহীহঃ বুখারী ও মুসলিম। মা'মার (রহঃ) বলেন, আইউব আমাকে জানান যে, আয়িশাহ্ (রাযিঃ) তাকে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি যে আপনাকেই বেছে নিয়েছি তা আপনার অন্যান্য স্ত্রীকে জানাবেন না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা আমাকে মুবাল্লিগ (প্রচারক) হিসেবে পাঠিয়েছেন, কষ্ট-কাঠিন্যে নিক্ষেপকারী হিসেবে নয়। হাসানঃ সহীহ হাদীস সিরিজ (হাঃ ১৫১৬), মুসলিম জাবির (রাযিঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ গারীব। এ হাদীস ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে একাধিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে
3319। আবদুল ওয়াহিদ ইবনু সুলাইম (রহঃ) বলেন, 'আত্মা ইবনু আবী রাবাহ (রাহঃ)-এর সঙ্গে আমি মক্কায় পৌছে দেখা করলাম। তাকে আমি বললাম, হে আবূ মুহাম্মাদ! এখানে আমাদের কিছু লোক তাকদীর স্বীকার করে না। আত্বা (রাহঃ) বলেন, ওয়ালীদ ইবনু উবাদাহ ইবনুস সামিত (রাহঃ)-এর সঙ্গে দেখা করলে তিনি বলেন, আমার বাবা আমার নিকট রিওয়ায়াত করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমি বলতে শুনেছিঃ সর্বপ্রথম আল্লাহ তা'আলা কলম সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি কলমকে বললেন, লিখ। তখন কলম লিখতে শুরু করে এবং অনন্তকাল পর্যন্ত যা কিছু ঘটবে তা লিপিবদ্ধ করে। সহীহঃ ২১৫৫ নং হাদীস পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। হাদীসে সংশ্লিষ্ট একটি ঘটনা রয়েছে। আবূ ঈসা বলেন, এটি হাসান সহীহ গারীব হাদীস। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে।
3320। আল-আব্বাস ইবনু আবদুল মুত্তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি একদল লোকের সাথে আল-বাতহা নামক কংকরময় জায়গায় বসা ছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মধ্যে বসা ছিলেন। তখন তাদের মাথার উপর দিয়ে এক খণ্ড মেঘ উড়ে যাচ্ছিল। তারা সে দিকে তাকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা এর নাম জান কি? তারা বললঃ হ্যাঁ, এক খণ্ড মেঘ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল-মুযনু। সাহাবাগণ বললেন, আল-মুযনু? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হ্যা, আনান (মেঘ)-ও। তারা বলল আল-আনান। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন তোমরা কি জান, আকাশ ও যমিনের মাঝের ব্যবধান কত? তারা বললেনঃ আল্লাহর শপথ আমরা জানি না। তিনি বললেনঃ এতদুভয়ের মধ্যে একাত্তর বা বাহাত্তর বা তিয়াত্তর বছরের দূরত্ব। এক আকাশের উপর অপর যে আকাশ রয়েছে তার ব্যবধানও অনুরূপ। এভাবে তিনি সপ্তম আকাশ পর্যন্ত দূরত্বের বর্ণনা দেন। তারপর তিনি বললেনঃ সপ্তম আকাশের উপর একটি সমুদ্র আছে, যার উপর ও তলদেশের মধ্যকার দূরত্ব (গভীরতা) এক আকাশ থেকে অপর আকাশের দূরত্বের সমান। আর এই সমুদ্রের উপর বন্য ছাগল অনুরূপ আটজন ফেরেশতা আছেন, যাদের পদতল ও হাটুর মধ্যবর্তী ব্যবধান এক আকাশ থেকে অপর আকাশের ব্যবধানের সমান। এদের পিঠের উপর আল্লাহর আরশ’ অবস্থিত, যার উপরিভাগ ও নিম্নভাগের মধ্যকার দূরত্ব (উচ্চতা) এক আকাশ হতে অপর আকাশের দূরত্বের সমান। আল্লাহ তার উপর (উপবিষ্ট)। যঈফ, ইবনু মাজাহ (১৯৩) আবদ ইবনু হুমাইদ (রহঃ) বলেন, আমি ইয়াহইয়া ইবনু মাঈনকে বলতে শুনেছি, আবদুর রহমান কি হাজ্জে যাবেন না (অবশ্য যাবেন), যাতে তার নিকট আমরা এ হাদীস শুনতে পারি। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। ওয়ালীদ ইবনু আবূ সাওর (রহঃ) সিমাকের সূত্রে এ হাদীস মারফুরূপে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। শারীক এ হাদীসের অংশবিশেষ সিমাকের সূত্রে মাওকুফরুপে বর্ণনা করেছেন, মারফুরূপে নয়। রাবী আব্দুর রহমান হলেন, ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু সা’দ আল-রাবী।
3321। ইয়াহইয়া ইবনু মূসা-আবদুর রহমান ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু সা’দ আর-রায়ী-তার পিতার সূত্রে বলেনঃ আমি বুখারায় এক ব্যক্তিকে কালো পাগড়ী পরিহিত অবস্থায় একটি খচ্চরের পিঠে বসা দেখলাম। তিনি বলছিলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এ পাগড়ী পরিয়ে দিয়েছেন। সনদ দুর্বল
3322। আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বাণী “কালমুহলি” (বিগলিত ধাতুর মত) এর ব্যাখ্যায় বলেছেনঃ অর্থাৎ (যাইতুন) তেলের গাদের মত হয়ে যাবে। কাফির ব্যক্তি তা মুখের নিকটে আনামাত্র তার মুখের চামড়া তাতে (গাদের মধ্যে) খসে পড়ে যাবে। যঈফ, পূর্বের ২৭০৭ নংহাদীসে উল্লেখিত হয়েছে আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি গারীব। আমরা শুধু রিশদীন ইবনু সাদের রিওয়াত হিসেবে এ হাদীস জেনেছি।
3323। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, জিনদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম না কিছু (কুরআন) পাঠ করে শুনিয়েছেন আর না তাদেরকে প্রত্যক্ষ করেছেন। (বরং ঘটনা এই যে, একদিন) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার একদল সাহাবীকে সঙ্গে নিয়ে উকায নামক বাজারে যাওয়ার জন্য রওয়ানা হন। ইতোমধ্যে আকাশের সংবাদ শোনার বিষয়ে জিনদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং তাদের বিরুদ্ধে উল্কাপিণ্ড নিক্ষিপ্ত হয়। অতঃপর শাইতান জিনেরা নিজেদের সম্প্রদায়ের নিকট ফিরে আসলে তখন তাদের অপরাপর জিনেরা প্রশ্ন করে, কি বিষয়! তারা বলে, আকাশের সংবাদ সংগ্ৰহ করতে আমাদের জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরী করা হচ্ছে এবং আমাদের প্রতি উল্কাপিণ্ড নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। তারা বলল, অবশ্যই নতুন কিছু ঘটার কারণে আমাদের ও আকাশের সংবাদ সংগ্রহের মধ্যে বাধার সৃষ্টি হয়েছে। পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিম সব জায়গায় তোমরা ঘুরে দেখ, কি ব্যাপার ঘটেছে যার কারণে তোমাদের ও আকাশের সংবাদের মাঝে বাধার সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং পৃথিবীর পূর্ব হতে পশ্চিম পর্যন্ত তারা তাদের আকাশের সংবাদের মাঝে বাধার কারণ বের করার জন্য বেরিয়ে পড়ল। যারা তিহামার উদ্দেশে বেরিয়েছিল তারা “নাখলা" নামক জায়গায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট হাযির হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উকাযের বাজারে যাওয়ার পথে এখানে অবস্থান করছিলেন। সে সময় সাহাবীদেরকে নিয়ে তিনি ফজরের নামায আদায় করছিলেন। জিনদের ঐ দলটি কুরআন মাজীদের তিলাওয়াত শুনতে পেয়ে গভীর মনোযোগের সাথে তা শুনে। তারা বলল, আল্লাহর কসম! এটাই সেই জিনিস যা তোমাদের ও আকাশের খবরের মধ্যে বাধার কারণ ঘটিয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, সে সময় তারা তাদের গোত্রে ফিরে গিয়ে বলল, হে আমাদের সম্প্রদায়! আমরা এক বিস্ময়কর কুরআন শুনেছি, আমাদেরকে যা কল্যাণের পথ দেখায়। তাই তার উপর আমরা ঈমান এনেছি। আর কখনো আমরা আমাদের প্রভুর সঙ্গে কাউকে অংশীদার করব না। আল্লাহ তা'আলা তার নবীর নিকট আয়াত অবতীর্ণ করেন (অনুবাদ) “আপনি বলুন, আমার নিকট ওয়াহী প্রেরণ করা হয়েছে যে, জিনদের একদল মনোযোগ সহকারে (কুরআন) শুনেছে"- (সূরা জিন ১)। এভাবে ওয়াহী দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিনদের আলাপচারিতা প্রসঙ্গে জানানো হয়। " সহীহঃ বুখারী (হাঃ ৪৯২১), মুসলিম (হাঃ ২/৩৫, ৩৬)। একই সনদে ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে আরো বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ এটাও জিনদের কথা যা তারা তাদের গোত্রকে বলেছিল, “আল্লাহ তা'আলার বান্দা যখন তাকে ডাকার জন্য দৃঢ়বদ্ধ হয় সে সময় তারা তার নিকট ভিড় জমায়”— (সূরা জিন ১৯)। আর যখন এই জিনেরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নামায আদায় করতে ও তার সাহাবীদেরও তার সঙ্গে নামায আদায় করতে এবং তার সিজদার সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকেও সিজদা করতে দেখে সে সময়েই তারা তার প্রতি সাহাবীদের এ আনুগত্যে অবিভূত হয়। তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলে, আল্লাহ তা'আলার বান্দা যখন তাকে (আল্লাহ তা'আলাকে) ডাকার জন্য দৃঢ়বদ্ধ হয় তখন তারা তার নিকট জড়ো হয়”। হাদীসটির সানাদ সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ।
3324। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, উর্ধ্ব জগতে জিনেরা যাতায়াত করত আকাশের সংবাদ সংগ্রহের জন্য। একটি কথা শুনতে পেলে তার সঙ্গে তারা নিজেদের পক্ষ হতে আরো নয়টি কথা সংযুক্ত করত। যার কারণে সেই একটি কথা সত্য হত এবং বাকি নয়টি কথা হত মিথ্যা। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়াতপ্রাপ্ত হলে উর্ধ্ব জগতে তাদের উপবেশনে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। সুতরাং (জিনেরা) এ ব্যাপারটি তারা ইবলিসকে অবহিত করে। আর ইতোপূর্বে কখনো তাদের প্রতি উল্কাপিণ্ড নিক্ষিপ্ত হয়নি। ইবলীস তাদেরকে বলল, পৃথিবীতে অবশ্যই নতুন কিছু ঘটেছে, যার কারণে এই প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং ইবলীস তার দলকে প্রেরণ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তারা দু'টি পাহাড়ের মাঝামাঝিতে নামায আদায় করতে দেখে। (ইমাম তিরমিয়ী বলেন,) আমার ধারণা হয় মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াহইয়া বলেছেন, মাক্কায় (নামায আদায় করতে দেখে)। তারপর তারা ইবলীসের সঙ্গে দেখা করে তাকে ব্যাপারটি জানায়। সে বলল, সেই নতুন ঘটনা এটাই যা দুনিয়াতে ঘটেছে। সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ।
3325। জাবির ইবনু আবদিল্লাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমি সাময়িকভাবে ওয়াহী বন্ধ থাকার বিষয়ের রিওয়ায়াত প্রসঙ্গে বলতে শুনেছিঃ আমি পথ চলছিলাম। এ সময়ে আমি উর্ধ্ব জগত হতে একটি আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমি মাথা তুলতেই প্রত্যক্ষ করলাম, হেরা গুহায় যে ফেরেশতা আমার নিকট এসেছিলেন তিনি আকাশ ও যামীনের মধ্যবর্তী জায়গায় একটি চেয়ারে বসে আছেন। তাকে দেখে আমি খুব ভীত হয়ে গেলাম। (ঘরে) ফিরে এসে আমি বললামঃ আমাকে তোমরা চাদরে ঢেকে দাও! আমাকে চাদর জড়িয়ে দাও। অতঃপর তারা আমাকে চাদর দিয়ে জড়িয়ে দিল। সে সময় আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেনঃ “হে বস্ত্রাচ্ছাদিত! উঠো, আর সাবধান করো .... আর পৌত্তলিকতা পরিত্যাগ করো"- (সূরা মুদ্দাসসির ১-৫)। এটা নামায ফরয হওয়ার পূর্বেকার ঘটনা। সহীহঃ বুখারী ও মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। হাদীসটি ইয়াহইয়া ইবনু আবী কাসীর (রাহঃ) আবূ সালামাহ্ ইবনু আবদুর রহমানের সূত্রে জাবির (রাযিঃ) হতে রিওয়ায়াত করেছেন। আবূ সালামাহর নাম আবদুল্লাহ।
3326। আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ সাউদ হল জাহান্নামের একটি পাহাড়। জাহান্নামীরা সত্তর বছর ধরে তার চূড়ায় আরোহণ করবে এবং তারপর সেখান থেকে সত্তর বছরে গড়িয়ে পড়বে। এভাবে তারা তাতে চিরকাল ধরে উঠবে ও নামবে। যঈফ, ২৭০২নংহাদীসে পূর্বে বর্ণিত হয়েছে আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি গারীব। আমরা শুধু ইবনু লাহীআর হাদীস হিসেবে এটিকে মারফু হিসেবে জেনেছি। আর এ হাদীসের মতই আত্যিয়া আবূ সাঈদ (রাঃ) সূত্রেও মাওকুফ হিসেবে বর্ণিত আছে।
3327। জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ কিছু সংখ্যক ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কয়েকজন সাহাবীর নিকটে প্রশ্ন করল, জাহান্নামের দারোগার সংখ্যা কত তা কি তোমাদের নবী জানেন? তারা বললেনঃ আমরা তা তার নিকটে জিজ্ঞেস না করে বলতে পারি না। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে এসে বললঃ হে মুহাম্মাদ। আজ আপনার সঙ্গীরা হেরে গেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ কেন তারা হেরে গেছে? সে বলল, ইয়াহুদীরা তাদের নিকটে প্রশ্ন করেছিল, তোমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি জানেন জাহান্নামের দারোগার সংখ্যা কত? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তারা কি জবাব দিয়েছে? সে বললঃ তারা বলেছে, আমরা আমাদের নবীকে জিজ্ঞেস না করে বলতে পারি না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সেই জাতি কি হেরে যায়, যাদের কাছে এমন ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয় যা তারা জানে না, তারপর তারা বলে, এ ব্যাপারে আমাদের নবীর নিকটে জিজ্ঞেস না করে আমরা বলতে পারি না? বরং ইয়াহুদীরা তো তাদের নবীর কাছে অযাচিত আবদার ধরেছিল, “আমাদেরকে প্রকাশ্যে আল্লাহ্ তা'আলাকে দেখান"। আল্লাহ তা'আলার শক্রদেরকে আমার নিকট নিয়ে এসো। আমি আল্লাহর এই শক্ৰদেরকে জান্নাতের মাটি প্রসঙ্গে প্রশ্ন করব। আর তা হল ময়দা। তারপর ইয়াহুদীরা এসে বলল, হে আবূল কাসিম! জাহান্নামের দারোগার সংখ্যা কত? তিনি বললেনঃ এত এতজন (এক হাতের আঙ্গুলের ইশারায়) দশজন এবং (অপর হাতের ইশারায়) নয়জন। তারা বলল, হ্যাঁ আপনি ঠিকই বলেছেন। এবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ জান্নাতের মাটি কিসের? রাবী বলেন, তারা কিছু সময় চুপ থাকার পর বলল, হে আবূল কাসিম! তা হল রুটি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ময়দার রুটি। যঈফ, যঈফা (৩৩৪৮), মুসলিম (৮/১৯১)। আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবনু সাঈদকে বললেনঃ জান্নাতের মাটি কেমন? তিনি বললেনঃ সাদা ময়দা মিসকের মত সুগন্ধি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সত্য বলেছে। আবূ ঈসা বলেনঃ আমরা এ হাদীসটি শুধুমাত্র এই সনদে মুজালিদের রিওয়ায়াত হিসেবে জেনেছি।
3328। আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “তিনিই সেই সত্তা যাকে ভয় করা উচিত। আর তিনিই বান্দার পাপ মার্জনা করার অধিকারী" (সূরাঃ আল-মুদাচ্ছির— ৫৬)। এই আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ আমিই কেবল মাত্র (বান্দার জন্য) ভয়ের যোগ্য। সুতরাং যে ব্যক্তি আমাকে ভয় করে, আমার সাথে কাউকে অংশীদার স্থির করে না, তাকে মাফ করার যথার্থ অধিকারী আমিই। যঈফ, ইবনু মাজাহ (৪২৯৯) আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান গারীব। হাদীস শাস্ত্রবিদগণের দৃষ্টিতে সুহাইল তেমন মজবুত রাবী নন। সাবিত হতে এ হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি একাকী।
3329। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর উপর কুরআন অবতীর্ণ হত তখন তিনি তা মুখস্থ করে নেয়ার জন্য (ফেরেশতার সঙ্গে সঙ্গে) জিহবা নাড়াতেন। এ অবস্থায় আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেনঃ “তাড়াতাড়ি ওয়াহী মুখস্থ করার জন্য তুমি তোমার জিহবা সঞ্চালন করো না....."— (সূরা কিয়ামাহু ১৬-২১)। অধঃস্তন বর্ণনাকারী মূসা তার ঠোঁট দু’টো নেড়ে দেখাতেন। সহীহঃ বুখারী ও মুসলিম। সুফইয়ানও তার ঠোঁট দু'টো নাড়তেন। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ। আলী ইবনুল মাদীনী বলেন, ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ আল-কাত্তান বলেছেন, সুফইয়ান আস-সাওরী (রহঃ) মূসা ইবনু আবী আয়িশাহর খুব সুনাম করতেন।
3330। সুওয়াইর (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি ইবনু উমার (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একজন সাধারণ মর্যাদাসম্পন্ন জান্নাতীর উদ্যানসমূহ, বিবিগণ, চাকরগণ এবং খাট-পালংকসমূহ কেউ দেখতে চাইলে তা তার জন্য হাজার বছরের রাস্তা। তাদের মধ্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট সর্বাধিক মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যায় তার চেহারা দেখতে সৌভাগ্য লাভ করবেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াত পাঠ করেনঃ “কিছু মুখমণ্ডল সেদিন উজ্জ্বল হবে এবং তারা তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে" (সূরাঃ আল-কিয়ামাহ- ২২-২৩)। যঈফ, যঈফা (১৯৮৫) আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি গারীব। একাধিক বর্ণনাকারী ইসরাঈলের সূত্রে হাদীসটি একইভাবে মারফু হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আবদুল মালিক ইবনু আবজার (রাহঃ) সুওয়াইর হতে তিনি (মুজাহিদ) ইবনু উমার (রাঃ) সূত্রে এটিকে তার কথা হিসেবে (মাওকুফ হিসেবে) বর্ণনা করেছেন, মারফু হিসেবে নয়। আল-আশজাঈ (রাহঃ) সুফিয়ান হতে তিনি সুওয়াইর হতে তিনি মুজাহিদ হতে তিনি ইবনু উমর (রাঃ) সূত্রে তার কথারূপে বর্ণনা করেছেন এবং মারফুরূপে বর্ণনা করেননি। আবূ ঈসা বলেন, আমাদের জানামতে এ হাদীসের সনদে সুফিয়ান ব্যতীত অন্য কেউ মুজাহিদের উল্লেখ করেননি। সুওয়াইর-এর ডাক নাম আবূ জাহম। আবূ ফাখি তার নাম সাঈদ ইবনু ইলাকা।
3331। আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, “আবাসা ওয়া তাওয়াল্লা" সূরাটি অন্ধ সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনু উম্মু মাকতুম (রাযিঃ) প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে এসে তিনি বলতে লাগলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে দ্বীনের সঠিক পথ বলে দিন। সে সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাজলিসে মুশরিকদের এক নেতৃস্থানীয় লোক হাযির ছিল। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এড়িয়ে চলেন এবং উক্ত নেতার প্রতি মনোযোগ দেন। ইবনু উম্মু মাকতুম (রাযিঃ) বলেন, আপনি কি মনে করেন- আমি যা বলছি তা মন্দ? তিনি বলতে থাকেনঃ না। এ প্রসঙ্গে সূরাটি অবতীর্ণ হয়। হাদীসটির সানাদ সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান গারীব। এ হাদীস কিছু বর্ণনাকারী হিশাম ইবনু উরওয়াহ হতে, তার বাবার সূত্রে রিওয়ায়াত করেছেন। তিনি বলেন, “আবাসাহ ওয়া তাওয়াল্লা" সূরাটি ইবনু উম্মু মাকতুম (রাযিঃ) প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি এ সনদে আয়িশাহ (রাযিঃ)-এর প্রসঙ্গ উল্লেখ করেননি।
3332। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদেরকে কিয়ামতের দিন নগ্নপদে, নগ্ন শরীরে ও খাতনাহীন অবস্থায় উঠানো হবে। এক মহিলা আয়িশাহ (রাযিঃ) বলেন, তবে কি আমাদের একে অন্যের গুপ্তস্থান দেখতে পাবে! তিনি বললেন, হে অমুক! “সেদিন তাদের সবার এরূপ গুরুতর পরিণতি হবে যা তাকে সম্পূর্ণরূপে ব্যতিব্যস্ত রাখবে”— (সূরা আবাসা ৩৭)। হাসান সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ। এ হাদীসটি একাধিক সনদে ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। এটি সাঈদ ইবনু জুবাইরও বর্ণনা করেছেন। এ অনুচ্ছেদে আয়িশাহ্ (রাযিঃ) হতেও হাদীস বর্ণিত আছে।
3333। ইবনু উমর (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দৃশ্যাবলী যে লোক চাক্ষুষভাবে প্রত্যক্ষ করতে উৎসাহী সে যেন “ইযাশ-শামসু কুব্বিরাত”, “ইযাস্ সামাউন ফাত্বারাত” ও “ইযাস্ সামাউন শাককাত" এ তিনটি সূরা পাঠ করে। সহীহঃ সহীহ হাদীস সিরিজ (হাঃ ১০৮১)। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান গারীব। হিশাম ইবনু ইউসুফ প্রমুখ বর্ণনাকারীগণ হাদীসটি উক্ত সনদে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেনঃ যে ব্যক্তি প্রত্যক্ষভাবে কিয়ামত দিবস অবলোকন করতে পছন্দ করে সে যেন “ইযাশ শামসু কুববিরাত" পাঠ করে। এ বর্ণনায় “ইযাস্ সামাউন ফাতারাত" এবং “ইযাস্ সামাউন শাকক্বাত” উল্লেখ করেননি।
3334। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বান্দা যখন একটি গুনাহ করে তখন তার অন্তরের মধ্যে একটি কালো চিহ্ন পড়ে। অতঃপর যখন সে গুনাহর কাজ পরিহার করে, ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং তওবা করে তার অন্তর তখন পরিষ্কার ও দাগমুক্ত হয়ে যায়। সে আবার পাপ করলে তার অন্তরে দাগ বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তার পুরো অন্তর এভাবে কালো দাগে ঢেকে যায়। এটাই সেই মরিচা আল্লাহ তা'আলা যার বর্ণনা করেছেনঃ “কখনো নয়, বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের মনে জং (মরিচা) ধরিয়েছে”— (সূরা মুত্বাফফিফীন ১৪)। হাসানঃ আত-তা’লীকুর রাগীব (হাঃ ২/২৬৮)। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ।
3335। ইবনু উমার (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, হাম্মাদ (রাহঃ) বলেন, আমাদের মতে এটি মারফু হাদীস (মহানবীর বাণী)। “সকল মানুষ যে দিন রাববুল আলামীনের সামনে দণ্ডায়মান হবে”— (সূরা মুত্ত্বাফফিফীন ৬) আয়াতের বর্ণনা সম্পর্কে তিনি বলেনঃ লোকেরা (কিয়ামতের মায়দানে) সেদিন কানের লতিকা পর্যন্ত ঘামে ডুবন্ত অবস্থায় দণ্ডায়মান থাকবে। সহীহঃ বুখারী ও মুসলিম, এটি ২৪২২ নং হাদীসের পুনরুল্লেখ।
3336। ইবনু উমার (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, “সকল মানুষ যেদিন বিশ্বপ্রভুর সম্মুখে দণ্ডায়মান থাকবে”— (সূরা মুত্ত্বাফফিফীন ৬) আয়াত প্রসঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মানুষ তার কানের লতিকা পর্যন্ত ঘামে দণ্ডায়মান থাকবে। সহীহ, দেখুন পূর্বের হাদিস। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ। এ অনুচ্ছেদে আবূ হুরাইরাহיי (রাযিঃ) হতেও হাদীস বর্ণিত আছে।
3337। আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমি বলতে শুনেছিঃ কিয়ামতের দিন নিখুঁতভাবে যার হিসাব নেয়া হবে সে তো বিলীন হয়ে যাবে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তা'আলা তো বলেছেনঃ “যাকে তার ‘আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে, তার হিসাব-নিকাশ অতি সহজেই হবে”— (সূরা আল-ইনশিকাক ৭-৮)। তিনি বললেনঃ সে তো নামমাত্র হাযির করা। সহীহঃ বুখারী ও মুসলিম, ২৪২৬ নং হাদীস পূর্বেও বর্ণিত হয়েছে। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। সুয়াইদ ইবনু নাসর 'আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারাক হতে, তিনি উসমান ইবনুল আসওয়াদ হতে, উক্ত সনদে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। মুহাম্মাদ ইবনু আবান প্রমুখ-‘আবদুল মুলাইকাহ হতে, তিনি আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সূত্রে উপরোক্ত হাদীসের একই রকম বর্ণনা করেছেন।
3338। আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যার হিসাব নেয়া হবে সে তো আযাবপ্রাপ্ত হবে। হাসান সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি গারীব। আমরা শুধু কাতাদাহ্ হতে আনাস (রাযিঃ)-এর বরাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সূত্রে হাদীসটি অবগত হয়েছি।
3339। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “আল ইয়াউমুল মাওউদ”— (সূরা বুরুজ ২) অর্থ- কিয়ামতের দিন; “আল-ইয়াউমুল মাশহুদ”— (সূরা হুদ ১০৩) অর্থঃ আরাফাতে (উপস্থিতির) দিন এবং “আশ-শাহিদ" (সূরা বুরুজ ৩) অর্থঃ জুমুআর দিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেনঃ যে সমস্ত দিনে সূর্য উদিত হয় ও অস্ত যায় তার মাঝে জুমুআর দিনের তুলনায় বেশি ভাল কোন দিন নেই। এ দিনের মধ্যে এমন একটি সময় আছে, ঠিক সে সময় কোন মুমিন বান্দা আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করলে তার প্রার্থনা তিনি কবুল করেন এবং যে বস্তু (অনিষ্ট) হতে সে আশ্রয় প্রার্থনা করে তা হতে তিনি তাকে আশ্রয় দান করেন। হাসানঃ মিশকাত তাহকীক সানী (হাঃ ১৩৬২), সহীহ হাদীস সিরিজ (হাঃ ১৫০২)। আলী ইবনু হুজর-কুররান ইবনু তাম্মাম আল আসাদী হতে, তিনি মুসা ইবনু উবাইদাহর সনদে উপরোক্ত হাদীসের একই রকম বর্ণনা করেছেন। মূসা ইবনু উবাইদাহ আর-রাবায়ীর উপনাম আবূ আবদুল আযীয। ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ আল-কাত্তান প্রমুখ তার স্মরণশক্তির দুর্বলতার সমালোচনা করেছেন। অবশ্য শু’বাহ, সুফইয়ান আস-সাওরী প্রমুখ ইমামগণ মূসা ইবনু উবাইদাহ হতে হাদীস রিওয়ায়াত করেছেন। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। এ হাদীস কেবল মূসা ইবনু উবাইদাহর সনদেই আমরা অবগত হয়েছি। হাদীসশাস্ত্রে মূসা ইবনু উবাইদাকে দুর্বল আখ্যায়িত করা হয়েছে। ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ প্রমুখ তাকে তার স্মৃতিশক্তির দিক হতে কমজোড় বলেছেন।
3340। সুহাইব ইবনু সিনান আর-রুমী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসরের নামায আদায় করার পর নিঃশব্দে কিছু তিলাওয়াত করতেন। কারো মতে 'হামস্' অর্থ ‘ঠোট নাড়ানো। যেন তিনি কথা বলছেন। তাই তাকে প্রশ্ন করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! আসরের নামায আদায় করার পর আপনি ঠোট নেড়ে থাকেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আল্লাহ তা'আলার একজন নবী তার উম্মাতের (সংখ্যাধিক্যের) জন্য অধিক খুশী হন। তাই তিনি মনে মনে বলেন, কারা তাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে! সে সময় আল্লাহ তা'আলা তার নিকট ওয়াহী পাঠানঃ তাদেরকে তুমি দুটি বিষয়ের যে কোন একটি গ্রহণের এখতিয়ার দাওঃ হয় তাদের উপর আমি প্রতিশোধ নিব কিংবা শক্রবাহিনীকে তাদের উপর আধিপত্য দান করব। তারা প্রতিশোধ নেয়াকে এখতিয়ার করল। অতঃপর তাদের উপর আল্লাহ তা'আলা মৃত্যু চাপিয়ে দিলেন, ফলে এক দিনেই তাদের সত্তর হাজার লোক মারা গেল। সহীহঃ তাখরীজ আল-কালিমুত তাইয়্যিব (হাঃ ১২৫/৮৩)। বর্ণনাকারী বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ঘটনা উদ্ধৃত করতেন সে সময় এর সঙ্গে তিনি আরো একটি ঘটনা বলতেন। তিনি বলেন জনৈক বাদশার এক যাদুকর ছিল। বাদশাকে সে ভবিষ্যদ্বাণী শুনাত। যাদুকরটি লোকদেরকে বলল, আমাকে তোমরা একটি বুদ্ধিমান, সাবধানী ও ধিশক্তি সম্পন্ন বালক এনে দাও। আমি তাকে আমার জ্ঞান শিখিয়ে দিব। কারণ আমার মনে হচ্ছে যে, আমি মারা গেলে আমার এ বিদ্যা হতে তোমরা বঞ্চিত হবে। তোমাদের মাঝে এই জ্ঞান সম্পন্ন আর কেউ থাকবে না। তিনি বলেনঃ লোকেরা (যাদুকরের) কথামত একটি বুদ্ধিমান ছেলে খুঁজে বের করে এবং তাকে সেই যাদুকরের নিকট প্রত্যহ যাতায়াতের ও তার সাহচর্য লাভের আদেশ দেয়। ছেলেটি সেই যাদুকরের নিকট যাতায়াত করতে থাকে। ছেলেটির যাওয়া-আসার পথে একটি গীর্জায় এক পাদ্রী (রাহেব) অবস্থানরত ছিল। বর্ণনাকারী মা'মার বলেন, আমার বিশ্বাস সে সময় গীর্জার পাদ্রীগণ তাওহীদের বিশ্বাসী মুসলিম ছিলেন। সে এ পাদ্রীর কাছ দিয়ে যাতায়াতকালে তার নিকট (দীন প্রসঙ্গে) প্রশ্ন করত। অবশেষে সে বলল, আমি আল্লাহ তা’আলার ইবাদত করি। তারপর পাদ্রীর নিকট ছেলেটি অবস্থান করতে শুরু করে এবং যাদুকরের নিকট বিলম্বে উপস্থিত হয়। যাদুকর ছেলের অভিভাবককে বলে পাঠায় যে আমার আশঙ্কা হয় সে আমার নিকট আসবে না। বালক পাদ্রীকে এ বিষয়টি অবহিত করলে তিনি তাকে বলেন, তুমি কোথায় ছিলে যাদুকর তোমাকে এ প্রশ্ন করলে তুমি বলবে, আমি বাড়ীতে ছিলাম। আর তোমাকে অভিভাবকরা প্রশ্ন করলে তুমি বলবে, আমি যাদুকরের নিকট ছিলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এভাবে বেশ কিছু দিন বালকটির কেটে গেল। একদিন সে এক বিরাট সংখ্যক লোকের নিকট দিয়ে যাচ্ছিল। তাদের পথে একটি হিংস্র জন্তু বাধা হয়ে দাড়ায়। কেউ কেউ বললেন, ঐ জন্তুটি ছিল বাঘ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ বালকটি একটি পাথর তুলে নিয়ে বলে, হে আল্লাহ! পাদ্রী যা বলে তা যদি সত্য হয় তাহলে আমি আপনার নিকট চাই যে, এ জন্তুটিকে আমি হত্যা করি। এ কথা বলে সে পাথরটি ছুড়ে মারল এবং জন্তুটি হত্যা করল। লোকেরা বলল, জন্তুটি কে হত্যা করেছে? লোকেরা বলল, এ বালকটি। লোকেরা বিমর্ষ হয়ে বলল, এমন জ্ঞান সে আয়ত্ত করেছে যা আর কারো নিকটে নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এক অন্ধ লোক এ ঘটনা শুনতে পেয়ে তাকে বলল, যদি তুমি আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিতে পার তবে তোমাকে আমি এই এই পরিমাণ সম্পদ দিব। বালকটি তাকে বলল, তোমার নিকট আমি তা চাই না। তবে যদি তোমার দৃষ্টিশক্তি তুমি ফিরিয়ে পাও তাহলে যিনি তোমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিবে তার উপর কি তুমি ঈমান আনবে? অন্ধ বলল, হ্যাঁ। তারপর আল্লাহ তা'আলার নিকট ছেলেটি দু'আ করল এবং আল্লাহ তা'আলা তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলেন। অন্ধ ব্যক্তিও ঈমান আনল। বিষয়টি বাদশার কানে গিয়ে পৌছলে সে তাদের ডেকে পাঠায়। তার নিকট তাদেরকে হাযির করা হলে সে বলল, তোমাদের প্রত্যেককে আমি এক এক নতুন পন্থায় হত্যা করব যে পন্থায় তার সঙ্গীকে হত্যা করব না। সে পাদ্রী ও অন্ধ লোকটিকে হত্যার হুকুম দিল এবং সে অনুযায়ী এদের একজনের মাথার উপর করাত চালিয়ে হত্যা করা হয় এবং অন্যজনকে আরেকভাবে হত্যা করা হয়। তারপর বালকটি প্রসঙ্গে বাদশা বলল, একে ঐ পর্বতে নিয়ে যাও এবং তার চূড়া হতে তাকে ফেলে দাও। অতঃপর তারা তাকে নিয়ে সেই পর্বতে গেল। যখন তারা পাহাড়ের সেই নির্দিষ্ট জায়গা হতে তাকে ফেলে দিতে প্রস্তুত হল তখন একে একে তারা সকলে পড়ে মারা গেল এবং বালকটি ব্যতীত কেউই বাকি থাকল না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ সে ফিরে এলে বাদশা তাকে নিয়ে নদীতে ডুবিয়ে মারার জন্য লোকদেরকে হুকুম দিল। তারপর তাকে নদীতে নিয়ে যাওয়া হল। আল্লাহ তা'আলা বালকটির সাথী সকলকে ডুবিয়ে হত্যা করলেন এবং তাকে বাঁচিয়ে রাখলেন। পরবর্তীতে ছেলেটিই বাদশাকে বলল, আমাকে তুমি হত্যা করতে পারবে না। তবে আমাকে তুমি শূলে চড়িয়ে “এ বালকের প্রতিপালকের নামে” বলে তীর নিক্ষেপ করলেই কেবল আমাকে হত্যা করতে পারবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তার কথামত বাদশা হুকুম দিল এবং অতঃপর তাকে শূলে চড়িয়ে “এই বালকের প্রতিপালকের নামে" বলে তীর নিক্ষেপ করল, ছেলেটি তার হাত তার কান ও মাথার মাঝের জায়গায় স্থাপন করল এবং মারা গেল। লোকেরা বলল, এমন জ্ঞান বালকটি লাভ করেছে যা আর কেউই লাভ করতে পারেনি। কাজেই এই বালকের প্রতিপালকের উপর আমরাও ঈমান আনলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ বাদশাকে বলা হল, আপনি তো তিন ব্যক্তির বিরোধিতায় ভয় পেয়ে গেলেন। এখন সারা দুনিয়াই তো আপনার বিরোধী হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ সে সময় বাদশা একটি সুদীর্ঘ গর্ত খুঁড়ে তাতে কাঠ দিয়ে আগুন ধরায়, তারপর লোকদেরকে একসঙ্গে বলে, “যে তার ধর্ম হতে ফিরে আসবে তাকে ছেড়ে দিব এবং যে ধর্ম হতে না ফিরবে তাকে আমি এ আগুনে নিক্ষেপ করব"। ঈমানদার লোকদেরকে সে আগুনের গর্তে নিপতিত করতে লাগল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এ প্রেক্ষিতেই আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, “গর্তের অধিপতিরা ধ্বংস হয়েছে, যে গর্তে আগুন প্রজ্জ্বলিত ছিল। যখন ওরা ঐ গর্তের পাশে বসা ছিল, আর ওরা ঈমানদারদের সঙ্গে যা করছিল তা প্রত্যক্ষ করছিল। তারা তাদেরকে যুলম করেছিল কেবল এ কারণে যে, তারা মহাশক্তিমান ও প্রশংসিত আল্লাহ তা'আলার প্রতি ঈমান এনেছিল"- (সূরা বুরুজ ৪-৮)। বর্ণনাকারী বলেন, বালকটিকে দাফন করা হয়েছিল। রাবী বলেন, উল্লেখিত আছে যে, ঐ বালকের লাশ উমর (রাযিঃ)-এর খিলাফতকালে তোলা হয়েছিল। মারা যাওয়ার সময় তার হাত যেভাবে তার কান ও মাথার মধ্যবর্তী জায়গায় রাখা ছিল সেভাবেই তাকে পাওয়া যায়। সহীহঃ মুসলিম (৮/২২৯-২৩১) আয়াতের উল্লেখ ব্যতীত। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান গারীব।
3341। জাবির (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মানুষের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য আমি প্রেরিত হয়েছি যতক্ষণ না তারা “লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহ" (আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত কোন মা’বুদ নেই) বলে। এ কথা তারা মনে-প্রাণে স্বীকার করে নিলে তাদের জান-মাল আমার হতে নিরাপদ করে নিল। কিন্তু ইসলামের বিধান (অপরাধের জন্য) প্রযোজ্য থাকবে। আর তাদের চূড়ান্ত হিসাব আল্লাহ তা'আলার উপর অর্পিত। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াত পাঠ করেন (অনুবাদ) “আপনি তো একজন উপদেশদাতা মাত্র। আপনি তাদের কর্ম নিয়ন্ত্রক নন”— (সূরা গাশিয়াহ ২১-২২)। সহীহ মুতাওয়াতিরঃ ইবনু মাজাহ (হাঃ ৭১)। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ।
3342। ইমরান ইবনু হুসাইন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জোড় ও বেজোড়" (সূরাঃ আল-ফাজর-৩) প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেনঃ তা নামায, যার (রাকাআত সংখ্যা) কিছু জোড় এবং কিছু বেজোড়। সনদ দুর্বল আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি গারীব। আমরা শুধু কাতাদার রিওয়ায়াত হিসেবে এ হাদীস জেনেছি। খালিদ ইবনু কাইসও কাতাদা হতে এ হাদীস বর্ণনা করেছেন।
3343। আবদুল্লাহ ইবনু যাম'আহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, একদিন আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে (সামূদ জাতির প্রতি প্রেরিত) উষ্ট্রী ও তার হত্যাকারী প্রসঙ্গে কথোকথন করতে শুনেছি। তিনি পাঠ করেনঃ “এদের মাঝে যে সবচেয়ে হতভাগ্য সে যখন তৎপর হল”— (সূরা আশ-শামস্ ১২)। তারপর তিনি বলেনঃ উষ্ট্রীকে খুন করতে সেই জাতির সর্বাধিক শক্তিশালী, নিষ্ঠুর, বিদ্রোহী ও দুর্ভাগা লোক উঠেছিল, সে আবূ যাম'আহর মত প্রভাবশালী ও শক্তিধর ছিল। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর আমি মহিলাদের প্রসঙ্গেও তাকে আলোচনা করতে শুনলাম। তিনি বলেনঃ এমন লোকও তোমাদের মাঝে আছে যে তার সহধর্মিনীকে দাসীর ন্যায় চাবুক মারে কিন্তু আবার ঐ দিন শেষে রাতের বেলা তার সঙ্গে মিলিত হয়। এটা কতই না মন্দ ও জঘন্য বিষয়। অতঃপর বায়ু নিঃসরণ করে হাসি দেয়া প্রসঙ্গে উপদেশ প্রদান পূর্বক তিনি বলেনঃ নিজেই যে কাজ করে সে কাজে তোমাদের কারো কি হাসা উচিত? সহীহঃ ইবনু মাজাহ (হাঃ ১৯৮৩), বুখারী, মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3344। আলী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, বাকীতে একটি জানাযায় আমরা হাযির ছিলাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও এসে বসলেন এবং তার সঙ্গে আমরাও বসলাম। তার সঙ্গে একটি কাঠ ছিল যা দিয়ে তিনি যামীন খুঁড়ছিলেন। অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মাথা তুলে বলেনঃ কোন সৃষ্টিই এরূপ নেই যার বাসস্থান লিখিত হয়নি। লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! তবে আমাদের সেই লেখার উপর আমরা কি নির্ভর করব না? যে আমাদের মাঝে ভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত সে তো সৌভাগ্যসুলভ কাজই করবে, আর যে হতভাগ্যদের দলভুক্ত সে তো দুর্ভাগ্যের কর্মই করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ বরং তোমরা আমল করতে থাক। কারণ যাকে যে আমলের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে সেটাই তার জন্য সহজসুলভ করে দেয়া হয়েছে। যে লোক ভাগ্যবানদের দলভুক্ত তার জন্য সৌভাগ্যসুলভ আমলই সহজতর করা হয়েছে এবং যে লোক হতভাগ্যদের দলভুক্ত তার জন্য দুর্ভাগ্যজনক কাজই সহজতর করা হয়েছে। অতঃপর তিনি তিলাওয়াত করেনঃ “সুতরাং কেউ দান করলে, মুত্তাকী হলে এবং যা ভাল তা সঠিক মনে করে গ্রহণ করলে তার জন্য আমি সুগম করে দিব সহজ পথ। আর কেউ কৃপণতা করলে ও নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করলে, আর যা ভাল তা অস্বীকার করলে আমি তার জন্য সুগম করে দিব কঠোর পথ”- (সূরা লাইল ৫-১০)। সহীহঃ বুখারী ও মুসলিম, ২১৩৬ নং হাদীস পূর্বে সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছে। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3345। জুনদাব আল-বাজালী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আমি এক গুহার মাঝে ছিলাম। সে সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আঙ্গুল হতে রক্তক্ষরণ হলে তিনি বলেনঃ তুই একটি আঙ্গুল মাত্র। তোর মাঝ হতে রক্ত বের হল। যা তোর উপর দিয়ে ঘটল তা আল্লাহ তা'আলার রাস্তাই। বর্ণনাকারী বলেন, জিবরীল (আঃ) কিছু দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট না এলে মুশরিকরা বলল, মুহাম্মাদ পরিত্যক্ত হয়েছে। সে সময় আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেনঃ “তোমার প্রভু তোমাকে ত্যাগও করেননি বা তোমার প্রতি নাখোশও হননি"- (সূরা আয-যুহা ৩)। সহীহঃ বুখারী ও মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। এ হাদীস শুবাহ ও সাওরী (রাহঃ) আল-আসওয়াদ ইবনু কুইস হতে রিওয়ায়াত করেছেন।
3346। মালিক ইবনু সাসা'আহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ একদিন বাইতুল্লাহর নিকট আমি ঘুম ঘুম ভাব অবস্থায় অবস্থানরত ছিলাম। এমন সময় আমি এক বক্তাকে বলতে শুনলামঃ তিনজনের মধ্যে একজন। তারপর একখানা সোনার পেয়ালা আমার নিকট আনা হল যার মাঝে যমযমের পানি ছিল। তারপর আমার বক্ষদেশ তারা এই এই পর্যন্ত উম্মুক্ত বা বিদীর্ণ করে। কাতাদাহ (রাহঃ) বলেন, আমি আনাস (রাযিঃ)-কে বললাম, কোন পর্যন্ত তিনি বললেনঃ (তিনি বলেছেন) আমার পেটের নিম্নদেশ পর্যন্ত। অতঃপর আমার অন্তঃকরণ বের করে যমযমের পানি দ্বারা ধুয়ে আবার স্ব-স্থানে স্থাপন করা হয়। এরপর তা ঈমান ও হিকমত দ্বারা পরিপূর্ণ করা হয়। হাদীসে সুদীর্ঘ ঘটনা বিদ্যমান। সহীহঃ বুখারী ও মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3347। আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ যে ব্যক্তি সূরা ওয়াত-তীন ওয়ায-যাইতুন পাঠ করে সে যেন “আলাইসাল্লাহু বিআহকামিল হাকিমীন” (আল্লাহ তা'আলা কি সকল বিচারকের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিচারক নন) পাঠের পর বলেঃ “বালা ওয়া আনা আলা যালিকা মিনাশ-শাহিদীন (হ্যা, অবশ্যই আমিও এ কথার সাক্ষ্যদানকারীদের অন্তর্ভুক্ত)। যঈফ, যঈফ আবূ দাউদ (১৫৬) আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি যে আরব বিদুইন আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন তার নাম অপরিচিত।
3348। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, “আমিও শাস্তি প্রদানকারী ফেশেতাদেরকে আহবান করব”— (সূরা ‘আলাক ১৮) আয়াতের বর্ণনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আবূ জাহল বলল, যদি মুহাম্মাদকে আমি নামাযরত অবস্থায় পাই তবে তার ঘাড় পদদলিত করব। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যদি তাই করতে সে প্রস্তুত হত তাহলে ফেরেশতারা তখনই তাকে আটক করত। সহীহঃ বুখারী (হাঃ ৪৯৫৮)। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান, সহীহ গারীব।
3349। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায আদায় করছিলেন। আবূ জাহল তখন এসে বলল, আমি কি তোমাকে এ কাজ করতে বারণ করিনি, আমি তোমাকে এ কাজ করতে কি বারণ করিনি, আমি তোমাকে এ কাজ করতে কি বারণ করিনি? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায সমাপ্ত করে তাকে ভৎসনা করলেন। আবূ জাহল বলল, তুমি নিশ্চয়ই জান যে, মক্কায় আমার তুলনায় বেশি সংখ্যক সমর্থক আর কারো নেই না)। সে সময় আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেনঃ “সে তার সহযোগীদের ডাকুক। আমি ডাকব জাহান্নামের প্রহরীদেরকে”— (সূরা ‘আলাক ১৭-১৮)। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) বলেন, আল্লাহর শপথ! যদি আবূ জাহল তার সহযোগীদেরকে ডাকত, তাহলে আল্লাহ তা'আলার প্রহরীগণ (ফেরেশতাগণ) তাকে অবশ্যই প্রেপ্তার করত। হদীসটির সানাদ সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান, সহীহ গারীব। এ অনুচ্ছেদে আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতেও হাদীস বর্ণিত আছে।
3350। ইউসুফ ইবনু সা'দ (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন হাসান (রাঃ) মুআবিআ (রাঃ)-এর নিকট বাই’আত গ্রহণের পর তার সামনে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলেনঃ আপনি (মুআবিয়ার নিকট বায়’আত গ্রহণ করে) মু'মিনদের চেহারা কলঙ্কিত করেছেন। এতে তিনি বললেনঃ তুমি আমাকে অভিযুক্ত করো না। আল্লাহ তা'আলা তোমার প্রতি রহমত করুন। যেহেতু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে (স্বপ্নে) উমাইয়্যা বংশীয়দেরকে তার মিম্বারের উপর দেখানো হয়েছে। বিষয়টি তার নিকট খারাপ লাগে। তখন অবতীর্ণ হয়ঃ “আমি অবশ্যই তোমাকে কাওসার (ঝরণা) দান করেছি" (সূরাঃ আল-কাওসার- ১) অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ! আমি জান্নাতে তোমাকে কাওসার নামক ঝরণা দান করেছি। আরো অবতীর্ণ হয়ঃ “নিশ্চয় আমি এ কুরআন মহিমান্বিত রাতে অবতীর্ণ করেছি। আর মাহিমান্বিত রাত প্রসঙ্গে আপনি কি জানেন? মহিমান্বিত রাত হাজার মাস হতেও উত্তম" (সূরাঃ আল-কাঁদর- ১-৩)। হে মুহাম্মাদ! আপনার পরে বানী উমাইয়্যা অত মাস শাসন করবে। কাসিম (রাহঃ) বলেনঃ আমরা গণনা করে দেখেছি বানী উমাইয়্যাদের শাসনকাল ছিল পূর্ণ এক হাজার মাস’, এর এক দিন কম বা বেশি নয়। সনদ দুর্বল ও অস্থির, মতন মুনকার। আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি গারীব। আমরা শুধু কাসিম ইবনুল ফাযলের হাদীস হিসেবে এটি জেনেছি। কথিত আছে যে, কাসিম ইবনুল ফাযল (রহঃ) ইউসুফ ইবনু মাযিনের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। কাসিম ইবনুল ফাযল আল-হুদ্দানী সিকাহ রাবী। ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ ও আবদুর রহমান ইবনু মাহদী তাকে বিশ্বাসযোগ্য বলেছেন। ইউসুফ ইবনু সা'দ অপরিচিত ব্যক্তি, আমরা শুধু উপরোক্ত সূত্রেই একই রকম শব্দে এ হাদীস বর্ণিত পেয়েছি।
3351। যির ইবনু হুবাইশ (রহঃ) বলেন, আমি উবাই ইবনু কা’ব (রাযি:) কে বললাম, আপনার ভাই আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) বলেন, সারা বছর যে লোক রাত জেগে ইবাদাত করবে সে কাদরের রাত লাভ করবে। উবাই (রাযিঃ) বলেন, আল্লাহ তা'আলা আবূ আবদুর রহমানকে মাফ করুন! নিশ্চয়ই তিনি জানেন যে, কাদরের রাত রমযানের শেষ দশ দিনে এবং তা সাতাশে রামযানের রাতেই। তবুও তার এ কথা বলার লক্ষ্য হল লোকেরা যেন (সাতাশ তারিখের) নির্ভর করে বসে না থাকে। তারপর কোন প্রকার ব্যতিক্রম না করেই উবাই (রাযিঃ) কসম করে বলেন, সাতাশের রাত কাদরের রাত। বর্ণনাকারী বলেন, আমি বললাম, হে আবূল মুনযির! এ কথা আপনি কিসের পরিপ্রেক্ষিতে বলছেন? তিনি বললেন, সেই আলামাত বা নিদর্শনের প্রেক্ষিতে যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে জানিয়েছেন। তা হলঃ ঐ দিন সকালে সূর্য এরূপভাবে উদিত হয় যে, তার মাঝে প্রখর রশ্মি থাকে না। হাসান সহীহঃ ৭৮৬ নং হাদীসেও পূর্বে অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ।
3352। আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এক লোক ইয়া খাইরাল বারিয়্যাহ্ (হে সৃষ্টির সেরা) বলে ডাকলে তিনি বললেনঃ সৃষ্টির সেরা হলেন ইবরাহীম (আঃ)। সহীহঃ মুসলিম (হাঃ ৭/৯৭)। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ।
3353। আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াত পাঠ করলেনঃ “সেই দিন দুনিয়া তার যাবতীয় সংবাদ ব্যক্ত করবে” (সূরাঃ আল-যিলযালঃ ৪)। তিনি বললেনঃ তোমরা কি জান দুনিয়ার সংবাদ কি? তারা বললেনঃ আল্লাহ ও তার রাসূলই বেশি জানেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তার সংবাদ হল—তার বুকে প্রত্যেক নর-নারী যা কিছু করেছে সে তার সাক্ষ্য দিবে। সে (দুনিয়া) বলবে, সে তো অমুক অমুক দিন এই এই কাজ করেছে। এটাই হল যমীনের সংবাদ। সনদ দুর্বল, ২৫৪৬ নং হাদীসে পূর্বে বর্ণিত হয়েছে আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান, সহীহ।
3354। মুতাররিফ ইবনু ‘আবদুল্লাহ ইবনুশ শিখখীর (রাহঃ) হতে তার বাবার সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গেলেন। তিনি তখন (সূরা তাকাসুর) “তোমাদেরকে সম্পদের প্রাচুর্যের মোহ আল্লাহ তা'আলা হতে উদাসীন করে ফেলেছে”— (সূরা তাকাসুর ১) পাঠ করছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আদম সন্তান বলে, আমার মাল; আমার সম্পত্তি। কিন্তু যে জিনিস তুমি দান-খাইরাত করেছ (আল্লাহ তা'আলার খাতায়) তা জমা রেখেছ, যা খেয়ে শেষ করেছ কিংবা যা পরিধান করে পুরাতন করেছ, এগুলো ব্যতীত তোমার সম্পদ বলতে কিছু নেই। সহীহঃ মুসলিম, ২৩২৯ নং হাদীস পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ।
3355। আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমরা কবরের আযাব প্রসঙ্গে সংশয়ে ছিলাম। সেই প্রেক্ষাপটে সূরা আলহাকুমুত-তাকাসুর অবতীর্ণ হয়। সনদ দুর্বল আবূ কুরাইব কখনো আমর ইবনু আবূ কাইস হতে তিনি ইবনু আবী লাইলা হতে তিনি আল-মিনহাল হতে তিনি এভাবে বর্ণনা করেছেন। আমর ইবনু আবূ কাইস হলেন আর-রায়ী এবং আমর ইবনু আবূ কাইস আল-মালাঈ হলেন কূফার বাসিন্দা। আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি গারীব।
3356। আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর ইবনুল আওওয়াম (রহঃ) হতে তার বাবার সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, যখন অবতীর্ণ হলঃ “তারপর তোমাদেরকে সেদিন অবশ্যই নি’আমাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে”— (সূরা তাকাসুর ৮)। সে সময় যুবাইর (রাযিঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদেরকে কোন নি’আমাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে? আমাদের নিকট তো শুধুমাত্র দু'ধরনের জিনিস রয়েছে? খেজুর ও পানি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সে (সম্পত্তি) তো অদূর ভবিষ্যতে অর্জিত হবে। হাদীসটির সানাদ হাসান। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান।
3357। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, যখন “তারপর তোমাদেরকে সেদিন নি'আমাত সম্পর্কে অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে”— (সূরা তাকাসুর ৮) আয়াত অবতীর্ণ হয় সে সময় লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদেরকে কোন সমস্ত নি’আমাত প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হবে? আমাদের নিকট তো শুধু দুটি কালো জিনিস (খেজুর ও পানি) রয়েছে; আর সর্বদা দুশমন প্রস্তুত রয়েছে এবং আমাদের তরবারিগুলো আমাদের কাধে ঝুলন্ত রয়েছে? তিনি বললেনঃ এটা অদূর ভবিষ্যতে হবে। পূর্বের হাদীসের সহায়তায় এটি হাসান। আবূ ঈসা (রাহঃ) বলেন, এ হাদীসের চাইতে মুহাম্মাদ ইবনু আমরের সূত্রে ইবনু উয়াইনাহ্ (রহঃ) বর্ণিত হাদীসটি আমার দৃষ্টিতে বেশি বিশুদ্ধ। সুফইয়ান ইবনু উয়াইনাহ্ (রহঃ) আবূ বাকর ইবনু আইয়্যাশের চেয়ে বেশি স্মরণশক্তি সম্পন্ন ও অনেক বিশুদ্ধ।
3358। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন বান্দার নিকট সর্বপ্রথম যে নি’আমাত প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে সে প্রসঙ্গে তাকে বলা হবে, আমি তোমার শরীর কি সুস্থ রাখিনি এবং সুশীতল পানির মাধ্যমে তোমাকে তৃপ্ত করিনি? সহীহঃ সহীহাহ (হাঃ ৫৩৯), মিশকাত (হাঃ ৫১৯৬)। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি গারীব। আয-যাহহাক হলেন ইবনু আবদুর রহমান ইবনু আরযাব। ইবনু আরযাব-কে ইবনু ‘আরযামও বলা হয়, আর ইবনু আরযামই অনেক বেশী সহীহ।
3359। আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, “অবশ্যই আমি তোমাকে কাওসার দান করেছি"- (সূরা কাওসার ১) আয়াত প্রসঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ কাওসার হল জান্নাতের একটি ঝর্ণা। বর্ণনাকারী বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেনঃ জান্নাতে আমি এমন একটি প্রস্রবণ দেখলাম যার প্রত্যেক তীরে মুক্তার তাবু খাটানো রয়েছে। আমি বললামঃ হে জিবরীল! এটা কি? তিনি বললেনঃ এটা সেই “কাওসার” আল্লাহ তা'আলা যা আপনাকে দান করেছেন। সহীহঃ বুখারী (হাঃ ৪৯৬৪)। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ।
3360। আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (মি'রাজের রাতে) যখন আমি জান্নাতের মাঝে ভ্রমণ করতে করতে এক নহরের সম্মুখে পৌছে গেলাম, যার প্রত্যেক তীরে মুক্তার তাবু খাটানো রয়েছে, ফেরেশতাকে আমি প্রশ্ন করলাম, এটা কি? তিনি বললেন, এটা সেই কাওসার যা আল্লাহ তা'আলা আপনাকে দান করেছেন। অতঃপর জিবরীল তার হাত দিয়ে এর মাটি তোলেন। তা ছিল কস্তুরী। অতঃপর আমাকে সিদরাতুল মুনতাহায় তোলা হয়। তার নিকট আমি এক বিরাটকায় নূর প্রত্যক্ষ করলাম। সহীহঃ বুখারী (হাঃ ৬৫৮১)। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ। এ হাদীস আনাস (রাযিঃ) হতে একাধিকভাবে বর্ণিত আছে।
3361। 'আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জান্নাতের একটি প্রস্রবণের নাম কাওসার, যার প্রত্যেক তীর সোনার এবং যার পানি মুক্তা ও ইয়াকুতের উপর দিয়ে প্রবাহমান। এর যমীন কস্তুরীর তুলনায় অধিক সুগন্ধসম্পন্ন, এর পানি মধুর তুলনায় অধিক মিষ্ট এবং বরফের তুলনায় অধিক সাদা। সহীহঃ ইবনু মাজাহ (হাঃ ৪৩৩৪)। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ।
3362। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীদের উপস্থিতিতে উমার (রাযিঃ) আমার নিকট অনেক বিষয় প্রসঙ্গে প্রশ্ন করতেন। তাকে আবদুর রহমান ইবনু আওফ (রাযিঃ) বলেন, আপনি তার নিকট প্রশ্ন করেন, অথচ আমাদেরও তার ন্যায় সন্তান-সন্ততি আছে। রাবী বলেন, "উমর (রাযিঃ) তাকে বললেন, তার নিকট প্রশ্ন করার কারণ আপনি জানেন। তারপর তিনি তাকে “যখন আল্লাহ তা'আলার সাহায্য ও বিজয় আসবে”— (সূরা নাসর ১) এ আয়াত প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেন। আমি বললাম, এটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর ইন্তিকালের খবর যে বিষয়ে আল্লাহ তা'আলা তাকে অবগত করেছেন। তিনি শেষ পর্যন্ত সূরাটি তিলাওয়াত করলেন। তারপর উমর (রাযিঃ) তাকে বলেন, আল্লাহর শপথ! এর যে ব্যাখ্যা আপনি জানেন আমিও তাই জানি। সহীহঃ বুখারী (হাঃ ৪৯৬৯, ৪৯৭০)। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ। এ সনদে মুহাম্মাদ ইবনু বাশশার-মুহাম্মাদ ইবনু জাফার হতে, তিনি শুবাহ হতে, তিনি আবূ বিশর (রাহঃ) হতে উপরের হাদীসের একই রকম বর্ণনা করেছেন। তবে এ বর্ণনায় বর্ণনাকারী বলেন, তারপর আবদুর রহমান ইবনু ‘আওফ (রাযিঃ) তাকে বলেন, আপনি এ ছেলের নিকট মাসআলাহ প্রশ্ন করেছেন, অথচ আমাদেরও এমন ছেলে রয়েছে।
3363। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন সাফা পাহাড়ের উপর উঠে “ইয়া সাবাহা" (হে ভোরের বিপদ) বলে উচ্চকণ্ঠে ডাকলেন। ফলে কুরাইশ গোত্রের লোকেরা তার নিকট একত্রিত হয়। তিনি বললেনঃ তোমাদেরকে আমি এক কঠিন শাস্তির ভয় দেখাচ্ছি। তোমাদের কি মত, যদি আমি তোমাদেরকে বলি যে, সকাল বা সন্ধ্যায় শক্র বাহিনী তোমাদেরকে আক্রমণ করার জন্য আসছে, তাহলে আমাকে কি তোমরা বিশ্বাস করবে? সে সময় আবূ লাহাব বলল, তোমার ধ্বংস হোক! এজন্য কি তুমি আমাদেরকে একত্রিত করেছ? সে সময় আল্লাহ তা'আলা “তাব্বাত ইয়াদ আবী লাহাব" সূরা অবতীর্ণ করেন। সহীহঃ বুখারী (হাঃ ৪৯৭১, ৪৯৭২), মুসলিম (হাঃ ১/১৩৪)। আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ।
3364। উবাই ইবনু কাব (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মুশরিকরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলল, আমাদেরকে আপনার প্রভুর বংশ বৃত্তান্ত দিন। এরই জবাবে মহান আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেনঃ কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ। আল্লাহুস্ সামাদ (“আপনি বলুন, তিনিই আল্লাহ” যিনি এক ও অদ্বিতীয়। আল্লাহ তা'আলা কারো মুখাপেক্ষী নন)। আর সামাদ (অমুখাপেক্ষী) তিনিই, যিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাকেও জন্ম দেয়া হয়নি। কেননা যে কারো ঔরসজাত হবে সে মারা যাবে এবং তার উত্তরাধিকারীও হবে। অথচ আল্লাহ তা'আলা মৃত্যুবরণ করবেন না এবং তার উত্তরাধিকারীও কেউ নেই। “এবং তার সমান কেউ নেই।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তার কোন সদৃশ ও সমকক্ষ নেই। “কোন কিছুই তার সদৃশ নয়।" (সূরা শূরা ১) “আর সামাদ তিনিই অংশ বাদে হাদীসটি হাসান, যিলালুল জান্নাহ।" তাহকীক সানী (হাঃ)
3365। আবূল আলিয়া (রাহঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুশরিকদের দেবতাদের প্রসঙ্গে আলোচনা করলে তারা বললেঃ আপনি আপনার প্রভুর বংশধারা আমাদেরকে জানিয়ে দিন। তখন জিবরাঈল আলাইহিস সালাম কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ সূরাটি নিয়ে আসেন...... উপরোক্ত হাদীসের অনুরূপ। এ সনদে উবাই ইবনু কা'ব (রাঃ)-এর উল্লেখ নেই। দুর্বল, প্রাগুক্ত সূত্রটি আবূ সাদের সনদ হতে বিশুদ্ধতর। আর আবূ সাদের নাম মুহাম্মাদ ইবনু মুইয়াসসার। আবূ জাফর-এর নাম ঈসা, আবূল আলিয়াহ-এর নাম রুফাই। তিনি কৃতদাস ছিলেন, একজন সাবিয়াহ মহিলা তাকে মুক্ত করেন।
3366। আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেনঃ হে ‘আয়িশাহ আল্লাহ তা'আলার নিকট এর ক্ষতি হতে আশ্রয় প্রার্থনা কর। কেননা এটাই হল গাসিক (অন্ধকার) যখন তা গাঢ় হয়। হাসান সহীহঃ সহীহ হাদীস সিরিজ (হাঃ ৩৭২), মিশকাত (হাঃ ২৪৭৫)। আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
3369। আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা'আলা যখন দুনিয়া সৃষ্টি করেন তখন তা দুলতে থাকে। তাই তিনি পর্বতমালা সৃষ্টি করে তাকে দুনিয়ার উপর স্থাপন করেন। ফলে দুনিয়া শান্ত হয়। পর্বতমালার শক্ত কাঠামোতে ফিরিশতাগণ বিস্মিত হয়ে বলেনঃ হে প্রতিপালক! আপনার সৃষ্টির মধ্যে পর্বতমালা হতেও কঠিন কোন কিছু আছে কি? আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হ্যাঁ, লোহা। তারা বললেনঃ হে রব! আপনার সৃষ্টির মধ্যে লোহা হতেও শক্ত ও মজবুত কোন কিছু আছে কি? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, আগুন। তারা বললেনঃ হে প্রতিপালক "আগুন হতেও আপনার সৃষ্টির মধ্যে শক্তিমান ও কঠিন অন্য কিছু আছে কি? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, পানি। তারা বললেনঃ প্ৰভু হে! আপনার সৃষ্টির মধ্যে পানি হতেও শক্তিশালী কিছু আছে কি? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, বায়ু। অবশেষে ফিরিশতাগণ বললেনঃ হে প্রতিপালক। বায়ু হতেও বেশি কঠিন ও শক্তিশালী আপনার সৃষ্টির মধ্যে কিছু আছে কি? আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ হ্যাঁ, সেই আদম-সন্তান, যে ডান হাতে দান-খাইরাত করলে তার বাম হাতের কাছে অজানা থাকে। যঈফ, মিশকাত (১৯২৩), তা’লীকুর রাগীব (২/৩১) আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি গারীব। আমরা শুধু উপরোক্ত সূত্রে এ হাদীস মারফু হিসেবে জেনেছি।
3723। আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি (জ্ঞানের ভাণ্ডার) পাঠশালা এবং আলী তার দরজা। যঈফ, মিশকাত (৬০৮৭) আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি গারীব মুনকার। কিছু রাবী এ হাদীস শারীক হতে বর্ণনা করেছেন এবং তারা এর সনদে আস-সুনাবিহী হতে’ উল্লেখ করেননি। অনন্তর আমরা উক্ত হাদীস শারীক হতে কোন নির্ভরযোগ্য রাবীর সূত্রে জানতে পারিনি। এ অনুচ্ছেদে ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতেও হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
উৎস: Jami At Tirmidhi
WEBREATH · 11:11
«Should I not be a thankful servant?» — Sahih al-Bukhari
Breath is one for all: everyone lives by it, whoever they are and whatever they believe. Every day at 11:11 local time people stop for sixty seconds, breathe, and thank GOD for the breath — each in their own words, each within themselves. In that minute we are One Breath.
WEBREATH — the Minute at 11:11, your own local time — we are One Breath